হঠকারীতা সবখানে!



মুসা আল হাফিজ
                                                           
বিচারপতি ছিলেনতত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবার ভাগ্যও হয়েছিলোসেই সুযোগে ইসলামী চেতনাকে যথাসম্ভব ঝঁকুনি দেয়ার কুশেশ কম করেননিবিসমিল্লাহর বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছেনইসলামী আদর্শবাদী রাজনীতিকে কবরস্ত করার তোড়জোড় শরু করেছিলেনপারেননিকিন্তু তার ধর্মনিরপে বিবেক অন্তত এ শান্তনা পাবে যে, চেষ্টাটি তিনি করেছেনকাজ-কর্মের দ্বারা একজন ধর্মনিরপে নাস্তিক হিসেবে নিজেকে প্রমান করলেনতার কথা-বার্তা, লেখা-জোখা, জীবনধারা সবই ্এ পরিচয়কে শক্তিশালী করলেনপরে যখন অবসরে গেলেন পুরোপুরি, প্রগতিশীলতার আবরণে নাস্তিকতার পোষাক তখন ও তার গায়েলেখালেখির মাত্রা বেড়ে গেলোবিশ্বাসী মানুষের প্রতি অসহিষ্ণতা ও ঈমানী চেতনার বিরুদ্ধে ােভ ফুঁসফুঁস করতো তার কলামগুলোতেকিন্তু হঠাৎ!
হঠাৎ হঠাৎ করে তিনি সেজে গেলেন ইসলামী চিন্তাবীদ! কুরআন বিশেষজ্ঞ! কুরআন শরীফের তর্জমা লিখে ফেলেছেনতবে কুরআন শরীফকে তিনি কুরআন শরীফ বলতে রাজী ননএকটি বই লিখেছেন, নাম দিয়েছেন-কুরান তথ্যাকোষইসলামী জ্ঞান সন্ধানে তার সফর কাবার দিকে এগোয়না, ফলে তার জানা- শোনার উৎস হয় পেঙ্গইন কিংবা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত কোনো ঝকঝকে ইংরেজী বইসীরাত নিয়ে নাকি তার কলম বেশ এগুচ্ছেতার এসব কাজ-কাম একটি বিশেষ মহলকে খুবই আনন্দ দিয়েছেযারা ইসলামের গন্ধ পেলেই হায় হায় করে উঠেন, তারাই তাঁর লেখা-জোখা ছাপছেন, প্রচার করছেনআমরা এর নিন্দা করিনাতবে এটা জানি যে এই সব লোক ইসলামী বিষয়ে লিখতে বসে কী প্রসব করবেন, তাদের শস্যেেত ধানের চারা কয়টা আর আগাছা কয় হাজার জন্মাবে, এ নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়বেনাসমাধান মিলবে এ ধারায় তাদের পূর্বসূরীদের কীর্ত্তিকান্ড ল্য করলেইভাই গীরিশ চন্দ্র সেন মুসলমান না হয়েও কুরআন তর্জমা করেছেনযথেষ্ট বিভ্রান্তি সত্তেও তার এ প্রচেষ্টাকে আমরা বাহবা দেইতবে তার তর্জমা যেহেতু নির্ভরযোগ্য নয়, তাই ভুলগুলোকে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে নানা গ্রন্থে
