মুসা আল হাফিজ
মহাকবি জালাল উদ্দীন রুমী সেই সাধনামার্গের মহানায়ক,
যে সাধনমার্গ ঐষী উৎসমূল থেকে উৎসারিত। চিরকালের রহস্যলোকে যার বিস্তার। আত্মার ঐশ্বর্য যার
বাহন। এ হচ্ছে সেই আলো, যে আলোর হিন্দোলে
মানবাত্মা জীবন্ত হয়ে ওঠে। ফলে মানুষ বলীয়ান হয়
মানবিক মহিমায়। রুমীর কবিতা হচ্ছে সেই মহিমার দীপিত দলিল। তার কবিতা হচ্ছে শাশ্বতের সেই প্রেমঝংকার, যা পৃথিবীর জন্য রচনা করে স্বর্গীয় সম্ভাবনা। তার কবিতা হচেছ অপার্থিব সেই বৃষ্টিধারা, যা মানবাত্মার মহোত্তম পিপাসা মিটাবার ল্েয বর্ষিত।
যে বর্ষণে আত্মা সিক্ত না হলে জীবন হয়ে উঠে খরখরে বালুর মরুভূমি। হৃদয় হতে থাকে বিবর্ণ, পাষাণ। চেতনায় বিরাজ করে দারিদ্রের জীর্ণতা। রুমীর কবিতা তাই পৃথিবীকে দিয়েছে সেই প্রেমের সবক, যা মানবাত্মাকে মহিয়ান করে তুলে পরমের আলোয়। স্রষ্টার বাণীরাজীকে দীপ্তিমান করে চেতনার মর্মমূলে। ফলে স্রষ্টার সৌন্দর্যে মানুষ হতে থাকে পূর্ণতার প্রতিবিম্ব। জীবন হয়ে উঠে প্রেমের ঝর্ণাধারা। কর্ম হয়ে উঠে পবিত্রতার দীপ্তি। সমাজ ও পৃথিবী উজ্জীবিত হয় মাহাত্মের বাসন্তি হিল্লোলে। রুমীর কবিতা তাই পৃথিবীর সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ভালোবাসার অভিধান হয়ে উঠেছে। মরমী সাধকদের জন্য হয়ে উঠেছে প্রেমের ওজিফা। মসনবী হচ্ছে রুমীর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। আধ্যাত্মপথে এ গ্রন্থ হচ্ছে রহস্যের গুপ্তধন। এ গ্রন্থের মূল প্রাণ হচ্ছে কুরআনের হেদায়েত। ফলত মহাকবি আবদুর রহমান জামী লিখেন- ‘সমনবীয়ে মৌলভীয়ে মা’নবী/ হাস্তে কুরআন দর জবানে পাহলবী।’
যে বর্ষণে আত্মা সিক্ত না হলে জীবন হয়ে উঠে খরখরে বালুর মরুভূমি। হৃদয় হতে থাকে বিবর্ণ, পাষাণ। চেতনায় বিরাজ করে দারিদ্রের জীর্ণতা। রুমীর কবিতা তাই পৃথিবীকে দিয়েছে সেই প্রেমের সবক, যা মানবাত্মাকে মহিয়ান করে তুলে পরমের আলোয়। স্রষ্টার বাণীরাজীকে দীপ্তিমান করে চেতনার মর্মমূলে। ফলে স্রষ্টার সৌন্দর্যে মানুষ হতে থাকে পূর্ণতার প্রতিবিম্ব। জীবন হয়ে উঠে প্রেমের ঝর্ণাধারা। কর্ম হয়ে উঠে পবিত্রতার দীপ্তি। সমাজ ও পৃথিবী উজ্জীবিত হয় মাহাত্মের বাসন্তি হিল্লোলে। রুমীর কবিতা তাই পৃথিবীর সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ভালোবাসার অভিধান হয়ে উঠেছে। মরমী সাধকদের জন্য হয়ে উঠেছে প্রেমের ওজিফা। মসনবী হচ্ছে রুমীর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। আধ্যাত্মপথে এ গ্রন্থ হচ্ছে রহস্যের গুপ্তধন। এ গ্রন্থের মূল প্রাণ হচ্ছে কুরআনের হেদায়েত। ফলত মহাকবি আবদুর রহমান জামী লিখেন- ‘সমনবীয়ে মৌলভীয়ে মা’নবী/ হাস্তে কুরআন দর জবানে পাহলবী।’
জামীর এই কথাটি প্রবাধে পরিণত হতে সময় লাগলো না। মুসলিম দুনিয়া রুমীর কবিতাকে বুকে টেনে নিলো। ফার্সী ভাষার কুরআনকে উচ্চতর মর্যাদার সিলেবাসে স্থান দিলো মুসলিম দুনিয়ার জামেয়া
সমূহ। এর মধ্যস্থিত দর্শন, শিল্প ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে জমে উঠলো জ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার আসরসমূহ। রুমী অনূদিত হলেন আরবীতে এবং অনতিবিলম্বে ল্যাটিন ও স্পেনিশ ভাষায়। সেই অনুবাদ তাকে পৌঁছে দিলো ইউরোপে। রুমীর কবিতাকে প্রাচ্য
