মুসা আল হাফিজ
ইসলামে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা: যেহেতু ইসলামের অন্যতম
আলোচ্য বিষয় মানুষ, মানুষের পৃথিবী ও সামগ্রিক জীবন, অতএব মানবস্বভাবের স্বাভাবিকতা, পৃথিবীর প্রতিটি পরিবর্তন ও জীবনের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে ইসলাম আলোচনা করে। এই আলোচনা আংশিক নয়, বরং পরিপূর্ণ,
স্থানিক নয় বরং বৈশ্বিক এবং কালিক নয় বরং সর্বকালীন।
এ কারণে পৃথিবীর পরিবর্তন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক উন্নতি, বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যবস্থা, যোগাযোগ উপকরণ, জীবনযাপনের মান ও মাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে যেসকল অভুতপূর্ব সম্ভাবনা ও নয়া আবির্ভূত সংকট ও সমস্যা দেখা দিয়েছে, এ ক্ষেত্রে চৌদ্দশত বছর পূর্বের ইসলাম সমস্যাসমূহের সমাধানে ও জীবন ব্যবস্থার পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে যে প্রচারণা, আমরা তাকে অবান্তর সাব্যস্ত করতে চাই। কেননা ইসলামের আলোচ্য বিষয় মানুষ ও তার প্রকৃতি, যা অপরিবর্তনীয়। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও বিশ্বায়নের অভিঘাতে পরিবর্তন হয়েছে জীবনোপকরণে, জীবনযাপনের মাধ্যম ও পন্থায়। কিন্তু মানবস্বভাব ও মানুষের মানবিক প্রকৃতি চির অপরিবর্তনীয়। আর ইসলাম মাবস্বভাবেরই ধর্ম। অতএব পৃথিবী যতই আধুনিক হোক মানুষকে যেহেতু তার স্বভাব ও প্রকৃতি নিয়েই জীবনযাপন করতে হবে, সুতরাং ইসলাম তার জন্য অনিবার্য প্রতিটি প্রসঙ্গে। মানবস্বভাবের স্বাভাবিকতা ও তার চিরন্তন চেতনার মধ্যেই ইসলামের বসবাস। বস্তুগত ও উপকরণগত পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তনটি হয়েছে, তা হচ্ছে জ্ঞান ও শাস্ত্রগত। জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, দর্শনসহ বিশ্বব্যবস্থায় সুবিপুল যে পরিবর্তন হয়েছে, তা আগেকার পৃথিবীতে ছিল অকল্পনীয়, অভাবনীয়। অতএব, ইসলামের আওতা এবং ইসলামের কার্যকারিতা জ্ঞান বিজ্ঞানের এতসব বিস্তৃত শাখা, অর্থনীতি, রাজনীতির অভিনব উদ্ভাসন ও ভাবধারা এবং বৈচিত্রময় সংস্কৃতি ও অভূতপূর্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানÑ যার সাথে ইসলামের কোন পরিচয় নেই, ইসলাম তাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কিভাবে তার সাথে সহাবস্থান করবে? এই প্রশ্ন স্বাভাবিক হলেও এর উৎস কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান ও সুস্পষ্ট ধারণার অভাব। কেননা ইসলাম সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থব্যবস্থাপনা, বিচার ও শাস্তিবিধান, সমর ও জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র ও আভ্যন্তরীন কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল, বৈশ্বিক শান্তি সহযোগিতা ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তি, ব্যক্তির সাথে সমাজ, ব্যক্তির সাথে বিশ্বজগত এবং ব্যক্তির সাথে তার আত্মার সম্পর্ক, তথা সকল বিষয়ের মৌলিক নীতি ও পদ্ধতি ইসলাম সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে। জীবনঘনিষ্ট এমন কোন বিষয় নেই যার পূর্ণ সমাধান ইসলাম পেশ করেনি। ইসলাম প্রদত্ত সমাধান সর্বজনীন, সর্বব্যাপী। যা বর্তমান উন্নতি ও উৎকর্ষতার স্রোতধারাকে পরিচালনা করতে পারে এবং জীবনের মাঠের প্রতিটি পরিস্থিতি ও সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ইসলামী আইন সুদীর্ঘ এগার বারোশত বছর পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত ও বৃহত্তম ভূখন্ড শাসন করেছে। বিভিন্ন বৈচিত্রময় সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও রাজনৈতিব চিন্তানৈতিক মতাদর্শের সাথে পরিচয় লাভ করেছে। কিন্তু ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান উদ্ভাবন ও গবেষণা, শিল্প ও আবিস্কারে প্রতিবন্ধক হবে তো দুুুরের কথা, বরং তার পৃষ্টপোষকতা করেছে, সৃষ্টি করেছে নবতর গতিশীলতা । অতএব ইসলাম এ যুগের জ্ঞানগত প্রণোদনা ও সভ্যতার সীমাহীন গতিময়তাকে পরিচালনা করতে পারে এবং এ কাজে সে পুরোটাই সক্ষম। ইসলামের এই সম্ভাব্য ভূমিকায় ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি আনা অবান্তর। কেননা ইসলাম নিছক ইবাদত বন্দেগী কেন্দ্রিক কোন ধর্ম নয় । বরং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এবং প্রতিটি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে ইসলাম আবর্তিত। অতএব প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাধান ও পথনির্র্দেশের যে অভাব, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান কিংবা অন্য ধর্মসমূহে বর্তমান, ইসলামের বেলায় তা নয়। আর ইসলাম মানতে হলে মুসলমানদেরকে তা মানতে হয় পরিপূর্ণভাবে। ইসলামী আইনে অন্যধর্মের অনুসারীদের অধিকার খর্ব হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। কারণ ইসলাম অনিবার্যভাবেই তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্যান্য মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে। ইসলাম মানবজাতিকে মানুষ হিসেবে খন্ডিতভাবে দেখেনা। মানবজাতিকে সার্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাই ইসলামী চিন্তাধারা। এ কারণেই আল্লাহর পরিচয়ে ইসলাম বলে রাব্বুল আলামিন, নবীর পরিচয়ে রাহমাতুল্লিল আলামীন আর কুরআনের পরিচয়ে যিকরা লিল আলামিন। মানুুষের এখতিয়ার আইন নয়; কিন্তু আইন যেহেতু জীবনকে একটি কাঠামো ও পদ্ধতির ভেতর স্থিত