মুসা আল হাফিজ
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস যে পৃথিবীর শিল্পী, তা উজ্জল চাঁদের দুধে বিধৌত। এই পৃথিবী একান্তই তার নির্মাণ। বিচিত্র সব দৃশ্য আর
পরিবেশ, রহস্যময় সব অলিগলি তার শিল্পের বিবৃতিতে ভরে
আছে। মার্কেসের নির্মাণবিশ্ব একান্ত তারই, যার সাথে মিল নেই কোনো অতীত নির্মাণের। সিরিয়াস শিল্পের শিখরে
পা রেখেছিলেন তিনি, আবার জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন আকাশছোঁয়া।
তিনি বিশ্বসাহিত্যকে যে জায়গায় পেয়েছিলেন, যে অবয়বে পেয়েছিলেন আপন বীভা দিয়ে সেই জায়গা থেকে অন্য এক বিশালতায় তাকে স্থাপন করলেন, অন্য এক অবয়বে তাকে সজ্জিত করলেন। মার্কেসের শ্রেষ্ঠত্ব পৃথিবীজোড়া। এই শ্রেষ্ঠত্ব এ কারণে নয় যে, দুনিয়ার সেরা রাষ্ট্রনায়কেরা মার্কস এর ঘনিষ্ট ছিলেন, তিনি মনিকা লিওনস্কির কেলেঙ্কারিতে প নেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিনটনের, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সাথে তার বন্ধুত্ব ছিলো প্রবাদপ্রতীম, ফ্রাঁসোয়া মিতের্য আবদ্ধ ছিলেন মার্কেসের প্রগাঢ় বন্ধুত্বে, ল্যাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে তার দ্রোহী উচ্চারণ, সাংবাদিকতায় কিংবদন্তিতুল্য সচলতা কিংবা ১৯৮২ সালে ৫৫ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। অথবা বৈচিত্রময় জীবনযাপন, অবিশ্বাস্য খ্যাতি, উত্যুঙ্গ জনপ্রিয়তা কূটনৈতিক তৎপরতা, চলচ্চিত্রে উজ্জল কর্মকান্ড এমনকি প্রত্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ, এসব কিছুই মার্কেস এর শ্রেষ্ঠত্বের মূলে নয়। তার প্রতিভা সূর্যের সামনে এসব বিষয় বিন্দু বিন্দু আলোর কণা হয়ে আছে মাত্র । বিশ্বসাহিত্যে মার্কেস এর অনন্যতা ভিন্নমাত্রিক ঔজ্জল্য পেয়েছে মানবজীবনের শীলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে তার ধ্বণির বিশিষ্টতার কারণে। তার এই বিশিষ্টতার তাৎপর্য কোথায়? সেই তাৎপর্য আবেগ নিয়ন্ত্রিত অথচ ঝর্ণার মতো গতিময় স্রোতের কলতানে, যে কলতান তার সাহিত্যের পাতায় পাতায় মন্দ্রিত। এক স্বচ্ছ, শান্ত, স্থিরতার উদ্যানে বসে মার্কেস চিরকালের বীণায় সুরারোপ করেন। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে একই সাথে কাসিক্যাল ও অতি পরিচিত এক সুধা। এক দ্যুাতি অধিকার করে দিগন্তকে, যেখানে আছে বর্ণালি পাথরের চমক, আছে মহাকালিক গীতিময়তা, যেনো হঠাৎ করে চারদিকে উৎসুক্য ছড়িয়ে কলমের শক্তিতে ডানা মেলছে এক রহস্য, যার সৌন্দর্যে আকাশও শিহরিত। সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে সে ধারণ করছে জীবনের ভাষ্য, নিপীড়িত পৃথিবীর আত্মার আহাজারি এবং বলতে গেলে বৃহত্তর মানববিশ্বের