যেভাবে বরণ করেছিলো, পাশ্চাত্য তেমনটি করতে কসুর করেনি। ইউরোপের চিন্তা ও কাব্যজগতে রুমী স্থায়ী প্রভাতের স্রোতধারা বইয়ে দিলেন। বোকাশিও হয়ে উঠলেন তার ভক্ত ও মুগ্ধ প্রচারক। ফিটসজেরাল্ড মজলেন রুমীতে। এ. জে. আরবেরী নিমজ্জিত
হলেন তার অতলে। সেই যে শুরু হলো, তারপর ধারাবাহিক এই পরিক্রমায় যুক্ত হলেন নিকলসন গ্যাটে, ফ্রেডেরিক হেগেল থেকে নিয়ে আজকের কোলম্যান বার্কস পর্যন্ত । রুমীর কবিতার নত্র কখনো অস্ত যায়নি। প্রাচ্যে যেমন প্রতীচ্যেও
তেমনি। একদিকে তার ভক্তকূলে আছেন মহাত্ম গান্ধী অপরদিকে আছেন পোপ জন
( ২৩ তম) কবির ইন্তেকালের ৮০০ বছর পরও ২০০ সালে ইংরেজী ভাষায় কোলম্যান বার্কস অনুদিত
‘রুমীর নির্বাচিত কবিতা’ বিক্রি হয় ২৫০,০০০ কপি। আর দি সোল অব রুমী হয় ইউরোপের বেস্টসেলার। বিগত ২০০৭ সালে দুনিয়াজুড়ে পালিত হয় জন্মশত বর্ষপূর্তি। মহাসমারোহে সেই উৎসবে ইউনেস্কোর মাধ্যমে পৃষ্টপোষকতা করে জাতিসংঘ। ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে ঘোষণা করে ইন্টারন্যাশনাল রুমী ইয়ার হিসেবে। ২৬ শে অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত ইরান পালন করে রুমী সপ্তাহ। তেহরানে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক রুমী
উৎসব। ২৯ টি দেশের বিদগ্ধ গবেষকরা তাতে অংশ নেন। ৪৫০ টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয় রুমীর কবিতা নিয়ে । এ সময়ে আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ বিভিন্ন
দেশে পালিত হয় রুমীউৎসব।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাথে রুমীর কবিতার সম্পর্ক অনেক পুরনো। উপমহাদেশে চিশতিয়া সাবেরিয়া তরিকা, চিশতিয়া নিযামিয়া
তরিকা, চিশতিয়া ওয়ারেসিয়া তরিকা প্রভৃতি সুফী পন্থায়
রুমীর ভাবলোকের প্রভাব নামে স্রোতের মতো।
তুর্কি মুসলমানদের হাত হয়ে রুমীর কবিতা দ্বাদশ শতকে এ দেশে চলে
আসে। এক সময় ফার্সী রাজভাষা হলো, আর আরবী ফার্সির প্রভাবে যাবনী মিশাল বাংলা এ দেশের হিন্দু মুসলমানদের সুখের ভাষা
হয়ে উঠলো। মসনবীর শিা ও ভাবাদর্শ তখন এ দেশের সমাজ সংস্কৃতির গভীরে আসন
পাতে। মহাকবি আলাওল ও শাহ মুহাম্মদ সগীরের কাব্যে তাই রুমী হয়ে ওঠেন
প্রেরণা। আবদুল হাকিমের চিত্তলোকে লাগে রুমীর দোলা। সময়ের গভীরে রুমীর অবস্থান সম্পর্কে বৈষ্ণব কবি জয়ানন্দ তার ‘চৈতন্যমঙ্গল’ গ্রন্থে অবতার নামে পরিচিত চৈতন্যদেবের মাহাত্ম্য
প্রচার প্রসঙ্গে জাগাই-মাধাই উদ্ধার পর্বে স্ব্যা দিচ্ছেনÑ ‘ মসনবী আবৃত্তি করে থাকে নলবনে/ মহাপাপী জগাই মাধাই দুইজনে’। বৈষ্ণব কবি জাগাই মাধাইকে মহাপাপী বানিয়েছেন হয়তো ‘সতত রুমী আবৃত্তির’ পাপে। কিন্তু রুমী আবৃত্তি করে করেই তারা চৈতন্যদেবকে প্রেমের অবতার হিসেবে চিনতে পারলো। আর সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও অল্েয প্রমাণ হয়ে গেলো যে তখন হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে
রুমী আবৃত্তি ছিলো অব্যাহত। নাতপন্থী ও সহজিয়া
কবিরাও রুমী দ্বারা প্রভাবিত হলেন। কেচ্ছাকাব্যে গোরবিজয়,
বিদ্যাসুন্দর, পদ্মাবতী,
ছন্দ্রাবতী, লোরচন্দ্রানী ও সতী
ময়না ইত্যাদি কাহিনী ফার্সী কাব্য ঐতিহ্য থেকে ঋণ গ্রহণ করে, বিশেষত রুমী থেকে । এ প্রভাব অষ্টাদশ শতকের
শেষভাগে কানু ফকীরের আধ্যাত্মিক কাব্য ‘জ্ঞান সাগরে’ মূর্ত হয় সরাসরি। তিনি রুমীর অনুকরণে