রাখতে চায়, আর অপরদিকে জীবন যেহেতু প্রতিনিয়ত নতুন অভিব্যক্তি, বৈচিত্রময় ভাবধারা ও বিকাশের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেতে চায় - অতএব উভয়ের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। এই সমন্বয়ের চাহিদা থেকেই আইনের ইতিহাসের সাথে সংস্কারের ইতিহাসও সমান্তরালভাবে প্রবাহিত। জীবনের সাথে আইনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা কিংবা আইনের ছাদের নিচে জীবনের জায়গা করার অঙ্গীকার ব্যবিলনে প্রবর্তিত হামুরাবি কোর্টে পরিবর্তন ও সংস্কার এনেছে, রোমান ল এম্পায়ারে সংস্কার ও পরিবর্তন এনেছে, পরিবর্তন ও সংস্কার এনেছে ইউরোপীয় আইনে। ফরাসী বিপ্লবের পর সেই আইনে ব্যাপক রদবদল এনে তার আধুনিক পরিণতি নিশ্চিত করা হলেও সংস্কারের ধারা থেমে নেই, তা আজও অব্যাহত। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আইনসমূহের মূল কাঠামো উলটপালট হয়েছে, নীতিমালা হ্রাস বৃদ্ধি ঘটেছে, অন্য আইনের সাথে দান গ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। এমনও হয়েছে যে, সংস্কারের পরে আইনের যে চেহারা দাড়ালো, তা যেন সম্পূর্ণ নতুন এবং সংস্কারপূর্ব অবস্থার সাথে কোন পূর্ব পরিচয় নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় এমনও ধরা পড়েছে যে, সংস্কারের আগেই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটি অপেক্ষাকৃত উত্তম ছিল। কিংবা সংস্কারের মাধ্যমে যে ধারাটি প্রবর্তন করা হলো, তা নিছক জাতিবিশেষের জন্য উপযোগি, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এর কোন উপযোগিতা নেই। বিংবা অন্য জাতির জন্য তাকে গ্রহণ করা ক্ষতির কারণও হতে পারে। এমনও দেখা গেছে যে, আইন প্রণেতাদের ব্যক্তিগত ঝোক ও পছন্দ অপছন্দ আইনের বিভিন্ন ধারার মর্যাদা অধিকার করেছে, কিংবা সময় এবং পরিস্থিতির প্রণোদনা তাদেরকে তাড়িত করেছে এমন ধারা প্রবর্তন করতে, পরিস্থিতির পরিবর্তনে যা একান্তই অকার্যকর বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে দেখি গ্রিক দার্শনিক জ্যানুফ্যানিস আইনাদর্শ স্থির করলেন বিশ্বের সমস্ত বস্তুর একত্ব ও অপরিবর্তনীয়তার স্বপ্নোকল্পিত দর্শনকে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিল হেরাল্কিতুসের দর্শনে তিনি আইনাদর্র্শ স্থির করলেন প্রতিটি বস্তুর আপেক্ষিকতাকে। তিনি সৃষ্টির সর্বত্রই প্রত্যক্ষ করলেন বিপরীতমুখিতা। অথচ এ উভয় আইনাদর্শ মূলত প্রান্তিক। এলেন পারমেনিদেস। তাই আইনও হবে অজর, অমর। অত:পর এলেন এমপিদোকিস। তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিন্তা পেশ করলেন। তার মতে পানি, আগুন, মাটি ও বাতাস এই চার উপাদানের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বস্তুনিচয় আবর্তিত এবং আত্মা কর্মঅনুযায়ী দেহ ভ্রমণ করে। সুতরাং পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী একই আত্মার আধার। বাস্তবিক অর্থে এই দর্শনের আলোকে জীবন পরিচালনার কোন আইনী ভিত্তি দাড়াতেই পারে না। এই চরম প্রান্তিকতা ও একদেশদর্শীতা দেখা গেছে প্রোতাগোরাসের মধ্যে (৫০০-৪৩০ খৃ, পূর্ব) দিমাক্রিতোস (৪৬০-৩৭০ খৃ, পূর্ব) পিনদার (৫১৮-৪৫৬ খৃ, পূর্ব) স্কাইলাস (৫২৮-৪৫৬ খৃ, পূর্ব) সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খৃ, পূর্ব) এমনকি বিশ্বখ্যিাত রিপাবলিক ও ল’জ এর প্রণেতা মহামতি প্লেটো কিংবা অবিসংবাদিত আইন প্রণেতা এরিষ্টোটলের আইনাদর্শেও । কেননা তাদের কাছে জীবন জিজ্ঞাসার কোন সদুত্তর ছিল না। যার উপর আইনাদর্শের কাঠামো দাড়াবে। আধুনিক পৃথিবীতে দেওয়ানী আইনের জনকখ্যাত বারটোরাস, আন্তর্জাতিক আইনের প্রোটিইয়াস, ফরাসী আইনের পোথিয়ার, জার্মান আইনের স্যাভিগনি, বৃটিশ সাধারণ আইনের কোক, আমেরিকার সংবিধান আইনের মার্শাল Ñ প্রত্যেকেই মূল্যবোধ আইনাদর্শের প্রশ্নে সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ। আইন প্রণেতাদের জন্য এমনতরো পরিণতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না এজন্যই যে, যেহেতু তারা মানুষ, এবং মানুষ একই সাথে চতুর্দিক পরিদর্শন করতে পারে না। যে অতীত ভুলে যায়, বর্তমান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে অনুমান এবং ধারণা ছাড়া কার্যত তার কোন জ্ঞানই নেই। প্রবৃত্তির তাড়না থেকে মানুষ যেহেতু নিরাপদ থাকতে পারেনা, অতএব আইন প্রবর্তনের গুরুদায়িত্ব তার হাতে দিলে আইনের নানা পর্যায়ে প্রবৃত্তি তার উপর জয়ী হওয়া স্বাভাবিক, ফলে সেই আইন পৃথিবীর জন্য নতুন বিপর্যয়ের জন্মদাত্রী হতে বাধ্য। যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় দগদগে ক্ষতের মতো মানবতার দুঃখরূপে বর্তমান। আজকের পৃথিবীতে সভ্যতার সংকট, জীবনাদর্শের দারিদ্র, মানবাত্মার হাহাকার ও জীবনজিজ্ঞাসার জবাবের অনুপস্থিতির উৎসমূলে রয়েছে বস্তুবাদী দর্শন ও আইন। এমনকি এই আইনে মানুষ কতটা মানুষ- এই মীমাংসা না থাকা ভয়াবহ জটের সৃষ্টি করেছে। এর সবই মানুষের সীমাবদ্ধতা না বুঝা এবং যে কাজটি সৃষ্টিকর্তার, সেটা সৃষ্টির হাতে তুলে দেয়ার অনিবার্য পরিণতি।