অপরিমেয় শ্বাস-প্রশ্বাস। যখন তার অভ্যুদয় হলো, মননশীল মানুষ সেই শিহরণে চমকে উঠলো। কারণ ল্যাতিন আমেরিকায় এমন করে কেউ উদয়ের গান গায়নি। শুধু ল্যাতিন আমেরিকা কেনো, স্পেনীয় সাহিত্য এমন করে শুনেনি জীবনের সুর। ইংরেজী, ফরাসী, জর্মানী কিংবা অন্য কোনো সাহিত্যে এভাবে জীবনের রহস্যকে কেউ দলিত মথিত করেনি। অভ্যুদয়ের পর তার প্রকাশিত দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ ‘সিয়েন আনিয়োস দে সোলেদাদ’ বা ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ বইটি প্রকাশের পরপরই এ যাবৎকালের সবচে পঠিত লেখকে পরিণত হলেন মার্কেস। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত বইটি মার্কেসকে দুনিয়ার অন্যতম কথাশিল্পী হিসেবে শুধু প্রতিষ্ঠিত করলো না, বরং অনন্যতার শিরোপা পরিয়ে দিলো। সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হলো জাদুবাস্তবতা। গোটা ল্যাতিন আমেরিকার কথা সাহিত্যের ধারাকে পাল্টে দিয়ে বইটি হাজির করলো এমন এক ধারা, যা অচিরেই বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রকাশধারায় পরিণত হলো।এক অস্পষ্ট ধোঁয়াশা, এক অনচ্ছ গিলাফ, যা ঢেকে আছে বাস্তবতাকে, তার আড়াল থেকে বাস্তবতার অন্তরকে অনুবাদ করে দেখালেন মার্কেস, যে অনুবাদে যুদ্ধের উত্তাপ আছে, প্রেমের মুগ্ধতা আছে, উপনিবেশিক হানাদারীর চরিত্র লুকিয়ে আছে, সর্বোপরি জন্মস্বাধীন মানুষের বয়ে আনা ইতিহাসের সফল উৎক্রান্তি আছে। একইসাথে আছে জীবনমথিত লোকগাঁথা, কল্পকথা, ভৌতিকতা, অতিবাস্তবতা, রহস্যময়তা, স্বপ্ন, বিভ্রম, নেশাধর্মী মনোপাঠ, চিত্রময় বাস্তবতা, একেবারে জীবন্ত হয়ে, যেভাবে জীবন্ত স্বপ্নবান মানুষ।
তিনি বিশ্বসাহিত্যকে যে জায়গায় পেয়েছিলেন, যে অবয়বে পেয়েছিলেন আপন বীভা দিয়ে সেই জায়গা থেকে অন্য এক বিশালতায় তাকে স্থাপন করলেন, অন্য এক অবয়বে তাকে সজ্জিত করলেন। মার্কেসের শ্রেষ্ঠত্ব পৃথিবীজোড়া। এই শ্রেষ্ঠত্ব এ কারণে নয় যে, দুনিয়ার সেরা রাষ্ট্রনায়কেরা মার্কস এর ঘনিষ্ট ছিলেন, তিনি মনিকা লিওনস্কির কেলেঙ্কারিতে প নেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিনটনের, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সাথে তার বন্ধুত্ব ছিলো প্রবাদপ্রতীম, ফ্রাঁসোয়া মিতের্য আবদ্ধ ছিলেন মার্কেসের প্রগাঢ় বন্ধুত্বে, ল্যাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে তার দ্রোহী উচ্চারণ, সাংবাদিকতায় কিংবদন্তিতুল্য সচলতা কিংবা ১৯৮২ সালে ৫৫ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। অথবা বৈচিত্রময় জীবনযাপন, অবিশ্বাস্য খ্যাতি, উত্যুঙ্গ জনপ্রিয়তা কূটনৈতিক তৎপরতা, চলচ্চিত্রে উজ্জল কর্মকান্ড এমনকি