মুসা আল হাফিজ
দুয়ারে তোমার, রূহানী জোয়ার
ডাগর ডাগর ছিলো তার স্বপ্নের চোখ। দু চোখে ছিলো সাগর সাগর সুন্দরের তৃষ্ণা। হৃদয়ে ছিলো কাতর কাতর প্রেমের মধু। ফলে জগত জুড়ে ছড়িয়েছেন
শিল্পের আতর আতর সুবাতাস। মানবতার পাথর পাথর
জটিলতাকে ঢেকে দিয়েছেন উর্Ÿরতার পলিমাটি দিয়ে।
এখনো আত্মার বীজতলায় সেই পলিমাটির আস্তরণ
এখনো ইতিহাসের মহল্লায় সেই সুগন্ধির মৌ মৌ গরিমা!
কান পাতো, সময়ের তরঙ্গে কী শুনা
যাচ্ছেনা জামীর প্রেমগীতি?
হ্যাঁ, আবদুর রহমান জামীর
কথাই বলছি।
মহাকালের জমি চিরে বইতে থাকা তার শিল্পের নদী ঢেউ ঢেউ উল্লাসে
বলে চলছে- জামী বিশ্বসাহিত্যের যুবরাজ!
বাতাসের দিগন্ত জুড়ে উড়তে থাকা তার ছন্দের প্রজাপতিগুলো থৈ থৈ
উচ্ছাসে ডগমগ করে বলছে- তিনি সুন্দরের তুলনাহীন যাদুকর!
বিশ্বাসের উদ্যান জুড়ে প্রস্ফুটিত তার কবিতার ফুলগুলো খিলখিল
সৌরভে মাতোয়ারা হয়ে বলছে- তিনি চিরকালের কবি সার্বভৌম!
পূর্ণিমার মজলিসে উচ্চকিত তার প্রেমের পঙক্তিমালা খুশ খুশ গৌরবে
আমোদিত হয়ে বলছে- তিনি পরম প্রেমের অজেয় সেনাপতি!
বিশ্বাস, প্রেম, কবিতা- সবই যখন জামীতে আসক্ত, তখন আমি তাকে এড়িয়ে চলবো কোন সাহসে? আমিও প্রবেশ
করলাম তার রাজ্যে।
জামী তৈরী করেছেন কবিতার শরাবখানা। সেখানে ঢুকে দেখি কেবলই এশকের জজবা!
জামীর পেয়ালা স্পর্শ করলাম। ও আল্লাহ! এর মাজে তো রহস্যের অপার্থিব মাদকতা!
জামীর জামে চুমু দিলাম। ও আল্লাহ! এ তো আত্মার চিরন্তন আবেহায়াত!
জামীর সেতারে টুকা দিলাম। ও আল্লাহ! শুরু হয়ে গেলো অফুরন্ত হামদ-নাত!
দেখলাম জামীর জ্ঞানবৃে ঝুলছে সতেজ ও পরিপ কতো ফল!
আমি যখন ফলগুলো নেড়ে দেখছি, তখন আকাশে গোল চাঁদ চকচক করছিলো শাহী মূদ্রার মতো। কিন্তু আমি ফলের মুগ্ধতাকে পাঠ করছিলাম চাঁদের রূপ উপো করে। আকাশের আবেদনও তখন বড় হয়ে উঠেনি। কারণ জামীর রহস্যের
বাগান জুড়ে জড়ানো ছিলো এক অগাধ নত্রের নীলাকাশ। বাগানের ধূলোবালিতে সুগভীর শিহরণ। সেখানে কানে কানে অদ্ভূদ
আনন্দ ছড়িয়ে জ্যোৎস্নার ভাষা ধার করে কথা বলে তরুলতা।
আমি যখন ঘাসজমির শিশিরে জামীর শিহরণ ছড়িয়ে দিলাম, তখন পাশেই বিচরণশীল প্রাণীগুলো ব্যাকুল হয়ে উঠলো। তারা বঞ্চিত হতে চায়না সেই শিহরণ থেকে। তাদের ব্যাকুলতাকে
সমর্থন করলো পুকুরের রূপালি জল, এবং নত্রের দানার মতো
এক ঝাঁক উজ্জল মাছের চোখ। দেখলাম, সৌন্দর্যের সজীব স্থাপত্যের মতো যে উদ্যান, সেখানে বিছানো গালিচার মতো ভূমির হৃদয় ও যেনো কোন এক অমীয়ধারা
পান করতে বেকারার। সবাইকে পরিতৃপ্ত করবো, সে সাধ্য আমার কই?
বিব্রত আমি সুরের কোকিলকে আহ্বান করলাম জামী আবৃত্তির আসরে।
কোকিলের কন্ঠস্বরে জামী ধ্বণিত হচ্ছেন। এক আশ্চর্য অতলতা কেবলই প্রশস্ত হচ্ছে সেই সুরে। শব্দের ঝংকারে নড়ে উঠছে জন্ম-জন্মান্তর!
জামীর ছন্দগুলো আমার সমগ্র সত্তায় ফুটিয়ে তুললো রঙ-বেরঙের ফুল।
অনুভব করলাম হৃদয়জুড়ে অজস্র নত্রের নাচ! আমার শরীরটাই যেনো নিমেষে
হয়ে উঠলো মোহনীয় মাদকের মৌজ! টের পেলাম শিরায় শিরায় হুঁ হুঁ করছে কবিতার স্রোত। রক্তের তরঙ্গে সঙ্গীতের বিহ্বলতা।
সেই সঙ্গীতে কীসের তান?
তার প্রাণের গহীনে কীসের আনচান?
সে তান কেবলই এশকের মাদকতায় ধ্বণিময়। তার গহীনে কেবলই আত্মার জ্বলজ্বলে আলোর আনচান। সেই আলোর প্রতিটি ঝিলিক থেকে কে যেনো তুলপাড় করে আওয়াজ তুলছে- দুয়ারে তোমার,
রূহানী জোয়ার! জাগো!!
স্বপ্নের সেই ফুল
বিশ্বসাহিত্যে এক নজিরবিহীন বটবৃরে নাম আবদুর রহমান জামী। সুুবিপুল তার শাখার বিস্তার। আকাশ অবধি তার উচ্চতা। তার আবেদন দিগন্তের চেয়েও প্রসারিত। অফুরন্ত তার ছায়াচ্ছন্ন
নিবিড়তা। যেখানে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য খুজে পায় হৃদয়ের শীতলতা। যে ছায়ায় আশ্রয় পায় বহু ধর্মের অখন্ড মানুষ। সকলেরই হয় সেখানে স্নেহস্নিগ্ধ অধিষ্টান। বহুবর্ণের ভেদ সেখানে হয় তিরোহিত। জামীর কবিতা তাই কালো-ধলো,
-সমস্ত পৃথিবীর।
খোরাসানের খারগের্দ এই মহাকবির জন্মস্থান। খারগের্দ গ্রামটি ছিলো জাম নামক প্রসিদ্ধ মহকুমার অন্তর্ভূক্ত। এ কারলে তিনি জামী তথা জামের একজন বলে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেন। উর্বর এলাকা জাম। খোরাসানের সমৃদ্ধ জনপদ। প্রকৃতি এখানে সৌন্দর্যকে অঙ্কন করেছে অভিনব খেয়ালে।
বহমান নদীর গীতলতা, ঢেউ তোলা সবুজের
শীতলতা, সুউচ্চ বৃরে বরাভয়- সবই ছিলো জামে।
ছিলো পাখির সুর আর বুনো বাতাসের নুপূর।
ছিলো সাহিত্যের ঝংকার আর সংগীতের কোলাহল।
জমিতে ছিলো উর্বরতা, এলাকায় ছিলো প্রাচূর্য।
জামের প্রতি গোটা খোরাসানেই ছিলো আলাদা সমীহ। আলাদা মূল্যায়ন। সবাই জানতো গানের দেশ আর প্রাণের দেশ হলো
জাম। রাজনীতির উত্তাপ এখানে ছিলো কম। শিয়া-সুন্নী মিলে-মিশেই বসবাস করতেন যুগ যুগ ধরে।
আবদুর রহমান জামীর পিতা শামসুদ্দীন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইস্পাহান
থেকে হিজরত করে জামে চলে আসেন। ইস্পাহানের দাশতে নামী
মহল্লায় তিনি থাকতেন সপরিবারে। সে কারণে তাকে দাশতী
চলা হতো। তিনি ছিলেন দাশতের গৌরব, মর্যাদার মুকুট। সেই এলাকার বরেণ্য বুজুর্গ ছিলেন তিনি। যুগ যুগ ধরে সেই এলাকায় জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শিখা প্রজ্জলিত করছিলেন জামীর পূর্বপুরুষ।
শামসুদ্দীন দাশত ছাড়লেন রাজনৈতিক দূর্ঘটনায়। দাশতের পরেই তার পছন্দ ছিলো জাম। ধীরে ধীরে তার পরিবার
জামে খ্যাতিমান হয়ে উঠলো। শামসুদ্দীন বিলাতে
লাগলেন জ্ঞান আর ভালোবাসা।
জামের মানুষ তার কর্মের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ তাকে
লকব দিলো শায়খুল ইসলাম। ভালোবাসার রেনূ মাখিয়ে তাকে আপন করে নিলো
গোটা দেশ। কিন্তু খ্যাতি পেলেও প্রাচূর্য পাননি শামসুদ্দীন আহমদ। এ নিয়ে তার কোনো অনুতাপ ছিলোনা। প্রাচূর্যহীন পরিবারটি
অল্পে তুষ্টির পর্দার আড়ালে কাটাচ্ছিলো দিন-রাত্রি। আর অপো করছিলো তাদের তাকদীরের সেতারা কখন উদিত হয়!
৮১৭ হিজরীর শাবান মাস। পরিবারটিতে নতুন এক প্রতীার চাঞ্চল্য। ১৭ শাবান সেই প্রতীা
পরিণতি পেলো। বিকেল হতে না হতেই জামীর জননী অনুভব করলেন
প্রতীতি অতিথির আগমন বেদনা। বেদনা বাড়ছে। মা কখনো লীন হচ্ছেন যন্ত্রণায়। কখনো উদ্ভাসিত হচ্ছেন
নয়া মেহমানের আগমনের আনন্দে। এশার ওয়াক্ত হলো। পৃথিবীতে এলেন আবদুর রহমান জামী। মা অগাধ ভালোবাসায়
চেয়ে থাকেন সন্তানের মুখপানে। এতো নয় সাধারণ কোনো
সন্তান। এর আগমনের সুসংবাদ ধ্বণিত হয়েছে কতো তাপসের কন্ঠে। অনেক আগ থেকেই তত্তজ্ঞানীরা বলে আসছেন ইমাম মুহাম্মদের রাহ. বংশধারায় জন্ম নেবে
এক প্রেমের কোকিল। তার সুরের শরবতে আশেকদের হৃদয় হবে মাতোয়ারা। যুগ যুগ ধরে আল্লাহর পাগলরা তার কবিতার বৈঠা দিয়ে বাইতে থাকবে প্রেমের নৌকা। সাধকদের হৃদয়ে জ্বলতে থাকবে তার বাক্যের প্রদীপ। তার আত্মার আলোতে উদ্ভাসিত হবে শতাব্দীর বিয়াবান। তার জ্যোতিতে প্লাবিত হবে কোটি জীবনের রূহানী মানচিত্র। সাধনার মাধ্যমে রাসূলে মাকবুলের (সাঃ) যে নৈকট্য তিনি হাসিল করবেন, তা সাধকদের জন্য হয়ে উঠবে প্রেরণার ঝর্ণাধারা।
ইমাম মুহাম্মদের (রহঃ) বংশের লোকেরা এমনতরো সুসংবাদের সাথে পরিচিত। তারা অনেকের মধ্যে প্রতীতি সেই সন্তানের প্রতিচ্ছবি দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু পরে তা বাস্তব হয়ে উঠেনি। শামসুদ্দীন আহমদ কিন্তু
দৃঢ়প্রত্যয়ী- তার কোনো সন্তানই হবে সেই প্রতীতি রতন। কেননা তাকে সম্বোধন করে বুজুর্গদের বক্তব্য অহেতুক হবার নয়। ভর যৌবনে একদিন তিনি ইস্পাহানে গেলেন। অকস্মাৎ শুনা গেলো
এক বুজুর্গের সংবাদ। যার সাথে লোকেরা সাাতের জন্য ছুটছে। আহমদ সেখানে গেলেন। বুজুর্গকে সালাম করলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে হাসলেন। বললেন- ‘একটি নদী, যার ভেতর থেকে বেরিয়ে
আসবে সমুদ্র।’ শামসুদ্দীন আহমদ বুঝে নিলেন কোনো এক কীর্ত্তিমান
সন্তানের সুসংবাদ নিহিত আছে এ বক্তব্যে।
এরপর তিনি ডুবলেন আশ্চর্য স্বপ্নে। ফুল ফুটেছে তার হাতে। অলি আসছে চারদিক থেকে। ফুলের পাঁপড়িতে ধ্বণিত হচ্ছে আযানের শব্দাবলী। সেই শব্দে জাগছে ঘুমন্ত জনপদ। একের পর এক,
একের পর এক... ...
শামসুদ্দীন আহমদ অপূর্ব সুন্দর শিশুটির দিকে তাকান। চাঁদের কিরণমাখা চেহারাটি তার। শিশুটিকে তিনি বারবার
পাঠ করতে থাকেন। সহসা তার অন্তর থেকে অল্েযই বেরিয়ে আসে আওয়াজ-
হ্যাঁ, এ-ই সেই সমুদ্র, সেই আশ্চর্য ফুল!!
চিত্তে জ্বলে তারার আলো
সেই সময় খোরাসানের অধিপতি ছিলেন মীর্জা শাহরুখ। শাহরুখ খেয়ালী শাসক ছিলেন। কিন্তু কবিতার ছন্দ
ও শব্দের মৌতাতে তার চিত্ত বিমোহিত হতো সহজেই। শিল্পের প্রতি তার অনুরাগ ছিলো প্রবল।
খোরাসান তখন জ্ঞান ও প্রজ্ঞাবৃরে সমারোহে সারা বিশ্বে এক অনন্য
উদ্যান। চারদিকে বিদ্যার আলোক ও প্রতিভার ঝলকানি। চারদিকে সুরের তরঙ্গ ও মনস্বীতার কলস্বর। কান পাতলেই শুনা যায় হাফিজের কাসিদা। মজলিসে ধ্বনিত হয় রুমীর
সংলাপ কিংবা সাদীর উপদেশ। শিশুদের মুখেও বেজে
ওঠে নাসির খসরুর বয়েত!
ফার্সী ভাষা তখন বিকাশের তুঙ্গে। অনেকগুলো সূর্যের আলো তখন ভাষাটির উপর দেদীপ্যমান। এ ভাষা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে ফেরদৌসীর কবিতার প্লাবনে। এ প্লাবনের পলিতে উর্বর হয়ে উঠেছে ফার্সীর জমি, তখনই এলো আরেক জোয়ার। ফরিদ উদ্দীন আত্তারের
কবিতা ছড়িয়ে দিলো নতুন বর্ষণের হিন্দোল। নেমে এলো সৃজনের আশ্চর্য
বারিধারা। এইভাবে একের পর এক প্রাণমাতানো তরঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ হয়ে
গৌরবের রাজাসনে বসে আছে ফার্সী ভাষা।
বিশ্ববরেণ্য মহাকবিদের পদচ্ছাপে গৌরবান্বিত পারস্যের ইতিহাস। প্রত্যেকেই ছায়া দিচ্ছেন ফার্সী সাহিত্যের উদ্যানে। এই সব মহাকবি যার যার স্বাতন্ত্র নিয়ে একেকটি দিগন্তকে নিজের বানিয়ে নিয়েছেন। সেখানে তাদেরই সার্বভৌমত্ত। নতুন কারো কর্তৃত্বের
জায়গা ছিলোনা কোথাও। এমন কোন দিকটি, যাতে ফার্সী কবিতায় দারিদ্র ছিলো? এমন কোন ঐশ্বর্য,
যা ফার্সী কবিতায় তখন অনুপস্থিত? প্রতিটি দিকই সমৃদ্ধির পানিতে একাকার। সর্বত্রই সৃষ্টিশীলতার
বান বইছে। প্রতিটি মাঠই স্বর্ণশস্যে গমগম করছে। এখানে নতুন কবির জন্য কেউ স্টেজ বানিয়ে দেবে কোন গরজে?
জীবিত এবং সদ্যবিগত কবিদের সৃষ্টিরাজী নিয়ে সবাই মাতোয়ারা। ফেরদৌসীর কবিতায় দেশপ্রেম ও প্রাচীন ঐতিহ্যের দামামা বেজে উঠেছে তো আমীর খসরুর
কবিতায় গেয়ে উঠেছে বিশ্বাত্মার পাখি, অনন্তের স্বরগ্রাম। নিজামীর কবিতায় দ্রোহ ও দার্শনিকতা তুঙ্গে উঠেছে তো কামাল ইসমাঈলের কবিতায় সুর
তুলেছে ভক্তির পাপিয়া। জামাল আবদুর রাজ্জাকের কাসিদায় শাশ্বত মানব
প্রেম মূর্ত হয়েছে তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বাস্তবতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে খাকানীর কবিতা। আনওয়ারীর গীতিতে মানব মনের নানা জিজ্ঞাসা ভাষা পেয়েছে তো সালমান সাওজীর গীতিকায়
ভোগবাদের উচ্ছাস সৃষ্টি হয়েছে। হাসন দেহলভীর গজলে
জীবনের আনন্দিত রূপ ফুটে উঠেছে, তো কামাল খজনদীর গজলে
বিষাদের বিলাপ। হাফিজের কবিতায় জীবন বিগলিত হয়েছে সামগ্রিকতায়
তো সা’দীর কবিতায় হেসে উঠেছে উচ্চতর মাহাত্মের মুখচ্ছবি। আর জালাল উদ্দীন রুমী? তিনি তো সেই সমুদ্র,
যেখানে জীবনের সমস্ত তরঙ্গরাজী একাকার হয়ে আওয়াজ তুলেছে প্রেমের
বাঁশরীতে। বাঁশরীর ধ্বনিতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত- সবই সংগুপ্ত। ভাষা সংস্কৃতি-ভূগোল-সবই দ্রবীভূত। দেহ, আত্মা, সমাজ সবই প্রতিধ্বনিত।
এই কবিদলের কেউই গৌণ ছিলেন না। প্রত্যেকেই আপন ঐশ্বর্য দিয়ে গুলজার করে তুলতে পারেন শতাব্দীর বিয়াবান। মুখর করে তুলতে পারেন যে কোন জাতিগোষ্ঠীকে। একটি ভাষা যুগ যুগ প্রতীার পর এমন একজনকে পায়। কিন্তু ফার্সীর কী যে ভাগ্য, তার জমিতে মহাকাব্যের
চারা একের পর এক এতো বেশি গজালো যে, এটি আজো হয়ে
আছে বিশ্বের বিস্ময়।!
এতো সব সমুন্নত বৃরে শাসনে নতুন কোনো বটবৃরে মাথা তোলা ছিলো
সুকঠিন। কিন্তু জামী এদের ভিড়ে তৈরী করলেন আপন ছায়া। বিস্তার করলেন ডালপালা। অর্জন করলেন স্বাতন্ত্র। খুবই দ্রুততায় তিনি অন্যান্য মহাকবির কাতারে নিজের আসন স্থির করে নিলেন। সুন্দরের মহাসভায় নিজের ঝলক দেখালেন পৃথিবীকে। সাহিত্যে ছড়ালের আশ্চর্য জ্বালওয়া।
সেই জ্বালওয়া কী অপূর্ব! চিত্তহারী!!
কী বেনজির তার আবেদন!!
জামীর প্রতিটি কবিতাই শিল্পের ঐশ্বর্য ও আবেদনের তীব্রতা নিয়ে
সুগভীর। সেই গভীরতা কৈশোরের মেঠো পথ মাড়ানোর সময় গুণগুনিয়ে আবৃত্তি করা
কবিতায়ও ল্যণীয়।
কিশোর জামী একদিন পাখির পেছনে ছুটলেন। হয়তো পাখি শিকার করবেন। কিংবা দেখবেন পাখির
কর্মকান্ড।
একটি হলদে পাখি গাছের ডালে। এ ডাল থেকে ও ডালে উড়ছে, ঘুরছে। জামী আছেন পিছে পিছে। হঠাৎ কান্ত পাখিটি
একটি ঝোঁপে বসলো। আর ফনা উদ্যত একটি সাপ পাখিটিতে ছোবল মেরে
গিলতে লাগলো।
দৃশ্যটি জামীর হৃদয়েও যেনো ছোবল দিয়ে বসলো।
কী অসহনীয়!
একটি জীবন্ত সুন্দর কুৎসিতের গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। সুরের পেয়ালাকে গিলে খাচ্ছে বিষাক্ত সাপ। তার দংশনে রক্তাক্ত পাখিটি কঁকিয়ে উঠছে বারবার। এখন সে আর আর্তনাদও করতে পারছে না। নেতিয়ে পড়ছে ডানা। অন্তিম নিঃশ্বাস নিচ্ছে তার জীবন। জামী তখন স্থির থাকতে
পারলেন না।
প্রিয় পাখিটিকে সম্বোধন করে আবৃত্তি করলেন:-
সাপের স্পর্শ যদি না দেখো বাতাসে
ডানা মেলে তবে কেনো ছুটলে হাওয়ায়
হিংস্র সে কোনো দিন হবেনা সুবোধ
সুরে সুরে শত গান বাতাসে গাওয়ায়
ছোবলের আগে তুমি টের পেয়ো পাখি
জীবনের এই পাঠ বুজে নিয়ো খুব
পরে আর লাভ নেই ডানা ঝাঁপটিয়ে
সাপের উদরে গিয়ে হতে হবে চুপ
জামী পঙক্তিগুলো আউড়াতে আউড়াতে বিষন্ন মনে বাড়ী ফিরলেন। তার চিত্তে মেঘের ছায়া। গম্ভীর স্থিরতা যেনো
অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চেতনায়। পাখিটির শোক জামীকে
জমিয়ে দিয়েছে। তিনি সেই শোকে আবৃত্তি করলেন আরো দুটি লাইন-
ভুলতে পারিনা সেই সুরের পাখিকে
সাপের ছোবলে
যার থেমে গেলো গান
তাকে ভুলে যেয়ো না যে প্রাণ মাতাতো
ছড়িয়ে সুরের
রেণু দিয়ে গেলো জান
জামীর প্রতিভার সুগন্দি ছড়াচ্ছে ঘরময়। বাড়ীর আনেকেই ঠের পেলো সুঘ্রাণ। পিতার কানেও গেলো সেই
বৃত্তান্ত।
তিনি নতুনভাবে উপলব্ধি করতে লাগলেন ছেলের দীপ্তিকে। দেখলেন- তার চিত্তে জ্বলজ্বল করছে ধ্র“বতারার আলো।
শুরু হলো চাষাবাদ
জামী এখানেই থেমে নেই। তিনি পিতার গ্রন্থ ভূবনে হানা দিলেন। সাঁতার শুরু করলেন
আরব কবি ইমরুল কায়েস, জুহাইর আর আবুল আলা মাআররির পাথারে। চেখে দেখলেন লবীদ আর ফরজদকের কবিতা। ঝাঁপিয়ে পড়লেন রুমীর
সাম্রাজ্যে। পর্যটন শুরু করলেন হাফিজের এলাকায়। রস নিংড়াতে লাগলেন সাদীর কবিতা থেকে। এই সবে কেটে যায় তার
প্রহরের পর প্রহর।
ছেলেরা যখন মাঠ দাঁপিয়ে গোল্লাছুট খেলে, জামী সে বয়সে শব্দের সাথে খেলছেন হাডুডু। কবিতার মর্মের সাথে চলছে তার লুটোপুটি। ভাবের বাজারে চলছে
ছন্দ খুটাখুটি। বাক্যবিন্যাসের ময়দানে চলছে ইচ্ছেমতো ছুটাছুটি।
জামী এখন সবেমাত্র তরুণ। একদিন এক দূরন্ত ভাবনা মাথায় চাপলো। শুধু বড় কবিদের কবিতা
পড়লেই তো হবে না। তাদের মতো করে লিখতে হবে।
তাদের সাথে করতে হবে প্রতিযোগিতা!
তাদেরকে হারাতে হবে কিংবা তাদের কাছে হেরে হেরে শিখতে হবে জিত!
জামী ভাবলেন- তার সবচে প্রিয় কবি সা’দীকে পরাজিত করবেন। তিনি সা’দীর কয়েকটি উচ্চাঙ্গের পঙক্তি নির্বাচন করলেন। এগুলোর চেয়ে উত্তম পঙক্তি লেখতে পারলেই সা’দী হেরে গেলেন।
বেজে উঠলো যুদ্ধের সাইরেন!