এ কারণে পৃথিবীর পরিবর্তন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক উন্নতি, বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যবস্থা, যোগাযোগ উপকরণ, জীবনযাপনের মান ও মাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে যেসকল অভুতপূর্ব সম্ভাবনা ও নয়া আবির্ভূত সংকট ও সমস্যা দেখা দিয়েছে, এ ক্ষেত্রে চৌদ্দশত বছর পূর্বের ইসলাম সমস্যাসমূহের সমাধানে ও জীবন ব্যবস্থার পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে যে প্রচারণা, আমরা তাকে অবান্তর সাব্যস্ত করতে চাই। কেননা ইসলামের আলোচ্য বিষয় মানুষ ও তার প্রকৃতি, যা অপরিবর্তনীয়। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও বিশ্বায়নের অভিঘাতে পরিবর্তন হয়েছে জীবনোপকরণে, জীবনযাপনের মাধ্যম ও পন্থায়। কিন্তু মানবস্বভাব ও মানুষের মানবিক প্রকৃতি চির অপরিবর্তনীয়। আর ইসলাম মাবস্বভাবেরই ধর্ম। অতএব পৃথিবী যতই আধুনিক হোক মানুষকে যেহেতু তার স্বভাব ও প্রকৃতি নিয়েই জীবনযাপন করতে হবে, সুতরাং ইসলাম তার জন্য অনিবার্য প্রতিটি প্রসঙ্গে। মানবস্বভাবের স্বাভাবিকতা ও তার চিরন্তন চেতনার মধ্যেই ইসলামের বসবাস। বস্তুগত ও উপকরণগত পরিবর্তনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তনটি হয়েছে, তা হচ্ছে জ্ঞান ও শাস্ত্রগত। জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, দর্শনসহ বিশ্বব্যবস্থায় সুবিপুল যে পরিবর্তন হয়েছে, তা আগেকার পৃথিবীতে ছিল অকল্পনীয়, অভাবনীয়। অতএব, ইসলামের আওতা এবং ইসলামের কার্যকারিতা জ্ঞান বিজ্ঞানের এতসব বিস্তৃত শাখা, অর্থনীতি, রাজনীতির অভিনব উদ্ভাসন ও ভাবধারা এবং বৈচিত্রময় সংস্কৃতি ও অভূতপূর্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানÑ যার সাথে ইসলামের কোন পরিচয় নেই, ইসলাম তাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কিভাবে তার সাথে সহাবস্থান করবে? এই প্রশ্ন স্বাভাবিক হলেও এর উৎস কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান ও সুস্পষ্ট ধারণার অভাব। কেননা ইসলাম সম্পর্কে পারদর্শী ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়, রাষ্ট্রনৈতিক ও অর্থব্যবস্থাপনা, বিচার ও শাস্তিবিধান, সমর ও জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র ও আভ্যন্তরীন কর্মপদ্ধতি, কর্মকৌশল, বৈশ্বিক শান্তি সহযোগিতা ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তি, ব্যক্তির সাথে সমাজ, ব্যক্তির সাথে বিশ্বজগত এবং ব্যক্তির সাথে তার আত্মার সম্পর্ক, তথা সকল বিষয়ের মৌলিক নীতি ও পদ্ধতি ইসলাম সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে। জীবনঘনিষ্ট এমন কোন বিষয় নেই যার পূর্ণ সমাধান ইসলাম পেশ করেনি। ইসলাম প্রদত্ত সমাধান সর্বজনীন, সর্বব্যাপী। যা বর্তমান উন্নতি ও উৎকর্ষতার স্রোতধারাকে পরিচালনা করতে পারে এবং জীবনের মাঠের প্রতিটি পরিস্থিতি ও সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ইসলামী আইন সুদীর্ঘ এগার বারোশত বছর পৃথিবীর সবচেয়ে আলোকিত ও বৃহত্তম ভূখন্ড শাসন করেছে। বিভিন্ন বৈচিত্রময় সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও রাজনৈতিব চিন্তানৈতিক মতাদর্শের সাথে পরিচয় লাভ করেছে। কিন্তু ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান উদ্ভাবন ও গবেষণা, শিল্প ও আবিস্কারে প্রতিবন্ধক হবে তো দুুুরের কথা, বরং তার পৃষ্টপোষকতা করেছে, সৃষ্টি করেছে নবতর গতিশীলতা । অতএব ইসলাম এ যুগের জ্ঞানগত প্রণোদনা ও সভ্যতার সীমাহীন গতিময়তাকে পরিচালনা করতে পারে এবং এ কাজে সে পুরোটাই সক্ষম। ইসলামের এই সম্ভাব্য ভূমিকায় ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি আনা অবান্তর। কেননা ইসলাম নিছক ইবাদত বন্দেগী কেন্দ্রিক কোন ধর্ম নয় । বরং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এবং প্রতিটি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে ইসলাম আবর্তিত। অতএব প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাধান ও পথনির্র্দেশের যে অভাব, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান কিংবা অন্য ধর্মসমূহে বর্তমান, ইসলামের বেলায় তা নয়। আর ইসলাম মানতে হলে মুসলমানদেরকে তা মানতে হয় পরিপূর্ণভাবে। ইসলামী আইনে অন্যধর্মের অনুসারীদের অধিকার খর্ব হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। কারণ ইসলাম অনিবার্যভাবেই তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অন্যান্য মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে। ইসলাম মানবজাতিকে মানুষ হিসেবে খন্ডিতভাবে দেখেনা। মানবজাতিকে সার্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাই ইসলামী চিন্তাধারা। এ কারণেই আল্লাহর পরিচয়ে ইসলাম বলে রাব্বুল আলামিন, নবীর পরিচয়ে রাহমাতুল্লিল আলামীন আর কুরআনের পরিচয়ে যিকরা লিল আলামিন। মানুুষের এখতিয়ার আইন নয়; কিন্তু আইন যেহেতু জীবনকে একটি কাঠামো ও পদ্ধতির ভেতর স্থিত রাখতে চায়, আর অপরদিকে জীবন যেহেতু প্রতিনিয়ত নতুন অভিব্যক্তি, বৈচিত্রময় ভাবধারা ও বিকাশের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেতে চায় - অতএব উভয়ের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। এই সমন্বয়ের চাহিদা থেকেই আইনের ইতিহাসের সাথে সংস্কারের ইতিহাসও সমান্তরালভাবে প্রবাহিত। জীবনের সাথে আইনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা কিংবা আইনের ছাদের নিচে জীবনের জায়গা করার অঙ্গীকার ব্যবিলনে প্রবর্তিত হামুরাবি কোর্টে পরিবর্তন ও সংস্কার এনেছে, রোমান ল এম্পায়ারে সংস্কার ও পরিবর্তন এনেছে, পরিবর্তন ও সংস্কার এনেছে ইউরোপীয় আইনে। ফরাসী বিপ্লবের পর সেই আইনে ব্যাপক রদবদল এনে তার আধুনিক পরিণতি নিশ্চিত করা হলেও সংস্কারের ধারা থেমে নেই, তা আজও অব্যাহত। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আইনসমূহের মূল কাঠামো উলটপালট হয়েছে, নীতিমালা হ্রাস বৃদ্ধি ঘটেছে, অন্য আইনের সাথে দান গ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। এমনও হয়েছে যে, সংস্কারের পরে আইনের যে চেহারা দাড়ালো, তা যেন সম্পূর্ণ নতুন এবং সংস্কারপূর্ব অবস্থার সাথে কোন পূর্ব পরিচয় নেই। কোন কোন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতায় এমনও ধরা পড়েছে যে, সংস্কারের আগেই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটি অপেক্ষাকৃত উত্তম ছিল। কিংবা সংস্কারের মাধ্যমে যে ধারাটি প্রবর্তন করা হলো, তা নিছক জাতিবিশেষের জন্য উপযোগি, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এর কোন উপযোগিতা নেই। বিংবা অন্য জাতির জন্য তাকে গ্রহণ করা ক্ষতির কারণও হতে পারে। এমনও দেখা গেছে যে, আইন প্রণেতাদের ব্যক্তিগত ঝোক ও পছন্দ অপছন্দ আইনের বিভিন্ন ধারার মর্যাদা অধিকার করেছে, কিংবা সময় এবং পরিস্থিতির প্রণোদনা তাদেরকে তাড়িত করেছে এমন ধারা প্রবর্তন করতে, পরিস্থিতির পরিবর্তনে যা একান্তই অকার্যকর বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে দেখি গ্রিক দার্শনিক জ্যানুফ্যানিস আইনাদর্শ স্থির করলেন বিশ্বের সমস্ত বস্তুর একত্ব ও অপরিবর্তনীয়তার স্বপ্নোকল্পিত দর্শনকে। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিল হেরাল্কিতুসের দর্শনে তিনি আইনাদর্র্শ স্থির করলেন প্রতিটি বস্তুর আপেক্ষিকতাকে। তিনি সৃষ্টির সর্বত্রই প্রত্যক্ষ করলেন বিপরীতমুখিতা। অথচ এ উভয় আইনাদর্শ মূলত প্রান্তিক। এলেন পারমেনিদেস। তাই আইনও হবে অজর, অমর। অত:পর এলেন এমপিদোকিস। তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিন্তা পেশ করলেন। তার মতে পানি, আগুন, মাটি ও বাতাস এই চার উপাদানের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বস্তুনিচয় আবর্তিত এবং আত্মা কর্মঅনুযায়ী দেহ ভ্রমণ করে। সুতরাং পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী একই আত্মার আধার। বাস্তবিক অর্থে এই দর্শনের আলোকে জীবন পরিচালনার কোন আইনী ভিত্তি দাড়াতেই পারে না। এই চরম প্রান্তিকতা ও একদেশদর্শীতা দেখা গেছে প্রোতাগোরাসের মধ্যে (৫০০-৪৩০ খৃ, পূর্ব) দিমাক্রিতোস (৪৬০-৩৭০ খৃ, পূর্ব) পিনদার (৫১৮-৪৫৬ খৃ, পূর্ব) স্কাইলাস (৫২৮-৪৫৬ খৃ, পূর্ব) সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খৃ, পূর্ব) এমনকি বিশ্বখ্যিাত রিপাবলিক ও ল’জ এর প্রণেতা মহামতি প্লেটো কিংবা অবিসংবাদিত আইন প্রণেতা এরিষ্টোটলের আইনাদর্শেও । কেননা তাদের কাছে জীবন জিজ্ঞাসার কোন সদুত্তর ছিল না। যার উপর আইনাদর্শের কাঠামো দাড়াবে। আধুনিক পৃথিবীতে দেওয়ানী আইনের জনকখ্যাত বারটোরাস, আন্তর্জাতিক আইনের প্রোটিইয়াস, ফরাসী আইনের পোথিয়ার, জার্মান আইনের স্যাভিগনি, বৃটিশ সাধারণ আইনের কোক, আমেরিকার সংবিধান আইনের মার্শাল Ñ প্রত্যেকেই মূল্যবোধ আইনাদর্শের প্রশ্নে সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ। আইন প্রণেতাদের জন্য এমনতরো পরিণতি এড়ানো সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না এজন্যই যে, যেহেতু তারা মানুষ, এবং মানুষ একই সাথে চতুর্দিক পরিদর্শন করতে পারে না। যে অতীত ভুলে যায়, বর্তমান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে অনুমান এবং ধারণা ছাড়া কার্যত তার কোন জ্ঞানই নেই। প্রবৃত্তির তাড়না থেকে মানুষ যেহেতু নিরাপদ থাকতে পারেনা, অতএব আইন প্রবর্তনের গুরুদায়িত্ব তার হাতে দিলে আইনের নানা পর্যায়ে প্রবৃত্তি তার উপর জয়ী হওয়া স্বাভাবিক, ফলে সেই আইন পৃথিবীর জন্য নতুন বিপর্যয়ের জন্মদাত্রী হতে বাধ্য। যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় দগদগে ক্ষতের মতো মানবতার দুঃখরূপে বর্তমান। আজকের পৃথিবীতে সভ্যতার সংকট, জীবনাদর্শের দারিদ্র, মানবাত্মার হাহাকার ও জীবনজিজ্ঞাসার জবাবের অনুপস্থিতির উৎসমূলে রয়েছে বস্তুবাদী দর্শন ও আইন। এমনকি এই আইনে মানুষ কতটা মানুষ- এই মীমাংসা না থাকা ভয়াবহ জটের সৃষ্টি করেছে। এর সবই মানুষের সীমাবদ্ধতা না বুঝা এবং যে কাজটি সৃষ্টিকর্তার, সেটা সৃষ্টির হাতে তুলে দেয়ার অনিবার্য পরিণতি।
আল্লাহ প্রদত্ত্ব আইন: যেহেতু জীবন জিজ্ঞাসার সত্যিকার কোন জবাব
মানব মস্তিস্কপ্রসূত আইনে অনুপস্থিত অথচ এর মাধ্যমেই মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। আর যেখানে মূল্যবোধ নেই, সেখানে আইনাদর্শ নেই। যেখানে আইনাদর্শ নেই, সেখানে কোন আইন থাকতে
পারে না। আইন সেখানে প্রহসনে পর্যবসিত হতে বাধ্য। পাশ্চাত্য দেশগুলোতে প্রয়োগের গুণে যদিও আইন সচল, কিন্তু তা মানবজীবনের কোন সন্তুষজনক পরিণতি নির্দেশ করতে পারছে না। অপরদিকে তৃতীয় বিশ্বে আইনাদর্শের সংঘাত আইনের শাসনের সৃষ্ট বিকাশ বিঘিœত করেছে এবং আইনের নামে জারি করেছে এমন কর প্রহসনমূলক আইনের হাট, যেখানে বিচারের রায় বেচা-কেনা থেকে নিয়ে বিবিধ ধরণের জালিয়াতি
চলতে থাকে।
ইসলাম এজন্যই বলে যে, মানবজাতির জীবনযাত্রার বিধিব্যবস্থা নির্দেশ করবেন সৃষ্টিকর্তা। যিনি প্রত্যেক মানুষের স্বভাব চরিত্র, অতীত বর্তমান
ভবিষ্যত এবং পৃথিবীর প্রতিটি পরিবর্তনের ধরণ
ও মাত্রা আর এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবগত। তার প্রবর্তিত আইন হবে, তার বড়ত্ব,
প্রজ্ঞা ও পূর্বাপর সকল বিষয়ের জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি। সেটা হবে প্রকৃতির অন্যসব নিয়মের মতো, দিন রাত্রির
বিবর্তনের শৃঙ্খলার মতো, চন্দ্র-সূর্যের শাশ্বত