উচ্চারণ করেনÑ
‘প্রথমে আছিল প্রভূ এক নিরঞ্জন।
প্রেমরসে ডুবি‘ কৈল যুগল সৃজন।
প্রেমরসে ডুবি প্রভূ যাহাকে সৃজিলা।
মোহাম্মদ করি’ নাম গৌরবে রাখিলা।’
রুমীর কবিতার অন্যতম প্রতিপাদ্য মানবতা। সেই মানবতা বাণীর তরঙ্গ এ দেশে আচড়ে পড়ার পর বাংলা কবিতা আর আগের জায়গায় রইলো না। ড. মোহাম্মদ এনামুল হক এর ভাষায়Ñ ‘এর প্রভাবে
বাংলা কাব্যে মানবতাবোধের জন্ম, চন্ডীদাসের রচনায় মানুষের
শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হতে পেরেছে ইসলামী সংস্কৃতির সংস্পর্শেই। চন্ডীদাসের রচনায় কেউ কেউ শেখ সাদী ও রুমীর বাণীর প্রতিধ্বণিও খুঁজে পেয়েছেন।’
তাইতো দেখি একদিকে যেমন দৌলত কাজী রুমী ভক্ত, অপরদিকে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরও রুমীতে মজ্জমান। ফকীর লালন শাহ, শীতালং শাহ, আরকুম শাহ প্রমূখের চিত্ত অবগাহন করে রুমীর
সূর্যালোকে। তাদের গান ও ভাবনায় রুমীর প্রভাব রেখেছে রক্তসঞ্চারী
ভূমিকা। রুমী অনুবাদে সর্বপ্রথম কলম উঠান খাতের মুহাম্মদ। তিনি বাশঁরীর কান্না নিয়ে দুভাষী পুঁথিতে চরনা করেন তৎকালে জনপ্রিয় কিছু অনুবাদ
কবিতা। আধুনিক বাংলায় সর্বপ্রথম মসনবীর কাব্যানুবাদ করেন চট্টগ্রাম
নর্মাল স্কুলের হেড পন্ডিত নোয়াখালী নিবাসী মরহুম আবদুল ওয়াহিদ। ১৯২০ সালে তার অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গদ্যে সমগ্র মসনবীর অনুবাদ করেন যশোর জেলার কাকড়া নিবাসী মরহুম ফজলুল করীম। তারপর খুলনার বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক কাজী আকরাম হুসেন মসনবীর প্রথম খন্ডের
কাব্যানুবাদ করেন। ১৯৫০ সালে তা প্রকাশিত হয়। আ.ন.ম. বজলুর রশীদ মসনবীর নির্বাচিত কিছু অংশের অনুবাদ করেন। কলকাতায় আবদুল আজীজ আল আমান রুমীর কবিতা বিষয়ে সারগর্ব কিছু প্রবন্ধ লিখেন। বিশিষ্ট গবেষক মুহাম্মদ বরকত উল্লাহ তার বিখ্যাত ‘পারস্য প্রতিভা’ গ্রন্থে রুমীর জীবন ও কবিতা বিষয়ে বিস্তৃত
আলোচনা করেন। কবি ফররূখ আহমদ ছিলেন রুমীর ভক্ত এবং তার
দর্শনের অনুরাগী। তিনি রুমী সম্পর্কে রচনা করেন অসাধারণ কিছু
সনেট। তার অনূদিত ‘ইকবালের নির্বাচিত
কবিতা’য় রুমী সম্পর্কিত ইকবালের বক্তব্যকে তিনি অনুবাদ করেছেন অসামান্য
মুন্সিয়ানায়। তার অনুবাদে রুমীর প্রতি আন্তরিকতা ও একাত্মবোধ
যেনো উপচে উঠেছ্ েএবং তার অসামান্য প্রভাব ইকবাল হয়ে ফররুখে প্রতিফলিত হয়েছে-
‘রুমীর প্রতিভা দীপ্তি উদ্দীপিত করেছে আমাকে
রহস্যের গ্রন্থ হতে আজ আমি গেয়ে যাই গান
আত্মা তার অগ্নিকুন্ড, জ্বলন্ত, উজ্জল,
আমি শুধু অগ্নিকণা প্রাণ পাই মুহূর্তের তরে।
পতঙ্গের মত মোরে গ্রাস করিয়াছে তার দীপ্ত অগ্নিশিখা
আমার পেয়ালা পূর্ণ করিয়াছে কানায়, কানায়
স্বর্ণ মহিমায় মোর মৃত্তিকারে ফেরায়েছে রুমী
প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ড করেছে সে মোর বিভূতিরে
সূর্যের ঔজ্জল্য, বিভা কেড়ে নিতে
বালুকণা উঠে এল
মরুভূমি থেকে।’
অনুবাদ কিংবা মৌলিক কবিতায় রুমী বন্দনা ও তার দর্শন বিপুলভাবে
মূর্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গানে, কাজী নজরুলের ভাববাদী নির্মাণে, ফররুখ আহমদের
সৃষ্টিবিশ্বে, সৈয়দ আলী আহসানের চাহার দরবেশ ও অন্যান্য
কবিতা, এবং স্পষ্টভাবে সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতারাজ্যে। বেনজীর আহমদ,