বিশ্বসেরা মহাকবির সাথে এক তরুণের লড়াই!!
একজন কবর থেকে ঢাল ধরে আছেন। আরেকজন ধনুকের ছিলা তাক করে ঢালটি বিদীর্ণ করে দিতে উদ্যত! এ লড়াই প্রত্য করছে
ব্যস্ত একটি কলম ও কাটাকুটিতে ভরা কিছু কাগজ। কলম কেবলই বিস্মীত হচ্ছে। কাগজ কেবলই চমকে উঠছে। আর হাসছে কেবলই ইতিহাস!!
লড়াই শেষ।
একদিকে সা’দীর কবিতা, আরেকদিকে জামীর।
সা’দী লিখেছেন-
তরসসুম না রসী ব কা’বা আয় এ’রাবী
কে য়ী রাহ কেহ তু মী রোয়ী ব তুর্কিস্তা-নাস্ত
অর্থাৎ-
পবিত্র সেই কা’বায় যাওয়া
হবেনারে তোর কোনো দিন
কারণ হলো তুর্কিস্তানের
পথ ধরেছো হে বেদুইন!
জামী লিখেছেন-
জামী আয খাকে খোরাসান চেহ কুনী কাসদে হেযাজ
চু কে তুরা কা’বা মকছুদ ব তুর্কিস্তা-নাস্ত
অর্থাৎ-
জামী আছো খোরাসানে,
চাইছো হেযাজ
পৌছে যাওয়া
তুর্ক-মুলুকের পথ ধরেছো
হবেনা রে কা’বা পাওয়া
সা’দী লিখেছেন-
আশেকানে কাশতেগানে মা’শুকন্দ
বর নয়া য়েদ যে কাশতেগা-নে আওয়াজ
অর্থাৎ-
প্রেমাস্পদের জন্য প্রেমিক হয় যে লাশ
মৃতের কোনো নেই কো আওয়াজ-কী নি:শ্বাস!
জামী লিখেছেন-
জুদামন্দ আয তু জামী ও নানালীদ
যে কশতাহ বর নয়াইদ হর গিজ আওয়াজ
অর্থাৎ-
জামী তো লাশ তোমার থেকে পৃথক হয়েই
লাশের কভু নেই কো ধ্বণি, সুর কোনো নেই
প্রথম কবিতায় জামী হয়তো সা’দীর নাগাল পেলেন না। কিন্তু দ্বিতীয়টিতে একেবারে কাছাকাছি পৌছে গেলেন। মহাকবির ঘাড়ের কাছে ছাড়লেন জোর নিঃশ্বাস।
জামীর এই কান্ড ঘরে হাস্যরসের সৃষ্টি করলো। পিতাও শুনলেন এই খবর। ভাবলেন- অনুকরণের মতা
যখন আছে, তাহলে মৌলিক সৃষ্টিতেও একদিন সে সফল হবে। সে জন্য প্রয়োজন যথার্ত দিকনির্দেশনা।
পিতার এবার শুরু হলো নতুন সাধনা। এমনিতেই তিনি পুত্রকে পড়ান আরবী-ফার্সী। পড়ান সরফ-নাহু। দেখেন তার প্রতিভার ঝলক। দেখে দেখে হন হতবাক। কতো সহজেই ছেলেটি আত্মস্থ করে নেয় ভাষাতত্তের জটিল বিষয়াবলী! কতো সহজেই মুখস্ত
করে নেয় নিয়মনীতির অলিগলি!
পিতা দুলতে থাকেন প্রত্যাশার বাতাসে।
হৃদয়ে ফুটতে থাকে একের পর এক কোমল গোলাপ।
এবার তিনি দেখলেন কবিতার সমীরণ। দেখলেন মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলছে জ্যোতির্ময় এক মিনার!
তিনি এর গায়ে করবেন হীরে-চুনি-পান্নার কারুকাজ!
শুরু হলো শিল্পশ্রম।
আবদুর রহমানকে তিনি শেখান- কীভাবে শব্দ দিয়ে তৈরী করতে হয় অলৌকিক
বাগান!
কীভাবে ছন্দের বাড়ীতে জমিয়ে তুলতে হয় পাখিদের মজমা
কীভাবে বিমূর্ত ভাবের শরীরে পরিয়ে দিতে হয় দূরন্ত ডানা।
তিনি জামীর মনে ঢুকিয়ে দিলেন নতুন জগত অধিকারে নেশা। চোখে পরিয়ে দিলেন স্বপ্নের আশ্চর্য চশমা।
সেই নেশা ও স্বপ্ন পরবর্তিতে তাকে বানিয়েছে মহাকবি জামী।
এ জন্য কৃতীত্ব তিনি দিয়েছেন তার পিতাকে- শায়খুল ইসলামকে!
জন্ম আমার জাম শহরে
তাই তো জামী
নইরে ভাই
কলমটাতে কৃষ্ণকালি
সেথায় জামের
শরাব নাই
শায়খুল ইসলাম যার উপাধি
তিনিই জামের
শীতল বারি
তারই ছোয়ায় কাব্য আমার
নানান রকম অর্থধারী
কাব্যগাঁথার শরাব বানাই
মর্মছোয়া নানান
তালে
তাই কবিনাম জামী আমার
দুলতে থাকে
কালের ডালে
এই কবিতা বলে দিচ্ছে জামে জন্ম হয়েছে বলে তিনি জামী নন। বরং কবিতার পেয়ালায় বিতরণ করেছেন শরবত। মানুষের চিত্তে ঢেলে
দিয়েছেন কাউসার-জাম-তাই তার এই তখল্লুস।
অথচ আমরা আগে বলেছি- জামে জন্ম গ্রহণের কারণেই তিনি জামী!
আসলে এই দুধরণের কথায় ঐতিহাসিকদের মতামতটাই কেবল প্রতিফলিত হয়েছে। কেউ কেউ এই কবিতাকে দলীল বানিয়ে দাঁড়িয়েছেন এক প।ে অপরদল কবির জন্মস্থানকে উঠিয়ে এনে তার উপর পেতেছেন ডেরা। তারপর বেঁধেছে মধুর লড়াই। পন্ডিতদের এ লড়াই চলছে,
চলুক। তাতে আমাদের কী?
হায়রে কবে কেটে গেছে
এই মনীষির কাল
নামের ভেদে পন্ডিতেরা
আজও নাজেহাল!
সমরকন্দের ঢেউ
পিতা এবার মনে করলেন তার অধ্যায় শেষ। জামীর জন্য চাই আরো উন্নত পরিবেশ। সেখানকার বিশুদ্ধ আলো
বাতাসে তরতর করে বেড়ে উঠবে প্রতিভার চারাটি। এজন্যে সবচে অনুকূল
সমরকন্দ। সেখানে আছেন বিদগ্ধ বহু আলেম। খুবই জমজমাট তাদের দরস। বিদ্যার্থীরা এজন্য
সমরকন্দে ছুটে চারদিক থেকে।
জামীকে পিতা সমরকন্দ পাঠালেন। তিনি এখানে ধর্ম, সাহিত্য ও বিজ্ঞান অধ্যয়ন করবেন।
জামেয়ায় দেখা গেলো অন্য এক জামীকে। অষ্টধার এক হীরের টুকরো যেনো চকচক করছে। গ্রন্থের সাথে তার
এতো প্রেম! শিকদের প্রতি তার এতোই আদব! জ্ঞানের প্রতি তার এতোই পিপাসা! সময়ের প্রতি
তার এতোই যতœ! শৃঙ্খলার প্রতি এতোই অনুবর্তিতা! লোকেরা বিস্মীত হলো জামীর সাধনা
দেখে।
কোরআন-হাদীসে তিনি ডুবে থাকেন দিন-রাত। তার রাত্রি মানেই ঘুমহীন জ্ঞানার্জন। প্রহরের পর প্রহর শুধু
সাধনার সমুদ্র মন্থন!!
জামীর স্মৃতিশক্তি ছিলো অসাধারণ। এর সাথে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় মিলিত হলে যা হয়, তাই হলো। চারদিকে ছড়ালো বিচিত্র মুগ্ধতা। তার মেধার তীক্ষ্মতা স্বীকৃত হলো প্রতিষ্ঠানময়। কেউই এেেত্র তার সমক ছিলোনা। আরবী ভাষাতত্তে তার
অবাধ বিচরণের কথা জানজানি হলো। শব্দের মর্মোদঘাটনে
তিনি হয়ে উঠলেন অনন্য। প্রতিটি বিষয়ে তত্তমূলক জিজ্ঞাসা সমূহ তিনি
সাজিয়ে রাখতেন। যা নিয়ে ছিলো তার গবেষণা।
তার চরিত্র ও ছিলো তুলনাহীন গোলাপ। বীনয় ও নম্রতা ছিলো সেই গোলাপের সুগন্ধি। সহপাঠিদের সেবায় এগিয়ে আসতেন যে কোন সময়। এমনকি তাদের যে কোন কাজ করে দিতেও তার কুণ্ঠা ছিলোনা। আবদুুল গফুর লারী লিখেছেন কয়েকটি জিনিস একত্রিত হয়ে থাকতে পারেনা। আগুন ও পানি। ক্রোধ ও সুস্থবুদ্ধি এবং অহংকার ও আবদুুর
রহমান জামী।
জামীর সহপাঠী মোল্লা খোরাসানী বলেছেন আবদুুর রহমান জামী কোনো
দিন কাউকে নিজের চেয়ে ুদ্র হিসেবে তাচ্ছিল্য করেছেন, এমন দেখিনি।
জামীর এই সব গুণ তাকে দিলো শিকদের বিশেষ নৈকট্য। করে তুললো সবার প্রিয়ভাজন।
সমরকন্দে জামীর উস্তাদ ছিলেন যুগের বিদ্যাসাগর খাজা আলী সমরকন্দী। যিনি ছিলেন মীর সাইয়্যিদ শরীফ জুরজানীর একান্ত ঘনিষ্ট শাগরিদ। আল্লামা তাফতাজানীর শিষ্য মাওলানা শিহাবুদ্দীনের নিকট ও তিনি জ্ঞানার্জন করেন। এরা ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিচরণশীল আধার। জামী এদের সান্নিধ্যে হৃদয়ের দুকূল ভর্তি করে তুলেন ইলমের সফেদ দুধে। প্রতিটি শাস্ত্রে তিনি অর্জন করেন বিশেষজ্ঞ সূলভ পাণ্ডিত্য। কিন্তু তাতেও তৃপ্ত হচ্ছিলোনা জ্ঞান পিপাসা। আব্দুর রহমান জামী শরীক হতে লাগলেন মাওলানা জানদাউলীর হলকায়। সেখানে তার অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করে শ্রদ্ধা ও সমীহ। স্বীকৃত হন তিনি মুহাক্কিক হিসেবে। তারপর তালাশ করতে লাগলেন
সুউচ্চ কোন জ্ঞানবৃরে ছায়া। তর্ক ও ন্যায়শাস্ত্রের
বিখ্যাত গ্রন্থ চুগমুনীর ব্যাখ্যাকার ছিলেন সমরকন্দের তৎকালীন কাজী। জামী এবার তার কাছ থেকে ভর্তি করতে চাইলেন হৃদয়ের পেয়ালা। আগ্রহ নিয়ে কাজী সাহেবের কাছে গেলেন এবং শুরু হলো বিদ্যাচর্চা। কিন্তু এ কী?
কাজী সাহেব তো ভেবেছিলেন কোনো এক ছাত্রকে তিনি পড়াচ্ছেন। তিনি তো কল্পনাও করেননি এ ছাত্র নিজেই জ্ঞানের গুপ্তধন। যতই তিনি ছাত্রটিকে আলোকিত করতে চান, দেখেন তার চেয়েও
অধিক আলো সে ধারণ করছে হৃদয়ে।
তিনি বীস্ময় মানলেন তার প্রজ্ঞা ও বিচারবোধে! অবাক হলেন তার
স্মৃতিশক্তির বিপুলতায়। তার কল্পনা ও হার মানলো ছাত্রটির উদ্ভাবনীও
বিশ্লেষণী মতায়। তার মেধার বিশালতা দেখে পুলকিত কাজী সাহেব। তার চিন্তার গভীরতা দেখে মুগ্ধবিস্ময়ে তিনি স্তম্ভিত।
কাজী সাহেব যেখানে যেতেন, ছাত্রটির প্রশংসা তার মুখে ফুটতো খইয়ের মতো। একদিন তিনি আলেমদের মজলিসে ঘোষণা করলেন কোনো কালেই আবদুুর রহমান জামীর চেয়ে ভালো
কোনো ছাত্র সমরকন্দ দেখেনি। সত্যিকার ছাত্র কেউ
দেখতে চাইলে জামীকে যেনো একবার দেখে নেয়।
বিখ্যাত তাজরীদ গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার মহাপণ্ডিত আলাউদ্দীন কৌছজীর
সাথে একবার এক তাত্তিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন জামী। আলাউদ্দীন ছিলেন অপ্রতিদ্বন্ধি। কিন্তু জামীর সাথে
তিনি কুলিয়ে উঠতে পারেননি। বিতর্কে তিনি হারলেন। আর এর মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন আবদুর রহমান জামীকে। টের পেলেন এক সীমানাহীন সমুদ্রের ঊর্মীনাদ। বুঝতে পারলেন কতোটা সুউচ্চ আর অজেয় পর্বতের নাম জামী।
কৌসজীকে কেউ জিজ্ঞেস করলো অল্প বয়েসী যুবকটি বিতর্কে জিতে গেলো
কীভাবে? জবাবে তিনি বললেন তার জয় না হয়ে তো উপায় ছিলোনা। কারণ এই যুবক আলেমের ভেতরে অনাদী আত্মার অবস্থান। রূহে কুদসীর উপস্থিতি।
সমরকন্দ থেকে ছড়াতে থাকলো জামীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিরল সব কাহিনী। মানুষের মুখে মুখে তা পেতে থাকলো কীংবদন্তির রূপ। সর্বত্র আলোচিত হতে লাগলো তার বিদ্যাবত্তার কথা আর মনকাড়া সব কবিতার মর্ম। খোরাসানে জামীর কবিতা পেলো বিকাশের সুবাতাস। ধীরে ধীরে তার বক্তব্য হতে থাকলো শাণিত। তার ছন্দে নেমে এলো
নদীর তরঙ্গময়তা। তার শব্দে জারি হলো হাওয়ার উচ্ছাস। তার ভাবে বইতে লাগলো বসন্তের কল্লোল। প্রকৃতির সান্নিধ্য
জামীকে মুগ্ধ করে রাখতো। সেখানে থেকে তিনি খুজে
নিতেন চিন্তার মাল-মসলা। ইতিহাস তাকে দুলিয়েছিলো
বৃপত্রের মতো। পাখির মতো ডানা মেলে তিনি উড়াল দিলেন তার
কপথে। ফলে জামীর কবিতা পেলো নতুন স্ফূর্তি। তার সুখ্যাতি ছড়াতে লাগলো দিগন্তে দিগন্তে।
সুখ্যাতি ছড়ায় আর জামীও যেনো ভোরের আলোর মতো আরোও বিকশিত করেন
নিজেকে। সমরকন্দ পেরিয়ে জামীর উত্থানের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো গোটা পারস্যে। মহাকবিদের বিচরণ ভূমিতে এসেছেন আরেক শক্তিমান কবি। অন্য সব মহাকবি তো কবরে, কিন্তু তাদের ঔজ্জল্য
নিয়ে সমরকন্দে পায়চারি করছেন জামী। সবার দৃষ্টি তখন সেদিকেই
ধাবমান। কাব্যপ্রেমীরা তো সমরকন্দকে বানিয়ে নিলো আগ্রহের ল্যস্থল।
জামী তখন যৌবনের সম্রাট।
তার কণ্ঠে প্রেম ও জীবনের জয়ধ্বনি।
নিগূঢ় আধ্যাত্মিকতা তখন ও জমেনি বাক্যের অতলে। তখন ও কবিতায় হানা দেয়নি অপার্থিব লোকের বন্যা। তখন ও তার সুরে ছড়িয়ে পড়েনি আত্মার রাহসিক বংশীনাদ। জামীর শব্দাবলী তখনও হয়ে উঠেনি রব্বানী ঝর্ণাধারার বিচূর্ণ কলধ্বনি। বাহ্যিক সৌন্দর্য জামীকে করে রেখেছে বিভোর।
এক সুখাস্বাদী হৃদয়বান কবি হিসেবেই জামী বরেণ্য হয়ে উঠলেন। তার কবিতায় তখন উষার রোদের উড়াউড়ি। কুয়াশার মায়াবীতা আর
সহাস্য তরুলতার করতালি!
জামীর কলম থেকে বেরিয়ে এলো নতুন এক কাব্য অপূর্ব শব্দ ঝংকার
আর বানী মহিমার স্রোতধারা। অনন্য কারুকাজ আর বর্ণনার
ঝলক দিয়ে তিনি সাজিয়ে তুলেন এই আশ্চর্য গ্রন্থ।
এ দিয়েই সম্পন্ন হলো রাজ্যজয়। জামীর কবি প্রতিভা নিয়ে কারো আর কোনো সন্দেহ রইলোনা। সমাজের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে ধন্য বোধ করতেন। জামীর জীবনযাত্রা হয়ে উঠলো স্বাচ্ছন্দময়। অন্য অনেক কবির মতো দূরবস্থা জামীর পিছু ধাওয়া করেনি। দারিদ্রের অভিশাপ জর্জরিত করেনি তার দিবস রজনীকে। অনটনের কষাঘাত আসেনি তার উপর। যা ব্যাহত করবে স্বাভাবিক
অগ্রযাত্রা। ফেরদৌসীকে প্রভাবশালীদের ইর্ষা ও বিদ্বেষের
করাতে হতে হয়েছে ত-বিত। দারিদ্রের দু:সহ দুর্দিন মাথায় চাপিয়ে কড়াইয়ের
মতো টগবগে কঠিনতায় শেখ সাদীকে কাটাতে হয়েছে বছরের পর বছর। মাটি শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। যাপন করতে হয়েছে কারাজীবন। শামসে তাব্রিজের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণরা রুমীর সুখ ও আত্মার আনন্দকে করেছে নির্বাসিত। সেখানে জামীর পথচলায় কাটা হয়ে দাঁড়ায়নি সমাজপতিরা। এ আসলে কবির সৌভাগ্যই বলতে হবে।
সমাজপতিরা বরং কবির উদ্ভাসনকে নিজেদের গৌরব হিসেবে ভাবতে চাইলো। তারা কবির যাত্রাপথে ছড়িয়ে দিলো ফুলের পাঁপড়ি। চতুর্দিক থেকে উপচে পড়া শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জামীকে নতুন আলোয় অভিষিক্ত করলো। সুখের লালিত্য তার কণ্ঠে পেতে থাকলো মূর্চ্ছনা।
বিশ্বের উদ্দেশ্যে জামী ছড়াতে লাগলেন আনন্দের সুরধারা। তিনি গাইলেন:
চিত্তজয়ী কাব্যতুমি বিশ্বজেতা,
জয় তোমার
নরক দেখে পালিয়ে যাওয়া কর্ম কভু
নয় তোমার
নরক জুড়ে স্বর্গ জাগাও প্রাণের
খুশির সুর দিয়ে
মৃত্যু রাতের গহ্বরে ও যাও গো
খুবির ভোর নিয়ে
জীবনের এমন জয়গাঁথা যার কণ্ঠে, জীবনবাদী মানুষ তার পেছনে কাতারবন্দি হবে না তো কী? আনন্দের বিপুল বৃষ্টিধারা যার ছন্দে, তার জন্যে চতুর্দিকে
নবানন্দের দুয়ার খুলতে থাকলো একে একে।
রাজকীয় জমি, শুদ্ধতার চাষ
মানুষের উদ্দেশ্যে জামীর শুভ কামনা ও বিশ্বসংসারে সুখবার্তার
সুনিপুণ ঘোষণা যুগের কর্ণকোহরে আলোড়ন তুললো। কবিতাকে যিনি নরক গুলজার
করার দায়িত্ব দিয়েছেন, তার মাধ্যমে নিজের
রাজসভা গুলজার করাতে চাইলেন হেরাতের অধিপতি সুলতান আবু সাইদ। তিনি জামীকে দাওয়াত করলেন রাজসভায়। অনুরোধ করলেন যেনো
তিনি সেখানে সৌন্দর্যবর্ধন করতে রাজী হন। জামী রাজী হলেন। তার উদ্দেশ্যে বর্ষিত হলো পুষ্পবৃষ্টি। অনবরত রাজঅনুগ্রহ। বহু মূল্যবান উপঢৌকন জামীর পাশে স্তুপাকার হয়ে উঠলো। সুলতানের প্রধান উজির আলীশের হয়ে উঠলেন জামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু।
রাজ্যের কবিকূল তখন জামীর সৃষ্টিশীলতার নদীতে সাঁতরাচ্ছেন। আর তিনিও দিগন্তের সকল সীমানায় বইয়ে দিতে লাগলেন প্রাণ-প্রাচূর্যের ঝংকার।
রাজকীয় ঐশ্বর্য বিলাস কবির মনকে বিমোহিত করলো সত্য, কিন্তু শৃঙ্খলিত করতে পারলোনা। ফলে তার কবিতা রাজা রানীর কীর্ত্তিগাঁথা হয়ে উঠেনি। বরং চিরকালের শিল্পরসিকের জ্ঞানকাণ্ডে সিঞ্চনের শীতল জলের বিপুল বর্ষণে তা হতে
থাকে প্লাবিত। অনবরত আত্মঅতিক্রমের মাধ্যমে জামীর কবিতা
স্বরূপে প্রকাশিত হয়। এবং তা কেবলই জ্ঞানের বস্তু হয়ে বসে থাকেনি। বরং হতে থাকে অনুভবের এবং পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনের অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ। ধর্ম ও ইতিহাস যেখানে হাজির হতে থাকে। কিন্তু শাস্ত্র হয়ে
নয়। প্রচ্ছন্নভাবে। বাইরের পর্দাটুকু নয়,
আসে বরং সারনির্যাস। এই প্রচ্ছন্নতার মাধ্যমে
তিনি এক স্বত:সিদ্ধ প্রকরণের প্রচলন করেন। ভাবালুতা পূর্ণ ছন্দ
কিংবা তরল বাক্যবিন্যাসের আকাঙ্খা তার ছিলোনা। প্রবল ও শক্তিমান বাক্যে অপরিহার্য শব্দগুচ্ছ নির্বাচন করতেন তিনি। সেখানে মননশীলতার সঙ্গে হৃদয়বৃত্তির ঘটতো সমন্বয়। বিষয় নির্বাচনে তার যতœ,
শব্দ প্রয়োগের তার কুশলতা, উপমা, চিত্রকল্প নির্মাণে তার অনন্যতা, ছন্দের ব্যবহারে তার যাদুকরিতা, পদবিন্যাসে তার স্বাতন্ত্র ফার্সী কবিতার জগতে নতুন মায়াজাল আর মদিরার ঘোর সৃষ্টি
করে। স্বভাবতই কবিদের গন্তব্য হয়ে উঠে জামীর অবস্থানস্থল। জামীর স্বীকৃতি হয়ে উঠে কবিদের জন্য সর্বশেষ সনদ।
ফার্সী কবিতার নতুন মহারাজ কাব্যকুশলতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সৃজনশীলতার
বাগান গড়তে লাগলেন। শিল্পের েেত্র ছাড় দিতেন না তিনি। যে কোন প্রবীণ কবিও শিল্পবোধের ঘাটতি কিংবা ছন্দরীতির লংঘণে তার কাছে পরিতাজ্য
হয়েছেন। একবার এক নামকরা কবি তার বাছাই করা একটি কবিতা নিয়ে জামীর কাছে
হাজির। কবিগুরুকে শুনাবেন তিনি। আদায় করবেন স্বীকৃতি। দরবারে এসে তিনি কোলাহল
শুরু করলেন গুরু! গুরু! আমি এমন কবিতা লিখেছি, যেখানে আলিফ অরটি আসেনি। জামী মনোযোগ দিলেন
তার প্রতি।
তিনি আবৃত্তি করছেন প্রিয় কবিতা। কণ্ঠ সুললিত। আবৃত্তি মনোহর। একের পর এক তিনি পড়ছেন পঙক্তিমালা। মজলিসের অনেকেই বাহবা
মারহাবা শব্দে হচ্ছেন উচ্চকিত। জামী কিন্তু গম্ভীর। তার চেহারায় ধীরে ধীরে ছড়াচ্ছে অস্পষ্ট উপো!