আইনের হতো, পৃথিবীর সব পরিবর্তনকে স্বীকার করেও যা নিত্যনতুন
, চির আধুনিক, প্রত্যহ অপরিহার্য
এবং সতত চিরন্তন। পৃথিবী যতই পাল্টাক, গ্রহ-নক্ষত্রের নিয়ম পাল্টাবে না। বৃষ্টির যে কানুন, মানবসন্তান জন্মের
যে নীতি, এগুলো প্রাকৃতিক আইন, জীবনযাত্রার মান ও মাত্রায় শত পরিবর্তনেও এগুলোতে পরিবর্তনের
কিছু নেই। মানবস্বভাবের স্বাভাবিকতার সাথে সঙ্গতিশীল, মানুষের সহজাত চেতনা ও গতিশীলতার ধারক, জীবনীসত্যের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যবস্থা হলো ইসলাম। প্রকৃতির অন্যদশটি আইনের সাথে ইসলামের এই প্রতিতুলনা আবেগের তাড়নাবশত নয়,
বরং এটা বুঝাতে যে, ইসলামের মূলনীতিমালা
মানবজীবনে অন্তরাত্মা ও সৃষ্টিগত স্বাভাবিকতার ধারক, একান্তই বাস্তবভিত্তিক। এগুলো সরাসরি আল্লাহকতৃক
প্রদত্ত। আল্লাহ স্বয়ং এই নীতিমালা দান করলেন এবং ঘোষণা করলেনÑ
‘এই নীতির কোন পরিবর্তন নেই’। এটাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা যেহেতু তিনি রব বা পালনকর্তা, তাই তার রবুবিয়্যাতের
শর্ত হলো তিনি তার মারবুব তথা যাদেরকে লালান পালন করবেন, তাদেরকে শুধু সৃষ্টি করার দ্বারাই রবুবিয়্যাতের দায়িত্ব শেষ করবেন না বরং দুনিয়ার
বুকে তাদেরকে লালন- পালনের পাশাপাশি জীবনযাপনের জন্য আত্মিক ও ব্যবহারিক প্রতিটি ক্ষেত্রে
কি কি নীতিমালা ও চিন্তা চেতনার অনুবর্তিতা তারা করবে- তার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবেন। সেখানে অতি অবশ্যই মানুষের জীবনজিজ্ঞাসার জবাব থাকবে, আইনাদর্শ থাকবে, থাকবে মানবস্বভাবের স্বাভাবিকতার ধারক এক
উন্নত মূল্যবোধ। ইসলামে এর সবটাই পরিপূর্ণতার সাথে নিশ্চিত রয়েছে। জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বান্দা কি কি আইন-কানুন মেনে চলবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা নির্দেশ করেছেন। যেহেতু তিনি রব তাই তার ঘোষণাÑ‘আইনদানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর’।
রাসূলের সা. দায়িত্ব: জীবনযাপনের জন্য আল্লাহ প্রবর্তিত এই বিধিব্যবস্থার
বাস্তব প্রয়োগ ও মানুষকে এর অনুবর্তি করে তোলার কর্মসূচী নিয়ে পুত:পবিত্র সত্ত্বা,
প্রজ্ঞার আধার ও ইনসানিয়াতের পরিপূর্ণ রূপরেখা জীবনে ধারণকারী
এক জামাতের আবির্ভাব পৃথিবীতে ঘটেছে। যে জামাতের পূর্ণতাসাধনকারী
হলেন হযরত মুহাম্মদ সা.। তার মাধ্যমে আল্লাহ
প্রদত্ত বিধিব্যবস্থার পূর্ণতা সাধিত হয় এবং এর প্রায়োগিক অবয়ব ও সম্পূর্ণতা লাভ করে। কিতাবুল্লাহর মাধ্যমে আগত যে আহকাম, সেগুলোকে কেন্দ্র
করে আবর্তিত ছিল নবীজির জীবন ও সাধনা। সেই বিধিব্যবস্থার
শিক্ষাদান, প্রচার ও প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্ব ছিল তার
উপর ন্যস্ত। কুরআন বলছেÑ ‘আল্লাহপাক তিনিই যিনি উম্মতের মধ্যে তাদেরই একজনকে পাঠিয়েছেন রাসূলরূপে,
যে তাদের নিকট আবৃত্তি করে তার আয়াত, তাদেরকে মন্দ চরিত্র থেকে পবিত্র করে উত্তম চরিত্র দ্বারা সুসজ্জিত করে,
তাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়, ইতোমধ্যে তো এরা ছিল ঘোরবিভ্রান্তিতে ’। আলোচ্য আয়াতে রাসূলের সা. চারটি দায়িত্ব নির্দেশ করা হয়েছে। ১. আল্লাহ প্রেরিত ওহী হৃদয়ে ধারণপূর্বক অন্যদের পাঠ করে শুনানো এবং প্রয়োজনীয়
বিষয়ে আমলী দৃষ্টান্তসহকারে অন্যদের শিখানো। ( ‘এয়াতলু আলাইহিম আয়াতিহ’ এর মর্মার্থ এটাই )। ২. আত্মার পরিশুদ্ধি
তথা তাযকিয়ায়ে নফস। মানবিক মনগঠন তথা উৎকর্ষ সংস্কৃতির বুনিয়াদ
তৈবী করা। চারিত্রিক কদর্যতা দূরীভূত করে মানুষের জীবনাচারকে মহোত্তম গুণাবলী
দ্বারা সুশোভিত করা মানুষকে মানবীয় মহিমার শ্রেষ্ঠত্বে উপনীত করা। ৩.আল্লাহর কিতাব শিক্ষা দেয়া তথা মানবিক জীবনযাপনে খোদাপ্রদত্ত নীতিমালা ও বিধিবিধান
মানুষের হৃদয়ঙ্গম করানো এবং এর উপর আরোপিত সংশয়, সন্দেহ ও অভিযোগসমূহের অপনোদনপূর্বক এর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রতিষ্ঠার ভিত্তিগঠন। ৪. হিকমাত শিক্ষা দেয়া। অর্থাৎ কিতাবুল্লাহর
আয়াতসমূহ থেকে যে সকল বিধিবিধান নির্গত হয়, সেগুলোর উল্লত তথা কার্যকারণ বুঝিয়ে দেয়া। জীবনযাপনের নীতিমালার ভিতরগত কারণ সম্পর্কে শরীয়ত মানুষকে অন্ধকারে রাখতে চায় না। এ কারণে হুজুর সা. এর দায়িত্ব এটাও ছিল যে, তিনি বিধিবিধান সমূহের ইল্লত জানিয়ে দিবেন। এছাড়া এই ইল্লতসমূহ অনুধাবন করতে পারার উপর নির্ভর করছে শরীয়তের নস থেকে আহকামাত
উন্মোচন ও মাসআলা নির্গত করা।
মূলনীতি ও কার্যকারণ : কুরআন-হাদীস কেবলই মূলনীতি বর্ণনা করে। হয়তো সেটা ক্ষুদ্র কোন হুকুমের অবয়বে কিংবা ক্ষুদ্র বা বিশেষ কোন পরিপ্রেক্ষিতকে
উপলক্ষ্য করে। বাহ্যত তাকে ক্ষুদ্রজলাশয় মনে হলেও তার মধ্যে
নিহিত থাকে সুবিশাল এক সমুদ্র। সংক্ষিপ্ত আয়াত বা
হাদীসের মধ্যে সংগুপ্ত থাকে এমন কার্যকারণ, যা জীবনের বিশাল বিশাল দিগন্তকে নিজের আওতায় নিয়ে নেয়। এরকম কার্যকারণ থেকে শরীয়তের কোন নসই শূণ্য নয়। কার্যকারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকুক বা নাই থাকুক, কিংবা সেটা উদঘাটিত হোক বা এখন পর্যন্ত অনুদঘাটিত থাকুক। নসের মধ্যে ইল্লত যে আছে, আছেই। এ বিষয়ে শায়খুল ইসলাম কাসিম নানুতাবী রাহ. তার ‘আবে হায়াত’ গ্রন্থের শুরুতে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে কুরআন-হাদীসের প্রতিটি হুকুমই কার্যকারণ সমৃদ্ধ। প্রত্যেকটির মধ্যেই ইল্লত বিদ্যমান। ফলে প্রতিটি ক্ষুদ্র
একক পরিণত হয়েছে বৃহতে, সংক্ষিপ্ত বিষয়েও ঢুকে
পড়েছে ব্যাপক সারাসার। তবে সিয়াম অবস্থায় ভুলবশত পানাহার জাতীয় ব্যতিক্রম