মুফাখখারুল ইসলাম, তালিম হোসেন,
আবুল হোসেন, আল মাহমুদ,
আফজাল চৌধুরী থেকে নিয়ে মুকুল চৌধুরী পর্যন্ত ঐতিহ্য ও প্রেমপন্থি
কবিদের বিভিন্ন কবিতায় রুমীর চেতনা ও দর্শন প্রস্ফুটিত হয়েছে নানামাত্রায়। দর্শনে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ রুমীর অহমবাদকে অবলম্বন করেছিলেন তার অন্যতম দিকদর্শন
হিসেবে। আবুল হাশেম রুমীর দর্শনে চিন্তানৈতিক উত্তরণ খুঁজে পেয়েছিলেন। ড. হাসান জামান রুমীর দর্শনকে আত্মার পরিত্রাণের পথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
শিশুদের উপযোগী করে জালাল উদ্দীন রুমীর জীবনী লিখেন অধ্যাপক
আখতার ফারুক। তার ‘ফুটলো গোলাপ ইরান দেশে’ গ্রন্থে হাফিজ, সাদী, ফেরদৌসীর সাথে রুমীর জীবনীও আলোচিত হয়। রুমীর কবিতার অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় বড় পরিসরে একটি গ্রন্থ লিখেন আল্লামা আজিজুল হক। তিনি গদ্যে রুমীর কবিতার অনুবাদ ও তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উন্মোচন করেন বাংলা
মসনবী শরীফে। গ্রন্থটি যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়। পরপর এর চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আধুনিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে
মসনবীর অনুবাদ ও বিশ্লেষণে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন মনির উদ্দিন ইউসুফ। তার ‘রুমীর মসনবী’ গ্রন্থটি ষাটের দশকে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। উপমহাদেশের বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও সাধক আলিম আশরাফ আলী থানভী রাহ. এর বিশালায়তনের
উর্দু গ্রন্থ ‘কলীদে মসনবী’ অনুবাদ করে রুমীর কবিতা চর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন মাওলানা মুজিবুর রাহমান ও মাওলানা
নূরুদ্দীন।
পাকিস্তানের সুফী সাধক হাকিম আখতার সাহেবের অনবদ্য গ্রন্থ মাআরিফে
মসনবী গ্রন্থের অনুবাদ করেন শায়খ আবদুল মতিন বিন হুসাইন। কোলম্যান বার্কসের দি সোল অব রুমী অনুবাদ করেন আনোয়ার হুসেন মঞ্জু। বিখ্যাত সংগীত ব্যক্তিত্ব মোস্তফা জামান আব্বাসী লিখেন তথ্য ও তত্তপূর্ণ একটি গ্রন্থ
‘রুমীর অলৌকিক বাগান’। চট্টগ্রামের মাওলানা আহমদুর রহমান রুমী প্রেমিক
হিসেবে ছিলেন খ্যাতিমান। তিনি ঐ বিষয়ে কয়েকটি
গ্রন্থ রচনা করেন। ইরানী কালচারাল সেন্টার থেকে রুমীর কবিতা
বিষয়ক কয়েকটি স্যুভেনির প্রকাশিত হয়। বর্তমানে রুমী চর্চায়
ভূমিকা যারা রাখছেন, তাদের মধ্যে ড. মাওলানা ঈসা শাহেদী,
ফরিদ উদ্দীন আহমদ প্রমূখ সতত সক্রিয়। রুমী চর্চার এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় কবি আফজাল চৌধুরী আপন বিশেষত্ব নিয়ে বিকশিত
‘জালাল উদ্দীন রুমীর কবিতা’ বইটির মাধ্যমে। চট্টগ্রামের মুফতী ফয়জুল্লাহ রাহ. মসনভীর মূলভাব ব্যাখ্যা করে একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ
লিখেন। সেটা মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় শিা প্রতিষ্ঠানে রুমীর কবিতার পাঠদান
পদ্ধতি বিষয়ক গাইড লাইন। এ দেশে শত শত বছর ধরে
মাদরাসাসমূহে রুমীর কবিতা পঠিত হয়ে আসছিলো। সম্প্রতি এই চর্চার
