মাহমুদ হাসান
বিপরিতধর্মি প্রতিভা এবং ঘটনার সমাবেশ
ঘটেছিল নজরুলের জীবনে । কিছুটা নিজের প্রতিভার গুনে কিছুটা কাকতলীয়ে ভাবে
ঘটনার পরম্পরায় । এখানে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যের কিছু দিক আলোকপাত করা হলো
নজরুল ও গান :: পৃথিবীর সর্ব সংখ্যক গানের রচয়িতা কবি নজরুল । ৫ হাজার এর অধিক । এর মধ্যে
১৫০০-২০০০ এর মতো গান পাওয়া যায় না , নজরুল বেচে থাকতেই হারিয়ে গিয়েছে । যে ৩ হাজারের মতো গান পাওয়া যায় সেটা নিয়েই বলা যায় পৃথিবীর সর্ব সংখ্যক
গানের রচয়িতা কবি নজরুল । দ্বিতিয় স্হানে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আনুমানিক
২২২৭ টি ।
নজরুল ও রসবোধ ::গোলাম মোস্তফা নজরুলকে নিয়ে প্যারোডি লেখা ছেড়ে দিলে নজরুল বললেন : গোলাম মোস্তফা
নজরুল ও রসবোধ ::গোলাম মোস্তফা নজরুলকে নিয়ে প্যারোডি লেখা ছেড়ে দিলে নজরুল বললেন : গোলাম মোস্তফা
দিলাম ইস্তফা ।
আড্ডাবাজ নজরুল :: একবার কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং এর ফুটবল খেলা দেখার পর কয়েক বন্ধু মিলে
হাটতে হাটতে হাওড়া স্টেশন-এ এসে দেখেন ট্রেন অপেক্ষা করছে । ঢাকা যাবার
ট্রেন । অমনি নজরুল এবং তার বন্ধুরা উঠে গেলেন কাউকে কিছু না জানিয়ে ।
দিনের পর দিন খবর নাই নজরুল কোথায় । অবশেষে তার ফেমিলি , বন্ধু-বান্ধব সবাই
মিলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবার পরিকল্পনা করলেন । এমন সময় নজরুল দল নিয়ে
ফিরে আসল এক মাস পর।
নজরুল ও দাবা খেলা :: ঘন্টার পর ঘন্টা
দাবা খেলতেন বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন এর সাথে ( সেবা প্রকাশনীর মালিক কাজী
আনোয়ার হোসেন এর পিতা ) । একবার এক অনুষ্ঠানে যাবার জন্য লোকজন হাজির এবং
নজরুল গোছগাছ করে রেডি হলেন তাদের সাথে যাবার জন্য । এমন সময় মোতাহার হোসেন
হাজির । নজরুল তাদের বললেন আপনারা যান আমি একটু পরের ট্রেনে আসছি । তারাও
সরল বিশ্বাসে চলে গেলেন এবং অনুষ্ঠানের সবাইকে বললেন নজরুল ঠিক সময়ে আসবে ।
পরে যা হবার তাই হলো । তারা অপেক্ষা করতে করতে কোনোমতে দর্শকদের থেকে
পালিয়ে এসে নজরুলের বাসায় যখন ঢুকলেন তখন নজরুল বলছে এই তোমার কিস্তি মাত ।
তাৎক্ষনিক লেখা ও নজরুল :: শওকত ওসমান একবার খাতা এগিয়ে দিয়ে নজরুলকে বলেছিলেন কিছু লিখে দিতে । নজরুল তত্ক্ষনাৎ লিখে দিলেন
বিশ্বব্রম্মান্ড স্বরূপ আছে চুর্ন অনুতে
আছে অজানা তরুন তোমার বদ্ধ তনুতে
আছে অজানা তরুন তোমার বদ্ধ তনুতে
উপস্হিত বুদ্ধি ও নজরুল :: একবার নজরুলকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল জীবনানন্দ দাশ এর উপমা সম্বন্ধে আপনার মত কি .. নজরুল সাথে সাথে উত্তর দিলেন মা দিয়ে আর কাজ হচ্ছে না বুঝি তাই উপমা
নজরুল ও রুবাইয়াত-ই- ওমর খৈয়াম :: নজরুল অসাধারন ফারসী ভাষা জানতেন । আর ফারসী সাহিত্যের দিকপাল ওমর খৈয়াম - এর রুবাইয়াত নজরুল অনুবাদ করেছেন । কান্তিঘোষ ওমর খৈয়াম - এর রুবাইয়াত অনুবাদ করেছিল ইংরেজী ফিটজারেল্ড এর অনুবাদ থেকে কিন্তু নজরুল সরাসরি ফারসী থেকে । সেই হিসেবে তারটা মুলভাব অনেকটাই বজায় রেখেছে । এইজন্য মুজতবা আলী বলেছিলেন কাজীর অনুবাদ সকল অনুবাদের কাজী ।
প্রেম ও বিদ্রোহ :: প্রেম এবং বিদ্রোহ সম্পুর্ন বিপরীত জিনিস । সম্পূর্ন বিপরীত দুটো ঘরানায় সাহিত্য লিখে উভয়টাতে দক্ষতা দেখানো বাহাদুরীর কাজ যেটা নজরুল দেখিয়েছিলেন খুবই মুন্সিয়ানার সাথে । দেখুন তার বিদ্রোহী কবিতা
এর চেয়ে বেশী কি দেবে গাল
আমরা পিশাচ খুন মাতাল
আমরা বলিব সর্বদাই
দু:শাসনের রক্ত চাই !!