প্রত্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ, এসব কিছুই মার্কেস এর শ্রেষ্ঠত্বের মূলে নয়। তার প্রতিভা সূর্যের সামনে এসব বিষয় বিন্দু বিন্দু আলোর কণা হয়ে আছে মাত্র । বিশ্বসাহিত্যে মার্কেস এর অনন্যতা ভিন্নমাত্রিক ঔজ্জল্য পেয়েছে মানবজীবনের শীলিত কণ্ঠস্বর হিসেবে তার ধ্বণির বিশিষ্টতার কারণে। তার এই বিশিষ্টতার তাৎপর্য কোথায়? সেই তাৎপর্য আবেগ নিয়ন্ত্রিত অথচ ঝর্ণার মতো গতিময় স্রোতের কলতানে, যে কলতান তার সাহিত্যের পাতায় পাতায় মন্দ্রিত। এক স্বচ্ছ, শান্ত, স্থিরতার উদ্যানে বসে মার্কেস চিরকালের বীণায় সুরারোপ করেন। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে একই সাথে কাসিক্যাল ও অতি পরিচিত এক সুধা। এক দ্যুাতি অধিকার করে দিগন্তকে, যেখানে আছে বর্ণালি পাথরের চমক, আছে মহাকালিক গীতিময়তা, যেনো হঠাৎ করে চারদিকে উৎসুক্য ছড়িয়ে কলমের শক্তিতে ডানা মেলছে এক রহস্য, যার সৌন্দর্যে আকাশও শিহরিত। সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে সে ধারণ করছে জীবনের ভাষ্য, নিপীড়িত পৃথিবীর আত্মার আহাজারি এবং বলতে গেলে বৃহত্তর মানববিশ্বের অপরিমেয় শ্বাস-প্রশ্বাস। যখন তার অভ্যুদয় হলো, মননশীল মানুষ সেই শিহরণে চমকে উঠলো। কারণ ল্যাতিন আমেরিকায় এমন করে কেউ উদয়ের গান গায়নি। শুধু ল্যাতিন আমেরিকা কেনো, স্পেনীয় সাহিত্য এমন করে শুনেনি জীবনের সুর। ইংরেজী, ফরাসী, জর্মানী কিংবা অন্য কোনো সাহিত্যে এভাবে জীবনের রহস্যকে কেউ দলিত মথিত করেনি। অভ্যুদয়ের পর তার প্রকাশিত দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ ‘সিয়েন আনিয়োস দে সোলেদাদ’ বা ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ বইটি প্রকাশের পরপরই এ যাবৎকালের সবচে পঠিত লেখকে পরিণত হলেন মার্কেস। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত বইটি মার্কেসকে দুনিয়ার অন্যতম কথাশিল্পী হিসেবে শুধু প্রতিষ্ঠিত করলো না, বরং অনন্যতার শিরোপা পরিয়ে দিলো। সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হলো জাদুবাস্তবতা। গোটা ল্যাতিন আমেরিকার কথা সাহিত্যের ধারাকে পাল্টে দিয়ে বইটি হাজির করলো এমন এক ধারা, যা অচিরেই বিশ্বসাহিত্যে অন্যতম প্রকাশধারায় পরিণত হলো।এক অস্পষ্ট ধোঁয়াশা, এক অনচ্ছ গিলাফ, যা ঢেকে আছে বাস্তবতাকে, তার আড়াল থেকে বাস্তবতার অন্তরকে অনুবাদ করে দেখালেন মার্কেস, যে অনুবাদে যুদ্ধের উত্তাপ আছে, প্রেমের মুগ্ধতা আছে, উপনিবেশিক হানাদারীর চরিত্র লুকিয়ে আছে, সর্বোপরি জন্মস্বাধীন মানুষের বয়ে আনা ইতিহাসের সফল উৎক্রান্তি আছে। একইসাথে আছে জীবনমথিত লোকগাঁথা, কল্পকথা, ভৌতিকতা, অতিবাস্তবতা, রহস্যময়তা, স্বপ্ন, বিভ্রম, নেশাধর্মী মনোপাঠ, চিত্রময় বাস্তবতা, একেবারে জীবন্ত হয়ে, যেভাবে জীবন্ত স্বপ্নবান মানুষ।