গতিবেগ ীণতর হয়ে পড়লেও ধারাবাহিকতা কোথাও কোথাও অবশিষ্ট রয়েছে। এখনো গ্রামে গঞ্জে ধর্মীয় মাহফিলে রুমীর কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে মানুষের হৃদয়কে প্রেমে
উজ্জীবিত করার প্রয়োজনে। রুমীর জীবনে যে আধ্যাত্মিকতার
স্ফূরণ ঘটেছিলো, আফজাল চৌধুরী মানুষের আত্মায় তার বিকাশ কামনা
করতেন। এবং সেই কামনা তাকে জাগিয়ে তুলতো রাত্রির শেষ প্রহরে নিজের জীবনে
তাকে আবিষ্কার করার জন্যে। যে আধ্যাত্মিকতার ঊর্মী
মুখর স্রোত তাকে আহ্বান করতোÑ ‘কাছে আয়, কাছে আয় না বে’ যে ঊর্মী তাকে দিয়ে ঘোষণা করাতো Ñ
‘বলিও আমার প্রেম ব্রতে ইশ্বরের ভষ্ম নয় ভূমা’ যেই আত্মিক ঐশ্বর্য তাকে পরিণত করে জীবন্ত কল্যাণে। সেই ঐশ্বর্যের জানালা দিয়ে তিনি অবলোকন করেন রুমীর কবিতা নামক মহাকাশ। আফজাল চৌধুরীর চেতনলোকে তাই রুমী ছিলেন আলোকসঞ্চারী সূর্যের ভূমিকায়। রুমীকে উপলব্ধির জন্যে চিত্তলোকে যে আধ্যাত্মিক উর্বরতা থাকার প্রয়োজন,
আফজাল চৌধুরীতে তা ছিলো এবং ছিলো বলেই তিনি শুধু রুমীর শব্দ
ও বাক্যাবলীকে অনুবাদ করেছেন তা নয় বরং অনুবাদ করতে চেয়েছেন রুমীর আত্মাকেও। যে কবি জড়বাদী জীবনকে দুঃসাহসে চ্যালেঞ্জ করেন, জরাগ্রস্থ চিন্তাকে ধুইয়ে দিতে চান অলৌকিক সরোবরে এবং পৃথিবীর উদ্দেশ্যে উচ্চারিত
হয় তার দীপ্তকণ্ঠ- হে পৃথিবী নিরাময় হও বলে, সেই আফজাল চৌধুরী যখন রুমী অনুবাদে প্রয়াসী হন তখন সে অনুবাদ আমাদের জন্য হয়ে উঠে দারুণ এক সুসমাচার।
আফজাল চৌধুরীর নিত্যপাঠ্য ছিলেন রুমী, হালী, ইকবাল, আলী শরিয়তী প্রমুখ। আলী শরিয়তীর অসাধারণ
কিছু অনুবাদ তার কলম থেকে আমরা পেয়েছি। খোশহাল খান খটকেরও
ভক্ত ছিলেন তিনি। তাকেও নিবেদন করে লিখেছেন কবিতা। কিন্তু রুমীতে আফজাল যেভাবে মজ্জমান ছিলেন তা এক কথায় অতুলনীয়। তার অনূদিত ‘আফজাল চৌধুরীর কবিতা’ বইটির পান্ডুলিপি তিনি তৈরী করে যান জীবদ্দশায়। কিন্তু বইটির প্রকাশনা সম্পন্ন হয় কবির ইন্তেকালের পরে, ২০১৩ সালের একুশে বইমেলায়। বইটির প্রকাশক গিয়াস
উদ্দীন খসরু, ঝিঙেফুল, ৩৪ নর্থব্র“ক হল রোড, বাংলাবাজার,
ঢাকা। চমৎকার গেটাপ-মেকাপে
সজ্জিত বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন খসরু। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬৪, যাতে রয়েছে রুমীর জীবন
ও কবিতা বিষয়ক চল্লিশ পৃষ্ঠা দীর্ঘ আফজাল চৌধুরী লিখিত ভূমিকা। চমৎকার কাব্যিক গদ্যে উপন্যাসিয় আবহে আফজাল রচনা করেন ভূমিকাটি। তার ভূমিকার শুরুতেই সাাৎ হয় সুন্দর একটি পরিচ্ছন্ন সকালের সাথে। তাওরুস পর্বত থেকে লাফ দিয়ে উঠা তরুণ সূর্য ঝলমল করছে চারদিকে, সারাটি শহর হাসছে, আপেল ও মেপল
গাছের পাতা ছুয়ে গলে পড়ছে বেশ কয়দিনের জমানো ধুলোর আস্তর। এই রকম দৃশ্যের সমারোহে পাঠক শোনতে পাবেন সরাইখানার মালিকদের বিনয়ের সম্ভাষণ,
দুলকিতালে ছুটে চলা খন্ড খন্ড ঘোড়ার অনন্দধ্বণি, আর ভূমধ্য সাগরের ঝিরঝিরে বাতাসে কম্পিত সুরম্য শহরের জানালার
পর্দার আওয়াজ। আশপাশে দেখা যাবে ইস্পাহানী, বলখী, আরজিঞ্জী, সমরকন্দী তরুণদের চেহারা। সেখানে সহসাই হাজির হলেন শামসে তাবরীজ রাহ.। তারপর মাওলানা রুমীর খানকাপানে তার ছুটে চলা, মাওলানার সাথে সাাৎ, রহস্যময় আলাপচারিতা,
রুমীর হাত থেকে বই ছিনিয়ে নিয়ে চৌবাচ্ছায় ফেলে দেয়া এবং অবশেষে
রুমীর হাতে সম্পূর্ণ অত অবস্থায় কেতাব উঠিয়ে দেয়া........