ইসলাম মানেন না কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী, এমন লোকদের ইসলাম চর্চা বহু পূরনো ব্যাপারশত শত ইহুদী- খৃষ্টান, হিন্দু-বৌদ্ধ, শিক-জৈন ইসলাম চর্চা করেছেনবহু মহৎ অবদান তারা রেখেছেনবিশেষত পশ্চিমা পন্ডিতদের একটি অংশ এ কাজে জীবনপাত করেছেনতারা সীরাতসহ অন্যান্য বিষয়ে শত শত বই লিখেছেনএদের একটা অংশ ছিলো সরাসরি ক্রোসেডারকেউ কেউ ক্রসেডের উত্তরাধিকার বহনকারীক্রোসেডাররা অস্ত্র দিয়ে ইসলামকে হত্যা করতে পারেনিসেই আেেপ ও অপ্রশমিত ােভ নিয়ে এরা কলমের খোঁচায় ইসলামের প্রাণসত্তাকে খুন করার কাজে নেমেছিলেন  এদের বর্ণনা পদ্ধতি ছিলো খুবই নান্দনিক, বিশ্লেষণপদ্ধতি ছিলো খুবই চাতুর্যপূর্ণ, কাজের ছিলো খুবই যত্ম, আঘাত ছিলো খুবই সূ, কিন্তু এর প্রভাব ছিলো সর্বনাশাসম্প্রতি যে সব সেক্যূলার মুসলিম বুদ্ধিজীবি ইসলামী জ্ঞান চর্চা করতে অগ্রসর হচ্ছেন, তারা মূলত এইসব প্রাচ্যবীদের দ্বারাই অনুপ্রানিত  এদের বক্তব্যকে তারা সর্বোচ্ছ মূল্য দিতে অভ্যস্ত এবং এদের চিন্তা কপথে তারা আবর্তন করেন অনবরতপ্রাচ্যবীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আবেগের তোড়ে এই অনুকারীতার ফল যে কতো ভয়াবহ, এটা ভাবার হুশটুকুও তারা হােিরয়ে ফেলেন
এই ভয়াবহতাই প্রকাশ পেলো আবদুস সামাদের এক লেখায়ধর্ম ও মুক্তবুদ্ধি শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি দাবি করেছেন-ইসলামের নবী সা. এতোই প্রখর দৃষ্টি, উদার ও প্রতিভাবান ছিলেন যে, মাত্র বারো বছর বয়সে বুহায়রা পাদ্রীর সান্নিধ্যে ধর্মের যে গুঢ়তত্ত অনুভব করলেন, একে তিনি পরবর্তি জীবনে কী সুনিপুন সাফল্যে সুশোভিত করে তুললেন আবদুস সামাদ রাসুলে পাকের সা, প্রশংসাই তো করলেনকিন্তু এ হচ্ছে নিবোধ ও নির্জ্ঞানের বিপজ্জনক প্রশংসাঅথবা এ হচ্ছে প্রশংসাচ্ছলে ইসলামের সত্য ও হেদায়েতকে রাসুল সা. কর্তৃক উদ্ভাবিত বলে দাবি করার ধূর্ততাতবে এ ধূর্ততার জন্য আবদুস সামাদ কৃতীত্ব দাবি করতে পারবেন নাআমার মনে হচ্ছে এটা কৃতীত্ব দাবীর  জন্য তার কোনো চালাকির নয়, বরং সৎভাবেই তিনি পূর্বসূরী প্রাচ্যবীদদের বক্তব্যকে করেছেন মাত্রএর ভেতরে গরল আছে কী না, ভেবে দেখেননিআসলে স্যার ইউলিয়াম ম্যুর কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছেনইউলিয়াম ম্যুর মিথ্যা ও আজগুবি কাহিনী সমূহ জড়ো করে চরম বিদ্বেষ বিষাক্ত এক বই লিখেন- দি লাইফ অব মুহাম্মদএ বইয়ে মিথ্যা ও ভ্রান্তির মাত্রা এতো বেশি ছিলো যে, মুসলিম চিন্তাবীদ স্যার সৈয়দ আহমদ একে চ্যালেঞ্চ করে পাল্টা এক বই লিখেন- লাইফ অব মুহাম্মদ এতে ম্যুর সাহেবের প্রতিটি মিথ্যাকে উদঘাটন করা হয়সৈয়দ আহমদের জবাবে কলম উঠাবার সাধ্য আর ম্যুরের হয়নিএক যুগ পরে অনেক মিথ্যা বাদ দিয়ে লাইফ অব মুহাম্মদের দ্বিতীয় সংস্করণ তিনি প্রকাশ করেনস্বীকার করেন প্রথম সংস্করণে তথ্যগত ভ্রান্তি থাকার কথা