আমরা পিশাচ খুন মাতাল
আমরা বলিব সর্বদাই
দু:শাসনের রক্ত চাই !!
অনেক critic বলেছেন নজরুলের আগে কারো ধারনাই ছিলনা বাংলা ভাষায় এমন বিদ্রোহী কবিতা লেখা যায় ।
আবার দেখুন প্রেমের কবিতা
কেন সে বেদনা বুঝিতে পার না মুখে যাহা নাহি বলি
জয় করে কেনো নিলে না আমারে কেন তুমি গেলে চলি ।
কেন সে বেদনা বুঝিতে পার না মুখে যাহা নাহি বলি
জয় করে কেনো নিলে না আমারে কেন তুমি গেলে চলি ।
সাহিত্যের উপাদান : হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম :: পৃথিবীর আর কোনো সাহিত্যিক আছে কি যে দুটো ধর্মকে সাহিত্যের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছে ? এবং দুটোতেই A+ ? গ্যেটে খৃষ্টান ধর্ম , বাল্নিকি হিন্দু ধর্ম , আল্লামা ইকবাল ইসলাম ধর্ম । কিন্তু এমন কাউকে পাবেন না যে নজরুলের মতো ইসলাম ধর্ম নিয়ে লেখা হামদ, নাত সেটাও সংখ্যা এবং সাহিত্যিক মান উভয় দিক বিবেচনা করে বাংলা ভাষায় সর্বশেষ্ঠ আর হিন্দু ধর্মের ভজন, শ্যামা সংগীত সর্বোপরী যেগুলোকে ধর্মীয় সংগীত বলা হয় সেগুলোতে সংখ্যা এবং সাহিত্যিক মান উভয় দিক বিবেচনা করে .
ইসলাম ধর্ম নিয়ে লেখা :
ভুলিয়া গিয়েছি তব আদর্শ তোমার দেখানো পথ
তোমার বানীরে করিনি গ্রহন ক্ষমা কর হজরত
তোমার বানীরে করিনি গ্রহন ক্ষমা কর হজরত
হিন্দু ধর্মের উদাহরন দেখুন :
এল নন্দেরও নন্দন নব ঘনশ্যাম
এল যশোধা নয়নমনি নয়নাভিরাম
এল যশোধা নয়নমনি নয়নাভিরাম
প্রেম রাধার মন-নব বংকিমো ঠাম
চির রাখাল গোকুলে এলো গোলক ত্যাজি
চির রাখাল গোকুলে এলো গোলক ত্যাজি
কৃষ্ণজি , কৃষ্ণজি , কৃষ্ণজি ।
অথবা
মন্দিরে দুর্গে রয় না যে বন্দি সেই দুর্গারে দেশ চায়
চিন্ময়ী রূপ পুজি শ্রী দুর্গা মৃন্ময়ি রূপ ধরে আয় ।
চিন্ময়ী রূপ পুজি শ্রী দুর্গা মৃন্ময়ি রূপ ধরে আয় ।
কোনো এক গবেষক বলেছেন নজরুলের "বিদ্রোহী" কবিতায় একাধারে মুসলিম , হিন্দু ,
গ্রিক তিনটি ধর্মের সমাবেশ ঘটেছে । পাঠকের হয়ত খেয়াল থাকবে অর্ফিয়াসের
বাশরী লাইনটি গ্রিক মিথোলজী থেকে নেয়া
জন্ম এবং মৃত্যু :: আমাদের জাতীয় কবির জন্ম ১৮৯৯ এবং মৃত্যু ১৯৭৬ । অর্থ্যাত জন্ম উনবিংশ শতাব্দিতে এবং মৃত্যু বিংশ শতাব্দিতে ।
জন্ম পশ্চিমবংগে এবং মৃত্যু বাংলাদেশে । এখানে বৈচিত্র !! এমনকি প্রমিলার
পাশে তার কবর এর জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিল । কিন্তু নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে
আসার কারনে এবং ঘন ঘন অসুস্হ হবার কারনে তাকে আর ইন্ডিয়ান সরকার ফেরত নিতে
পারে নাই । তাই এখানেই মৃত্যুবরন এবং এখানেই দাফন ।
উপসংহার :: এতক্ষন আমি যেগুলো বর্ননা করলাম সেগুলোতে হয়ত অনেকে সন্তুষ্ট নাও হতে পারেন তাই নজরুলের নিজের কথায় শুনুন তার নিজের সম্বন্ধে :
বিদ্রোহী আংগিকে
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন: মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু
আবার প্রেমিক টোনে :
আমার গানের মদির ছোওয়ায়
গোলাপ কুড়ির ঘুম টুটে যায়
সে গান শুনে প্রেম দেওয়ানা কবির আখি ছলছল
গুলবাগিচার বুলবুলি আমি রংগিন প্রেমের গাই গজল ।
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন: মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু
আবার প্রেমিক টোনে :
আমার গানের মদির ছোওয়ায়
গোলাপ কুড়ির ঘুম টুটে যায়
সে গান শুনে প্রেম দেওয়ানা কবির আখি ছলছল
গুলবাগিচার বুলবুলি আমি রংগিন প্রেমের গাই গজল ।
নিজেকে নিয়ে কি বিপরীত ধর্মি বিশ্লেষন !!! প্রথম কবিতাটা কোনো কাগজের উপর
লিখলে মনে হয় আগুন ধরে যাবে আর দ্বিতিয়টা লিখলে যেন ফুল হয়ে ফুটবে।