আজ থেকে প্রায় সাতশ বছর আগেকার এ ঘটনাকে আফজাল চৌধুরীর যাদুকরি বর্ণনাভঙ্গি যেনো
আজকের ঘটনা হিসেবে জীবন্ত করে তুলেছে। পাঠক রুদ্ধশ্বাসে দৃশ্যের
পর দৃশ্য অবলোকন করেন, কখনো আধ্যাত্মিকতার
রহস্য বুঝিয়ে দেয়ার প্রয়োজনে তিনি হাত ধরে পাঠককে নিয়ে যান নবীয়ে কারীম সা. এর মুজেযার
দিকে। কখনো নিয়ে যান হযরত মুসা আ. এর সামুদ্রিক সফরের দিকে। যে সফরে তিনি খুঁজে পাবেন খিযির আ. কে এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের রহস্যের পর্দা উন্মোচিত
হতে থাকবে একের পর এক। এখানে আফজাল চৌধুরী শুধু ঘটনার বর্ণনাদাতা
নন, বরং ঘটনার অন্তরালের তাৎপর্যকেও তুলে এনে রুমীর আধ্যাত্মিকতা,
এবং শামসে তাবরীজের সাথে তার রহস্যময় সম্পর্কের আদিগন্ত ফুটিয়ে
তুলেছেন। জালাল উদ্দীন রুমীর পিতা একদিন বাহা উদ্দীন ওয়ালীদ, তখনকার কুনিয়া প্রদেশ, রুমীর জ্ঞানচর্চা, রাজনৈতিক অস্থিরতা
এবং সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা পরিচ্ছন্ন ছবির মতো চোখের সামনে হাজির হয়। শামসে তাবরীজের সাথে
তার প্রথম, দ্বিতীয় ও শেষ সাাতের ভিতরে প্রবেশ করে তিনি
রুমীর মনস্তত্ত এবং রূহানী মার্গের মানচিত্রে সফর করতে চেয়েছেন। কিছু মানুষের শত্র“তা কিভাবে শামসে তাবরীজের জন্য কুনিয়াকে বিপজ্জনক করে তুললো,
কিভাবে নিখোজ হলেন তিনি, বিরহকাতর রুমী তার সন্ধানে কিভাবে ব্যাকূল হয়ে উঠলেন, আফজাল চৌধুরী দিয়েছেন তার প্রাণময় বিবরণ। রুমীর জীবনসঙ্গিনী খিরাহ খাতুন তার শিষ্য হুসাম উদ্দীন, সালাহ উদ্দীন এবং পুত্র সুলতান ওয়ালিদ এর বিবরণ দিয়েছেন অনুপুঙ্খ। শামসের বিরহের আগে রুমী কবিতা লিখতেন না, কিন্তু বিরহ কিভাবে তার কবি চিত্তকে জাগিয়ে তুললো, কিভাবে সমুদ্রতরঙ্গের অবিশ্রান্ত শব্দঝঙ্কার একে একে উত্থিত হয়ে নতুন ছন্দ বাণী
ও সুরের ভূগোল রচনা করলো, তার কাহিনী আফজাল শুনিয়েছেন
বাশঁরীর কাহিনীর মতো। আফজাল চৌধুরীর এই ভূমিকার ভিতর থেকে মধুর
রবাব বাজিয়ে একটি মরমী আত্মা রুমীর যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে নিজের আধ্যাত্মিক স্বপ্নতরঙ্গে
যেনো দুলে উঠছে। সেই তরঙ্গ সামার মাহফিলে, তাহাজ্জুদের আস্বাদে, মোরাকাবার সৌরভে যেনো রুমীর আত্মার সাহচর্যের জন্য রোদন করছে। এই রোদনের আড়ালে সে জানিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম কাব্য, মসবীয়ে রুমীর জন্মকাহিনী। রুমী বলছেন আর সালাহ উদ্দীন জারঘব লিখছেন,
রুমী বলছেন আর হুসাম উদ্দীন লিখছেন। এভাবেই লিখিত হলো পচিশ হাজার ধ্যানমগ্ন গজল, যা সংকলিত হলো দেওয়ানে শামসে তাবরীজ নামে। লিখা হলো পচিশ হাজার রুবাই, যা হয়ে উঠলো জগতনন্দিত
মসনবীয়ে রুমীর প্রাণ। তবে আফজাল চৌধুরী এ ভূমিকায় শিশুদের সম্বোধন
করেছেন কোনো কোনো জায়গায়। মনে হয়েছে শিশুদের
কাছে রুমীকে উপস্থাপনার আকাঙ্খা থেকে স্বতন্ত্রভাবে একে বই হিসেবে প্রকাশ করবেন এমনটি আফজালের ইচ্ছা
ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার অনূদিত রুমীর কবিতার সাথে প্রাসঙ্গিক
হিসেবে তা বইটির ভূমিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়। এমনটি না হলে কয়েকটি
মাত্র কবিতা বইয়ের আকার পেতো না। কারণ এখানে মাত্র পনেরটি
কবিতা অনুবাদ করে তিনি গ্রন্থভূক্ত করেছেন এবং প্রতিটি কবিতাই ীণকলেবরের । স্বল্পসংখ্যক কবিতা হলেও তা শিল্পগুণে পরিপুষ্ট এবং বহুবর্ণিল বৈচিত্রে বিশিষ্ট। অনুবাদে আফজালীয় ভঙ্গিমা সোচ্চার। এবং কোথাও কোথাও মূল
কবিতার স্বাদকে স্পর্শ করার আকাঙ্খায় উদ্বেলিত। কখনো মনে হয়েছে এতো অনুবাদ নয়, মৌলিক নির্মাণ। যেমন- রুমীর কবিতাযাত্রার প্রথম রজনীতে রচিত কবিতাটি পাঠ করা যাক। আফজাল অনুবাদ করেছেনÑ
সুখের হল সেই সে সময় রঙমহলে ছিলাম যখন তুমি-আর এই-আমি
দুটি কায়া, দুটি ছায়া,
কিন্তু উভয় একই সত্তা, তুমি-আর এই-আমি
কুঞ্জবনের মঞ্জু সুরে পাখির গানে জাগবে যেদিন অমরতার ধ্বনি
সেই সময়ে আমরা দ্জুন মিলবো এসে সেই বাগিচায়
তুমি-আর এই-আমি
আসমানের ওই তারকারা
চেয়ে থাকবে তোমার এবং আমার পানে যখন
স্নিগ্ধ সে চাঁদ দেখিয়ে দেব তাদের যে গো,
সেই দ্যুলোকে তুমি আর এই আমি
তুমি আমি পৃথক নই তো অভিন্ন ও একাত্ম যে আনন্দময়তায়
অর্থবিহীন কুজন করে লুটছি কত স্ফুর্তি দেখ তুমি আর এই আমি
বেহেশতের ওই রাঙা বরণ পাখিগুলো
ঈর্ষাতেই মর্মে মরে দেখে, তোমায় আমায়
কী যে সুখের হাসিতেই ঢলে পড়ছি সেই বাগানে তুমি আর এই আমি
সবচেয়ে কি বিস্ময়কর এই নয় যে,
তুমি আমি পাশাপাশি বসেছি এইখানে
কিন্তু তুমি ইরাকে আর আমি খোরাশানে, ওগো তুমি আর এই আমি!