ম্যাজিক রিয়েলিজম বা জাদুবাস্ততা অবশ্য ল্যাতিন আমেরিকার সাহিত্যে
মার্কেসের দান নয়। তার চল আরো আগ থেকে। কিউবান কথাশিল্পী আলেহো কার্পেনতিয়ের ল্যাতিন আমেরিকান সাহিত্যের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট
বর্ণনা করতে গিয়ে জাদুবাস্তবতার উল্লেখ করেন প্রথম। আসলে এ মাধ্যমটি ল্যাতিন আমেরিকার অন্তর্বস্তু । এ কারণে এ মহাদেশের অধিকাংশ বরেণ্য কলমে
জাদুবাস্তবতা আপন উপস্থিতির স্বার রেখেছে। কিন্তু গাব্রিয়েল গার্সিয়া
মার্কেস তাকে শিল্পপ্রকরণ হিসেবে এমনই প্রতিষ্ঠা দিলেন, যার কোনো নজির নেই। স্বভাবতই তিনি অভিহিত হয়েছেন জাদুবাস্তবতার
গুরু হিসেবে। তাকে অনুসরণ করে বিশ্বজুড়ে শত শত লেখক এই
মাধ্যমে নিজেকে মোচন করতে চাইলেন। দ্রুতই তা হয়ে উঠলো
জনপ্রিয় এবং অনন্য সাধারণ এক শিল্পের স্কুল। মার্কেসের সাহিত্য
ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বব্যাপী। ঢেউ লাগলো প্রবলভাবে
বাংলা ভাষায়ও। আধুনিক লেখকদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই বাংলাভাষী
অঞ্চলে সবচে বেশি পঠিত, পরিচিত ও আলোচিত। দুনিয়ার বহু বাছা লেখকের সাহিত্য সম্ভারের েেত্র আমাদের অনুবাদ ভান্ডার দরিদ্র
হলেও মার্কেসের প্রধান সবগুলো বই বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পশ্চিম বঙ্গের মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় মার্কেসের একাধিক বই বাংলা অনুবাদ করেন। বিশালাকৃতির ‘সিয়েন আনিয়োস দে সোলেদাদ’ এর অনুবাদ করেন জিএইচ হাবীব ‘শতবর্ষের নির্জনতা’ নামে। ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’ এর অনুবাদ করেন কবির চৌধুরী ‘প্রেম ও কলেরা’ নামে। ‘দ্য জেনারেল ইন হিজ
ল্যাবরিন্থ’ এর অনুবাদ করেন মোর্শেদুর রহমান ‘গোলক ধাধায় সেনাপতি’ নামে। ‘মেমোরিজ অফ মাই মেলানকোলি হোরস’ এর অনুবাদ করেন অদিতি ফাল্গুনী, ‘আমার দুঃখভারাক্রান্ত বেশ্যাদের কাহিনী’ নামে। মার্কেসের আরো গ্রন্থের
অনুবাদ করেছেন বেলাল চৌধুরী, (মৃত্যুর কাড়ানাকাড়া)
সুরেশ রঞ্জন বসাক, ( একটি অপহরণ সংবাদ) আলী আহমদ, ( বারো অভিযাত্রীর কাহিনী) প্রমুখ। আমাদের অনুবাদ সাহিত্যের
প্রথম শ্রেণীর এইসব অনুবাদশিল্পী বাঙালী পাঠকদের জন্য মার্কেস বিষয়ক ধনাঢ্য সংসার তৈরী
করেছেন।
এটা শুধু বাংলা ভাষার েেত্র নয় বরং পৃথিবীর এমন কোনো ভাষা নেই, যে ভাষায় মার্কেস অনূদিত হননি। তার ‘সিয়েন আনিয়োস দ্য সুলেদাদ’ ইংরেজী অনুবাদ সহ এ পর্যন্ত বিক্রি হয় প্রায় আড়াই কোটি কপি। বইটি প্রকাশের প্রথম সপ্তাহে বিক্রি হয় আট হাজার কপি। তিন বছরে বিক্রি হয় পাঁচ লাখ কপি। প্রতি মাসে বের হতে
থাকে এর একাধিক সংস্করণ। ১৯৭০ সালে গ্রেগরি