কবিতা পাঠ শেষ হলে জামী বললেন আপনার কবিতায় আলিফ অরটি না এসে
বেচেঁছে। কতোইনা ভালো হতো, বর্ণমালার অন্যান্য
অর ও যদি বাদ পড়ে বাঁচতে পারতো। শিল্পের নিয়মের প্রতি
জামীর আনুগত্য ছিলো এতোই শক্ত। নিজে গভীরভাবে তা মানতেন। অন্য কেউ তা মানছেনা দেখলে কবিতার রাজবাড়ী থেকে তাকে বিদেয় করে দিতেন। এক কবি অনেক দূর থেকে একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে এলেন জামীকে শুনাবেন বলে। কবিতাগুলোতে ছন্দ ছিলো, কিন্তু অন্তর্নিহিত
ভাবসম্পদ ছিলোনা তাতে। একেবারে সাদামাটা সস্তা কিছু কথা দিয়ে ছন্দ
সাজানো হয়েছে। কিন্তু কবির উচ্চারণে এক ধরণের চমক ছিলো। কবিতার শরীরে ছিলো আবেগের দোলা। জামীকে শুনানো হলো
কবিতাটি।
তিনি বললেন বালির উপরে ভাসমান ণস্থায়ী বৃষ্টির পানি কূপের প্রয়োজন
পূরণ করেনা। কবিতা তো কূপের মতো। ঝর্ণাধারার মতো। বিন্যাসহীন ভাবালুতা কিংবা সস্তা আবেগের আলোড়নে
ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়না। আগত কবিকে জামী অনেক
সমাদর করলেন। তাকে বিদেয় করলেন যাতায়াত খরচ সঙ্গে দিয়ে। কিন্তু তার কবিতার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়।
জামীর এক স্নেহভাজন কবি কবিতায় শুধু মানুষের প্রতি অসন্তুষ ও
জীবনের প্রতি অনীহা প্রকাশ করতেন। তার কাছে কুৎসিতই বড়
হয়ে ধরা দিতো। এক ধরণের বিরক্তি ও বিতৃষ্ণা তার কবিতায় হাহাকার
করে উঠতো। জামী তাকে বললেন তুমি তো কবিতাকেই এখনো চিনলেনা। কবিতা হলো এই আনিন্দ্য সুন্দর গ্রহটির অনি:শেষ সৌন্দর্যে দোলায়িত এক মুগ্ধদর্শক। অপরিমেয় বিশ্বচরাচরের রহস্যমণ্ডিত বিদ্যালয়ের এক কৌতুহলী ছাত্র। তোমার কবিতা যদি কৌতুহলী ছাত্র হতে পারতো, তাহলে সে এক জায়গায় থেমে থাকতোনা। মুগ্ধদর্শক হতে পারলে
অন্ধকার এক কূপের ভেতর হাহাকার করতোনা।
কবিতার কঠিন সমালোচনা জামী করতেন শিল্পের প্রতি তার দায়বদ্ধতার
কারণে। নতুবা ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সুরসিক ও নিরহংকারী। জামীর রসিকতা ও বাকপটুতা ছিলো বিখ্যাত।
প্রথম যৌবনের কোনো কোনো কবিতায় জীবন সঙ্গিনীকে সম্বোধন করে তিনি
তার অগাধ ভালবাসা ব্যক্ত করতেন। বৈধ ও যথাস্থানে এ
প্রেম ছিলো ব্যক্ত করার মতোই। জামী লিখেনÑ
‘তুমি এমনই আমার হৃদয় মন অধিকার করে আছো যে যা কিছু আমার নজরে
পড়ে, মনে হয় তুমি।’
এক রসিক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলো যদি একটা গর্দভী আপনার নজরে
পড়ে?
জামী বললেন মনে হবে সেও তুমি। কারণ কোনো কোনো বৈশিষ্টে গর্দভীর সাথে তার মিল আছে। জামীর ভ্রাতুস্পুত্র ছিলেন কবি হাতিফী। অনন্য প্রতিভাধর এ
কবি ফার্সী সাহিত্যে নিজস্ব এক ভূগোল রচনা করেন। প্রথম জীবনে তিনি জামীর কবিতার পাঠশালায় ভর্তি হতে চাইলেন।
জামীর কাছে জানতে চাইলেন কাব্যরচনায় আদর্শ কাকে স্থির করা যায়?
তখন আদর্শ হবার উপযুক্ত জীবিত একমাত্র কবি ছিলেন আল্লামা জামী। পূর্ববর্তী মহা কবিদের তুলনায় তিনি কম ছিলেননা কোনো অংশেই। কিন্তু এসবের প্রতি তার নজর ছিলো না। তিনি জাতিজাকে নিজের
কবিতার পরিবর্তে হাকিম নেজামীর কবিতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার উপদেশ দিলেন। পূর্ববর্তী মনীষি কবিদের কৃতীত্বকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন অসামান্য সম্ভ্রমে। তাদের প্রতি ব্যক্ত করেছেন প্রাপ্য শ্রদ্ধা। তার অনন্য এক কাব্য বাহারিস্তান। গ্রন্থটিতে তিনি উপদেশের
রত্ম ছড়িয়েছেন। জীবন দর্শনের বাগান সাজিয়েছেন। সহজ সাবলীলতায় তিনি জিন্দেগীর মরুভূমিতে ছুটিয়েছেন অনবরত ঝর্ণাধারা। এতে তিনি ফার্সী কবিতার মহান কবিদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে পূর্ববর্তি এক কবির চারটি
পঙক্তি উদ্বৃত করেছেন। যাতে মসনবীর েেত্র ফেরদৌসিকে, কাসীদার েেত্র আনওয়ারীকে, আর গজলের েেত্র শেখ সাদীকে পয়গাম্বর রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কবিতাটি হলো
দর শেরে সেহ কাস পয়গাম্বরানান্দ
হর চন্দ কেহ লা-নাবিয়্যা বা’দী
আবইয়াত ও ফাসিদা ও গজলে-রা
ফেরদৌসী ও আনওয়ারী ও সাদী
ভাবার্থ: পয়গাম্বরের মতো আছেন
কাব্যলোকের তিন সুরকার
যদিও শেষ নবী বলেন
আমার পরে নেই নবী আর
কাসিদাতে আনওয়ারী আর
বয়েতে ফেরদৌসী আছেন
শেখ সা’দী তো গজলেরই
রাজাধিরাজ হয়ে বাঁচেন
পূর্ববর্তি মনীষি কবিদের প্রতি এই হলো জামীর শ্রদ্ধা!
নিজের কাব্যশক্তির প্রতি জামীর আস্থা ছিলো। কিন্তু এ নিয়ে অহংকার ছিলোনা। ছিলোনা কোনো আদিখ্যেতাও। সমকালীন অন্য বড় কবিদের প্রাপ্য সম্মানদানে তিনি ছিলেন অকুণ্ঠিত। প্রতিভাবান কেউ স্মরণাপন্ন হলে উপযুক্ত মূল্যায়নে তার কার্পণ্য ছিলোনা। এসব গুণ তাকে রাজকীয় মহিমায় মহিমান্বিতই করেনি, বরং মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সিংহাসনে সমাসীন করলো।
ভেঙ্গে পড়ে বাতাসের সিঁড়ি:
জামীর প্রতিভাসূর্য পূর্ণতার মধ্যাকাশে এখন স্থির। চূড়ান্ত প্রগতির রোদ উঁকি দিচ্ছে তার করিডোরে। সেই প্রগতি বাহ্যিকতা থেকে অভ্যন্তরের দিকে। পার্থিবতার লালিত্য থেকে আধ্যাত্মিকতার গাম্ভীর্যের দিকে। এক অমোঘ সুন্দরের হাতছানি জামীর হৃদয়ে পিপাসার হাহাকার সৃষ্টি করেছে। তার ভাবনার তীরে আছড়ে পড়ছে দূরবর্তি মহাসমুদ্রের উর্মীমালা।
জামীর চেতনায় যখন নতুন জগতের বৃষ্টিপাত, তখন হেরাতে চলছে বিশৃঙ্খলা। সুলতান আবু সাঈদ নিহত হলেন শত্র“র হাতে। মর্মান্তিক এই মৃত্যু
কবির হৃদয়ে সৃষ্টি করলো নতুন জখম। রাজাকে মরতে হলো। শক্তি সামর্থ তাকে পাহারা দিলোনা। সে সাধারণের সাথে দাফন
হলো। সে এখন আর রাজা নয়। রাজত্ব চলে গেছে অন্যের
হাতে। তার লোক লশকর অন্যের বশীভূত।
তার সাথে কবির যে গভীর নৈকট্য ছিলো তারই বা পরিণতি কি?
সম্পর্ক কী এক পলকা সুঁতো? রাজা ছিলেন, ছিলো! রাজা নেই, তো অবসিত! হ্যাঁ, একদিন দু’দিন করে তা তো বিস্মৃতির দিকেই যাত্রা করে। তাহলে এমনই কি বাস্তবতা সমস্ত পার্থিবতার? এমনই কি বৈশিষ্ট সকল আত্মীয়তার? স্ত্রী পুত্র,
পৃথিবী ও পরিপার্শ্বিকতার? তাহলে সমস্ত কিছুর শেষ ফলাফল নেতিয়ে পড়া?
প্রেমের শেষ প্রান্তে অপূর্ণতার গহবর? তাহলে কী সম্পর্ক মানুষের মহিমা ও বিদ্যমান বাস্তবতায়?
সমস্ত নৈকট্য একই পরিণতির দিকে ধাবমান। তা হলো অনিবার্য অবসান। বৈচিত্রহীন,
ধূসর পরিসমাপ্তি। তাহলে কী অর্থ বাতাসে
সেতু নির্মাণের? সব সেতুই তো ভেঙ্গে পড়ার জন্যে! তবে কি চূড়ান্ত
ও অমোঘ শাশ্বতের স্পর্শরহিত হয়েই থাকবে জীবন? সমস্ত নশ্বরতা তো এই জিজ্ঞাসার মুখে এসে থমকে দাঁড়ায়।
না। জীবনের সর্বোচ্চ মহিমা
ও চূড়ান্ত মহিমার চাবি অনশ্বরের হাতে। সেখানেই প্রেমের পূর্ণতা,
শৌর্যের মহিমা, রাজত্বের স্থায়ীত্ব,
আনন্দের অর্থময়তা। এবং মৃত্যু ও জীবনের
মধ্যকার দূরত্বের অবসান। জীবন ও মৃত্যু সেখানে
একই বিদ্যমানতার এ পীঠ ওপীঠ। সেই সত্যের আত্মীয়তা
ছাড়া জীবনের সমস্ত আয়োজনই ছেলেখেলা মাত্র। সমস্ত রাজ্যপাট তাসের
ঘর। সমস্ত কাব্যখ্যাতি হাওয়ার বুদবুদ।
এমন সব চিন্তা জামীর মাথায় আগেও ছিলো। কিন্তু এখন তা হাজির হয়েছে প্রবল পরাক্রম সহকারে। নতুন হাওয়ার হিল্লোলে দোলায়িত হচ্ছে চেতনার পত্র পল্লব। চিন্তার জাহাজ আলোকিত বন্দরে ফেলছে নোঙর। জামীর মর্মরাজ্যে তোলপাড় করছে অপার্থিব জলধারা।
ইতোমধ্যে হেরাতের সিংহাসনে বসেছেন হুসেন বাকারা। তিনি আরো অধিকতর আগ্রহে জামীকে কাছে পেতে চাইলেন। জামীর জন্য তিনি স্থির করে রাখলেন রাজকবির উর্ধ্বাসন।
কিন্তু এসবের প্রতি জামীর আকর্ষণ শূণ্যের কোটায়। তার হৃদয় তখন ধাবিত স্বীয় মুর্শিদ খাজা উবায়দুল্লাহ আহরারের প্রতি। যার দরবারে জামীর যাতায়াত প্রথাগত বিদ্যার্জনের সমাপ্তি থেকেই। জামী যখন সবেমাত্র লেখাপড়া শেষ করেছেন, তখনই ডাক পান দরবারে বাহারিস্তানের। তখনই তার চেতনায় ছড়িয়ে
দেয়া হয় আধ্যাত্মিকতার দানা।
একদা স্বপ্নযোগে জামীর সাাত হয় পূণ্যকান্তি এক বুজুর্গের সার্থে। তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন ‘ইত্তাখিয হাবিবা,
ইয়াহদী-কা’ বন্ধু গ্রহণ করো। তোমাকে সে পথ প্রদর্শন করবে। বাক্যটি জামীকে প্রবলভাবে
নাড়িয়ে দিলো। তিনি খুজতে লাগলেন রূহানী কোনো সূর্যের ঠিকানা। আধ্যাত্মিকতার বিশুদ্ধ রাহবার।
জামী চাইতেন আধ্যাত্মিকতায় চরম শুদ্ধতা। এমনটি না হলে আধ্যাত্মের পরম আনন্দ ও প্রেমের চূড়ান্ত সত্যকে স্পর্শ করা যাবেনা। এেেত্র প্রেমই আসল এবং পরমই মূল কাঙ্খিত। কেননাÑ
মুহুর্ত প্রেম, প্রেম মহাকাল
প্রেমই শুরু প্রেমই শেষ
পরম সত্য ল্য প্রেমের
ফাকিতে তা নিরুদ্দেশ
পরম সত্যের জন্য যে যাত্রা, তার পথ খুবই দুর্গম। খুবই বন্ধুর। এ পথে পদে পদে দস্যুর উৎপাত। পদে পদে পাথর আর কাটার
বিস্তার। পদে পদে বিভ্রান্তির মায়াজাল। স্থানে স্থানে হিংস্র পশুর হানা। ঘাটিতে ঘাটিতে ওৎ পাতা
সর্বনাশ। এ পথে আছে মরুভূমি, পিপাসায় তালু
শুকানো রৌদ্র। আছে মরিচিকার প্রতারণা। এ পথে আছে সাহস হারানো ধূলিঝড়। কোথাও ভীতিকর অরণ্য
পথ আগলে দাঁড়ায়। যেখানে নিরাপত্তার নেই কোনো নিশানা। কোথাও মহাসমুদ্র ভয়াল আতঙ্ক ছড়ায়। যার বুক জুড়ে কেবলই
হাঙ্গর কুমীরের ঢেউ! এ পথে অতিক্রম করতে হবে খাড়া পর্বত। যা চরম পিচ্ছিল এবং ভীতিকর। আবার কোথাও আছে আগ্নেয়গীরি!
যেখানে আগুন ব্যাদান করে আছে উত্তপ্ত জিহ্বা। এ পথের যাত্রী বড়ই ঝুকিপূর্ণ রাস্তাকে অবলম্বন করেন। যা পথপ্রদর্শক ছাড়া অতিক্রম করা অসম্ভব। অতএব জামীকে বলা হচ্ছে
বন্ধু তালাশের জন্য। রাহাগীর খুজে নেয়ার জন্য। এতো খুবই জরুরী কাজ।
কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি-মাল্লা
আব্দুর রহমান জামী পথপ্রদর্শক হিসেবে চিন্তা করলেন উবায়দুল্লাহ
আহরারকে। খুবই বিশাল আত্মার দরবেশ। ঝড়উচ্ছল সমুদ্রে দ হাতের নাবিক। আধ্যাত্মিকতার অনন্য
এক আলোকস্তম্ব। অন্ধকারের প্রান্তরে যার আলো যাত্রীদের বাতলে
দেয় গন্তব্য। আহরারের পিতা হলেন আরেক মহান ব্যক্তিত্ব। শায়খ মুহাম্মদ মাসুম নকশবন্দি রহ. আর দাদা তো ছিলেন ইমামে রব্বানী শায়খ আহমদ ফারুকী
নকশবন্দী রহ.। গরীয়ান এই বংশবৃরে ফুল আহরার। কারীম ইবনে কারীম ইবনে কারীম।
জামী হাঁটি হাঁটি পাঁ পাঁ করে ছুটলেন শায়খ আহরারের ঠিকানায়। দৃষ্টিতে তার দূরদিগন্তের রোদ। চেহারায় তার উৎসুক্যের
বিদ্যুৎ। হৃদয়জুড়ে অন্য এক গ্রহের অনুসন্ধান।
ব্যাকুল বেকারার চিত্তে জামী গেলেন হযরত আহরারের মহল্লায়। লোকেরা দেখিয়ে দিলো শায়খের আবাসস্থল। জামী অবাক হলেন। তিনি একী দেখছেন! এতো কোনো দরবেশের ডেরা নয়। এতো এক নজরকাড়া রাজপ্রাসাধ।
বিস্ময়কর চাকচিক্য আলিশান বালাখানায়। সৌন্দর্য যেনো টিকরে পড়ছে চারদিকে। এমন কিছু দেখবেনÑ
জামী কল্পনাও করেননি।
তিনি ভেবেছিলেন দরবেশ থাকবেন ছাউনির ছাপড়ায়। তার চারপাশে থাকবে দারিদ্রের পদচ্ছাপ। থাকবে দুনিয়াত্যাগী
এক মুসাফিরের সামানাহীন বৈভব।
কিন্তু শায়খের বালাখানায় এ কোন বৈভব? এতো রাজাদের মানায়। ফকিরদের জন্য এতো গৌরবের বিষয় নয়। জামীর মন বিষিয়ে উঠলো। তার আগ্রহের পাঁপড়িগুলো
নেতিয়ে পড়লো।
দুনিয়াদারীর মধ্যে অবস্থান করে খোদার সন্ধান, সেতো অসম্ভব। এ দুই পথÑ আলাদা আলাদা। উভয়টাতো এক সাথে চলতে
পারে না হাত ধরাধরি করে?
দুনিয়ার প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ যার, সে তো আধ্যাত্মপথের দিশরী হতে পারেনা। কেননা সে যে পথের যাত্রী,
এ পথে নয় আল্লাহর সন্তুষ বা ভালোবাসা। অতএব এমন লোক রূহানী রাজ্যের নাগরীকই নয়। আল্লাহর আশিকেরা কী তাকে মানুষ বলেন? তারা কী একে
হিসেবের মধ্যে রাখেন?
তারা তো ঘোষণা করে দিয়েছেন:
আদমিয়্যত লহম শহম পুস্ত নেস্ত
আদমিয়্যত জুয
রেজায়ে দুস্ত নেস্ত
অর্থাৎ মাংশ
শিরা ত্বক মিলেই
মানুষ হওয়া হয়না রে
প্রেমাস্পদের খুশি বিনে
মনুষত্ব তো রয় না রে
জামী আহরারের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে পারলেন না। তার বাড়ীর দেয়ালে তিনি দেখলেনÑ
‘‘না মরদ আস্ত
আ কে দুনইয়া দুস্তে দারদ’’
খোদার পথের
লোকই নয়, দুস্ত যেজন এই দুনিয়ার
বাক্যটি সুন্দর করে লিখে আনমনে তিনি বাড়ীর পথ ধরলেন।
জামী যে রাহবার খুজছেন, তিনি আহরার নন।
তাহলে কী করা যায়?
কোথায় যাওয়া যায়?
কোথায় পাবো সেই কাম্য ব্যক্তিত্বের সন্ধান?......
জামীর মাথায় ভাবনার মেঘ। পুঞ্জ পুঞ্জ প্রশ্নের বরফ মনে নিয়ে তিনি হাঁটছেন।
Ñ তাকে তো পেতেই হবে সেই রাহবার। যিনি সত্তার ভেতর প্রকৃত সত্যের সুগন্ধি জাগিয়ে দেবেন। রুমীর কবিতা তিনি পড়েন: আদমিরা আদমিয়্যত
লাযিমাস্ত
উ-দর আগর বু
না বাশদ হাইযমাস্ত
মনুষত্ব খুবই
জরুর
মানুষ হওয়ার
তরে
গন্ধহারা ‘উদর’ গাছও
জ্বলে আগুন
পরে
উদর হলো সুগন্ধিযুক্ত এক মূল্যবান গাছ। সুগন্ধি থাকলে তা হয় অভিজাত বালাখানার শোভা। সুগন্ধি না থাকলে তা হয় আগুনের কাট। জামী ভাবেনÑ
মানুষ ও তো এমনই। তার সাফল্য নির্ভর
করছে আত্মার সুগন্ধির উপর। সেই খুশবু না হলে কীভাবে
চলে?
ভাবনার এক ঢেউ থেকে অন্য ঢেউয়ে দুলতে দুলতে তিনি বাড়ী ফিরলেন।
দিন কাটলো অস্থিরতায়। এলো রাত।
ঘুমের বিছানায় জামী।
বিছানাটি যেনো মেঘের নৌকা হয়ে শূন্যের উপরে ভাসছে। আর জামী শুধু ভাবছেন আর ভাবছেন। হঠাৎ ঘুম এলো। গহীন আরণ্যক ঘুম। ঘুমন্ত জামী দেখলেন বিস্ময়কর এক স্বপ্ন।
কিয়ামত কায়েম হয়ে গেছে! ঝরে পড়ছে কোটি কোটি নত্র। রুদ্ররূষে ফুঁসে উঠেছে বাতাস। পাহাড় উড়ন্ত তুলো। আকাশ চূর্ণ-বিচূর্ণ আর সমুদ্র হয়ে উঠেছে আগুনের সংুদ্ধ তুফান। সবকিছু ধ্বংশ হয়ে গেলো এবং তারপর পৃথিবীটা বদলে গেলো আরেক পৃথিবীতে। আকাশ হয়ে গেলো ভিন্ন এক আকাশ।
কোন এক অলৌকিক আহবানে মানুষেরা কবর থেকে জেগে উঠলো। কোটি কোটি মানুষ হাজির হলো ময়দানে মাহশরে। কারো গায়ে নেই কোনো পোষাক। কারো পরণে নেই জুতো। সবাই উন্মাদের মতো নিজের ভাবনায় অস্থির।
সেখান থেকে সবাই বাধভাঙা তরঙ্গের মতো ছুটলো পুলসিরাতের দিকে।
শত-সহস্র মানুষ আগুনের উপর নির্মিত তীক্ষ্মধার পুল অতিক্রমের
জন্য হয়রান।
অনেকেই পুল পাড়ি দিচ্ছে। গভীরতর অন্ধকারে তাদের হাতে আলো। তারা বিদ্যুৎগতিতে
পেরিয়ে যাচ্ছে সুদীর্ঘ সেতু।
কারো হাতে মিটিমিটি প্রদীপ। পড়ি পড়ি করে তারা এগুচ্ছে। খুবই বিপন্ন তাদের
অবস্থা।
কেউ আবার কেটে পড়ছে ভয়াবহ অগ্নিতে। ভীত-সন্ত্রস্থ চিত্তে অনেকে হারিয়ে ফেলছে ভাষা। আর্তনাদ করছে অনেকেই। শুনা যাচ্ছে দূরাবস্থার
নি:শব্দ চিৎকার!
জামীতো একদম জমে গেছেন। আড়ষ্ট হয়ে গেছেন ভয়ে। সামনে এগুবেন,
ভরষা পাচ্ছেন না। তার হাতে নেই কোনো
আলো। চিত্তে নেই বল। দৃষ্টি ধূসর। পা এগুচ্ছেনা।
এদিকে পুলসিরাত অতিক্রম করতেই হবে।
সময় যতই যাচ্ছে, আগুনের হলকা
যেনো শাঁ শাঁ করে নিচ থেকে উপরে উঠতে চাচ্ছে।
এ সময় দেখা গেলো এক নূরানী দরবেশ। চেহারায় প্রশান্তির আচ্ছাদন। যেদিকেই তিনি যাচেছন,
বিকীর্ণ হচ্ছে আলো। যেদিকেই তার নজর পড়ছে,
খেলে যাচ্ছে আশার বিদ্যুৎ।
হঠাৎ তিনি জামীর দিকে এগিয়ে এলেন। জামী চিনলেন তাকে। উজ্জল সেই দরবেশ হচ্ছেন শায়খ উবায়দুল্লাহ
আহরার নকশ বন্দী! দুই টোঁঠে তার হাসির ঝিলিক। বিপন্ন জামীর দিকে তিনি বাড়িয়ে দিলেন হাত। জামী তার হাতে ধরলেন। তিনি তাকে এগিয়ে নিয়ে
গেলেন পুলসিরাতের দিকে এবং বিস্ময়কর দ্রুততায় পার হয়ে গেলেন তীক্ষ্মধার সেই পুল!
জামীর ঘুম ভাঙলো। সারা শরীর ঘামে একাকার। শরীরের প্রতিটি রোম আতঙ্কে শিহরিত। স্বপ্নের ভয়াবহতায়
যেনো স্তব্ধ হয়ে গেছে রক্ত চলাচল। অনেকণ ধরে স্বাভাবিক
হতে পারছেনা শ্বাস-প্রশ্বাস। রুজে মাহশরের ভয়াবহতা
যেনো তীরের মতো বিদ্ধ হয়ে গেছে তার অন্তরাত্মায়। পুলসিরাতের শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র যেনো জমে আছে তার দেমাগে। চোখ থেকে কোনোভাবেই সরাতে পারছেন না সেই ভয়াবহতাকে। আর অপরূপ সেই সূর্যপুরুষকে!