আফজাল চৌধুরীর অনুবাদের সৌকর্য তার কবি প্রতিভার বিশেষত্বকে
মনে করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেনÑ ‘অনুবাদ কাশ্মিরী শালের উল্টা পীঠের মতো।’ এর প্রতিফলন ঘটেছিল তার অনূদিত আপন কাব্য গীতাঞ্জলীর ইংরেজী
তর্জমায়। আশ্চর্য প্রাণাবেগে উদ্দীপিত সেই অনুবাদ তাকে দিয়েছিলো বিস্ময়কর
প্রসার। হাফিজের কবিতার অনুবাদে কাজী নজরুল ইসলাম সেই সিদ্ধি অর্জন করেন। ওমর খৈয়ামের নজরুলকৃত অনুবাদ বাংলা অনুবাদ কবিতায় শীর্ষাসন অধিকার করেছিলো। আফজাল চৌধুরীর অনুবাদ এর সমগোত্রীয় । তবে তিনি সরাসরি ফার্সী
থেকে নয়, বরং নিকলসন, এ জে আরবেরি প্রমূখের ইংরেজী অনুবাদ থেকে রুমীকে আত্মস্থ করেছেন এবং অনুবাদ করেছেন। ফলে তা হয়ে উঠেছে অনুবাদের অনুবাদ। কিন্তু তার কবিকৃতি
সেই জায়গায় মূলীভূত সৌন্দর্য ও তত্তকে হরণ করে নিজস্ব নির্মাণের গরিমায় বিকশিত হয়েছে। ফলে আফজাল চৌধুরীর অনুবাদ রুমীর কবিতার অন্য অনুবাদকদের থেকে ভিন্নতর হয়ে উঠেছে। উদাহরণ দেয়া যায় রুমীর বিখ্যাত বাঁশরীর কাহিনী থেকে। প্রবাদ প্রতীম এই কবিতা শুরু হয়েছে এভাবেÑ ‘বিশনো আয় নায় চুঁ হেকায়েত মী কুনাদ
ওয জুদাঈ হা শিকায়ত মী কুনাদ
কায নায়েস্তাঁ তা মারা বুবরীদা আন্দ
আয নফীরম মারদ ও যন নালীদা আন্দ
সীনা খাহাম শরহে শরহা আয ফেরাক
তা বগোয়ম শারহে দরদে ইশতিয়াক’
পংক্তিগুলোর অনুবাদ ড. মুহাম্মদ এনামুল হক করেছেন এভাবেÑ
‘শুনলো সজনি! একি সে কাহিনী শুনায় বাঁশের বাঁশী
ফরিয়াদে তার ফাটিয়া পড়িছে বিরহ বেদনরাশি।
কাদিয়া বেড়াই ঝাড় হতে মোয় যেদিন আনিল কাড়ি
আমার বিধুর সুর মুরছনে মুরছায় নরনারী।
আমার এ বুক ছিদ্রিত হোক বিচ্ছেদের বেদনায়
সে বেদনা বিলাইতে পারি নিখিলের আঙিনায়।’
বিখ্যাত অনুবাদক মনির উদ্দীন ইউসুফের অনুবাদ Ñ
‘বাঁশীর কাছে শোনো কি কাহিনী সে বলে
তার বিরহের অভিযোগে সে ক্রন্দন করে চলে
বাশবন থেকে কাটিয়া আমাকে বিযুক্ত করার পর
আমার কান্নায় কাদিছে কেবল বিশ্বের নারী-নর
ব আমার সে বিরহে হোক ছিন্ন-উন্মোচিত
তবেই হবে প্রেম বেদনার ব্যাখ্যা প্রকাশিত।’
আফজাল চৌধুরীর অনুবাদÑ
‘যেদিন হতেই কর্তিত এই বাঁশি
আপন বংশঝাড়ের অংশ হতে
সেদিন হতেই বিরহ যাতনা রাশি
ফুৎকারে তোলে যত কিছু সুর, ওতে।
এই সে সুরের তত্ত্ব তবু এমন
সহজ, যদিও জানে না বোঝে
না কেহ
সমব্যথীরূপে বোঝে কিছু এই মন
আমার প্রতি সে তাই এত সস্নেহ।
এই সে প্রেমের শিখা যা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে
আমাকে করল তো প্রেম পিয়ালার উপচার
দেখ আশিক আহত কিভাবে, দাঁড়িয়ে
শোন শোন তবে বিধুর বাঁশির হাহাকার!’