রাবাসার হাত দিয়ে যখন বইটির ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হলো, মার্কেসের দিকে চতুর্দিক থেকে আসতে থাকলো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, সম্মাননা ও খ্যাতির স্রোত। গোটা বিশ্ব সর্বকালের সেরা উপন্যাস বা মাস্টার পিস হিসেবে বরণ করলো বইটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানজনক ডিলিট উপাধি দিলো, আর মারিও ভার্গাস ইয়োসা মার্কেসের জীবনের প্রথম তেতাল্লিশ বছর
নিয়ে লিখে ফেললেন বিশ্ব কাঁপানো আরেকটি বই।
অথচ মার্কেসের প্রথম জীবন ছিলো কাদা আর কাটায় ভরা। ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ জন্ম হয় তার। কলম্বিয়ার আরাকাটাকা
নামের এক অখ্যাত গ্রামে। শৈশবেই মা-বাবা তাকে
রেখে আসেন নানা নানীর কাছে। নানা ছিলেন কর্ণেল
আর নানী ছিলেন ভয়ানক কুসংস্কারাচ্ছন্ন, জাদুতে বিশ্বাসী,
ভূত-প্রেত আর দেও-দানোতে আস্থাবান কিন্তু অসম্ভব গল্প বলিয়ে
রমণী। নানা চাইলেন মার্কেসকে নিজের মতো করে গড়বেন । কিন্তু নানীর কাছে দেও-দানো আর জাদুÑ রহস্যের প্রগাঢ়
গল্প শুনে শুনে তার মনোলোক তৈরী হলো। নানীই হয়ে উঠলেন তার
গুরু। কী কৈশোরে, কী পরবর্তি সাহিত্য
জীবনে। মার্কেস এর ভাষায়Ñ “নির্বিকার মুখে,
নানী আমাকে সারাণ আশ্চর্য ও আজগুবি সব গল্প শোনাতেন,
অথচ মাথার চুল খাড়া হতো না, মনে হতো যা বর্ণনা করছেন তা যেন তিনি এইমাত্র দেখতে পেয়েছেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম তার ওই অবিচল নির্বিকার ভঙ্গি আর তার চিত্রকল্পগুলোর ঐশ্চর্যই
তার গল্পগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতো। আমি ‘একশো বছরের নির্জনতা’ লিখেছিলাম আমার নানীর গল্প বলার কৌশল ব্যবহার করেই।” নানা এক সময় দুনিয়া ছাড়লেন, মার্কেসকে পাঠিয়ে দেয়া
হলো বর্ডিং স্কুলে। সেখানে একাকিত্বে জর্জরিত, আনন্দহীন কিন্তু দরিদ্র সহপাঠীদের সান্নিধ্যে বৈচিত্রময় একটি
অধ্যায় অতিক্রম করে বুগোটার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৪৬ সালে ভর্তি হন মার্কেস। সেখানে শুরু হলো তার কবিতামত্ততা। হিস্পানী স্বর্ণ যুগের
কবিতায় ডুবে রইলেন সারাণ। ছেড়ে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে
আইন পড়া। হাত বাড়ালেন সফোকিস, হেমিংওয়ে, জয়েস উলফ, ফকনার, কাফকার সাহিত্য রাজ্যে। তাদের প্রভাবকে গ্রহণ করে নিজস্ব পথে নিজেকে নির্মাণ করতে শুরু করলেন। বোহেমিয়ান জীবন মার্কেসকে দিলো নতুন নিমজ্জন। বিশ্বকোষ বিক্রির চাকরী, এল এসপেকতাদো পত্রিকায়
সাংবাদিকতা, প্রেমিকা মেরসেদেস বারখা পার্দোর সঙ্গে বিয়ে,
ইউরোপে পাড়ি দেয়াÑ কিন্তু সর্বত্রই
অর্থনৈতিক দৈন্য, পেশাগত অনিশ্চয়তা আর রোমাঞ্চকর ঘটনার ঘনঘটা