তিনি যেনো হৃদয় জুড়ে অনুভব করছেন সেই দরবেশের উপস্থিতি।
তার সমস্ত সত্তায় ছেয়ে গেছে মহব্বতের স্বাদ।
তার চেতনার গহীনে যেনো বিচরণ করছে স্বপ্নের মৃগহরিণ। ছট ফট করে তার কেটে যাচ্ছে রাত। জামীর একটিই প্রতীা
কতণে সেই স্বপ্নপুরুষের সান্নিধ্যে যাবেন? কতণে নিজেকে
সর্ম্পণ করবেন তার পদপ্রান্তে। সে রাতের প্রহরগুলো
বুজি খুবই দীর্ঘায়িত ছিলো? খুবই বুঝি মন্থর হয়ে
গিয়েছিলো সময়ের স্রোত! সম্ভবত থেমেই গিয়েছিলো মুহূর্তের অগ্রযাত্রা!
নতুবা রজনীটি জামীর জন্য এতো সুদীর্ঘ হবে কেনো? কেন তার দু:সহ রাত্রিটি হয়ে উঠবে বছরের সমান? কেন দু:স্বপ্নের আতঙ্কে রাত্রি থেকে সরে গেলো সকল আশ্বস্ততা?
কেন তার ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো অস্থিরতার বারুদ? জামী কিছুই বুঝতে পারছেন না। তার প্রয়োজন কেবল সকাল হওয়া।
অবশেষে সকাল হলো। অন্ধকার তার পর্দা
উঠালো।
তিনি খাচা ভাঙা পাখির মতো ছুটলেন হযরত আহরাবের সান্নিধ্যে। ছুটলেন তিনি আলোর প্রেরণায়, পতঙ্গের উচ্ছাসে। উবায়দুল্লাহ আহরারের বাসায় পৌছে তিনি যেনো কূলায় ফেরা পাখির তৃপ্তি অনুভব করলেন। সাাৎ করলেন প্রিয় শায়খের সাথে। শায়খ ইঙ্গিত করলেন
তার বাসার দেয়ালে জামীর দেখা সেই পঙক্তির প্রতি।
বললেনÑ তোমার জায়গা আমার এখানে
হবেনা। আগে বলো আমার দেয়ালে কি লিখেছো? জামী লজ্জায় ঘর্মাক্ত, বিস্ময়ে স্তম্বিত।
এ লাইনটি কিভাবে দেখলেন তিনি? তা যে আমার লেখা, জানলেন কিভাবে? জামী ভাবছেন আর ভাবছেন।
আহরার বললেন: বলো তোমার লাইনটি।
জামী বলতে পারছেন না। অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছেন।
‘বলো’ আবারো নির্দেশ দিলেন আহরার।
জামী তো বললেন, কাঁপা কণ্ঠে,
লজ্জিত চিত্তে।
এবার নির্দেশ হলোÑ এর পরের পঙক্তি
কী হবে তা বলো।
জামীর কাব্যকুশলতা তখন স্তব্ধ। সার্বণিক কবি এই মুহুর্তে যেনো হয়ে পড়লেন কবিত্বহীন, মূক মানুষ। মাত্র একটি পঙক্তি বলতে হবে। জামী তা পারছেন না। সেখানে তার প্রতিভার বৃে নাড়া দিলেই টুপ টুপ
করে ঝরতে থাকে সুপ পঙক্তিমালা, সেখানে এমন কী ঘটলো
যার ফলে জামী পারছেন না স্বাভাবিক সহজ একটি লাইন জুড়িয়ে মিল তৈরী করতে!
না। জামীর বিদ্যাবত্তা
এখন থমকে গেছে। মুর্শিদের দৃষ্টির সামনে নি®প্রভ হয়ে গেছে উদ্যমের প্রদীপ। তার আত্মবোধের ডাল পালা কাঁপছে চমকে ওঠা বাতাসে।
শায়খ বললেনÑ জামী! তুমি তো বলতে
চেয়েছো বিত্তÑ বৈভবে আসক্ত কেউ খোদার পথের লোকই নয়। তবে সেই লোকটি সম্পর্কে বলো যে আছে প্রাচুর্যে, কিন্তু হৃদয়ে কেবলই ফকিরী। থাকে দুনিয়া নিয়েই,
কিন্তু তার হৃদয়ে লাগেনা এর ছোয়া। তার কাছে আসতেই থাকে বিত্তের স্রোত, কিন্তু সে আসক্ত
নয় এর প্রতি।
তুমি দেখছো কাউকে মানুষের ভিড়েই মিশে আছে, কিন্তু তার হৃদয়ে যদি থাকে নির্জনতা, যদি সে মনে মনে একাকী হয়েই রয়, সবাইকে বর্জন করার
চেয়ে সেটাই কি ভালো নয়?
তুমি দেখছো একজনের বালাখানা, ঘর-দোর। কিন্তু তার হৃদয় যদি হয় আখেরাতের মুসাফির,
তার আত্মা যদি ক্রমাগত সেদিকেই ধাবিত হয়, বৈরাগ্যের চেয়ে সে কী ভালো নয়?
জামী! তোমার লেখা সেই পঙক্তির পরের বাক্য হলো:
‘আগর দা-রদ বর আ-য়ে দুস্তে দা-রদ’
তবে যদি খোদার তরেই বেঁচে থাকে এই দুনিয়ায়
জামীর মন থেকে মুছে গেলো সংশয়ের ধুলোবলি।
জিজ্ঞাসার সমস্ত কুয়াসা সরে গিয়ে ঝলমল করতে লাগলো ভাবনার আকাশ। বিশ্বাসের প্রদীপ্ত আলোয় হেসে উঠলো মনের উঠান। আস্থায়, ভরষায় তার অন্তর হয়ে উঠলো সুদৃঢ়। ভক্তিতে হয়ে উঠলো ব্যাকুল। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে
নিজেকে সমর্úণ করলেন মুর্শিদের পদপ্রান্তে।
শুরু হলো নতুন দিগন্তে ডানার বিস্তার!
সাগরে মিশে নদী সাগর হয়ে যায়
জামী এখন নিজেকে জয়ের সাধনায়। নিজেকে অনুভব করার চেষ্টায় তিনি নিরত। আয়নার সামনে স্থাপন
করলেন আপনাকে। একদিকে প্রবৃত্তি, আরেক দিকে আত্মা। হিসেব চললোÑ কে কাকে চালায়? কে কার শাসক?
প্রবৃত্তি কী মানছে আত্মার শাসন না সে বিদ্রোহী?
না কী সে-ই আত্মার লাগাম নিজ হাতে তুলে নিয়ে তাকে ইচ্ছেমতো ঘুরাচ্ছে?
জামী দেখলেন আত্মা দূর্বল। প্রবৃত্তি বিদ্রোহী। উদ্ধত। স্বেচ্ছাচারী।
আত্মার চাই রাজদন্ড। পাকড়াও মতা। চেতনারাজ্যে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব। এজন্যে আত্মাকে হতে
হবে রুগমুক্ত। থাকতে পারবেনা কোনো জরাগ্রস্থতা। তার দিগন্তটা হবে ঝকঝকে, নির্মল।
এজন্যে শুরু হলো সাধনা। সুস্থ সবল পরিচ্ছন্ন হৃদয় নির্মাণের সাধনায়। জামীর আত্মা হতে থাকলো রুহানী রাজ্যের অশ্রান্ত ঈগল। যার ডানার বিেেপ ভেঙ্গে য়ায় বরফের চাঙড়। তছনছ হয়ে যায় ব্যধের
ফাদ, শূন্য জুড়ে শিকারীর পেতে রাখা অদৃশ্য জাল।
শায়খ আহরার তার হৃদয়ে পুঁতে দিলেন রূহানিয়্যাতের চারাবৃ।
সে বৃ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। নতুন কুঁড়ি গজাচ্ছে। হাসছে কিশলয়ের দল। সবুজে ছেয়ে যাচ্ছে বৃটি বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে পত্র-পল্লব। ধীরে ধীরে বাড়ছে ডালপালা। জামীর উদ্যানে লাগছে
বিকাশের আভা। উড়ছে সমৃদ্ধির স্বর্ণরেণূ। ফুটছে নতুন সম্ভাবনার কুঁড়ি।
নতুন সংকল্পে জামী গেয়ে উঠছেন:-
সুবেহ দম বা দায়ে শবানাহ যদীম
সাগী-রে আয়শ যাও দানাহ যদীম
সকালবেলা যৌবনেরই মদ্যপানের দিলাম হাঁচি
জাহির করি মত্ত নেশা ভবে যেনো সদা বাঁচি
গরচে খাম গশত কদমাঁ চু কামান
তীরে ইকবাল বর নিশানা যদীম
ধনুক সম বাঁকা হলো আজ যদিও পা দুটি মোর
তীরটা তবু দেবই মেরে ল্যস্থলে-ঠিক বরাবর!
যানীবে মা যমানাহ কুজ না গরিস্ত
খাকে দর দিদায়ে যমানা যদীম
পাল্টে যাওয়া আমায় দেখে বাঁকা সময় কাঁদলো খুব
কালের চোখে উপোরই ধূলি ছুঁড়ে করবো চুপ
নতুন এই লড়াইয়ের মাঠে জামী হলেন দূরন্ত ঘোড়সওয়ার। অবিরত যুদ্ধে যুদ্ধে তিনি পুলকিত কিন্তু পরিতৃপ্ত নন। এক সমৃদ্ধি থেকে আরেক সমৃদ্ধির দিকে ধাবমান তার সত্তা। এক উচ্চতা থেকে আরেক উচ্চতার অভিলাষী তার হৃদয়। সাধনার মায়াময় পাথারে তিনি মুখ ডুবালেন। যতই গভীরে যান,
ততই মধু!
জামী ঘোষণা করলেন:Ñ
কিশতিয়ে ওহম ও আকল বা শিকস্তিম
গোতাহ দর বহরে বে কিনারা যদী-ম
বুদ্ধি এবং সব খেয়ালের নৌকাগুলো চূর্ণ করে
কিনারাহীন সাগর বুকে ডুব দিয়েছি পূর্ণ করে
সাগরে দূর্যোগ ও আসে। আসে চারদিক আচ্ছন্ন করা অন্ধকার। জামী সবই উপো করেন। মুর্শিদের পথনির্দেশে তিনি হাঙ্গরে-কুমীরে ভরা সাগরে হয়ে উঠেন অকান্ত সাঁতারু। করেন আধ্যাত্মিক রাজ্যজয়।
এক রাজ্যের পর আরেক রাজ্যজয়ের নেশা জামীকে পেয়ে বসলো। তিনি উদগ্রীব হয়ে উঠলেন নতুন অভিপ্রায়ে, নতুন ল্েয। তার কানে বেজে উঠলো আরেক মহাদেশের তরঙ্গনাদ।
ধ্বণিত হলো আরেক বসন্তের বংশীধ্বণি।
হৃদয়কাড়া সেই ধ্বণি জামীকে করলো মুসাফির। তিনি ছুটলেন হেরাতের হৃদয় হযরত সা’দ উদ্দীন কাশগড়ীর আস্তানায়। মহান এই বুজুর্গ ছিলেন নকশবন্দিয়া তরিকার শায়খ।
খাজা আলাউদ্দীন আত্তার নকশবন্দীর অন্যতম খলীফা তিনি। শায়খ নেজমুদ্দীন খামুশ এর সাথীবর্গের অন্যতম চেরাগ ছিলেন কাশগড়ী। তার আধ্যাত্মিকতার সুগন্ধিতে মৌ মৌ করছে দিকবিদিক। তার তাওয়াজ্জুহের শক্তিমত্তা তখন প্রবাধপ্রতিম। কাশফের দরোজা তার উন্মোচিত সারাণ।
যারা তার মুরীদ তারা বলতেন- পাপের দিকে ধাবিত হলেই পীর সাহেবের
বাধা পাই। যেনো তার আত্মা আমাদের পাহারা দেয় আর শাসন করে। এই সব কথা মুখে মুখে প্রচারিত হয়। ছড়িয়ে পড়ে একের পর
এক বৃত্তান্ত। একেকজন একেক ঘটনার কথা বলেন। এগুলো ইতিহাস হয়ে উঠে। শায়খ কাল্লান নকশবন্দীর
ঘটনাও ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
তিনি বলেন- আমি তখন তাগড়া জওয়ান। রক্তে থৈ থৈ করছে যৌবনের দাহ। পেশা ছিলো বাণিজ্য। পিতার সহকারী হিসেবে দেশ-বিদেশে বাণিজ্য পরিচালনায় ব্যস্থ থাকি। একবার যাচ্ছি বিদেশ সফরে। পিতার নেতৃত্বে বিশাল
কাফেলার একজন হয়ে।
কাফেলায় ছিলো সৌম্যকান্তি এক কিশোর।
তার চেহারায় ছিলো উছলানো কমনীয়তা।
চোখ দুটো ছিলো ভরপূর দীঘি।
কপোলে ছিলো চিত্তহারী ঢেউ।
চুল থেকে লাফিয়ে পড়ছিলো টুকরে টুকরো সৌন্দর্য। আমি তার প্রতি তাকাচ্ছিলাম বার বার। বার বার ..........
হৃদয়ে এক সময় ভূমিধ্বসের আওয়াজ হলো।
টের পেলাম নদীভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ছেলেটার কাছাকাছি হবার জন্য অস্থির হয়ে উঠলাম। এই অস্থিরতায় কাফেলা কোন দিকে যাচ্ছে, তা বুঝিনি। কোথা থেকে কোথায় গেছে, তাও খেয়াল করিনি। হঠাৎ বুঝলাম রাত হয়েছে।
চারদিকে অন্ধকার
কাফেলা থেমে গেছে। সামনে এক অট্টালিকা। রাত্রিযাপন সেখানেই হবে।
সবাই ঘুমাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাতি নেভানো হলো। আমার কী আর ঘুম আসে!
আমার তো অস্থিরতাই শুধু বাড়ছে। ধীরে ধীরে এগুতে থাকলাম ছেলেটার দিকে।
এক পাঁ, দুই পাঁ ..... হঠাৎ
দেখলাম বিল্ডিং ফেটে গেছে। পশ্চিম দিকটা দু টুকরো
হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসছেন এক বৃদ্ধ। হাতে মশাল।
তিনি আমার দিকে তাকালেন। দৃষ্টিতে ক্রোধের আগুন। অগ্নিসেলের মতো দু
চোখ ধাঁধিয়ে গোটা কে সে আগুন ছড়িয়ে পড়লো। আমার সমগ্র সত্তায়
সৃষ্টি হলো ভীতির দমকাঝড়।
বৃদ্ধ পূর্বদিকে এগুলেন।
সেদিকে দেয়াল ফেটে দুভাগ হয়ে গেলো। তিনি সেদিকে বেরিয়ে গেলেন। আমি মনোযোগ সহকারে
তার দিকে তাকালাম। ও আল্লাহ! তিনি তো আমাদের মুর্শিদ হযরত কাশগড়ী। তার সেই রোষাগ্নিতে কী যেনো পুড়ে গেলো আমার ভেতরে!
খেয়াল করলাম, ছেলেটার প্রতি
আমার আর কোনো মহব্বত নেই। চিত্তে নেই অস্থিরতার
দাপাদাপি।
উত্থানের কাব্য
এমন এক বুজুর্গের সান্নিধ্যে যাবার আগ্রহ কার না থাকে?
চারদিক থেকে তার দিকে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতো আত্মার অসুখীরা। আর স্বচ্ছতার অভিলাষীরা।
খোদামস্ত বুজুর্গদের মিলনমেলা ছিলো সেখানে। চতুর্দিকে জালের মতো ছড়ানো ছিলো খানকার শাখা-প্রশাখা। লাখো মানুষ সম্পর্কিত ছিলেন এর সাথে। জামী এই দুনিয়াবিরাগীর
দরবারে যাচ্ছেন। দরবারের ধুলোর সাথে মিশিয়ে দেবেন নিজেকে। কাশগড়ীর কঠিন রূহানী শাসনে কেবলই শুদ্ধ হতে থাকবেন আর বুদ্ধ হতে থাকবেন!
তার আগুনে পুড়ে যাবে যা কিছু পুড়ার!
ফলে রক্তে খেলে যাবে শাশ্বত ঝংকার!!
থাকবেনা অনুভূতিও আপন সত্তার!!
থাকবে আত্মসমর্পণের জ্যোছনা। আত্মবিসর্জনের দ্যোতনা। এবং এরই মধ্য দিয়ে
পরম আনন্দের ঝলক। ঝর্ণার স্ফূর্তিতে আবগাহণের চমক!
জ্বলতে থাকবে ফানার অনির্বাণ শিখা!
চলতে থাকবে প্রেমের পেয়ালা পান!!
জামীর পথের পানে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গ্যালক্সির পাথর। সূর্যের রেণূগুলোও হয়তো কেঁপে উঠলো অভিনব মূর্ছনায়। ইতিহাস গেয়ে উঠলো হর্ষিত সংগীত:-
যা কিছু ঘটার ঘটবেই এবং
মেলে দেবে ডানা পাখি
কাফ পাহাড়ের শীর্ষচূড়ায়
জ্বলছে কালের আখি
দুর খোলো খোলে দাও দুর
আজ তৃষ্ণা মেটাবার দিন
এলো মাতালের মত্তসুম
হবে এ পানশালা রঙিন
নদী হবে নীল মহাসাগরে
মোহনায় যাবে যেই
আমি বলে কিছু থাকতে পারেনা
প্রেমের কানুন এ-ই
থাকবেনা যখন আমির দম্ভ
শুরু হবে মহাজয়
সেই জয়গানে ল সূর্য ও
প্রাণ পাবে নিশ্চয়
জামীর মতো জগতবরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিজের শিষ্যমন্ডলীতে পেয়ে
সা’দ উদ্দীন খুশি হলেন। ভবলেন- এবার প্রেমকে
বুঝবার যোগ্য লোক এসেছে।
এসেছে সেই তিমি, যার যোগ্য খাদ্য
প্রস্তুত করে অপোয় তিনি বসে আছেন।
হ্যাঁ, এমন একজনই কাশগড়ীর
দরকার। সম্ভবত জামী পারবে কাশগড়ীর চাহিদা পূরণ করতে। হয়তো সে সম হবে তাকে ধারণ করতে। জামীর মাধ্যমে তার
সিলসিলায় আসবে নতুন গতি। তার তরিকার জন্য জামী
হবেন মুক্তোতূল্য সংযোজন। তিনি আশা করতে লাগলেন
শিষ্যটি উপনীত হবেন উচ্চতর মাকামে।
শায়খ কাশগড়ী তার স্বপ্ন ও আনন্দকে গোপন রাখলেন না। নিকটবর্তী বন্ধুদের নিকট উচ্ছাসের কথা ব্যক্ত করলেন- আল্লাহর শুকর! জাল পেতেছিলাম। একটি বাজ পাখি ধরা পড়েছে।
হেরাতের আরেক সাধক ছিলেন শায়খ শিহাবুদ্দীন। কাশগড়ীর শিষ্যভূক্ত জামী হয়েছেন, এটা শুনে তিনি
বিস্মীত হলেন। বললেন- পাঁচশত বছর পর খোরাসান একটি রতœ প্রসব করলো। সা’দ উদ্দীন সেটিকেও লুফে নিলেন।
কাশগড়ীর খানকায় শত শত আলেম। জামী আসায় রতেœর ভান্ডার যেনো পূর্ণতা পেলো। কিন্তু জামীর প্রতি বাহ্যিকভাবে শায়খ কোনো আলাদা সমীহ দেখাননি।
লঙ্গরখানায় সবার সাথে খাবার তুলেন।
বসেন একেবারে সাধারণের সাথে, ছেড়া চটে।
খানকার বিভিন্ন কাজে খাটতে হয় সবার সাথে!
কখনো খেতে হয় মুর্শিদের ধমক। কখনো ভুল ধরিয়ে দেয়ার পর বোকা বনে যেতে হয়। জামী বুঝলেন অর্জিত বিদ্যা আর প্রায়োগিক বাস্তবতা কতো ভিন্নতর।
বিদ্যার জন্য তিনি মেহনত করেছেন ঘাম ঝরিয়ে। এবার আত্মায় তা মজিয়ে দেয়ার মেহনত করতে হচ্ছে হাড় গলিয়ে। যতোই এ পথে এগুচ্ছেন, ততই বিদ্যার স্বাদ
মরমে পশছে।
ততই তার মাধুর্য চাখতে পারছেন হৃদয়ের জিহ্বা দিয়ে।
শায়খে কাশগড়ী জামীকে দগ্ধ করতে লাগলেন আশ্চর্য আগুনে। পাল্টিয়ে দিতে লাগলেন তার উপলব্ধির মানচিত্র। তাকে ডুবিয়ে দিতে লাগলেন ইলিমের সেই অতলে, যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার কোনো আয়োজন নেই। নেই কোনো প্রয়োজনও। জামী নতুন অভিজ্ঞতার পানিতে সাতঁরাচ্ছেন। তিনি আগে ইলিম দেখেছেন কিতাবে। পড়েছেন শব্দাবলী। এখন দেখছেন জীবন্ত ইলিম। বিদগ্ধ হচ্ছেন নতুন
অনুভবে। শায়খ প্রথমেই পাকড়াও করলেন জামীর আলেমসূলভ আমিত্বকে। হত্যা করলেন তাকে সুকৌশলে। অপূর্ব এক নাটকীয়তার
মাধ্যমে ঘটনাটি ঘটে। যেখানে জামী জড়িত নন সরাসরি। কিন্তু এর প্রভাব পুরোটা পড়লো তার উপর। সুুফলটাও যথার্তভাবে
তিনি ভোগ করলেন।
কাশগড়ীর খানকায় শায়খ শামসুদ্দীন কুত্তসুয়ী ছিলেন এক নত্র। জামীর ঘনিষ্ট বন্ধু। দুঃসাহসী এক সালিক
ছিলেন তিনি। ছিলেন বিপূল ইলিমের অগাধ সাগর।
একবার দুটি সু জিজ্ঞাসার সামনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। কোনোই সমাধান পাচ্ছিলেন না। কোনোভাবে হচ্ছিলোনা
এর সুরাহা।
একদিক থেকে সমাধান করলেন অপরদিকে দেখা দিচ্ছিলো জটিলতা। প্যাঁচের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছিলো প্যাঁচ। খানকার কোনো আলেমই সন্তুষজনক সমাধান খুজে পাচ্ছিলেন না। এমনকি জামীও না। বিষয়টার ভেতরে কুয়াশা, সমাধানও হচ্ছিলো কুয়াশাচ্ছন্ন।
শামসুদ্দীন সিদ্ধান্ত নিলেন জিজ্ঞাসার জবাব পেতে তিনি দূর দেশে
সফর করবেন।
মুর্শিদের কাছে অনুমতি চাইলেন। মুর্শিদ অনুমতি দিলেন না। বললেন- প্রয়োজন নেই
সফরের। কাল সকালে এসে সমাধান বুজে নিয়ো।
পরের দিন সকাল।
মুর্শিদের মজলিসে শত শত আলেম।
শায়খে কাশগড়ী লম্বা এক চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে রেখেছেন। আজ তিনি কোনো কথাই বলছেন না। তাকাচ্ছেন না কারো
প্রতিও। উপস্থিত সবার মধ্যে বিচিত্র কৌতুহল। কী হচ্ছে? কী হবে এরপর? .................
শামসুদ্দীন তাকিয়ে আছেন মুর্শিদের চেহারার দিকে। কখন তিনি পর্দা সরান? কখন কথা বলেন?
সহসা শায়খ বলে উঠলেন- তুমি তোমার জবাব পেয়ে গেছো। তোমার প্রশ্নের এটাই উত্তর।
এরপর আর কী বলবে? কী বলবে তুমি?
শামসুদ্দীন বলে উঠলেন: না, আর কিছু বলার নেই। আমি জবাব পেয়ে গেছি। সন্তুষজনক জবাব। যার উপর আর কিছুই বলার নেই।
মজলিস শেষ।
লোকেরা কুত্তসুয়ীকে জিজ্ঞেস করলো- শায়খ কিছুই বললেন না। তারপরও আপনি জবাব কীভাবে পেয়ে গেলেন?