ড. এনামুল হক অনুবাদ করেছেন মূল ফার্সীর উর্দু অনুবাদ থেকে। ফলে মূল থেকে এক ধরণের দূরত্ব থাকলেও মূলের সুর ও সারকে রোদনের মতো ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু ধ্র“পদী আবহের সাথে সাথে আধ্যাত্মিক গভীরতার অনুবাদ যেনো মূর্ত হয়ে
উঠছে না। মনির উদ্দীন ইউসুফ অনুবাদ করেছেন মূল ফার্সী থেকে। আরিক অনুবাদের প্রচেষ্টা তার স্বত:স্ফূর্ততাকে আহত করেছে। ফলে রুমীর দর্শনকে তিনি অনুবাদ করলেন কিন্তু কাব্যস্বাদ অনূদিত হলো না। সে তুলনায় আফজাল চৌধুরী স্বতন্ত্র। তিনি অনুবাদ করেছেন
ইংরেজী থেকে। ইংরেজী অনুবাদক মূল ফার্সী অনুবাদের েেত্র
আরিক ছিলেন না। তিনি অনুবাদকের স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়েছেন। আর আফজাল ইংরেজী থেকে অনুবাদের েেত্র নিজস্ব আবহ এনেছেন্ এবং অনুবাদকের স্বাধীনতাকে
আরেকবার কাজে লাগিয়েছেন। ফলে তার কণ্ঠে রুমীর
কণ্ঠ বেজে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু অনেকটা দূরবর্তি
বংশীধ্বনীর মতো। মূলের সাথে মিলালে মনে হয় না একে অনুবাদ কিন্তু
মূলের ভাবাদর্শ স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনায় ঢেউ তুলেছে। একটি কাসিক্যাল স্বাস্থ্য বিদ্যমান অনুবাদে । যেনো রুমীকে অনুবর্তন করে, তার কবিতার নিঃশ্বাসকে
গ্রাস করে, তার রক্তে জীবন লাভ করে স্বতন্ত্রভাবে দেহ
কাঠামো লাভ করেছে। আর এভাবেই সে অনুবাদ কাশ্মিরী শালের উল্টা
পীঠ হয়ে উঠেছে। আফজাল চৌধুরী অনুবাদের েেত্র সুগভীর আধ্যাত্মিক
অভিজ্ঞতা সঞ্জাত কবিতা বাছাই করেছেন। নিছক ভাবালুতা নয়,
নিছক তত্তচর্চা নয়, কিংবা বাধভাঙা
আবেগ নয়, বরং বাস্তব জীবনী সত্যের রহস্য উন্মোচক পঙক্তিমালা
উঠে এসেছে আফজালের অনুবাদে। তার অনূদিত কবিতাগুলোর
শিরোনাম হচ্ছে মানবপ্রগতি, বর্ণাঢ্য পালক,
অন্তসত্য, তন্দ্রা ও বিস্মৃতি,
ধর্মান্ধতার প্রতি নিন্দা, প্রেম ও যুক্তি, বাশির ক্রন্দন, তুমি ইরাকে ও আমি খোরাশানে, আদি রসিকের কাজ,
ইসলামে বৈরাগ্য নেই, বিশ্বাস ও কর্ম, প্রেমলীলা, কুরবানি, আযরাইল হতে পলাতম ব্যক্তি, ও মৃতের দুঃখবোধ। এই সব কবিতায় বাঙময়
শাশ্বত সুর, উচ্চারিত হার্দিক ব্যাকূলতা, উদ্ভাসিত কর্মের নির্দেশনা আমাদের জীবনের গতিধারাকে আলোর সহযাত্রী
করে দিতে চায়। এবং যে আলো আদি ও অন্তে ক্রীড়াময়,
যে আলো নিখিলের আত্মা অবয়বে ছন্দিত, যে আলো চিরকালের কণ্ঠস্বরে বন্দিত, সেই আলোর ঐকতানকে আমাদের রক্তে, মজ্জায়, চেতনায় ও অনুভবে ছড়িয়ে
দেয়। একটি সুখদ পবিত্রতা, একটি ঐন্দ্রজালিক সূর্যাভা যেনো দিগন্তে উজ্জল হয় চিত্রকল্প রচনা করে। যা কল্যাণব্রতের কবির মর্মবেদনা ও মর্মালোকের পর্দা মোচন করে আমাদের জন্য মহাকালের
ঐশ্বর্যের দরোজা খোলে দেয়। যে দরোজায় চোখ রাখলে
হেসে ওঠেন চিরপ্রেমের জালাল উদ্দীন রুমী। যার হাসির য় নেই,
লয় নেই।