ঘিরে রেখেছিলো তার দিনরাত। এক সময় তাকে দেখা যাবে
ভেনিজুয়েলায়, সেখান থেকে কলম্বিয়ায় সৃষ্টিমত্ত কিন্তু অভাবজর্জর
মার্কেস কখনো সিনেমার সাবটাইটেল আর চিত্রনাট্য লিখছেন, কখনো ুধার্ত রাত্রিতে হোটেলে বসে লিখছেন অসাধারণ সব ছোটগল্প। কখনো ইতালির নব্যবাস্তববাদী বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাহচর্যে চলচ্চিত্রের
প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ নিচ্ছেন, কিন্তু কোথাও সুস্থির
হচ্ছেন না, সাফল্যও ধরা দিচ্ছে না। কিওবা বিপ্লব তাকে ওঠালো কিছুটা। বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রো
সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বুগোতায় স্থাপন করলেন প্রেস এজেন্সী প্রেনসা লাতিনা। সেখান থেকে ফিদেলের অনুরোধে সপরিবারে যেতে হলো নিউইয়র্কে।
১৯৬২ সালে প্রকাশিত হলো প্রথম গল্প সংকলন ‘বিগ মামাস ফ্যুনারেল’, চলচ্চিত্রের জন্য লিখলেন
দুটি চিত্রনাট্য। এতে তার প্রতিভার আলো প্রস্ফুটিত হলেও,
না বিক্রি হচ্ছিল বই, না জনপ্রিয় হচ্ছিল নাটক। বেঁচে থাকার জন্য কাজ
নিতে হলো বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আর পত্রিকা প্রকাশনায়। তারপর এলো মার্কেসের এক অভূতপূর্ব সময়। একদিন তিনি বাড়ীতে
ফিরে গেলেন এবং তার স্ত্রীকে বললেনÑ আমাকে বিরক্ত
করবে না, বিশেষ করে টাকা পয়সা নিয়ে। এই বলে তিনি তার লেখার ডেস্কে চলে গেলেন, যাকে তিনি বলেছেন মাফিয়ার গুহা। এটি মেক্সিকো সিটির
৬ কলা ডা লা লোমা-র একটি বাড়ী এবং প্রতিদিন আট থেকে দশ ঘন্টা করে পরিশ্রম করে আঠারো
মাস পর তার উপন্যাসটি লেখা শেষ করেন। তিনি জানতেন না স্ত্রী
এই সময় কী কাজ করতেন। তাকে কখনোই এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেননি
তিনি। মার্কেস এর কথায় ‘কিন্তু আমরা
এমনভাবে বাস করতাম যেন আমাদের অনেক টাকা আছে। আমি যেদিন লেখাটি শেষ করেছিলাম, আমার স্ত্রী
আমাকে বলল, আসলেই কি তুমি লেখাটা শেষ করতে পেরেছো?
আমরা এ পর্যন্ত বারো হাজার ডলার ধার করেছি। সে তার বন্ধুদের কাছ থেকে দেড় বছর ধরে ধার নিয়ে এসেছে। স্ত্রী যেহেতু একজন ভালো ক্রেতা ছিলো, মাংসঅলা তাকে
অফার করেছিলো যে তিনি প্রতিদিন টাকা না দিয়ে মাস শেষেও দিতে পারেন। স্ত্রী প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু যখন হাতটান
শুরু হলো, সে মাসচুক্তিতে রাজি হয়ে গেল। এ দিকে প্রতি মাসের বাসা ভাড়া দেয়া যখন অসম্ভব হয়ে উঠলো, সে বাড়ীঅলাকে জানালো যে, ছয় মাস পর্যন্ত কোনো ভাড়া দিতে পারবে না। বাড়ীঅলা বললো, ঠিক আছে। ফলে এসব নিয়ে তাদের কোনো বেগ পেতে হয়নি । আমার স্ত্রী আসলে অসাধারণ’। এভাবেই লেখা হলো তেরশ পৃষ্ঠার পান্ডুলিপি। স্ত্রী এবং বন্ধুদের শুনাচ্ছিলেন পাঠ করে এবং পাঠের একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় মার্কেস