তিনি বললেন:-
আমি যখন তার চেহারার ডানদিকে তাকালাম, তখন প্রথম প্রশ্নের জবাব আমার হৃদয়ে গুঞ্জরণ করতে থাকে। যখন বামদিকে তাকালাম, তখন দ্বিতীয় জিজ্ঞাসার
জবাবও হৃদয়ঙ্গম হয়ে যায়।
গোটা ঘটনাই জামীর চোখের সম্মুখে।
তিনি এবার দুলতে লাগলেন নতুন তরঙ্গে। তার অর্জিত বিদ্যাবত্তাকে নি®প্রাণ মনে হলো। এর প্রতি তার আস্থার দেয়াল গুঁড়িয়ে গেলো। তিনি বুজলেন- ইলিম অন্য এক মহাদরিয়ার নাম, যার সাথে এখনো তার পরিচয়ই হয়নি। জীবন্ত সেই সত্যের
জন্য তিনি শুরু করলেন দরিয়া সিনান।
মুর্শিদের পরিপূর্ণ তাওয়াজ্জুহ জামীকে উদ্দীপ্ত করে তুললো। তিনি যিকির ও মোবাকাবার যে গহন গহীনে ডুব দিলেন, তাতে যারা ডুব দিয়েছে, তাদের খুব কম সংখ্যক
লোকই ভেসে উঠতে পেরেছে। জামী আত্মহারা রহস্যের ঘূর্ণিতে আত্মলীন হয়ে
গেলেন।
ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে অবাঞ্চিত আবরণ।
ধীরে ধীরে ধরা দিচ্ছে অভিনব ইলিম! হাকিকাতুল হাকায়িক!!
কেতাবী ইলিমের গরিমা তখন মূর্ছা গেছে লজ্জায়।
জামী বলেন:-
দর জামে মী লাল তু য়েক শিম্মাহ ইয়াকতম
আসবাবে ইলিম ও ফজল ব মী খানা শদ গিরো
অর্থাৎ: মদের পাত্রে
তোমার প্রেমের
পেয়েছি যে মোতির ছোয়া
এরই ফলে জ্ঞান-গরিমা
মদ্যশালায় গেছে খোয়া
জুম তখম আরজু যে তু দর দিল নিকশতায়ীম
ফর খন্দাহ সা’য়াতে কে রসদ কশতেরাহে রু
অর্থাৎ: তোমার আশার
চারা ছাড়া
কিছুই মনে আর না গজায়
ধন্য হে ঐ সময় যাতে
এমনতরো মন হয়ে যায়
জামীর সমগ্র অস্তিত্বে ঝংকৃত হলে লাগলো বেদনাভরা বাঁশরী। তার হৃদয়ের চুল্লিতে যে প্রেমাগ্নি ঝলসে উঠলো, তার বিশদ উত্তাপ ছড়াতে লাগলো কবিতার পঙক্তিতে। জামীর কবিতা হয়ে উঠলো দরদের রোনাজারী। তার ছন্দের গহীনে ছলকে
উঠতো প্রেমদগ্ধ ধ্বণিপুঞ্জ। কখনো শুনা যেতো সুন্দরের
হাঁসি, অসীম মমতার কন্ঠস্বর।
এতোদিন তিনি ভাষা দিয়েছেন সুন্দরকে। এবার সমস্ত উৎসের দিকে যাত্রা করলো তার কবিতা। প্রেমের বাহনে সওয়ার হয়ে সমস্ত দর্শন, শিল্প আর জীবননাট্যের
আদিতে যে আনন্দময় পরম সত্তা, তারই রশ্মিধারায় তিনি
গোসল করতে লাগলেন।
তার গোসলের পানি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে!
বিন্দু বিন্দু আর্দ্রতায় সিক্ত হলো মহাকাল!
শুধু কী তিনি গোসল করলেন?
মিশে গেলেন পরম সমুদ্রে। গলে গলে নি:শেষিত হলেন। যেভাবে বৃষ্টির পানি
মিশে যায় ঝর্ণার স্রোতে, যেভাবে প্রাণের নি:শ্বাস
বাতাসে মিশে হয়ে যায় মহাবিশ্বের স্পন্দন। তেমনি এক নি:শেষিত
হওয়া এবং এর মধ্য দিয়ে সুবিশাল, সুগভীর ও সুতুমুল এক
উত্থানের কাব্য রচিত হলো কাশগড়ীর খানকায়।
তিনি বিমুগ্ধ নজরে দেখলেন জামীর বিবর্তন। শেষ জীবনে পরম তৃপ্তিতে তিনি উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন।
শুনো! আত্মার ইতিকথা
জামী পৃথিবীকে শুনাতে লাগলেন নতুন গল্প। আত্মার অভিযাত্রার ইতিকথা। আত্মা কীভাবে পরিপুষ্ট
হবে? কোন পবিত্রতার দিকে তার অভিগমন? কে তার শত্র“প? কোথায় তার মুক্তি?
আত্মার মুক্তিতে কী হবে অর্জন? ইত্যকার সুক্ষ্মতত্ত তিনি জগৎকে বুজাতে লাগলেন। জামীর বক্তব্যে আগে ছিলো বুদ্ধির দীপ্তি, এখন তাতে স্পন্দিত হতে লাগলো চিরকালের আত্মা। তার বক্তব্য হতে থাকলো রূপক। পর্দার আড়ালে স্থান
পেতে লাগলো মণি-মুক্তো।
জামী লিখলেন নতুন কাহিনীকাব্য- সালমান ও আবসাল। এ গ্রন্থে হৃদয়ের গলনপাত্রে বিদগ্ধ শব্দাবলী জামীর আশ্চর্য বর্ণনাপদ্ধতিতে ব্যক্ত
হয়ে প্রেমিকের কাছে পেলো ওযীফার মর্যাদা। কবিতার কাগজে জামী
লিখলেন অভিনব বৃত্তান্ত।
সালমান রাজপুত্র। চাঁদমাখা তার মুখ। অসাধারণ পৌরুষের ঝলক তার মাজে। চোখ থেকে বিচ্ছুরিত
হচ্ছে প্রতিভা। তার হৃদয়ে আছে কাতরতার আতর। সে মুগ্ধ হলো কুমারী আবসালের রূপে। পড়ে গেলো প্রেমে।
প্রেম কী স্থির থাকতে দেয় কাউকে?
অস্থির হয়ে উঠলো সালমানের দিন-রাত। ঘুম তার পালালো। সুখ হলো ঘরছাড়া।
একদিন সে আবসালকে নিয়ে পালালো। ছুটলো অজানার উদ্দেশ্যে। রাত্রির অন্ধকারে নালা-নর্দমা
ডিঙিয়ে সে এগিয়ে চললো। কিছুণ বিশ্রাম নিলো এক মরুদ্যানে। তারপর ধরা পড়ে যাওয়ার ভরে ছুটলো আবারো। মাঠ-ঘাট, পাহাড় মাড়ালো। নদী পেরুলো,
জলাশয় সাঁতরালো। দুঃখকষ্ট তাকে ঘিরে
ধরলো। দুর্দশার রুক্ষ্ম আঁচড়ে রক্তাক্ত হলো সে।
এক সময় উভয়কেই ঘিরে ধরলো হতাশা।
আশ্রয়হারা জীবনের লাঞ্চনা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা ফিরে
এলো যার যার গৃহে।
হারানো সালমানের জন্য ক্রন্দন করছিলো গোটা রাজমহল। সে ফিরে এলো, প্রাণ ফিরে এলো গোটা পরিবারে। স্নেহাতুর পিতা অনুরোধ করলেন ‘আবসালকে তুমি ভুলে
যাও। ত্যাগ কর তার সঙ্গ।’
সালমান কিছুদিন পিতার কথা মানলো। পরে আবারো আবসালের আকাঙ্খা চাগিয়ে উঠলো তার মনে। আবারো তাজা হলো পূরণো জখম। স্মৃতির মরিচীকার পেছনে
হাতড়াতে লাগলো সালমান।
ভাবতে লাগলো আবসালকে ছাড়া তার চলবেনা।
আবার শুরু হলো প্রেমিক-প্রেমিকার যোগাযোগ।
আবারো পালালো উভয়ে। কিন্তু পালিয়ে যাবে
কোথায়? সেই দুঃখের উপত্যকা। সেই দুর্দিনের বিয়াবান। তারা আশার কোনো ভিটে
খুজে পেলোনা। দিনের পর দিন যায়। কান্তি আর অবসাদ তাদেরকে জেঁকে ধরে। সুখস্বপ্ন তিরোহিত
হলো তাদের থেকে। বিবেকের দংশনে অধির হয়ে সালমান সিদ্ধান্ত
নিলো আবসালকে নিয়ে আগুনে আত্মহণন করবে।
জ্বলন্ত অনলকুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লো উভয়েই। দাউ দাউ আগুনে ভষ্ম হয়ে গেলো আবসাল। সালমানও পুড়তে পুড়তে
বেঁচে গেলো। কিন্তু এ বেঁচে থাকা তার জন্যে ছিলো আগুনের
চেয়েও অসহনীয়। আবসাল বিহীন এই বেঁচে থাকার যন্ত্রণা তার
কাছে ছিলো মরণের চেয়েও অধিক। অসহ শূণ্যতায় ভাসতে
লাগলো তার দিন-রাত। অনুতাপের বৃশ্চিক দংশনে সে হতে থাকলো লীন।
অবশেষে সে সন্ধান পেলো এক তাপস-প্রেমিকের। সালমান ভাবলো- অলৌকিক মতা দ্বারা তিনি হয়তো আবসালকে ফিরিয়ে দেবেন। সাধকের দরবারে জীর্ণ-শীর্ণ, বিপন্ন সালমান।
তার আরজ
: হুজুর! আমি
বাঁচতে চাই।
: শুধু বাঁচা নয়, সুখে ও শান্তিতে
বেঁচে থাকো
: কিন্তু আবসালকে ছাড়া আমি বাঁচবোনা
: কে আবসাল? কী হয়েছে তার?
: সে আমার প্রেম। আমার জীবন। আগুনে পুড়ে গেছে, ভষ্ম হয়ে গেছে। তাকে কি ফিরিয়ে আনা যাবে? তাকে কি আমি পাবো?
: হ্যাঁ, তুমি তাকে পাবে। কিন্তু এ জন্যে একটি কাজ করতে হবে।
: যে কোন ত্যাগের জন্য আমি প্রস্তুত। যে কোন কাজেই রাজী।
: তোমাকে থাকতে হবে আমার সান্নিধ্যে। মানতে হবে যা বলি।
সে রাজী হয়ে গেলো। সে এখন দরবেশের খানকায়
থাকে। দিনের পর দিন এখানে কেটে যায়। সাধক তাকে ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক অমৃতের সন্ধান দিতে লাগলেন। নুতন গন্তব্যের দিকে তার প্রেমকে ধাবিত করতে লাগলেন।
আবসালের স্মৃতি ক্রমেই মৃদূ হয়ে আসছে। ক্রমে ক্রমেই সে বিমুক্ত হচ্ছে দূর্ভাবনার বেষ্টনি থেকে। আর পাচ্ছে নতুন গ্রহের আমন্ত্রণ। এক সময় সে পরমার্থ
ধনের অধিকারী হলো। এবং সব ধরণের মোহের অতীত এক অফুরন্ত প্রেমের
আলিঙ্গনে সঞ্জীবিত হয়ে উঠলো। সে তার অতীতের দিকে
তাকায়। মৃত এক পোড়ো জমির মতো মনে হয় তাকে। দুঃসহ এক কারাগারে বন্দি ছিলো সে। কিন্তু সেখান থেকে
মুক্তি পাওয়ার কোনো ইচ্ছা বা স্বপ্ন তার ছিলোনা। সেটা এক এমন কারাগার, যেখানে বন্দি আছে প্রত্যেকেই
এবং এখানে আরো বেশি শৃঙখলিত হবার জন্য লোকেরা তৎপর। সালমান এখন মুক্ত স্বাধীন মানুষ। সুখ তার হাতে এসে ধরা
দিয়েছে। প্রকৃত প্রেমের মর্ম এখন তার কাছে পরিস্কার। এমন প্রেমের বিনিময়ে গোটা দুনিয়াও সে গ্রহণ করতে রাজী নয়। জামীর এই সালমান হলো মানুষের আত্মা। আর আবসাল হলো নফসে
আম্মারা বা প্রবৃত্তির চাকচিক্য। নফসে আম্মারা বিচিত্র
আকর্ষণে আত্মাকে নিজের আশিক বানাতে চায়। ফলে আত্মা তার পেছনে
ছুটতে ছুটতে নিঃস্ব, রিক্ত ও সর্বস্বহারা হয়ে যায়। সে হয়ে যায় অন্যের কণীভূত। তার তাকেনা ভালো-মন্দের
অনুভবটুকুও।
কিন্তু আত্মা যদি বলিষ্ট হতে চায়, যদি সে স্বাধীন হয়ে প্রকৃত মহীমার উচ্চাসন অধিকার করতে চায়, এবং যদি সে প্রেমে পূণ্যে হতে চায় উদ্ভাসিত, তাহলে আবসালকে ভস্মীভূত করতে হবে। পুড়িয়ে ফেলতে হবে লেলিহান আগুনে। কারণ আবসালের মায়াজালই
হলো কামনার কারাগার।
এশকে হাবীবে খোদা
জামীর হৃদয়ে ছিলো রাসূলে খোদার (সাঃ) মহব্বতের সূরভি। এ মহব্বত তো প্রত্যেক হৃদয়বানের ধন। এ মহব্বত তো প্রত্যেক
সুন্দরের নির্যাস। এ মহব্বত তো সমস্ত রহস্যের অন্তসার। এ মহব্বত আছে বলেই শুভবোধ মানুষের চিত্ত জাগায়। এ মহব্বত আছে বলেই সূর্য তার দুগ্ধ ঢেলে জাগিয়ে তুলে পুষ্পের চাঞ্চল্য। এ মহব্বত আছে বলেই জ্যোৎস্নার মাখন খেয়ে পুলকিত হয়ে ওঠে গাছের চারা। এ মহব্বত ঈমানের বুনিয়াদে এনে দেয় অটলতা। এ মহব্বত সৎকর্মের রক্ত প্রবাহ, সততার নিঃশ্বাসের
সুবাতাস। এ মহব্বত আছে বলেই কদর আছে মহত্বের। এ মহব্বত মানবাত্মার ঐশ্বর্য। পবিত্রতার সারাংশ। যা না হলে জীবন হবে খরখরে বালির মরুভূমি। নদী থেকে শুকিয়ে যাবে পানি। থাকবে শুধু থিকথিকে
কাদা। ইতিহাস ভরে যাবে বনে-জঙ্গলে। আর জনপদে মানুষের পরিবর্তে বসবাস করবে হিংস্র হায়ান!
এশকে হাবীবে খোদা বিশেষ কোনো সময়ের সাথে নয় সম্পর্কিত। যেদিন থেকে দুনিয়ায় মানুষের পদসঞ্চার শুরু, সেদিন থেকে পৃথিবীতে তার সূরভি। প্রথম মানব হৃদয়ে ছিলো
এই এশকের মধু। পৃথিবী যতদিন থাকবে, বইতে থাকবে এই মধুর ধারা।
এই এশক কী কোনো ধর্মের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ?
না। এতো ইনসানিয়াতের প্রাণের
স্পন্দন। যেখানে এ স্পন্দন থাকবেনা, সেখানে মনুষত্য মরে যাবে। তাকে বাঁচাবার থাকবেনা
কোনো দাওয়াই। এ কারণে প্রতিটি মানবিক মনে এই মহব্বতের মিনার
জাগ্রত। প্রতিটি প্রেমিক হৃদয়ে এ মহব্বত অর্জন করে রাজাসন। প্রত্যেক শিল্প পিপাসু আত্মার তুলি ভিজিয়ে নেন এ মহব্বতের জারক রসে। প্রত্যেক আলোর পাখি এ মহব্বতের আবে হায়াত পান করতে উদগ্রীব।
আবদুুর রহমান জামীও পান করেছিলেন এই শীতল শরাব।
এতো পান করেছিলেন যে আর কোনো ঘাটতি তার ছিলো না। এ মহব্বতের মৌতাতে তার দিন-রাত ছিলো বিমোহিত। নবীজীর (সাঃ) এতায়াত ছিলো তার ভূষণ আর মহব্বত ছিলো বেঁচে থাকার প্রাণ। এশকে হাবীবের (সাঃ) কোন দরিয়ায় জামীর জলডুবি হয়েছিলো, তা কেউ বলতে পারবেনা। তার হৃদয় সারাণ পড়ে
থাকতো সাগরের অতলে। নবিজীর (সাঃ) শানে তিনি গাইতেন প্রাণ মাতানো
কাসিদা। আশিক জামী যখন ব্যাকুল চিত্তে সেই কাসিদা আবৃত্তি করতেন,
তখন কন্ঠে যেনো ভর করতো নিখিলের সমস্ত আবেগ আর ভালোবাসা।
জামী হয়ে উঠলেন নবী প্রেমের পাপিয়া। অপূর্ব ভাব আর ছন্দে তিনি লিখেন নাতের পর নাত। জামীর নাতগুলো কল্পনার সতেজতা ও বক্তব্যের ওজস্বীতায় নজিরবিহীন। শত শত বছর ধরে তা মানুষের মুখে ও বুকে নবী প্রেমের তরঙ্গ দোলা ছড়িয়ে চলছে। ফার্সী ভাষায় তার খুবই বিখ্যাত একটি নাত পড়–ন এবং নিজের পড়া শুনুন:-
গুল যে পেশে আমুখতা
নাজুক বদনী রা বদনী রা বদনী রা
বুলবল যে তু আমুখতা
শিরী ছখুনিরা ছখুনিরা ছখুনিরা
হর কাসকে লাবে লাল তুরা দিদা বদেল
গোফতা বদেল গোফত
হককা কে চে খোস! কান্দে আকিকে
ইয়ামানীরা ইয়ামানীরা ইয়ামানীরা
খাইয়াতে আযল দোখতা বর কা মাতে জীবা
বর কদ্দে তুই জামায়ে সাবজা
চমনিরা চমনিরা চমনিরা
কুরবান শওয়াম লাম-আযালী রা কে যে কুদরাত
হাম চু দুররে ছাখতা ইয়াক কাৎরা
মনিরা ও মনিরা ও মনিরা
আয জামীয়ে বেচারা রেছানীদে সালামে-
বর দরগাহে দরবারে,
রাসূলে মদনীরা মদনীরা মদনীরা।
ভাব কথা নিম্নরূপ:
পুষ্প পেলো লাবণ্য তার
তোমার রূপের ভোর থেকে
মিষ্টি আওয়াজ বুলবুলি পায়
তোমার মোহন সুর থেকে
তোমার লোহিত চূণির মতো
ওষ্ট দেখে যার চোখে
হাওয়ার হৃদয় মুগ্ধ করা
নাত বাজে যে তার মুখে
ইয়া আল্লাহ! কী হৃদয় কাড়া
অপূর্ব রূপ তার মাজে
ইয়ামান দেশের মিছরি আকিক
ঝলসে যেনো তার সাজে
সৃষ্টির আদিম সেই কারিগর
সকল বাগান বাছাই করে
শ্যামলতায় সাজিয়ে গড়েন
তোমার জামা যাচাই করে
তার তরে হই কোরবান আমি
যিনি মহান শক্তিধারী
মুক্তো সম মণির ফোটায়
গড়েন সকল পুরুষ নারী
নিঃস্ব জামীর লাখো সালাম
হৃদয়চেরা প্রেমের রাগে
পৌছে যেনো সেই মদীনার
প্রিয় নবীর গুলের বাগে
রওজায় নয়, রওজাওয়ালার কাছে
জামী এমনই সব কাসিদার মাধ্যমে নবী প্রেমের সবক জপ করেন। সে সব কাসিদা নয় শুধু কল্পনার প্রগলভতা। বরং হৃদয়ের রক্তরণ
থেকে তা হয় উৎসারিত। দীর্ঘশ্বাসের ঘূর্ণিপাকে তা হয় ঝংকৃত। দগ্ধীভূত বুকের ব্যথায় যা পায় লালিত্য। ঈমানের সুনিবিড় আকর্ষণে
কবিতাগুলো পায় প্রাণাবেগ।
এই সব উচ্চমার্গীয় কবিতায় সীমাবদ্ধ থাকেন না জামী। তিনি বিদগ্ধচিত্তে নবীজীর উদ্দেশ্যে পাঠ করেন দরুদ। সর্বণ তার মুখে দরুদের সুঘ্রাণ।
অধিক দরুদের দ্বারা অধিক রহমতের বৃষ্টিতে বিধৌত হতে থাকেন। এগিয়ে যেতে থাকেন আল্লাহ ও তার হাবীবের সন্তুষ্টির দিকে। সেই সন্তুষ্টির রাজমহলের দিকে তার নিরন্তর যাত্রা। সেখানেই পড়ে আছে তার হৃদয়-মন।
জামীর মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো হজ্বের জন্য। প্রেমের লেবাস গায়ে জড়াবেন। কালো গিলাফে ধরে নিবেদন
করবেন আত্মার আর্তি। তওয়াফ করবেন বায়তুল্লাহ। আর হৃদয়ের সমস্ত দরদ দিয়ে বলতে থাকবেন- লাব্বাইক, আল্লা-হুম্মা লাব্বাইক।
আমি হাজির, হে মুনীব আমি হাজির।
সেখান থেকে ছুটবেন রওযায়ে আতহারের দিকে। পিয়ারে হাবীবের মদীনায়। যার প্রতিটি ধুলোবালি
জামীর চোখের সুরমা। যার সুঘ্রাণ হাওয়া জামীর আত্মার আতর।
জামী হজ্ব করলেন।
এবার যাচ্ছেন মদীনাতুর রাসূলে।
হৃদয়ে প্রেমের আগুন। দু চোখে অশ্র“র বৃষ্টি। চিত্তজুড়ে নিবিড় ভক্তিরস।
জামী চলছেন এগিয়ে। কন্ঠে তার অনিরুদ্ধ
নাতিয়া। আবৃত হচ্ছে অপূর্ব কাতরতায়। মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। জামীর প্রতিটি পদপে
কম্পিত হচ্ছে অজানা আবেগের দোলায়। সেই আবেগে যেনো মাটিও
দুলছে। দুলছে সময়ের প্রবাহ।
রাত হলো। জামী চলছেন তো চলছেনই।
এদিকে মক্কার গভর্নর স্বপ্নে পেলেন রাসূলে কারীমের (সাঃ) দীদার। রাসূলে করীম (সাঃ) তাকে একজন লোকের পরিচয় দিলেন। সে মদীনার দিকে যাচ্ছে। তাকে গ্রেফতার করতে
হবে।
গভর্নর ঘুম থেকে জেগেই সেদিকে পুলিশ পাঠালেন। তাদেরকে শুনালেন লোকটির বিবরণ। দ্রুততার সাথে এগুলো
তারা। রাস্তায় পেলো লোকটাকে। গভর্নরের দেয়া বিবরণের সাথে মিলে যাচ্ছে তার চেহারা-সুরত। জামীকে গ্রেফতার করে আনা হলো মক্কায়। পূরা হলো কারাগারে।
কারার প্রকোষ্টে দূর্বার হয়ে উঠলো জামীর প্রেমাগ্নি। তিনি অস্থির হয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। মুখে তার নাতিয়ার সুরেলা
মারুত। সহসা কোন এক সুযোগে তিনি বেরিয়ে গেলেন কারাগার থেকে। ছুটলেন মদীনার দিকে। নদীর স্রোতের মতো তার
গতি। রাত হলো। গভর্নর আবারো স্বপ্নে
দেখলেন- রাসূলে কারীম সা. নির্দেশ দিচ্ছেন- মদীনার দিকে এগুচ্ছে। গ্রেফতার করো তাকে।
ছুটলো আবারো পুলিশের দল। জামীকে আবারো পাঠানো হলো কারাগারে।
গভর্নর ভাবতে লাগলেন- লোকটি কতো বড়ো অপরাধি কে জানে?
যাকে গ্রেফতারের জন্য স্বয়ং রাসূলে আকরাম সা. দুই বার নির্দেশ
দিলেন! কারারীদের তিনি সতর্ক করে দিলেন লোকটিকে যেনো কঠিনভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়। কোনো ভাবেই যেনো সে পালাতে না পারে।
গভর্নর এই বন্দির কথা ভাবছিলেন- কোনো গুরুতর পাপী সে নিশ্চয়। যে কারণে তাকে মদীনায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। তার উপর নবীয়ে রহমত (সাঃ) কতোইনা অসন্তুষ্ট!