আবদুস সামাদ সাহেবের এসব জানার দরকার নেই তিনি দেখেছেন উইলিয়াম ম্যুর, ড্রেপার, মারগোলিয়থ প্রমূখ প্রাচ্যবীদ বুহায়রা পাদ্রীর বিষয়তাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেনএকে নবীয়ে পাক (স:) এর মূল প্রভাবক হিসেবে ব্যক্ত করেছেনতারা বুঝাতে চেয়েছেন রাসূল (সা:) ওহী হিসেবে যা প্রচার করেছেন, তা মূলত বিভিন্নভাবে অর্জিত জ্ঞান-গরিমার সমাহার
ইমাম হাকিম (রহ:) মুস্তাদরাক গ্রন্থে একে গ্রহনযোগ্য অভিহিত করলেও পরবর্তি বিশ্লেষনে এ হাদিসের কোন কোন দিককে বানোয়াট বলে উদঘাটন করেন
এ রকম একটি দুর্বল, সন্দেহজনক ঘটনা নিয়ে প্রাচ্যবাদীরা যে মাতামাতি করেছেন, তা বিস্ময়করস্যার উইলিয়াম ম্যুর তার লাইফ অব মুহাম্মদ গ্রন্থে লিখেন- সিরিয়ার বুহায়রা পাদ্রী মুহাম্মদকে (স:) একাত্ববাদের শিা দিলোমুহাম্মদের (স:) অসাধারন উপলব্ধি এই শিার মূলতত্ত্বকে নিমেষেই গ্রহন করে নিলোপরবর্তি জীবনে তিনি একাত্ত্ববাদী হয়েই থাকলেনমূর্তিপূজার বিরোদ্ধে ঘৃনার প্রচার করলেনবুহায়রার শিা কতো গভীরভাবে তাকে প্রভাবিত করেছিলো, এর প্রমান এতেই নিহিতপাদ্রী মন্টেগোমারি ওয়াট তো আরেক কাটি সরসতিনি এ ঘটনাকে অভিহিত করলেন আরবে নতুন ধর্মীয় বিপ্লবের স্মৃতিকাগার হিসেবে
প্রাচ্যবিদরা একে নানাভাবে রঙ চড়ায়, চড়াককারণ তারা এর দ্বারা প্রমাণ করতে চায় রাসূলে পাক (স:) ওহীর যে শিা প্রচার করেছেন, তা খোদার প থেকে নাজিলকৃত নয়বরং বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও শিার সমাহারকে তিনি কোরআনের মাধ্যমে ভাষারুপ দিয়ে বিন্যস্ত করে ধর্ম প্রবর্তন করেছেনঅমুসলিম প্রচারকরা এ মিথ্যা রচনা ও রটনা করেছে, তাদের ক্রোসেডীয় মতলবেকিন্তু মুসলিম নামধারী কেউ যখন এই প্রচারনার পালে হাওয়া দেন, তখন বুঝাই যায় কাইভের সন্তানেরা মুসলমানদের ভেতর থেকে নতুন মীর জাফর খুজে পেয়েছেতবে আব্দুস সামাদ যদি ভুলবশ:ত এই মিথ্যার খপ্পরে পড়েন, তবে তিনি মীর জাফর সাব্যস্থ হবেননাকিন্তু প্রশ্ন হলো ইসলাম চর্চা করবে, সীরাত নিয়ে আলোচনা করবেন, তো ইসলামী সূত্রসমূহ থেকে করুননাস্তিক্যবাদী মন নিয়ে ইসলাম চর্চা করবেন, ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মুল্লা- প্রতিক্রিয়াশীল সাব্যস্থ করে ক্রোসেডারদের ধর্মকে মুখে উঠাবেন, তাদের গরলকে উদগীরন করবেন, এ হঠকারীতা আর কতো?