পেয়ে গেলেন বইটির নামÑ ‘সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ’ বা শতবর্ষের নির্জনতা। প্রকাশকের কাছে পাঠাবার ডাক মাশুলও তখন ছিলো না মার্কেসের কাছে। স্ত্রীর চুল শুকোবার যন্ত্র আর বৈদ্যুতি স্টোভ বিক্রি করে যোগাড় করা হলো সেই টাকা। ১৯৬৭ এর জুন মাসে আর্হেন্তিনার বুয়েনস আইরেসের সোদামেরিকানা প্রকাশনা সংস্থা থেকে
প্রকাশিত হলো বইটি। তারপর মার্কেসের বিশ্বসাহিত্যের মহানায়কের
মঞ্চ দখল সম্পন্ন হলো। ঘুরে গেলো দুনিয়ার কথাসাহিত্যের গতি। অপরিসীম কল্পনাশক্তি ও বহুমাত্রিক ভেলকি দিয়ে মার্কেস এক অলৌকিকের জন্ম দিলেন,
যা মূলত ঋণি তার নানীর কাছে। শৈশবে বালিশে মাথা রাখা মার্কেস নানীর মুখে যে জগতের বিবৃতি শুনেছিলেন,
যেখানে অশরীরিরা ঘটনা ঘটার আগেই জানিয়ে দেয় এই সব ঘটতে যাচ্ছে। মার্কেসের মনোলোকে অঙ্কিত এই পৃথিবী বোর্হেসের কাছ থেকে কল্পনা ধার করে,
কাফকার কাছ থেকে বর্ণাঢ্যতা ও অবিরলতা আস্তস্থ করে, উইলিয়াম ফকনারের কাছ থেকে জীবনের জঙ্গমতাকে গ্রাস করে একেবারে
নিজের নিয়মে আপন সাম্রাজ্য সাজিয়ে নিলো। এই অলৌকিক সাম্রাজ্যে
অনিদ্রা ও স্মৃতি হারানোর প্লেগ চারদিকে বিচরণ করে। অনিদ্রার প্রহেলিকায় নিপতিত পুরো এক জাতি ভুলে যায় গরুকে গরু হিসেবে চিনতে। থোকা থোকা জাদুর আঙ্গুর মৃত্যুকে লুকিয়ে রাখে নিজের ভিতর। বৃষ্টি হয় রাতভর হলুদ ফুলের। বৃষ্টি হয় মাসের পর
মাস। বছরের পর বছর। একাধারে চার বছর এগার
মাস দুদিন। সেখানে জঙ্গল দেখা
যায়, যা আসলে হয়তো সমুদ্রই ছিলো। সেখানে জন্ম-মৃত্যু স্বতন্ত্র বর্ণে উজ্জল। সর্বত্র এক ভূতুড়ে অবাস্তবতা, সর্বত্র এক শিল্পভরা
নৈরাজ্য। প্রাকৃতিক বিষয়গুলো উল্টে যাচ্ছে, যুদ্ধ নিজেই রচনা করছে স্বতন্ত্র ব্যাকরণ, গৃহপালিত পশুগুলো জন্মের আগেই আপন গায়ে ধারণ করছে মালিকের নাম, এতো গরম পড়ছে চারদিকে যে, মানুষ ও পশুপাখি পাগল হয়ে গেছে। পাখিরা দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য
হয়ে আক্রমণ করছে বাসাবাড়ী। প্রাকৃতিক সত্যের সাথে
অতি প্রাকৃত বাস্তবতা মিলেমিশে এগিয়ে চলছে। রোদ আসছে, আসলে যার ভিতরে অন্ধকার। কিন্তু একেবারে পরাবাস্তব ডামাডোল নয়, একেবারে কল্পরাজ্যের
গল্প নয়, বাস্তবতা সর্বত্রই নিজের হাত-পা, চোখ-মুখ, নাক-কান, দাঁত-নোখ উপস্থাপন করছে। হ্যাঁ, দারিদ্র গোঙাচ্ছে জনপদের শোণিতে, রাস্থা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পিয়ানো বাদক, সৃষ্টিশীল একদল ফরাসী বেশ্যা, কোথাও চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুঃখকাতর কৃষক। এই পৃথিবীতে আবার দুর্নীতি মাথা তোলে দুর্বিনীত সাঁেপর মতো, এখানে লুটেরা হাত, শোষকের জিহ্বা