এই সব ভাবতে ভাবতে গভর্নর ঘুমিয়ে পড়লেন। আবারো স্বপ্নে হলো দীদারের সৌভাগ্য। হুজুর (সাঃ) এর চেহারা
খুবই প্রদীপ্ত। খুবই প্রশান্ত। তিনি তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন। শুনো! আমার সেই বন্দি
কোনো দোষে দুষী নন। তিনি আমার আশিক। যে ভক্তি ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি মদীনার দিকে যাচ্ছেন, তা তুলনাহীন। তিনি তৈরী করেছেন একটি কবিতা। রওজায়ে আতহারের কাছে পাঠ করবেন বলে। তিনি যদি সেখানে যান,
আর সালাম ও ভক্তি নিবেদন করেন, তাহলে রওজার ভেতর থেকে হয়তো আমার হাত বেরিয়ে পড়বে। সেখানে অনেক লোক থাকবে। তাদের সম্মুখে ঘটনাটি
ঘটলে নতুন ফেতনা দেখা দেবে। ফেতনা যাতে না হয়,
এ কারণে জামীর মদীনা যাওয়া সমীচিন মনে করছি না। তাই তাকে গ্রেফতারের আদেশ দিলাম।
গভর্ণর ঘুম থেকে জাগলেন। তিনি শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে নির্বাক। আশ্চর্য এক অনুভবে
তিনি স্তম্ভিত। ভাবছেন- এক আশেক কতো উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছেন
নবীজীর (সাঃ) দরবারে। কতো সৌভাগ্য তার! জামীর সেই কবিতার জন্যে
তার চিত্ত অধীর হয়ে উঠলো। কতোইনা প্রেমময়তা আছে
সেই কবিতায়! আর কতোইনা ভক্তিবিগলিত সেই কবির সত্তা! গভর্নর স্বপ্নবৃত্তান্ত লুকিয়ে
রাখতে পারলেন না। বলে দিলেন নিকটজনকে।
ঘটনাটি ঝড়ো বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়লো মানুষের মুখে মুখে। দেশে, দেশান্তরে। সর্বত্র শুরু হলা অভিনব এই চর্চা। পৃথিবী আগে জানতো এক
বিদ্যাসাগর জামীকে। তুলনাহীন কবি হিসেবে ছিলো তার খ্যাতি।
এখন নতুন জামীর পরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো! বিশুদ্ধ এক নবীপ্রেমিকের
স্বরূপে।
চারদিকে উৎসুক্য শুরু হলো- কোথায় সেই কবি? কী সেই কবিতা? কোন ভাবের দরিয়া
আছে সেই কবিতার হৃদয়ে? আশিকে রাসূলদের (সাঃ)
কাছে কবিতাটি গোপন রইলোনা। দেশে দেশে তারাও নিজেদের
আত্মার দহনকে ব্যক্ত করতে আবৃত্তি করতে লাগলন-
যে মাহযূ-রী বর আমদ জা-নে আলম
তারাহহাম ইয়া নবিয়্যাল্লা-হি তারাহহাম
নাহ আখেরে রাহমাতুল্লিল আলামি-নী
যে মাহরু-মা চেরা গাফিল নশি-নী
যে খাকে আয় লা’লা সয়রা-বে বর খেজ
চু নারগিছ খাবে চন্দ আয খা-বে বর খেজ
যে রুঁ আঁ ওর সর আয বরদে ইয়ামা-নী
কে রুঁয়ে তস্তে সুবহে জিন্দেগা-নী
শ-বে আন্দো মা-রা রুজে গরদান
যে রুয়তে রুজে মা ফিরুজে গরদান
বতন দর পুশে আম্বর বু-য়ে জামা
বসর বর বন্দ কাফুরী আমামা
ফরুদে উয়ে জাজে সব কি সওয়াঁ রা-
ফগুন সা পে বপা সর ও রওয়াঁ- রা-
আদি-মে তায়েফী না, লাইনে পা-কুন
শেরাক আয রেশতাহ জা-ন হায়ে মাকুন
জাহানে দীদাহ করদাহ ফরশ রহ আন্দ
চু ফরশ ইকবালে বা বুশে তু খা হান্দ
যে হুজরা পায়ে দর সেহনে হরম নাহ
ব ফরকে খাকে রহ বু সানে কদম নাহ
বদাহ দুস্তি যে পা উফতাদ গা-নে রা
বকুন দিলদার য়ে দিলদার গা-নে রা
আগর চে গরকে দরইয়া-য়ে গুনা হাম
ফতাদাহ খুশকে লবে বর খাকে রা হাম
তু আবরে রহমতি আঁ বেহকে গা-হে
কুনী বর হালে লব খুশকা-নে নিগা-হে
খুশা কয গিরদে আয কু-য়েতে রাসিদী-ম
বদ ইয়াদা গিরদে আয কুয়েতে কাশিদী-ম
ব মসজি-দে সেজদায়ে শুকর আ নাহ করদায়ী-ম
চেরা-গত রাজে জান পরু-আয করদায়ী-ম
বগিরদে রওজায়ে আত গুশতায়ী-মে গুস্তাম
দিলম চু পজরা- সু-রাখ সু রাখ
যদীম আয এশকে আ-বর চশমে বে খাব
হরীমে আস্তা-নে রওজায়ে আত-আব
গাহে রফতী-মে জান সা-হত গুবা-রে
গহে চি-দী-মে জু খাশাকে ও খা-রে
বাংলায় কবিতাটির ভাবকথা:-
বিরহ ব্যথায় মর্মাহত জগতের সব ধূলিকনা
অনুগ্রহের দৃষ্টিপাতে করুন দয়ার নজরানা
সন্দেহ নেই রহম তুমি এই দুনিয়ার তরে
কেমনে তবে হও বেখবর এই অভাগার পরে?
হে অপূর্ব পুস্প মোহন খুশবু দিয়ে বিশ্বটাকে
সঞ্জীবিত করো এবং ধন্য করো এ নিঃস্বটাকে
ঘুম ভাঙা নারগিছের মতো জেগে আপন সৌরভে
উদ্ভাসিত করো জগত জাগুক সবাই গৌরবে
ইয়ামানী সেই চাদর ছেড়ে চেহারাটা জাহির করুন
সেই চেহারার নূর আমাদের জীবন উষার দীপ্ত অরুণ
চিন্তাভরা রাতগুলোকে করুন দিনের রৌশনী
বিচ্ছেদের আধাঁর কেটে হোক মিলনের জয়ধ্বনি
জগতজনের হৃদয়কাড়া সেই চেহারার নূর দিয়ে
দিনগুলোকে ধন্য করুন কামিয়াবীর সুর দিয়ে
পবিত্র সেই বদনেতে খুশবুমাখা পোষাক পরুন
মাথার পরে কাফুরমাখা দীপ্ত সফেদ পাগড়ি বাধুন
হৃদয়কাড়া খুশবু মাখা চুল মোবারক মাথায় ছড়ান
চলার পথে যেন তারি শীতল ছায়া আপনি মাড়ান
তায়েফেরি চামড়া দিয়ে তৈরী জুতা পায়ে পরুন
মোদের প্রাণের তন্তুকে তার ফিতা রূপে কবুল করুন
এই দুনিয়া দেয় হাদিয়া হৃদয় এবং চোখ আপন
চলার পথে বিছানারূপে লাগবে তাতে সেই চরণ
কদমবুছির গৌরব তার হাসিল হবে, ধন্য সে
আসমানেরও চেয়ে তখন শ্রেষ্ঠরূপে গণ্য সে
সবুজ গম্বুজের হুজরা ছেড়ে মসজিদে তাশরীফ আনুন
পায়ের ধুলি চুমবে যারা, তাদের মাথায় কদম রাখুন
কমজোর এবং সহায়হীনের সাহায্যে হাত একটু বাড়ান
সত্যিকারের প্রেমিকজনে করুন প্রিয়, সান্তনা দান
পাপসাগরে ডুবলেও গো তোমার পথের পপুটে
তৃষ্ণাভরা হৃদয় নিয়ে পড়ে আছি শুকনো ঠোঁটে
রহমতেরই বর্ষা ওগো পিপাসিত প্রাণের প্রতি
মেহেরবানীর নজর করুন না হয় কোনো নেই যে গতি
কতো ভালো হতো যদি ধূলিমাখা শরীর নিয়ে
সেই মদীনায় গিয়ে চোখে সুরমা দিতাম ধূলি দিয়ে
রওজা পাকের চতূর্ধারে ঘুরতাম এমন পাগল বেগে
টুকরা টুকরা হয়ে যেতো হৃদয় আমার প্রেমের তেগে
পাক নবিজীর (সাঃ) মসজিদে শুকরানা নামাজ পড়ে
পতঙ্গ এ হৃদয় হতো রওজা পাকের বাতির তরে
ঘুম পালাতো, চোখের মেঘে বইয়ে দিতাম
আসুর ঢল
প্রেমের ব্যাথায় সে আস্তানায় ভাসতো দু চোখ অবিরল
সে মসজিদে আবার আমি ঝাড়– দিতাম গৌরবে
ধূলিকনা সাফ করে যে ধন্য হতাম সৌরভে
চোখের তরে ধূলিবালি তিই আনে, এই জানি
কিন্তু আমি সেই ধূলিকে আমার চোখের নূর মানি
আবর্জনা লাগলে জখম বিষাক্ত হয় ভয় বাড়ে
মোর জখমে পট্টি বানাই রওজা পাকের ময়লারে
না রাজা, না রাজাসন
রাজা-বাদশারা চাইতে থাকলো জামীর সান্নিধ্য। বসফরাসের ও পারেও ছড়িয়ে পড়লো সেই আগ্রহ। তুরস্কে তখন ওসমানী
সালতানাতের সোনালি সময়। গৌরব ও মর্যাদায় তখন ইস্তাম্বুল বিশ্ব-রাজধানী। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পি ও দার্শনিকদের মিলনমেলা শহরটিতে। রাজসভায় আছেন তাদের মধ্যে বাছাই করা অনেকেই। মর্যাদা তাদের অনেক। কদর তাদের সুবিপুল।
ওসমানী সুলতানরা চান সারা বিশ্বে চিন্তারাজ্যে নেতৃত্ব দিতে। এজন্যে তাদের দরকার বিশ্বপ্লাবী প্রতিভা।
জগতসেরা চিন্তানায়ক।
এমন কে আছে মুসলিম বিশ্বে? কে আছে?
সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ হঠাৎ ভাবলেন আবদুুর রহমান জামীকে এখানে
নিয়ে আসছিনা কেনো? তিনি তো ওলামা জগতের সূর্য। চিন্তানায়কদের মাথার মুকুট। রূহানিয়্যাতের শাহসওয়ার। আবার কাব্যজগতের শাহানমাহ।
জামীর সাথে সুলতানের পত্র যোগাযোগ ছিল অনেক আগ থেকেই। এরকম যোগাযোগ রাখতেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদও। তিনি ছিলেন জ্ঞানপাগল। জ্ঞান-বিদ্যার নানান
বিষয়ে তিনি শরণাপন্ন হতেন আল্লামা জামীর। তারও কামনা ছিলো জামীর
মাধ্যমে তিনি শাহী দরবারের রওনক বাড়াবেন। কিন্তু সেটি হয়নি। দ্বিতীয় মুহাম্মদ এবার তা করে ছাড়বেন।
তিনি খোজ নিলেন জামী হজ্বে আসবেন কি না?
খবর এলো-প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুলতান খুবই মেধাবী ও দ্বীনদার কয়েকজন প্রতিনিধি বাছাই করলেন। এদের দেখে জামী আকৃষ্ট হবেন। তার মেজাজ প্রসন্ন
হবে।
তারপর লিখলেন একটি পত্র। লিখলেন- সালতানাতের জন্য প্রয়োজন আপনার মেধা। প্রয়োজন প্রতিভার আলো। এজন্যে চাই রাজদরবারে
আপনার প্রত্য উপস্থিতি।
খুবই আন্তরিকতার সাথে জামীকে তিনি রাজসভায় আমন্ত্রণ করলেন।
বাহক নিয়ে এলো পত্রটি। সঙ্গে পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, হাদিয়া স্বরূপ। সুলতান অপো করতে লাগলেন হজ্ব শেষে জামী আসবেন তার রাজমহলে। তিনি তাকে বরণ করবেন অন্তরঙ্গ শ্রদ্ধায়। দান করবেন রাজকবির
স্বর্ণাসন।
কিন্তু হজ্ব শেষে জামী চললেন দামেস্কের দিকে। তিনি পালাচ্ছেন রাজকীয় আমন্ত্রণ থেকে। চাকচিক্যের প্রলোভন
থেকে। সালতানাতের সংবর্ধনা থেকে।
এগুলোর প্রতি তার মনে অনীহা। এ সব উঠকো ঝামেলা বড়ো বিরক্তিকর। তার আত্মিক আনন্দের
জন্যে এগুলো নয় অনুকূল। রাজকোলাহল তার মনে জাগায় বিরক্তি। তিনি বরং চান অখন্ড নীরবতা। সুস্থির নির্জনতা।
জামী দামেস্কে যাচ্ছেন- খবর পেয়ে তুরস্কের রাজদূত লোক-লশকর নিয়ে
ছুটলেন সেদিকে। তিনি জামী আগেই পৌছতে চান সিরিয়ার রাজধানীতে। তারা কোনো ভাবেই জামীকে ছাড়তে চান না। হারাতে চান না মুসলিম
বিশ্বের এই মুক্তোকে।
জামীর কাছে সে সংবাদ পৌছলো। তিনি বিরক্ত হলেন। রাজাদের কান্ড কারবার দেখে তাদের প্রতি হলেন
আরো অনাগ্রহী। তিনি দামেশকের দিকে আর এগুলেন না। পথ পাল্টিয়ে এবার যাত্রা করলেন তাবরেজের দিকে। অত্যন্ত সংগোপনে। সাধারণত দিনে আত্মগোপন করেন। রাতে পথ পাড়ি দেন। মরুভূমির বিজন পথ। তার সঙ্গী তখন চাঁদ আর আকাশের নত্ররাজী। নির্জনতার ভাষায় তার
সাথে কথা বলে জ্যোৎস্নার কন্ঠস্বর।
সহসা জামীর মনে হলো সুলমান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ও দ্বিতীয় বায়েজীদের
আন্তরিকতাকে কী অবমূল্যায়ন করে বসলাম? এটা কী উচিত
হলো? তাদের প্রতি সৌজন্য প্রদর্শনের কী হতে পারে পথ?
হঠাৎ ভাবলেন তাদের শুভেচ্ছার কদর করবেন অন্যভাবে। উভয়ের নামে উৎসর্গ করলেন দু’টি কাব্য। জামীর মনে কিঞ্চিৎ
অস্বস্থি ছিলো। তা দূর হলো। নির্ভাবনায় তিনি প্রবেশ করলেন তাবরেজে।
কিন্তু সেখানেও থাকলেন না। লোকেরা পঙ্গপালের মতো তার পিছু ছুটে। আমীর-উমারার বহর ছুটে
আসে। এদের মধ্যে অবস্থান করা যায়। এদেরকে সুপথ প্রদর্শনের যিম্মা নেয়া যায়। কিন্তু জামীকে তো তখন আহ্বান করছে অন্য এক যিম্মাদারী। তাকে আবাদ করতে হবে অন্য এক গ্রহ। সেখানে ফলাতে হবে আত্মার
সোনা দানা।
গোপনে গোপনে জামী হেরাত চলে গেলেন। প্রিয় মুরশিদের তখন বিদায়বেলা। তার হায়াতের সূর্য
আপন পরিক্রমা শেষে এখন অস্তগামী। সা’দ উদ্দীন কাশগড়ী। জামীকে ডাকলেন। দৃষ্টিতে তার পরম মমতা। আস্থা আর নির্ভরতা। বললেন- আব্দুর রহমান! আমার আমানত তোমাকে দিলাম। এ আমার সারা জীবনের সঞ্চিত ধন। আমি চলে যাচ্ছি। ডাক এসে গেছে। আমার পরে তুমিই হবে হেরাতের হৃদয়। মুলকের কুতুব। আমার খানকাকে তুমি প্রেমের সুবাস দিয়ে ভরে
দিয়ো। যারাই এখানে আসবে, সবার হৃদয়ে
রোপণ করবে হেদায়েতের তৃষ্ণাবৃ। সবাইকে দেখাবে আল্লাহর
পথের ঠিকানা।
জামী এবার শুরু করলেন অবিরত বৃরোপন।
লাখো লাখো বৃ তিনি রোপণ করলেন। মানুষের হৃদয়ে বেড়ে উঠতে লাগলো এই সব গাছ। বিচরণশীল তরোবর। কী স্নিগ্ধ তাদের ছায়া। যেখানে সে ছায়া পড়েছে, শান্তি বেঁধেছে বাসা। এই শান্তির স্পর্শ যারা পায়, তারা না হতে চায় রাজা,
না চায় স্বর্ণখচিত রাজাসন। তাদের কাছে অন্য সব প্রলোভন নস্যি। যে বিস্ময়কর আনন্দলোকে
তাদের নিবাস, সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে স্বর্গময়তা। বিশ্বের উদ্দেশ্যে তারা ঘোষণা করে-
আগর ফেরদৌস বরুয়ে জামিনাস্ত
হামীমাস্ত ও হামীমাস্তও হামীমাস্ত
স্বর্গ যদি থাকে কোথাও
এ দুনিয়ার মাজে
এইখানে তা এইখানে তা
এইখানে বিরাজে
জামীর মজলিস সম্পর্কে ভক্তরা বিশেষভাবে এটা দাবী করতে পারতো। জনগণের আত্মশুদ্ধি ও তাদের প্রতি নসিহতের যে মাহফিল তার খানকায় হতো, সেখানকার অমৃতের আস্বাদ রাজদরবারের সমস্ত গৌরবকে ম্লান করে দিতো। কেন নয়? কোনো রাজদরবার কি দিতে পারবে জামীর খানকার
অমীয় প্রশান্তি? যে প্রশান্তি অর্জনের জন্যে যুগের মহাত্মারাও
ছুটে আসতেন হেরাতে। একবার এলেন জালালুদ্দীন রুমীর এক সাহেবযাদা।
তাকে পেয়ে জামী যার পর নেই খুশি। কারণ আরিফ বিল্লাহ রুমী (রাহঃ) এর স্পর্শ ও স্নেহের দাগ রয়েছে তার গায়ে। তিনি আরিফে রুমীর আলোয় শুরু করলেন সন্তরণ। সন্তানের দিকে তাকিয়ে পাঠ করতে লাগলেন পিতাকে।
রুমীর প্রতি তো জামীর অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। হৃদয়ের দু কূল ছাপিয়ে ভক্তির পানি থৈ থৈ করে প্রতিনিয়ত। রুমী নিছক কবি তো নন। তিনি আত্মার রাজাধিরাজ!
তিনি প্রেমের পরিব্রাজক। তিনি পরমের অগাধ আকাশ!
অনন্তের ব্যাখ্যাকর! তিনি অলৌকিতার অপূর্ব সেতার! অনাদী সুন্দরের গীতিকার! তার কন্ঠে
বেজে ওঠে প্রত্যাদেশের প্রাণ! পয়গাম্বর তিনি ছিলেন না। কিন্তু তার গ্রন্থে ঝলসে উঠেছে নবভী হেদায়েতের লাইট হাউজ। এ সত্যকে ব্যক্ত করতে জামীর চেয়ে পরঙ্গম আর কে হতে পারে? তিনি তো রুমীর ফুলবাগানের ভ্রমর হয়ে মধু জমান নিজের সত্তায়। তিনি তো রুমীর জ্যোৎস্নার মাখন খেয়ে খেয়ে অস্তিত্বের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করেন। তিনি তো রুমীর অপার্থিব পানিতে ডুবে ডুবে করেন তৃষ্ণার উপশম। সেই কবির জন্য হৃদয়ের সবটুকু ঔদার্য দিয়ে তিনি সাজান ভক্তির মালা। লিখেন-
মন চেহ গুয়ম আ বুওদ আলী জনাব
নেস্তে পয়গাম্বর ও লেকিন দারদ কিতাব
তার কথা কি বলবো আমি মহাত্মা এক তিনি ছিলেন
নবী তিনি নন যদিও নবী সূলভ কিতাব দিলেন।
মহান সেই রুমীর পুত্রের দিকে তাকিয়ে জামী বুঝলেন তিনি রূহানী
পিপাসায় অধীর। আধ্যাত্মের পথে বহু কাটা আর কংকরের অত্যাচারে
রক্তাক্ত। জামীর খানকায় তার রাত্রিযাপনের হলো বন্দোবস্ত। খাদেম ব্যস্থ হয়ে গেলো আরামের আয়োজনে। তার জন্যে বিশেষ ক
নির্ধারিত হলো।
যেই মাত্র তিনি কে ঢুকলেন, এক বৈদ্যুতিক আকর্ষণে মোরাকাবায় বসে গেলেন। এখানকার প্রতিটি ধূলিকনা যেনো মোরাকাবায় তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। সবাই যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধ্যানস্ত হয়ে আছে। বাতাসেও যেনো সুগভীর নৈশব্দ। আর কোত্থেকে যেনো নেমে
এসেছে আশ্চর্য নির্জনতা।
মোরাকাবায় কেটে যাচ্ছে প্রহরের পর প্রহর। খাদেম অপো করছে। মেহমানের জন্য খাদ্য প্রস্তুত। সে অবাক হয়ে দেখছে বিস্ময়কর এই মেহমানকে। তার চোখের পাতাও নড়ছেনা। বাতাসে পোশাকটিও কাঁপছেনা। কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নেই বিন্দু পরিমাণও স্পন্দন। বসে আছেন সুস্থির পাহাড়ের মতো। এক বৈঠকে পার হয়ে গেলো
গোটা রাত।
ইবনে রুমী বলেন একটি মাত্র নিঃশ্বাসের মতো সংপ্তি মনে হলো রাতটিকে। কিন্তু তার ভেতরে ফেটে গিয়েছিলো প্রশান্তির ডিম। যুগ যুগ ধরে পান করেও তার নির্যাস শেষ করার নয়। এই রাতে আমি পেরিয়ে গেলাম সাগর-মহাসাগর। আমার দৃষ্টিপথে আর
থাকলোনা কোনো মেঘের ঘণঘটা। আমার আকাশ হয়ে উঠলো
ফকফকা রূপালী। প্রশান্তি এই হৃদয়ে এসে ঠিকানা খুঁজে নিলো। সেই থেকে ফিরে পেলাম আমার আমিকে।
এইভাবে কতো সহস্রজন নিজের হারানো সত্তাকে সমুদ্রতল থেকে উদ্ধার
করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসেব কি আছে? জামী তৈরী করেছিলেন ডুবুরিদের ঝাঁক। এরা রাত্রির নিসুপ্তিকে তছনছ করে দিতো জিকিরের উচ্ছাসে। নিদ্রার অরণ্যকে বানিয়ে দিতো উত্থাল সমুদ্র। যেখানে প্রেমের মাতাল তরঙ্গের অনেকেই ডুবতো। আবার ভেসে উঠতো। কেউ হয়ে যেতো এশকের শহীদ। এরা আনন্দের ডানা বিস্তার করে অসীম আকাশের দিকে ছুটতো আত্মার মসনবী আবৃত্তি করে
করে। আর যারা গহীন সমুদ্রে ডুবে ডুবে শিকার করতো সোনার মৎস্য,
কুড়াতো অপার্থিব মণি-মুক্তো, তারা হয়ে উঠেছেন মহাকালের মহাজন। দুনিয়ার সমস্ত বাহাদুরির
মাথায় যখন তারা পদাঘাত করেন, তখন এমন মধুময় ধ্বণিরাজীর
সৃষ্টি হয়, যার শ্র“তিমাধূর্য থেকে বঞ্চিত হলে রাজা-বাদশাদেরও
ক্রন্দন করা উচিত। জামীর ভাষায়-
প্রেমই আসল, আমরা রাজা
বাদ বাকি সব মূর্দা লাশ
প্রেম বাঁশরীর আওয়াজ পেলে
রাজাও হতো মোদের দাশ
শরহে জামী খান্দ, বাকী চেহ মান্দ
কবিরা সাধারণত বিশেষ কোনো শাস্ত্র ঘাটাঘাটিতে স্বাচ্ছন্দবোধ
করেন না। বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা কবির বাধাহীন কল্পনা বিহারের সহযাত্রী
নয়। ফলত কবি চান মুক্ত বিহঙ্গের অবাধ বিহার। তবে কোনো কবি এর ব্যতিক্রমও হন। তারা কবিত্বের সর্বত্রগ্রামী
পাখিকে কখনো বিশেষ সীমানার দানা খুটতে বাধ্য করেন।
জামীর সব্যসাচী হাত তাই দর্শন বিষয়ক কবিতার বই রচনা করলো। এ শাদিয়্যাত জামীর দার্শনিক কাব্যবিবৃতি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আছে তার উচ্চতর গবেষণা। লিখেছেন রিসালা ফিল হাইআত। তর্কশাস্ত্রে লিখেছেন
রিাসালা ফিল মানতিক।
জামী আসলে ছিলেন সর্বশাস্ত্রের ইমাম। তাফসীরে তার অনন্য কীর্তি- তাফসীরে ‘ফাইয়্যা-য়া
ফারহাবুন’। তওহীদের উপর তার অন্তর্ভেদী রচনা- রিসালায়ে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, রিসালাহ ফিল ওজুদ, রিসালাহ ফিল
ওয়াহীদ ও হাশিয়াতুল কুদসিয়্যাহ। হাদীস শাস্ত্রে তার
কীর্ত্তি- শরহে হাদীসে আবূ যর গিফারী, শরহে হাদীসে
আরবায়ী-ন। ইতিহাসে তার অসাধারণ কাজ- তারিখে হেরাত। তাসাওউফ শাস্ত্রে লিখেছেন- রিসালায়ে তাহকিকে মাযহাবে সুফী ও মুতকল্লিম ও হাকীম,
রিসালায়ে তরিকে সুফিয়্যাহ, নফহাতুল উনস মিন হযরাতিল কুদস ও শরহু ফুসুসিল হিকম। জীবনী বিষয়ক তার গ্রন্থ মানাকিবে মওলভী, মানাকিবে খাজা আব্দুল্লাহ আনসারী, ছখুনানে খাজা
পারসা। সিরাতে তার অনন্য কীর্ত্তি- শাওয়াহেদুন নবুওত। ফেকাহ শাস্ত্রে লিখেছেন রেসালায়ে আরকানে হজ্ব। এই সব শাস্ত্রে বিচরণ করলেও সাহিত্য সমালোচনায় তার অবস্থান ও অবদান অতুলনীয়। তিনি এেেত্র প্রবর্তন করেন নতুন ধারাও দৃষ্টিভঙ্গি। জালাল উদ্দীন রুমীর মসনবীর প্রথম বয়েতের ব্যাখ্যায় লিখেন রিসালাতুন নায়ীয়্যাহ। ফখরুদ্দীন ইবরাহীম হামদানীর লুমআত এর সমালোচনায় লিখেন- আশআতুল লুমআত। আমীর খসরুর কবিতার পর্যালোচনা করেন শরহে বয়তে খসরু দেহলভী গ্রন্থে। শরহে খাকানী গ্রন্থে করেন খাকানীর কবিতার ময়নাতদন্ত।
জামীর প্রতিটি রচনাই ছিলো তার অগাধ পন্ডিত্যের শিল্পিত প্রকাশ। সেই পান্ডিত্য কেবল উচ্চতর েেত্র বিচরণ করেনি। কিংবা বসে থাকেনি গজদন্ত তোরণে। বরং তা নিচেও নেমেছে। অবস্থান নিয়েছে মানুষের প্রয়োজনের নিকটবর্তী জায়গায়। এ কারণেই তো দেখি আরবী শব্দ প্রকরণ শাস্ত্রে তিনি লিখেন- রিসালা ফিস সরফ। আর বাক্য প্রকরণ শাস্ত্রে উপহার দেন জগতবিখ্যাত গ্রন্থ ফাওয়ায়ীদে যিয়াইয়্যাহ।
কবিতায় যেমন তিনি অসাধারণ, তেমনি ব্যাকরণ শাস্ত্রীয় এ গ্রন্থটি অন্য কোনো গ্রন্থের দিকে মানুষের মনোযোগ নিবদ্ধ
থাকতে দিলো না। সবার দৃষ্টিতে টেনে আনলো নিজের প্রতি।
আল্লামা জামীর পূত্র যিয়াউদ্দীন ইউসুফ তখন ছাত্র। আরবী বাক্যপ্রকরণ শাস্ত্রের বিখ্যাত কিতাব কাফিয়ার বিভিন্ন জায়গায় মর্ম অনুধাবনে
তার সমস্যা হচ্ছিলো। গ্রন্থটি এমনিতেই জটিল এবং বিশেষ করে এর লেখক
শাস্ত্রটির সূাতিসূ এলাকায় পায়চারি করেছেন। বিশেষজ্ঞদের সাথে মতবিরোধও
করেছেন। নিজের স্বতন্ত্র মতামত পেশও পরেছেন। ফলে কিতাবটির বহু সংখ্যক ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে।
আবূ আমর জামালুদ্দীন উসমান ইবনে হাযীবের এ গ্রন্থটি সর্বকালেই
সূধিমহলের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে। কেবল আরবীতেই এর ভাষ্যগ্রন্থ
রচিত হয়েছে ১৪২ টি। ফার্সী, তুর্কি, উর্দূ, পাখতুন ইত্যাদি ভাষায় আরো কতো যে ব্যাখ্যা হয়েছে, তার হিসেব এখনো হয়নি।
কিতাবটি নিয়ে যিয়াউদ্দীন পিতার স্মরণাপন্ন হলেন। জামী তাঁর পূত্রের জন্যে রচনা করলেন এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ- ফাওয়ায়ীদে যিয়ায়িয়্যাহ। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়লো হাজার হাজার পুত্রের হাতে। সারা দুনিয়া জুড়ে গ্রন্থটি হতে থাকলো সমাদৃত। কাফিয়ার সমস্ত দুরুহতা এর দ্বারা অপসৃত হলো। ধীরে ধীরে শরহে হিন্দি, শরহে রাজী,
শরহুশ শরীক ইত্যাদিকে পেছনে ফেলে পঠিত হতে লাগলো মুসলিম জাহানের
প্রতিটি জামেয়ায়। গ্রন্থটিতে যে মানের শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ,
সূক্ষ্মতা ও চিত্তাকর্ষক উদ্ভাবনী শক্তির ঝলক দেখা যায়,
এবং যে পর্যায়ের শৈলী ও মর্মস্পর্শের পরিঙ্গমতা প্রস্ফুটিত হয়,
তাতে একেই বলা হলো এ শাস্ত্রের সর্বোচ্চ কিতাব। এ কিতাব যার আয়ত্বে, এ বিষয়ে সে আর কোনো
কিছুর মুখাপেি নয়। বিদ্যালয় সমূহে ছড়িয়ে পড়লো নতুন প্রবাধ- শরহে
জামী খান্দ, বাকী চেহ মান্দ। জামীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ পড়া হয়ে গেলে পড়ার আর কী বাকি থাকলো?