বিশেষ করে বিভিন্ন দেশ সফরের মাধ্যমে তিনি প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেনএকে প্রমাণের জন্য তারা বহু মিথ্যার আশ্রয় গ্রহন করেনযেমন লুইস লামায়া লিখেন- রাসূল (সা:) সমুদ্র পথে একবার মিশর ভ্রমন করেছিলেনসমুদ্রের তরঙ্গ, জাহাজের ছুটে চলা, সামদ্রিক ঝড়ের ধেয়ে আসা ইত্যাদি স্বচে প্রত্য করেনফলে পরবর্তি জীবনে কোরআনে সমুদ্রের বিবরন ও জাহাজের যাত্রা ইত্যাদির বর্ণনায় এর প্রভাব আমরা ল্য করিকত বড় মিথ্যা, চিন্তা করুনরাসূলে কারীম (সা:) মিশরে গিয়েছিলেন এর কোন দূরতম ইঙ্গিতও কোন প্রামান্য ইতিহাসে নেইএর কোন সম্ভাবনাও তখন ছিলোনাকিন্তু প্রাচ্যবীদ লোকটি আজগুবি এক কাহিনী ফেদে নিলোভাগ্য ভালো আব্দুস সামাদ সাহেব এই মিথ্যার খপ্পরে পড়েননি
তিনি যে কাহিনীর প্যাচে পড়েছেন, সেটা অবশ্য প্রসিদ্ধ ঘটনাঘটনাটি হলো হুজুর (সা:) বারো বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্যোপল্েয দামেশ্ক সফরে যানবসরা শহরে বুহায়রা নামক এক খৃস্টান পাদ্রীর আস্তানায় উপস্থিত হলেনবুহায়রা রাসূল (সা:)-কে দেখে বললেন- ইনিই হচ্ছেন সেই নবী, যার প্রতিশ্রতি ইঞ্জিল শরিফে আছেইনি সর্বশ্রেষ্ট নবীলোকেরা  বললো- আপনি তা বুঝলেন কীভাবে? বুহাইরা বললেন- তোমরা যখন পাহাড় থেকে নামছিলে, তখন সমস্ত গাছ ও পাতর তার সম্মানে সেজদা করেছিলোঘটনাটি এখানেই শেষ
মাত্র অল্প সময়ের সাাৎহুজুর (সা:)-এর সাথে বুহায়রার কোন কথাবার্তা হয়নিকোন কিছু শিা নেয়া-দেয়ার তো প্রশ্নই উঠেনাএছাড়া এ কাহিনীর মূল ভিত্তিটাও প্রশ্নবিদ্ধপ্রথম যিনি একে বর্ণনা করেছেন, তিনি ঘটনার সময় ছিলেননাতিনি তার কাছে ঘটনাটি শুনেছেন, তাও উল্লেখ করেননিযতসূত্রে ঘটনাটি বর্ণিত, সব সূত্রই মুরসালইমাম তিরমিযী (রহ:) এ বর্ণনাটিকে হাসান ও গরীব সাব্যস্ত করেছেনএমনিতেই হাসান বর্ণনার মর্যাদা সহীহ বর্ণনার নিচেএর উপর তা আবার গরীব তথা একটি মাত্র সূত্রে বর্ণিতবুঝাই যাচ্ছে বর্ণনাটির মর্যাদা অনেক কমএই হাদিসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে আব্দুর রহমান ইবনে গায়ওয়ান রয়েছেনকেউ কেউ তাকে নির্ভরযোগ্য বললেও অধিকাংশ মুহাদ্দিস তাকে বিশ্বস্ত মনে করেন নামীযানুল ইতেদাল গ্রন্থে ইমাম সাহাবী (রহ:) অযোগ্য হাদীস বর্ণনাকারী সাব্যস্ত করেছেনআর বুহাইরা বিষয়ক বর্ণনাটিকে তার সবচেয়ে বড় মুনকার বলে অভিহিত করেছেনএ হাদীসে হযরত বেলাল ও আবু বকর (রা:)-কে রাসূল (স:) এর ভ্রমনকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছেঅথচ এটা সম্পূর্ণ অবাস্তবএমনটি হওয়ার কোনই সম্ভাবনা ছিলোনাইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) বর্ণনাকারীদের সম্মান রার্থে একে শুদ্ধ বলে উল্লেখ করলেও ইবনে গাযওয়ানের প্রতি সন্দেহ পোষন করেছেনতাহযীবুত তাহযীব গ্রন্থে লিখেছেন- তিনি ভুল করতেনএ ছাড়া বানোয়াট হাদীস তৈরীকারী মামালীকের কাছ থেকে তিনি শুনে শুনে বর্ণনা করতেনঅনুরুপভাবে