কিংবা কোন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্টতা ছাড়া অন্যান্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই
এই ব্যাপকতা প্রযোজ্য হবে। যেমন কুরআনে কারীমে
ওযু ভঙ্গের কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘আওজা-আ আহাদুম মিনকুম মিনাল গা-ইথ্’ এই আয়াত ছোট্ট একটি বিধান বলে মনে হলেও এর
মধ্যে যে ইল্লত আছে, তা ব্যাপক, বিস্তীর্ণ পরিসরের ধারক। এই আয়াতে ওযু ভঙ্গের
কারণ উল্লেখ করা হলেও ইমাম আবু হানিফা রাহ. এর মতে আয়াতের মূল ইল্লত হচ্ছে শরীর থেকে
নাপাকী নির্গত হয়ে গড়িয়ে পড়া। ইমাম শাফেয়ী রাহ. এর
মতে মূল ইল্লত হচ্ছে সাবীলাইন (প্রস্রাব পায়খানা রাস্তা) দিয়ে কোন নাপাকী বের হওয়া
। এ ভিত্তিতেই ওযু ভঙ্গের কারণসমূহ তারা নির্ণয় করেছেন। হাদীস শরীফে গম, যব ইত্যাদির উল্লেখ করে বলা হয়েছে এ সমস্ত
লেনদেনের সময় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সমানে সমানে আদান-প্রদান করতে হবে। আদন-প্রদান করতে হবে হাতে হাতে। বেশকম বা বাকি হলেই
সুদ হয়ে যাবে। ফুকাহায়ে কেরাম এই নির্দেশের ইল্লত অনুসন্ধান
করেছেন। ইমাম মালিক রাহ. খাদ্য বানানো ও প্রয়োজনের সময় গচ্ছিত রাখাকে
ইল্লত সাব্যস্ত করেছেন। ইমাম শাফেয়ী রাহ. সাব্যস্ত করেছেন আহার্য
ও মূল্যবান হওয়াকে। ইমাম আবু হানিফা রাহ. ওজন ও পরিমাপের বস্তু
হওয়া এবং একই প্রকারের বস্তু হওয়াকে ইল্লত সাব্যস্ত করেছেন । ইল্লত অনুধাবনের পর হুকুম ব্যাপক হয়ে যায়। তা আর এ ছয়টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং যত জিনিষের মধ্যেই
এই ইল্লতের উপস্থিতি থাকবে , প্রত্যেকটির উপরই উপরোক্ত
হুকুম প্রযোজ্য হবে।
ইসলামী ফিকাহ ও সাহাবায়ে কেরাম: নসসমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব ও তাৎপর্যজ্ঞানে
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও সবচেয়ে
অগ্রবর্তী।
তাদের চোখের সম্মুখে কুরআনে কারীম নাযিল হয়েছে এবং রাসূলপাক
সা. আয়াতসমূহের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি
শাখার গোড়াপত্তন তাদের হাতে। এই জ্ঞানের মর্যাদা
ও সারসত্তা তাদের চিন্তা চেতনায় সর্বোচ্ছ গুরুত্বের আসন পেয়েছিল। এর উৎস স্বয়ং রাব্বুল আলামীনÑ এই উপলব্ধির তীব্রতা,
প্রচন্ডতা ও ওজস্বিতায় তাদের সত্ত্বা ছিল দ্রবীভূত, অস্তিত্ব ছিল প্রতিনিয়ত জাগ্রত। যার ফলে জ্ঞানের প্রতিটি বিষয়কে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বাংশে, পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও সততার সাথে। অতএব তাদের জ্ঞানজিজ্ঞাসাগুলোর জবাব ওহীর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা যে প্রশ্নগুলো নবীজির কাছে করেছেন এর উত্তরে আয়াতে কুরআনী নাযিল হয়েছে। অতএব এটাই ছিল সবচেয়ে সমীচিন যে, এই মুবারক জামাতের
মাধ্যমই নসসমূহের ইল্লত নির্গতকরণ একটি কাঠামো পাবে। আর এ কাজের পথ ও পদ্ধতি সমূহের তাত্ত্বিক বুনিয়াদ তারাই গঠন করবেন। হলোও তাই । দেখা গেলো সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হাকাইক
ও দাকাইকের ক্ষেত্রে গভীরতার অধিকারী, ফেকাহতফিদ্দীনে
বুৎপত্তিসম্পন্নদের একটি ‘নফর’ ফিকহে ইসলামীর সাধনায় আত্মনিয়োগ করলেন। এ কাজে সবচেয়ে অগ্রবর্তী ছিলেন হযরত উমর রা.। তার সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতেন যেÑ ‘সমস্ত আরবের ইলম এক পাল্লায় আর উমরের ইলম এক পাল্লায় রাখা হলে ভারী হবে উমরের পাল্লাই’। সারা বিশ্বে ইলমে ফেকাহের প্রচলিত ভাবধারাসমূহের উৎসমূলে উমর রা. রয়েছেন। সেই সময় ইলমে ফেকাহ ছিল প্রত্যেকের জীবনের অপরিহার্য দিক। ফলত: ইসলামী জ্ঞানের কেন্দ্রসমূহে ফিকাহের চর্চায় সমুদ্রতুল্য ফেকাহতের অধিকারী
একেক সাহাবাকে কেন্দ্র করে গবেষণা ও পর্যালোচনার মাহফিল জমে উঠলো। মক্কা শরীফের শায়খ ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। মদীনা শরীফে হযরত যায়েদ বিন সাবিত রা.ও আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.। কুফায় হযরত আলী রা. ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও আবু মুসা আশয়ারী রা.। সিরিয়ায় হযরত আবুদ দারদা রা. ও হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. প্রমুখের মাধ্যমে ইলমে
ফিকাহ এর দেহ গঠন ও সত্ত্বার স্ফূরণ। যদিও সাহাবায়ে কেরামের
মধ্যে বহু অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি সত্ত্বেও জটিল বিষয়সমূহ নিয়ে ইজতেহাদ করতেন
মাত্র ছয়জন। তারা হলেনÑ হযরত উমর রা., হযরত আলী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., উবাই ইবনে কাব রা.,
যায়েদ ইবনে সাবিত রা. এবং হযরত আবু মুসা আশয়ারী রা.। মুহাদ্দীসগণের সর্ববাদী সম্মত রায় যে এদের মধ্যে সেরা উমর রা.,আলী রা.। সাহাবায়ে কেরামের ইজতেহাদ
ছিলো। বুখারীর ভাষ্যকার কাস্তালানী
রাহ. দাদার উত্তরাধিকারী সম্বন্ধে লিখেন- হযরত উমর রা. এ মাসআলা সম্পর্কে দীর্ঘদিন
গবেষণা করে প্রায় ১০০ টি সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেন। কুরআনের কোনো আয়াতের মাসআলায় সন্দেহ দেখা দিলে রাসূলের সা. নিকট উত্তমরূপে বুঝে
নিতেন। যতক্ষণ পুরোপুরি না বুঝলেন, ততক্ষণ প্রশ্ন করতে থাকতেন। এরূপ করা আর কারো দ্বারা
সম্ভব হতো না। ফারায়েযের জটিল মাসআলা সম্পর্কে তিনি এতো
জিজ্ঞাসা করেন যে, রাসূল সা. বলেন উমর সূরা নিসার শেষ আয়াতটি
তোমার জন্য যথেষ্ট হবে বলে বিশ্বাস। কিন্তু সেটা ছিল সুশৃঙ্খল,