এ প্রবাদটি শুধু বিশেষ গ্রন্থের কথা বলছে না, এ আমলে জামীর সমগ্র সত্তারই পরিচায়ক। জামীর প্রতিটি গ্রন্থই পাঠককে ল্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। ল্েয পৌঁছে গেলে মুখাপেতিা তাকে কোনো কিছুর? জামীর প্রতিটি কবিতাই গন্তব্যের দিক নির্ণয়ে আপনাকে অন্য কিছুর মুখাপেি রাখবে না। তার ব্যক্তিত্ব ও এমনই। তার সান্নিধ্য যারা
পেয়েছে, অন্যের স্মরণাপন্ন হবার প্রয়োজন থাকেনি তাদের। যারা তার আলোর ঝর্ণাধারায় ডুবেছে, তারা পৌঁছে
গেছে প্রেমের মঞ্জিলে। জামী তার ভক্তদের ডেকে বলেছেন:-
হারবে না তোরা, পরাজয় নেই
প্রেমের অভিধানে
হারবার কিছু থাকে কি কখনো
সূর্যের অভিযানে
কপথের ব পেরিয়ে
ল্েয পৌঁছে সে
মুগ্ধযুদ্ধে শুদ্ধ ছুটেছি
পরমের উদ্দেশে
জামী কোথায় পেলেন এতো প্রতীতি? নিজের প্রতি তার এতোই আস্থার তাৎপর্য কি? কীসের ভিত্তিতে তিনি ল্েয পৌঁছার সুসংবাদ শুনাচ্ছেন সহগামীদের? জামীর জবাব:-
আমরা কখনো আমরা নই রে
তারই চরণধূলি
যাত্রাপথের সকল দরোজা
নবীজী দিলেন খুলি
এখন শুধু পথ চলা চাই
জ্বলছে আলোক শিখা
আসমানী সেই ইশতেহারে
জয় আমাদের লিখা
অলৌকিক কবিতা আবৃত্তি
জামী নিজেকে ব্যক্ত করতে কোনো কার্পণ্য করেননি। বলে দিয়েছেন তার চেতনার মত্ততার কথা। সেই চেতনার ঢলউজানে
সিংহশাবক ছুটে। সেই চেতনার উঠান জুুড়ে সূর্য শিখার রোল। সেখানে দাউ দাউ করে একদিকে আগুন জ্বলছে অপরদিকে মৌ মৌ ফাগুন সুবাস মাতোয়ারা করছে
দিগন্ত। কখনো তিনি প্রার্থনার বিগলিত, কামনা তাকে বানিয়েছে ভিুক। কখনো আবার তিনি বাঘের
গর্জনে সোচ্চার। অস্তিত্বের আযানে সচকিত।
জামী নিজেই বলেন-
বর লবে উফতাদাহ যবান মি ঘির গি
ছগে আম তিশনায়ে জান
আমার মুখে গর্জন মুখর হিংস্রবাঘের ঠোঁট এসে জুড়েছে। আমি তো গলির কুকুর, কাতর হেয় ঘুরছি প্রাণের
পিপাসায়।
জামীর এ বক্তব্য নিছক কবির কথামালা নয়। এ হলো তার ফানা ও বাকার রাজ্যে প্রবেশকালীন অবস্থার বিবৃতি। কিন্তু সেখানে প্রবেশের পর জামীর যে হাল হতো, তা হালওয়ালাদেরও হয়রান করে দেয়। জামীর সেই হাল এতো
জীবন্ত, এতো উত্থাল, এতো প্রচণ্ড এবং এতোই সর্বগ্রাসী হতো যে, তখন তার আশপাশের মাটি, পানি, বাতাস ও এর দ্বারা আলোড়িত হতো। স্বাভাবিক অবস্থায় তার হালকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তিনটি পরিস্থিতি দ্বারা। যা একই সাথে জামীর চেতনারাজ্যে বিরাজ করতো। এবং এগুলোর মধ্যেই তার প্রশান্তির উপাদান নিহিত থাকতো। কখনো ঝড় উঠলে এই অবস্থা থেকেই তা উছলে উঠতো। ঝড় থামলে আবারো সেই অবস্থার স্বাভাবিকতায় তিনি ফিরে আসতেন। জামীর মধ্যে সর্বণ থাকতো বাযগশতের অবস্থা। অর্থাৎ তার মুখে পরমের নামের বৃষ্টি বইছে আর অন্তরের সমস্ত জমি-জমায় শুধু তুমি
শুধু তুমি এই আওয়াজ তুলে তরুলতার চিৎকার চলছে। আরেকটি অবস্থা হলো নিগাহদাশত- অর্থাৎ সেই পরিস্থিতির তীব্রতায় বিদ্যমান কোনো বস্তু,
চলমান কোনো ঘটনা, কিংবা অতীতের
জ্বলন্ত স্মৃতি বা অনিবার্য ভবিষ্যতের কোনো অস্থিত্ব ছায়া আকারেও অন্তরে তিষ্টাতে পারে
না কোনো কিছুর প্রতিই তখন না কোনো খেয়াল, না কোনো আকর্ষণ। জামীর আরেকটি বৈশিষ্ট ছিলো- ইয়াদদাশত। অর্থাৎ পরমের সাথে
আত্মার অবিচ্ছিন্ন সংযোগ। এটার তীব্রতা ও ব্যাপকতার
কোনো স্থির মাত্রা ছিলো না। বলা সম্ভব ছিলো না
তা কোন পর্যায়ে কিংবা কতটুকু।
এই নিসবত তথা সম্পর্ক যখন বিশেষ মাত্রা লাভ করতো, জামী তখন নিজেকে ভুলে যেতেন। তখন তার ভেতরে ফুঁসে উঠতো তুফানের মত্ততা। কখনো আবার প্রেমের অদ্ভূদ কৌতুক চলতো। পরমের যে আলো দৃষ্টিপথে
ছিলো, তা লুকোচুরি খেলতো এবং জামী তাকে খুজে পেতেন
না। ফলে তার আত্মা বিলাপ করতো ইথার কাঁপিয়ে। এই রোদন চলতো পূর্ববর্তি অবস্থাকে আরো তীব্রভাবে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত।
এই সামগ্রিক উত্থালতা জামীর ভেতরে যে ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করতো,
তারই কলরোল আছড়ে পড়তো কবিতা আকারে। তারই ধ্বণিপুঞ্জ ফেনায়িত হতো পঙক্তিমালায়। সেগুলোই জামীর মসনভী, কাসিদা কিংবা রুবাইয়াত। সেগুলোই তার আত্মার বিবৃতি। চিরকালের হর্ষিত প্রেমগাঁথা। কখনো তা থেকে নিনাদ উঠতে থাকে- তুমি কই? তুমি কই ......
কখনো ধ্বণিত হতে থাকে- আরো চাই, আরো চাই ......
কখনো হাহাকার উঠে- হায় বিরহ! হায় বিহর!! ......
কখনো আকাশ কাঁপানো আওয়াজ উঠে- হে তুমি সুন্দর! এতো সুন্দর!!
......
মিলনের তৃপ্তিতে তার শব্দাবলী ছুড়তো বিমুগ্ধ নিঃশ্বাস। শব্দের মুখে, চোখে, নাকে লেগে থাকতো মিলনের মৌতাত। শিশুর মুখে লেগে থাকা
দুধের দাগের মতো তখন নজরে পড়ে তা।
কিন্তু জামী যখন নবিজীর (সাঃ) প্রেমে মত্ত হবেন, তখন প্রেম নিবেদন, অনুযোগ আর আত্মার
যাতনার কথা বলবেন বেশি। তখন কবিতা হয়ে উঠবে ব্যাকুল বিলাপের মতো। প্রবল দীর্ঘশ্বাসের ধ্বণি উঠবে প্রতিটি পঙক্তি থেকে। তখন কোনো গর্জন শুনা যাবে না। নবিজীর প্রশংসার যেনো
বান বইবে কবিতার জমিতে। নিখাঁদ ভালোবাসার প্লাবনের পানিতে ভাসতে থাকবে
মাঠ-ঘাট।
নবিজীর (সাঃ) এশকে জামীর এই হাল ঘণঘণ সৃষ্টি হতো। আর হাল তরঙ্গায়িত হলেই শুরু হতো নাতের মূর্চ্ছনা। তখন চারপাশে একই সাথে ফেনায়িত হতো খুন ও শরাব। বাতাসে সৃষ্টি হতো অচেনা তুলপাড়। ইথারে বেজে উঠতো রহস্যময়
করতালি।
সমুদ্র বিহারে জামী প্রায়ই যেতেন। সমুদ্র তাকে প্রেমের প্রতিশ্র“তি কতো বিশাল, তা মনে করিয়ে
দিতো। অথবা প্রেমের অভিযানে সমুদ্র তাকে সঙ্গ দিতো। একদিন সাগরের বুকে জামীর বুকের সাগর উছলে উঠলো। নবিজীর এশক ও মহব্বতে তিনি বেকারার হয়ে উঠলেন। চরম মত্ততা ও আবেগ নিয়ে তিনি আবৃত্তি করতে লাগলেন নাতের পর নাত। প্রেরণ করতে লাগলেন সালাত ও সালাম-
আসসালাম য়ী কি মতি-তর
গওহরে দরইয়ায়ে জুদ
আসসালাম য়ী তাজা তর
গুল বরক সহরায়ে ওজু-দ
আসসালাম য়ী আঁ কে তা আয
যুবদায়ে আদম নাতাফত
নূরে পাকত কসে নবরদ আয
কুদসিয়া উ-রা- সজুদ
আসসালাম য়ী আ-কে নায়দ
দর হামা কওন ও মকান
তেজ বিনানে রা বজুয নূরে
তুম দর দশমে শহুদ
আসসালাম য়ী আঁ কে বহরে
ফরশে রাহত বাফত দহর
আতলাসী-রা কশে যে শব
করদন্দ তার আয রুজে পুদ
আসসালাম য়ী আঁ কে আবওয়া-
-বে শাফায়াত রুজে হাশর
জুয কলিন্দে লুতফে তুঁ বর
খলফ নতুওয়ান্দে কশুদ
আসসালাম য়ী আকে তা বু
দম দরী- মেহনতে সরা
দর সরম সওদা ও দরজা-
-নম তমন্না-য়ী তু বুত্তদ
সদ সালামত হি রেসানিম
হর দমে য়ী ফখরে কেরাম
বুকে আয়দ য়েক আলাইকুম
দর জওয়াবে সদ সালাম
কবিতাটির ভাবকথা নিম্নরূপ:-
হে ঐ সত্তা! মোতির চেয়েও মূল্য তোমার
লও সালাম
অনুগ্রহ সাত সাগরের তূল্য তোমার
লও সালাম
তাজাব তাজা মোহন ফুলের অধিক তুমি
লও সালাম
দানশীলতার মাঠ সুবিপুল, সঠিক তুমি
লও সালাম
সালাম হে নূর চমকালো যা আদম নবীর
পেশানিতে
সেজদা দিয়েও ফেরেশতারা পারলোনা যা
ছিনিয়ে নিতে
সালাম হে যার নূরের ছটা, খোদার
সকল সৃষ্টি জুড়ে
এ নূর বিনে নেই তো কিছুই, প্রি
চোখের দৃষ্টি জুড়ে
তোমার সুখের শয্যা বুনে রেশম দিয়ে
কালের তাঁতি
ঢাকবে তাকে কোন তিমিরে? আলোর বুকে
আসন পাতি?
সালাম ওগো! রুজ হাশরে
তুমিই চাবি সবদ্বারের
তুমি বিনে খুলবেনা দূর
পথ পাবেনা কেউ পারের
সালাম ওগো! তোমার তরে
শ্রমের ঘরে দিন কাটাই
মাথার উপর প্রেমের পূঁজি
বুকে আশা তোমায় চাই
হাজার সালাম পৌঁছাই আমি
শ্রেষ্ঠজনের গর্ব ওগো
একটি বারেই লাখ সালামের
জবাব দিয়ে ধন্য করো
আত্মার বিক্রম
জামীর ইন্তেকালের পাঁচ শো বছর পরের ঘটনা। হাফিজুল হাদীস আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি (রাহঃ) ছিলেন সাহেবে নিসবত বুজুর্গ। তিনি ছিলেন আশেকে রাসূলদের (সাঃ) তাজ। তিনি পথিক ছিলেন আগুনে
দগ্ধ ফাগুনে স্নিগ্ধ সেই প্রেমময় পথের, যে পথ মাড়িয়েছিলেন
আবদুুর রহমান জামী। আমাদের শায়খ আল্লামা তাফাজ্জুল হক (দাঃ বাঃ)
স্বীয় উস্তাদ আব্দুল্লাহ দরখাস্তির (রাহঃ) জীবনী গ্রন্থে লিখেছেন এক বিস্ময়কর ইতিবৃত্ত। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে হাফিজুল হাদীস দরখাস্তি (রাহঃ) এসেছিলেন বিশেষ এক সফরে। সঙ্গে অনেকগুলো আলোর স্ফুলিঙ্গন। জাগ্রত অনেক আত্মা। মুফতি মাহমুদ, গোলাম গউস হাজারুবী, মাওলানা আজমল খানসহ বহু আলেম।
নদীপতে তাদের যাত্রা পড়লো। প্রমত্ত বর্ষার নদী। জোয়ারের যৌবন ছিলো। তারা সওয়ার হলেন বড় এক নৌকায়। খরস্রোতা নদীর প্রচন্ড
স্রোত কুন্ডলি পাঁকিয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটছে আর মাতাল তরঙ্গ আছড়ে পড়ছে নৌকার পাটাতনে।
ধ্বণিত হচ্ছে তার সফেন উচ্ছাস।
রণিত হচ্ছে তার সঘণ উল্লাস।
নিঃশ্বাসের হাওয়ায় যেনো তারই রেশ। যতদূর চোখ যায় তরঙ্গের মাতলামী এক ধরণের ভীতিকর আবার প্রীতিকর দৃশ্য তৈরী করেছে।
দরখাস্তির (রাহঃ) হৃদয়ে তখন নবীপ্রেমের জোয়ার।
নদীতে যে জোয়ার, সে ছিলো ুদ্ধতার
আর হযরতের হৃদয়ে যে জোয়ার, সে ছিলো শুদ্ধতার। এক জোয়ারে কেবলই উত্তেজিত ধেয়ে চলা। আরেক জোয়ারে উদ্বেলিত
রহস্যময়তা।
এক জোয়ারে কেবলই তীব্রতর বেগ আরেক জোয়ারে দীপ্র প্রেমাবেগ!
দরখাস্তি (রাহঃ) তার আবেগকে লুকাতে পারলেন না। সহযাত্রীদের বললেন- ভাই সব! এই যে জোয়ার আর আমাদের নীরবতা, এ বড়ো বেমানান।
এসো আমরা নবীপ্রেমের জোয়ার তুলি নদীর বুকে।
এসো আমরা ভালোবাসার স্নিগ্ধ সজীবতা আনি এই রুদ্র-তীব্রতায়।
এসো আমরা উষ্ণ হয়ে উঠি বিশ্বাসের জ্বালওয়ায়। জলের বুকে জ্বালিয়ে দেই হৃদয়ের দীপ্ত শিখা! নটিনী তটিনীর তুফানী পবনে কাহিনী থাকুক
লিখা।
নবিজীর (সাঃ) প্রেমে নিবেদিত কবিতা যার যতো জানা আছে,
তার আবৃত্তি চলতে থাকুক ঝড়কে হার মানিয়ে।
চিরকালের সম্রাটের উদ্দেশ্যে আবৃত হোক আমাদের ভিখারী পদাবলী!
উচ্চারিত হতে থাকুক বিগলিত হৃদয়ের আঁকুতিগাঁথা!
উচ্চারিত হতে থাকুক শ্রদ্ধা ও ভক্তির মধুময় কুহুতান!
উচ্চারিত হতে থাকুক সুন্দরের সকাতর রাগিনী!
উচ্চারিত হতে থাকুক স্বপ্নের তন্তু দিয়ে কারুকাজ করা শিহরিত
শব্দাবলী!
উচ্চারিত হতে থাকুক বিগলিত হৃদয়ের প্রেমার্ত বংশীধ্বণি!
উচ্চারিত হতে থাকুক ঈমানের আগুনে ঝলসে ওঠা লেলিহান বাক্যের দামামা!
শুরু হোক সৌরভের অভ্যুত্থান! শুরু হোক! শুরু হোক!
শুরু হলো আশেকদের আকুলিবিকুলি।
শুরু হলো বিস্ময়ের বিমুগ্ধ ধারাপাত!
শুরু হলো পরমার্থ বাগ্মীতা!
ক্রমাগত ফুল ফুটছে শব্দের! হিল্লোল ছুটছে সুন্দরের।
উপস্থিত প্রত্যেকই ছিলেন প্রেমের জখমে ব্যাথাতুর। সহসা এই আহ্বানে অস্থির হয়ে উঠলো তাদের আবেগ! তাজা হয়ে গেলো তাদেরও জখম। হতে থাকলো উত্তপ্ত রক্তরণ।
হৃদয়ের সবটুকু দরদ ও ভক্তির সবটুকু নির্যাস দিয়ে আবৃত্তি করতে
লাগলেন একজনের পর একজন। একজনের পর একজন।
কবিতার পর কবিতা
কবিতার পর কবিতা
এলো দরখাস্তির পালা। তিনি শুরু করলেন জামীর
কবিতা। প্রেমের ভাষ্যকার যে তালে পড়তেন, ঠিক সেই তালে। প্রতিটি শব্দই মনে হচ্ছে অনিবার্য। প্রতিটি ছন্দই মনে হচ্ছে অপরিহার্য। প্রতিটি পঙক্তিই মনে
হচ্ছে সর্বোচ্চ পয়োজনীয়। উচ্চারণ মাত্রই তা
থেকে লাফিয়ে উঠছে অভিনব ভাবের শিখা। ছলকে উঠছে অফুরন্ত
অমৃত ধারা।
জামী যে সব নাত সমুদ্রে পড়েছিলেন, সেগুলোরই আবৃত্তি চলছে দরখাস্তির কন্ঠে।
হযরত মুফতি মাহমুদ বলেন- আমরা দেখলাম। সারা নদীতে যেনো ছড়িয়ে পড়লো অদ্ভূদ গাম্ভীর্য। বাতাসেও যেনো নিবিড় রহস্যের শিহরণ সৃষ্টি হলো।
উদ্বেলিত হয়ে উঠলো মৎসকূল। তারা লাফাতে লাগলো। সমবেতভাবেই যেনো তারা আত্মহারা ভাব প্রকাশে
লাফাচ্ছে।
নদীবে চলছে মাছের ছটফটানি।
লাফিয়ে নৌকায় উঠলো বহু মাছ। পাটাতনে এসে আছড়ে পড়লো বহু মাছ।
বিস্ময়কর এই মৌজে আমরাও যেনো হয়ে উঠলাম মাতোয়ারা। সকলেই কন্ঠ মেলালাম দরখাস্তির কন্ঠে। সম্মিলিত এমন প্রেমের
কবিতা আবৃত্তি কেউ শুনিনি কখনো। না জাগরণের মোহনায়
না স্বপ্নের মূর্ছনায়।
উপদেশের সুবাস
জামী বলতেন ‘পতঙ্গ হও! মৃত্যুও
মধুর হয়ে যাবে। কিংবা মৃত্যুই হবেনা আর’।
পতঙ্গ তিনি হতে পেরেছিলেন। তার ল্েয ছিলো নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের আলো। নূরুন আলা নূর। সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুড়ে যাবার লোভ ছিলো তার। সেই লোভ ব্যক্ত হতো প্রতিদিনের উচ্চারণে।
পুড়ে যেতে না পারার জন্য জামীর আফসোস ছিলো। পুড়ে যাওয়া মানে মৃত্যু- জামী তা মানেন নি। তিনি ঘোষণা করতেন-
লযযতে এশক কদীম আস্ত মা বাকী মুহদিস
প্রেমের মজা চিরজীবি বাদবাকী সব ধ্বংসশীল
সেই মজার পূর্ণতার জন্য জামী নিজের অস্তিত্বকে ভস্ম করে দিতে
চাইতেন।
যারা এমনটি করেছেন, তাদের প্রতি
ছিলো তার অগাধ সমীহ। সেই সব সৌভাগ্যবানের কথা উল্লেখ করে তিনি
অশ্র“ ঝরাতেন। কবিতা আউড়াতেন আর হয়ে উঠতেন বেকারার। সেই সব মহাত্মার পূণ্যনাম
জামীর কন্ঠে ফুটতো ফুলের পাঁপড়ির মতো। জামী আফসোস করে বলতেন-
তারাই ছিলেন সঠিক। আমরা সব মিথ্যার মরিচিকায় বিভ্রান্ত! এক ভক্ত
বললো! আমরা কী তবে নামাজ পড়ছি না? সেজদা করছিনা?