এবং বত্রিশটি বিপ্লবের রক্তস্নাত দিনরাত্রি। এটা এমন এক পৃথিবী,
যা পৃথিবীর আদিমতাকে, নৈসঙ্গকে, নির্জনতাকে, জাগরণকে, উদ্দমতাকে জাদুগ্রস্ত তুলি দিয়ে সর্বত্র সাজিয়ে
রাখে। এ এক উপন্যাস যা গোটা এক মহাদেশের মনের অন্ধকারকে, চেতনার অন্ত:সারকে, হৃদয়বৃত্তির
অলিগলিকে, উন্মাদ ধারাভাষ্যে অবিরত উচ্চারণ করেছে। কিন্তু এ আসলে সুন্দর একটি পরিবারে চটকদার গল্প, এক পরিবারের কোয়ায় সমুদ্র সমান মানবতার সকল দিক ভেসে উঠতে চায়। আপনি একে মাকোন্দুর ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাণ,
ক্রমবিকাশ, অবয় কিংবা হাহাকারের
হাস্যরসময় বনেদি চিত্রমালা হিসেবে অভিহিত করতে পারেন। কিন্তু পরণেই মনে হবে এতো পুরো ল্যাতিন আমেরিকার ছবি । মাকোন্দু শহরকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে যেনো পুরো মহাদেশ। লালসা আছে, আছে মমতা, ধনলিপ্সা আছে, আছে বিদ্রোহ, যৌবন আছে, আছে বার্ধক্য, যুদ্ধের কাড়ানাকাড়া কোথাও বাজছে তো শান্তির ছন্দিত সমিরণ বয়ে চলছে জানালা ছুয়ে। জীবনের বৈচিত্র, অন্তহীন মৃত্যু, আবেগময় প্রণয়, পুঁজিবাদের অমানবিকতা, স্বৈরাচারী নিপীড়ন, মুক্তির শ্লোগান
আর সত্যের অবিরত সন্ধান- এ যেনো গোটা তৃতীয় বিশ্বের প্রাণময় প্রতিবেদন।
এ হলো মার্কেসের শতবর্ষের নির্জনতার কিছু শৈলী ও প্রকৃতির ইশারা। এ শৈলী এতো সর্বগ্রাসী, এতো মাদকতাময়,
এতো বিদগ্ধ, এতো বৈচিত্রময়,
যা চিৎপ্রকর্ষের সর্বোচ্চ মার্গকে আপনার করে নিয়েছে। আবার রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোকে এতো সরল
কৌশলে বিবৃত করেছে যে, মনে হবে বর্ণনার সর্বোচ্চ
কৌশল একমাত্র এটাই। মনে হবে এর চেয়ে ভাল আর কোনো শৈলী পৃথিবী
দেখেনি কখনো। গার্সিয়ার এই অপরাজেয় পরাক্রম তার সবচে সহজবোধ্য
উপন্যাস ‘লাভ ইন দি টাইম অফ কলেরা’য় যেভাবে প্রস্ফুটিত তেমনি ‘মেমোরিজ অফ মাই মেলানকোলি
হোরস’-এ ( বাংলায় যার তর্জমা হয়েছে ‘আমার বিষন্ন বেশ্যাদের স্মৃতি’ নামে।) জীবনবোধের বিশালতা,
বৈচিত্র ও বৈদগ্ধ আশ্চর্য দ্যোতনায় সোচ্চার হয়ে উঠেছে। বইটি শুরু হয়েছে যে আশ্চর্য নিজস্বতায়, তার চমক বাংলা পাঠককেও অনুবাদের মাধ্যমে শিহরিত করে। ‘সদ্যযৌবনা কুমারী এক মেয়ের সঙ্গে উন্মত্ত ভালোবাসার রাত কাটিয়ে আমি নিজেকে আমার
নব্বইতম জন্মদিনের উপহার দিতে চেয়েছিলাম।’ এই একটিমাত্র লাইন উপন্যাসের গোটা ভিতর খুলে
দেয়। এভাবে যেকোনো গ্রন্থের যে কোনো একটি লাইন, একটি পৃষ্ঠা, একটি চরিত্র-
সবই সরবে মার্কেসের অনন্যতার বিবৃতি দিয়ে চলে। তার আত্মজীবনী ‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: অ্যা লাইফ’ যেভাবে অপ্রচলিত ও প্রথাবিরোধী জীবনের পরাক্রম দেখায়,
তেমনি তার প্রতিটি উপন্যাস।