সমন্বয়ধর্মী ও সুচিন্তাপ্রসূত। হযরত উমর রা. এর যুগে মুজতাহীদের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সেই সময়ে রোম পারস্য জয়ের ফলে দুটি ভিন্নধর্মী সভ্যতার সাথে ইসলামের তাখাল্লুতের
প্রেক্ষিতে নতুন নতুন প্রশ্ন ও পরিস্থিতি দেখা দেয়। শরীয়তের আলোকে নতুন পরিস্থিতিকে ঢেলে সাজাবার দরকার পড়েছিল এবং নবউদ্ভুত বিষয়াবলী
সম্পর্কে ইজতেহাদ হয়ে উঠেছিল অপরিহার্য। হযরত উমর রা. এই সময়ে
পরিষদভিত্তিক ইজতেহাদের ব্যবস্থা করেন এবং তার মজলিসে শূরার প্রত্যেক সদস্য ছিলেন মুজতাহিদ। পরিষদভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে মাসআলার সমাধান হতো। আল্লামা বালাজুরী রাহ. ‘কিতাবুল আশরাফে’ লিখেছেন Ñ হযরত উমর রা. কোন মাসআলায়
সাহাবীদের অনুমোদন ব্যতিরেখে মীমাংসা করেননি। সাহাবায়ে কেরাম নসসমূূহের ইল্লত নির্ণয় করে সমাধান পেশ করতেন। যে সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল সা. রাসূল হিসেবে স্পষ্ট কোন সিদ্ধান্ত পেশ করেননি,
গবেষণার দ্বারা সেগুলোর স্থান-কাল পাত্রভেদে প্রয়োজনানুরূপ নতুন
সিদ্ধান্ত গ্রহনে সেই পরিষদ সচেষ্ট ছিল। সেই পরিষদ বহু নতুন
বিষয়ে ইজতেহাদ করেছে। বিশ্বস্ত উপায়ে বর্র্ণিত এ রকম ইজতিহাদী সমাধানের
সংখ্যা একহাজারের চেয়েও বেশি। এর মধ্যে একহাজার মাসআলা
এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও সুষ্টভিত্তির
উপর প্রতিষ্ঠিত যে, চার মাযহাবের
ইমামগণ ঐকমত সহকারে তা গ্রহণ করেছেন। মুসান্নাফ ইবনে আবি
শাইবায় এই মাসআলাগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এগুলোয় সাহায্যে শাহ
ওয়ালিউল্লাহ ফারুকী ফিকাহের একটি পৃথক পুস্তিকা সংকলন করে স্বীয় কিতাব ‘ইযালাতুল খিফার’ পরিশিষ্টে সংযোজন করেছেন। ‘হুযযাতুল্লাহিল বালিগায়’ তিনি লিখেছেনÑ ‘হযরত উমরের রা. নীতি ছিলো তিনি সাহাবাদের
সাথে প্রত্যেক মাসআলা নিয়েই পরামর্শ ও বিতর্ক করতেন। সন্দেহাতীতভাবে যে সিদ্ধান্ত গৃহিত হতো তাই ফতুয়া আকারে প্রচার করা হতো। ছোট থেকে ছোট কোনো বিষয়ও পরিষদভিত্তিক ইজতিহাদের বিষয়বস্তু হতে পারতো। এ নিয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিতর্ক বিলম্বিত হতে পারতো’। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বায়হাকীর বর্ণনাকে আনা যায়। তিনি লিখেছেনÑ ‘যানাবাতের গোসলের বিশেষ একটি সুরত সম্পর্কে
সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ ছিলো উমর রা. মুহাজির ও আনসারদের সকলকে সমবেত করে বিষয়টি উত্থাপন
করলেন। সাহাবাদের প্রায় সকলেই একটি সিদ্ধান্তে একমত হলেন। একমাত্র আলী ও মুয়াজ রা. এর বিরোধিতা করলেন। হযরত উমর রা. তখন দাঁড়িয়ে বললেনÑ আপনারা বদরের
মুজাহিদ ও বিশিষ্ট সাহাবী। আপনাদের মধ্যেই এখতেলাফ
থাকলে পরবর্তি যুগের অবস্থা কি হবে। অনন্তর সকলে মিলে বিষয়টি
উম্মুল মুমিনীনের উপর ছেড়ে দিলেন । তাদের সিদ্ধান্তের
উপরই রায় গৃহিত হলো। অনুরূপভাবে জানাযার তাকবীর সম্পর্কে মতভেদ
দেখা দিলে সাহাবাদের সম্মেলন ডাকা হলো। অবশেষে সকলে বললেন
যে রাসূল সা. কর্তৃক পঠিত সর্বশেষ জানাযা অনুযায়ী মীমাংসা হবে। অনুসন্ধানে জানা গেলো শেষ জানাযার তিনি চার তাকবীর বলেছিলেন। এইভাবে ব্যাপক পর্যালোচনা সত্যিকারে নীতিমালা ও ঐকবদ্ধ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই
ইজতিহাদের চর্চা হয়েছিল। তবে একাদশ হিজরী থেকে
সূচীত হয়ে চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরামের ইজতিহাদের এ সময়কালে কোনো মাসআলায়
সাহাবায়ে কেরামের সম্মিলীত কোনো সিদ্ধান্ত না থাকলে মুজতাহিদে সাহাবায়ে কেরাম সে মাসআলায়
হাদীসের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত মতামত পেশ করতেন। যা পরে কিয়াসের ভিত্তিরূপে গৃহিত হয়। একচল্লিশ হিজরী তথা
মুয়াবিয়া রা. এর শাসনামল থেকে শুরু করে হিজরী প্রথম শতকের শেষ সময় পর্যন্ত ফিকহে ইসলামের
তৃতীয় যুগ।
এ সময় বড় বড় সাহাবারা দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন। এবং ইসলামী জাহান ফিকাহ সংকলনের প্রয়োজনীয়তাকে খুবই অনুভব করলেন। কারণ জীবিত সাহাবায়ে কেরাম তখন দুনিয়ার প্রান্তিক দিগন্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের নিয়ে আগের মতো পরামর্শভিত্তিক ইজতিহাদ সম্ভব হচ্ছিলোনা। একেক জায়গায় একেক সমস্যা ছিলো। সাহাবায়ে কেরামও এগুলোর
সমাধান দিলেন নিজ নিজ ইজতিহাদ মতো । ফলে একজন থেকে আরেকজনের
সমাধান ভিন্নতর হতে থাকলো। এ অবস্থায় সাহাবীরাও
একদিকে ধারাবাহিকভাবে বিদায় হয়ে যাচ্ছিলেন। ৫৭ হিজরীতে মদীনায়
হযরত আয়শা রা.। ৭৩ হিজরীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.। ৫৭ হিজরীতে হযরত আবু
হুরায়রা রা.এর ইন্তেকালের পর
মদীনায় ইজতিহাদ করতেন তাবেয়ী বুজুর্গগণ। যেমনÑ হযরত সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব রাহ. (ইন্তেকাল
৯৪ হিজরী)।
আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান রাহ. (ইন্তেকাল ৯৪ হিজরী)। ওরওয়া ইবনে যুবাইর আসলামী রাহ. (ইন্তেকাল ৯৪ হিজরী)। ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ রাহ. (ইন্তেকাল ৯৮ হিজরী)। সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.। (ইন্তেকাল ১০৬ হিজরী)। সুলাইমান ইবনে ইয়াসির রাহ. (ইন্তেকাল ১০৭ হিজরী)। কাসিম ইবনে মুহাম্মদ আবু বাকর রাহ. (ইন্তেকাল ১০৬ হিজরী)। অপরদিকে মক্কা মুকাররমায় ৬৮ হিজরীতে রঈসুল মুফাসিসরীন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.