আমরা কী তাকে স্মরণ করছিনা? আমরা কি তার ওহীকে অবলম্বন করছিনা? আমরা কীভাবে
মিথ্যা হয়ে গেলাম?
জামী তখন হাসলেন। সেই হাসিতে ছিলো গভীর
বিষাদ। বললেন- সাহাবী-তাবেয়ীদের দিকে তাকাও। সত্যিকার প্রেমিকদের প্রতি ল্য করো। তাদের মোকাবেলায় আমাদের
উপাসনা চুরি-ডাকাতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদের ইলিম আত্মপ্রতারণার ধোয়া ছাড়া আর কিছু নয়
আমাদের তাকওয়া বালির বাঁধ ছাড়া আর কিছু নয়
আমাদের সেজদা নি®প্রাণ ব্যায়াম
ছাড়া আর কিছু নয়
জামী একদিন বক্তৃতা করছিলেন। হাজারো মানুষ হৃদয়ের কান পেতে শুনছিলো। আত্মা কাাঁপিয়ে দেয়া
এমন বক্তব্য জীবনের সীমানায় ছুটিয়ে দিচ্ছিলো পালা বদলের ঝড়।
জামী হঠাৎ থেমে গেলেন। উপস্থিত লোকদের তিনি কিছুই বলছেন না।
সবাই আরো বেশি উৎকর্ণ হলো। সমস্ত পরিবেশ যেনো কান পাতলো কোন কথাটি জামীকে নিস্তব্ধ করেছে, তা শুনার জন্য। জামী সবাইকে অবাক করে
দিয়ে বলতে লাগলেন-
আব্দুর রহমান! কোন সাহসে তুমি উপদেশদাতা হয়ে গেলে! তুমি লোকদের
সততার নসীহত করছো অথচ তুমি কি উদাসীনদের দলে নও? তুমি কি ভুলে গেছো আল্লাহর বজ্রবাণী- “তোমরা কি লোকদের
ভালোর আদেশ দিচ্ছো আর নিজেদের বেলায় তা ভুলে যাচ্ছো”? আল্লাহ কি ধমক দিয়ে
বলেন নি- “কেন তোমরা এমন কথা বলো, যা কাজে পরিণত করছোনা?” ........................
জামী! সাবধান হয়ে যাও! সাবধান হয়ে যাও!।
জামীর বক্তব্য শেষ হতে না হতেই সারা মজলিসে কান্নার রোল পড়ে
গেলো!
সৃষ্টি হলো রোদনের তুফান।
আলেমরা বুঝলো উপদেশের ওজন ও দায়িত্বের ইতিকথা- সাবধান হতে চাইলো। সাধারণ মানুষ উপলব্দি করলো উপদেশ শুধু কথার কথা নয়- সবাধান হতে চাইলো। কর্মহীন বাক্যচর্চা থেকে সবাই সতর্ক হয়ে গেলো।
কেউ তাকে প্রশ্ন করলো প্রেমিকের বৈশিষ্ট্য কি?
তিনি বললেন-
সে মুখ খুললে প্রেমাস্পদের জিকির ধ্বণিত হবে আর মুখ বন্ধ রাখলে
ফিকির বিরাজ করবে।
কেউ প্রশ্ন করলো- জিকিরের তাৎপর্য কী?
তিনি বললেন- শুনো! এ প্রশ্ন সাঈদ ইবনে যুবাইরকে (রাহঃ) করা হয়েছিলো। তার জবাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেছেন-
আল্লাহর নির্দেশে জীবন অবনত হওয়া
আল্লাহর নিষেধে জীবন নিয়ন্ত্রিত হওয়া
এবং আল্লাহর প্রতি ধ্বনিত মন ও মনন- এই হচ্ছে জিকিরের সারকথা।
কেউ যদি আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আর রাতভর শুধু নাম জপ করে,
সে জিকিরকারী নয়। সে প্রেমের ধারে কাছেও
জায়গা পেলোনা। তার বিশ্বাস প্রাণশক্তিরহিত হয়ে রইলো!
বিশ্বাস ও প্রেমহীন জীবন- সে কেমন?
জামীর কাছে তা অসার এবং গ্লাণিময়। সে জীবন পূঁজাভবনে ঝুলন্ত বাঘের মূর্তি।
সে জীবনের জৌলুস মৃতের গায়ে ঝলমলে পোষাক পরানোর মতো।
সে জীবনের সাধনা কাটের পুতুলকে যোদ্ধা সাজানোর মতো।
সে জীবনের শীর্ষচূড়ায় নেই কোনো ঐজ্জল্যের লেশ।
সে জীবনের মধ্যরেখায় আছে কেবল ধাধার বিস্তার।
সে জীবনের হৃদয় জুড়ে কেবলই প্রবৃত্তির দৌড়ঝাঁপ।
মহাকবি জামী এেেত্র মহাতাপস হাসান বসরীর একটি কবিতা উদ্ধৃত করতেন। তাতে আছে পার্থিবতার সারাসার নিয়ে অন্তর্ভেদী গূঢ়তত্ত। তুমুল তিক্ততা নিয়ে উপলব্ধির গভীরতর প্রদেশ থেকে ঝলসে ওঠা সেই সত্যবাণীকে অস্বীকার
করার নয়।
প্রেম ও বিশ্বাসরিক্ত জীবনের ুদ্র ুদ্র আনন্দ ও স্থায়িত্বহীন
সুখাস্বাদ কোনো শুভ পরিণতি রচনা করেনা। সে জীবনের এক ব্যর্থ
উপাসক হাসান বসরীর কবিতাটি জামীর কন্ঠে শুনতে পেয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো হ্যাঁ,
এই-ই সত্য। পৃথিবীর সমস্ত মহাপুস্তকের
এটাই সারকথা। কবিতাটি হাহাকারের মতো বলতে থাকে-
শুরু তো কষ্ট দিয়ে শেষে কি বা পাই
পার্থিবতার শেষে কিছু নাই কিছু নাই
হালাল গ্রহণেও হিসাবের তাড়া
হারামে তো শাস্তির বাজে নাকড়া
এইখানে ধনবান ডুবে ফেতনায়
ধনহীন দুর্ভোগ করে হায় হায়
মা মীÑ কনীম!
জামের এক বুজুর্গ ছিলেন খাজা আহমদ। তার সত্তায় ছিলো বিনয়ের কাতরতা। নিজেকে মাটির সাথে
মিশিয়ে দিয়ে খাটি হন যারা, খাজা আহমদ ছিলেন তাদের
এক রতন। আমি কিছুই নইÑ এই অনুভব তাদের
হৃদয়ে আসন পেতেছিলো। ফলে আকাশ অবধি উচ্চতা সত্তেও ধূলির চেয়ে তুচ্ছ
হিসেবে নিজেকে ভাবতেন।
এমনটি হচ্ছে করলেই ভাবা যায়না। এর স্থান হৃদয়ে এমনিতেই হয় না। এটা এক উচ্চতর মাকাম। দাসত্বসূলভ এই মাকামে যারা পৌছেন, তাদের মাহাত্মের
কী শেষ আছে?
খাজা ছিলেন অনি:শেষ মাহাত্মে বিধৌত, পুলকিত। তিনি ছিলেন মুস্তাযাবুদ্দা’ওয়াত। মানে যেই মাত্র খোদার সমীপে আবেদন করবেন, তা মঞ্জুর হয়ে যাবে। উর্ধ্বে উত্তোলিত তার
হাত ফিরে আসবেনা শূণ্যরূপে। বরং মুঠোভর্তি কবুলিয়্যাতের
স্বর্ণশস্যে ভরপুর হয়ে যায় তার দুটি হাত। এইভাবে সকল কাম্যবস্তুকে
তিনি নিয়ে আসেন দরখাস্ত করে করে। দরখাস্ত করেন আর আকাশের
দরজা খোলে যায়। দরজা খোলে আর কাম্যবস্তু মিলে যায়।
খাজার এই বৈশিষ্টের কথা লোকে লোকে জানাজানি হয়ে গেলো। লোকেরা এখন তার কাছে এসে ভিড় করে। নানান প্রয়োজনের কথা
তাকে শুনায়। তিনি হাত উঠাবেন আর মাকছুদ পুরা হবে। একদিন এলো এক মহিলা। সঙ্গে জন্মন্ধ এক শিশু। মহিলাটি শিশুকে কোলে নিয়ে কাঁদছে। খাজাকে সে ধরলো এর
চু খোলা চাই। আপনার হাত তার মুখে রাখুন। এমন কিছু করুন, যাতে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে।
খাজা বললেনÑ এ কাজ আমার নয়। এ কাজের যোগ্য আমি নই। ইসা নবী সা. কে দিয়ে
এ কাজ করালো হয়েছে। আমার দ্বারা এ সম্ভব নয় মোটেও। কিন্তু মহিলাটি একদম নাছুড়।
সে রোদন জুড়ে দিলো। খোদার দরবারে কাঁদছে
আর কাঁদছে।
খাঁজা এবার গায়েবী আওয়াজ শুনলেনÑ ইসা কে? ইসার আ. কী মতা: তুমি কী? তোমার কী মতা? যা হয় সবই তো
আমি করি। মা-মী-কনীম! অন্ধকেও দৃষ্টি আমি দেই। মা-মী-কনী-ম!!
এবার খাজা সতেজ ও সচকিত হলেন। ডাকলেন মহিলাকে। সন্তানের চোখে বুলালেন হাত। আর বলতে থাকলেন মা-মী-কনী-ম। মা-মী-কনী-ম!! আমরাই
করি! আমরাই করি!!
আল্লাহর ওলীদের ব্যাপার এমনই ঘটে। খোদা যখন চান, তাদের থেকে বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটান। এতে ওলীদের বিশেষ মতা প্রমাণ হয় না। এ ঘটনা দ্বিতীয়বার
ঘটানোর এখতিয়ার ও তাদের থাকেনা। কিন্তু তাদের মাধ্যমে
খোদা ঘটনাটি ঘটিয়ে বিশেষ কল্যাণের দরোজা খুলে দেন কখনো কখনো। আব্দুর রহমান জামীর মাধ্যমেও সংগঠিত হলো আশ্চর্য বিভিন্ন ঘটনা।
একদিন তিনি বসে আছেন নদীতীরে। সঙ্গে মুহাম্মদ রুহী নকশবন্দী। কে জানে ভাবের কোন
গহীনে নিমজ্জিত ছিলেন দুই বুজুর্গ।
কে জানে নিসবতের কোন তবকায় আসন পেতে তারা মগ্ন হয়েছিলেন অপার্থিব
বিহারে? কে জানে পবিত্রতার কোন হাওয়া বইছিলো সে সময়
নদীর হৃদয়ে? সহসা আলৌকিকতার নিদর্শন উম্মোচন করলো আপন
পর্দা।
সহসা নদীতে ভেসে এলো এক লাশ!
নদীর ঢেউ লাশটিকে এনে রাখলো জামীর সামনে!
জামী কিছুণ ভাবলেন। কোথায় যেন তিনি ডুব
দিলেন।
তারপর উঠে দাঁড়ালেন। এবং অগ্রসর হয়ে লাশের
গায়ে হাত রাখলেন।
রুহী নকশবন্দী বলেনÑ আমি দেখলাম লাশটি যেনো জেগে উঠলো ঘুম থেকে। সে নদী থেকে উঠে এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালো। জামী হাঁটতে লাগলেন। পেছনে আমি। আর আমার পেছনে হেঁটে হেঁটে এগুচ্ছে জীবন্ত সেই ‘লাশ’। আমরা শহরে এলাম। পেছনে পেছনে আসা সেই ‘লাশটি’ আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে জনঅরণ্যে মিশে গেলো!
আমি বার বার তাকাচ্ছিলাম জামীর দিকে। এতো বড়ো বিস্ময়কর ঘটনার পরে তার কী অবিব্যক্তি হয়, বুঝতে চাইছিলাম। কিন্তু তিনি তো একেবারে ভাবলেশহীন! যেনো কিছুই
ঘটেনি। আর আমার থেকে তিনি যেনো অনেক দূরে। অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। আমি এই ঘটনা লোকদের
না জানালে কেউই তা জানতে পারতোনা! জামী এ নিয়ে কোনো দিন একটি কথাও বলেননি।
শহরের আমীর একদিন আলেমদের দাওয়াত দিলেন। যেখানে সবার মধ্যমণি হিসেবে আমন্ত্রিত হলেন আল্লামা জামী! বড় লোকদের এমন আয়োজনে
জামী সাধারণত শরীক হননা। সেদিন বিশেষ এক হাল
ছিলো। অবিরল কবিতা ঝংকারে হিন্দোলিত হচ্ছিলো তার আবহাওয়া। ক্রমাগত তিনি আরো গভীরভাবে অলিঙ্গন করছিলেন সৃষ্টির মাধুরিমাকে। তার চেতনায় প্রসারিত হচ্ছিলো প্রেমময়, ক্রীড়াময় এক
রণনশীল কবিতার বন্যা। জামীর হৃদয় তখন সৌন্দর্যের বাগান। সেখানে ফুটেছে আনন্দের ফুল। গাইছে তৃপ্তির পাখি। নড়ে উঠছে প্রেমস্নিগ্ধ তরু। বয়ে চলছে ঐন্দজালিক
তটিনী। জামী তখন আর স্থির নেই। তার সমগ্র সত্তায় তখন সম্মিলীত কোরাম। সম্মিলীত প্রেমার্ত
গীতি! তিনি সেই গীতিকে স্বাগত জানিয়ে হাতে নিলেন তবলা। আলেমদের মজলিসে গেলেন কিন্তু হাতের তবলা রাখলেন না। সেটা হাতেই আছে এবং যখন বাজানো দরকার, বাজাচ্ছেন ও। কিছু আলেম তো নাক উঁচু থাকেন বরাবরই। কিছু আলেম এমনিতেই
হল্লাপ্রিয়। তাদের একজন জামীকে বলে বসলেনÑ হুজুর! আপনি তবলা বাজালে আমরা থাকি কোথায়? এটা হাত থেকে ফেলে দিলে কী ভালো হয় না? জামী জবাবে কিছুই বললেন না। চুপচাপ বসে আছেন। হঠাৎ তাকে ডাকলেন কাছে আসার জন্য। কানে কানে কি যেনো তাকে বললেন। তারপর সেতো অন্য এক
মানুষ হয়ে গেলো। সে এখন কেবলই দুলছে। তার হাতÑপা দুলছে। থর থর করে কাঁপছে তার আত্মা। সে কেবলই শুনতে পাচ্ছে
তবলার আওয়াজ। জামী বাজাচ্ছেন। বাতাসে শব্দ হচ্ছে। মাটিতে শব্দ হচ্ছে। বৃে হচ্ছে। তার শরীর জুড়ে শব্দ হচ্ছে। শব্দ হচ্ছে মস্তিস্কের তারে তারে। তিনি আর স্থির থাকতে
পারলেন না।
বিনয়ে বিগলিত হয়ে জামীর কাছে মা চাইলেন।
জামী বললেনÑ আমি বেচারা মাজবুর। বাধ্য হয়ে একে হাতে নিয়েছি। তুমি বিতন্ডা করে যে
গুপ্ত বিষয়কে প্রকাশের দিকে নিয়ে গেলে, সেটাতো আমার
তবলা থেকে আরো বিপজ্জনক! যে বিষয় তোমার কাছে প্রকাশ পেলো এ আমার কাজ নয। যে সত্যের স্পন্দনে আমার সমস্ত সত্তা শিহরিত, সেই সত্যেরই কাজ। জেনে রেখো! কোনো মতাই আমরা রাখিনা। কোনো কিছুর উপরে আমাদের মতা নেই। এমনকি নিজের উপরেও
নেই।
মহাজাগতিক সুত্র
বৈশাখের ঝড়ো বাতাসে যেভাবে শুকনো পাতা উড়ে যায় জামীর দিন-রাত্রি
থেকে তেমনি উড়ে গেলো অস্থিরতা। তিনি দিন দিন কেবলই
আরো বেশি স্থির, আবার গতিময়। তার সেই স্থিরতার কাছে এসে শব্দ থেমে যায়, ছন্দ থেমে যায়। সূর্য নিভে যায়, চন্দ্র নি®প্রভ হয়ে যায়। চু বন্ধ হয়ে যায়। কর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি সত্তা লুপ্ত হয়ে যায়। থাকে শুধু সীমাহীন
মহাপ্রেমে মিশে যাওয়া। সেই ভুবনে আর কেউ নেই। আর কিছু নেই। আকাশে ভুতলে কেবলই অতল ব্যাকুলতা। সীমাশূন্য অসীম জুড়ে কেবলই নিমগ্নতা। কেবলই চৈতন্যের সুধা
তরঙ্গে ডুবে যাওয়া। ডুবে ডুবে হয়ে যাওয়া জ্যোতির বিন্দু,
জ্ঞানের সিন্ধু, আনন্দের তরঙ্গ।
কিন্তু জামী তো থেমে নেই। জ্যোতি থেকে জ্যোতিতে তার অভিগমন। জ্ঞান থেকে জ্ঞানে
তার পদসঞ্চার। আনন্দ থেকে আনন্দে তার ছুটে চলা। যেভাবে নদী ছুটে চলে সমুদ্রের দিকে। পতঙ্গ যেভাবে ছুটে
প্রদীপের দিকে। মৌমাছি যেভাবে ছুটে চলে পুষ্পের দিকে।
জামীর এই ছুটে চলা এক মহাউত্থানের দিকে।
জামীর এই অগ্রগামীতা এক মহামিলনের দিকে।
জামীর ল্য সেই পরম ও চরম সন্তুষ্টিতে অবগাহন, যা থেকে উৎপন্ন হয়েছে মহোত্তম সুন্দর। লয়হীন, য়হীন সৃজনের সুরধারা।
সে সুরের বংশীবাধক তো রাহমাতুল্লিল আলামীন সা. সে সুন্দরের চিত্রকর
তো প্রিয়তম রাসূলে কারীম সা.! সেই সন্তুষ্টির মোহনার নামইতো সর্বগ্রাসী প্রেম। জামীর সর্বগ্রাসী প্রেম ফেনায়িত হতে থাকলো প্রতি মুহুর্তে। জীবনের শেষ সময় যতই ঘনিয়ে আসছিলো, জামী ততবেশি
পাঠ করতে লাগলেন বিকশিত চৈতন্যের প্রেমভাষ্য! ইন্তেকালের কয়েকদিন আগে তিনি লিখেন এক
হৃদয়ছেদা ভক্তিগানÑ
আহান্না শাওকান ইলা দিয়ারিন
লাকি-তু ফি-হা জামা-লা সালমা
বওয়াদী গম মনম ফতাদাহ
যেমা-মে ফিকরত যদস্তে দা দাহ
নাহবখতে ইয়ারু, নাহ আকল রাহবর
নাহ ওন তওয়ানা, নাহ দিল শকী-বা
যেহী জামালে তু-কিবলায়ে জান
হরী-মে কু-য়েতু কা’বায়ে দিল
ফাইন সাজাদনা লাদাইকা নাসজুদু
ওয়াইন সাআইনা ইলাইকা নাস’আ
যে সিররে এশক তু বুত্তদ সাকিন
যবানে আরবা বে শত্তক লেকিন
যে-বে যবানী গম নাহানী
চুনাকে দানী শাদ আশকারা
বাকাত উয়ূনী আলা শুয়ূ-নী
ফা সা-আ হা-লী, ওয়ালা উবা-লী-
কে দা-নম আখের তবীব ওসলতে
মরীয খুদ রা কুনদ মদা-রা
আগর ব জুরম রব আওরী জান
ও গিদ তেগেম বেফগনী সর
ক্বসম জা-নতে কে বর না দারম
সর ইরাদত যে খা-কে আঁ পাঁ
ব না-যে গুফতি ফলাঁ কুযা-য়ী
চেহ বুত্তদ হালতে দরী-জুদায়ী
মারিযতু শওকান ওয়া মিততু হাজরান
ফা কাইফা আশকু ইলাইকা শাকওয়া
রব আস্তানত কমী-নাহ জামী
মজালে বু-দন নাদিদ আয আরুঁ
বকুনজে ফিরকত নিশস্ত মহজুন
ব কু-যে মেহনত গিরিফত মাঅওয়া
কবিতাটির ভাবকথাÑ
করছি রোদন আসক্তিতে
সেই সে দেশের যেইখানে
দেখা দিলো প্রেমাস্পদের
অপূর্ব রূপ এই জানে
তোমার বিপুল মমতা আর
অনুগ্রহ চায় এমন
আসুক ছুটে এদেশ পানে
আমার দিকে অনুণ
দূর্ভাবনার বিরান মাঠে
ছিটকে পড়ে কাদছি, হায়!
চিন্তারাজী নিয়ন্ত্রণের
লাগাম ছিড়েঁ তুমুল ধায়
ভাগ্য ও তো নয় সহায়ক
দেখায়না পথ বুদ্ধি যে
দেহেও নেই শুস্থতা আর
মনে সবর শুদ্ধি যে
কতোই যে রূপ তোমার মাজে
এ হৃদয়ের কিবলা তুমি
তোমার গলির এদিক ওদিক
দিলের কা’বা জেনেই তুমি
সত্যি যদি সেজদা খোদার
করি তবে তোমার পাশেই
লিপ্ত যদি হই সাধনায়
তাতো হবে তোমার পাশেই
প্রেমিকজনের স্তব্ধ জবান
প্রেমের গোপন ভেদ প্রকাশে
প্রেমের বীধি নয় তো সে সব
জাহির করা লোক সকাশে
আমার জবান স্তব্ধ তবু
হচ্ছে জাহির প্রেম অমীয়
গোপন ব্যথার ভাবনা যেমন
এমনি রটে, জানো প্রিয়
চু আমার অশ্র“ঝরায়
দূর্দশারই যন্ত্রণাতে
আমার হালত খুবই খারাপ
নেই পরোয়া কোনোই তাতে
জানি আমি আমার রোগের
ঔষধ হলো তোমার দীদার
দেখা দিয়ে রোগ সারাবেন
এটাই মনে আশার মীনার
চাইলে প্রেমের অত্যাচারে
করতে পারো খুন মোরে
তোমার তেগের কোপে যদি
এ মস্তকও যায় উড়ে
তোমার পায়ের ধুলা থেকে
তবুও মাথা সরবেনা
তোমার প্রাণের কসম! হৃদয়
একটুকুও নড়বেনা
খুশি হয়ে বলবে তখন
কোত্থেকে এ মাতাল এলো
বেদনাভরা বিরহ মাজে
তার এতোকাল কেমনে গেলো
প্রেমের ব্যথায় রুগ্ন আমি
চিন্তাতে তো গেছি মরে
সামর্থ কই? ব্যক্ত করি
প্রেম-অনুযোগ নবীর তরে
এই কমীনা জামী তোমার
চৌকাটে গো রইবে পড়ে
পায়না খুজে শক্তি কোনো
কোথাও যে যাবে সরে
বিচ্ছেদেরই ঘরের কোনায়
চিন্তামেঘে ছেয়ে আছি
কোন সাধনার গলিপথে
এবার আমি শরণ যাচি?