এর ইন্তেকালের পরে মুজাহিদ ইবনে যুবায়ের রা. (ইন্তেকাল ১০৩ হিজরী)। ইকরিমা রা. (ইন্তেকাল ১০৭ হিজরী)। আতা ইবনে আবু রাবা
রা. (ইন্তেকাল ১১৪ হিজরী)। প্রমুখ ইজতিহাদের ধারা
অব্যাহত রেখে চলছিলেন। বসরায় আনাস ইবনে মালিক আনসারী রা. ৯৩ হিজরীতে
ইন্তেকাল করেন। মিসরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস
রা. ৬৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। পরে তাবেয়ী ফকীহরা
ফতুয়া দান ও বিধান রূপান্তরে ধর্মীয় সমাধান উপস্থাপন করতেন। এ সময়কালের হযরত উমর রা. এর পরিষদভিত্তিক ইজতিহাদের কর্মপদ্ধতি পরবর্তীতে আবু হানিফা
রাহ. অনুসরণ করেন এবং পুরোটাই পরিষদভিত্তিক ইজতিহাদের উপর হানাফী ফিকাহ স্থাপন করেন।
ইল্লত বুঝার পদ্ধতি: আপন জ্ঞানমন্ডল, বিবেক ও চিন্তাশক্তি কুরআন হাদীসের আহকামের ইল্লত বুঝতে এগুলো সহায়ক হলেও এগুলোকেই
অবলম্বন করে ইল্লত বের করা যায় না। এতে হিতে বিপরীত হয়। কাবার যাত্রী তুর্কিস্থানের দিগন্তে নিখোঁজ হয়ে যায়। ইসলাম যদি মানুষের নিজস্ব বোধ বুদ্ধির উপর ইল্লত বের করার দায়িত্ব দিয়ে দিতো,
তাহলে ইসলামী ফিকাহের পরিণতি হতো সেইসব আইন কানুনের মতো,
মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত হওয়ার কারণে যেগুলো কমিউনিজমের মতো যাদুঘরের
অলংকার কিংবা গণতন্ত্রের মতো পৃথিবীতে ব্যর্থতার মহড়া প্রদর্শন করছে। ইসলাম এ জন্যে এতটুকু ফাঁক রাখেনি যে, কুরআন হাদীসের
উপর কেউ চাকুর কসরত করবে এবং মনগড়া তাসাররুফের মাধ্যমে যাচ্ছেতাই বিশ্লেষণের বাজার
গরম করবে। কিন্তু তারপরও অনেকেই এমনটা করেছেন। করেছেন আর ব্যর্থতার তালিকা প্রলম্বিত করেছেন। করতে গিয়েছেন আর নিজের ফাঁদে পৈত্রিক পা দুটি খুইয়েছেন। কেউ কেউ ‘আকিমুস সালাহ’ এই আমরের হুকুমের ইল্লত সাব্যস্ত করেছেন চরিত্র
সংশোধনকে। ফল দাঁড়িয়েছে তালীম বা শিক্ষা সুহবতের মাধ্যমে যখন চরিত্র সংশোধন
হয়ে যায়, তখন তার জন্য নামাযের প্রয়োজনীয়তাকে উড়িয়ে
দিয়েছেন। ওযুর ইল্লত সাব্যস্ত করেছেন পরিচ্ছন্নতা অর্জনকে। ফল দাঁিড়য়েছে নিজেরা পরিচ্ছন্ন থাকলে ওযু করার আর প্রয়োজনীয়তা মনে করেননি। এভাবে দ্বীনের বিবিন্ন মনগড়া তাসাররুফের ফলে তাহরীফাত হয়ে দ্বীনের যে কাঠামো রূপ
লাভ করে, তার মধ্যে ইসলাম থাকে না, সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম মাথা তুলে দাঁড়ায়। এ কারণে শরীয়তের নস থেকে ইল্লত বের করার তিনটি ধাপ নির্ধারিত । এগুলোর আাওতার ভেতর জ্ঞানমন্ডল, বিবেক ও চিন্তাশক্তির
যৌক্তিক চর্চা ও সুগভীর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ধাপগুলো হচ্ছে তাখরীজে মানাত, তানকীহে মানাত,
তাহকীকে মানাত। মুজতাহিদ সর্বপ্রথম
নস এর মাঝে অনুসন্ধান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ইল্লত বের করবেন। এটি তানকীহে মানাত। এরপর নির্ণিত প্রকৃত কারণকে ভিত্তি বানিয়ে
মাসআলা বের করা হবে। যেখানে নির্ণত প্রকৃত কারণ পাওয়া যাবে,
সেখানেই নসে বর্ণিত হুকুম প্রয়োগ হবে। এটি তাহকীকে মানাত। মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা. বা. লিখেছেন
Ñ ‘তাখরীজে মানাত করা সহজ। তাহকীকে মানাতও তত মুশকিল নয় । তবে তানকীহে মানাতের
কাজ অতিশয় জটিল। মুজতাহিদদের মধ্যে যে মতবিরোধ হয়,
তা সাধারণত তানকীহে মানাতের কারণেই হয়ে থাকে। এ বিষয়ে এক একজনের নীতিমালা এক এক রকম। হানাফী উলামায়ে কেরামের
মতে ইল্লতটি ক্রিয়াশীল ও প্রভাবসৃষ্টিকারী হতে হবে। ক্রিয়াশীল হওয়া ছাড়া কোন ইল্লত গ্রহনযোগ্য নয়। ক্রিয়াশীল ও প্রভাবসৃষ্টিকারীর অর্থ হলো কুরআন হাদীস অথবা ইজমা দ্বারা কোন ইল্লতের
প্রভাবসৃষ্টিকারী হওয়া প্রমানিত হতে হবে। যথা: শরীর থেকে নাপাকি
বের হয়ে গড়িয়ে পড়া ওযু ভঙ্গের ইল্লত। কুরআন মজীদে এই ইল্লতের
প্রভাব প্রকাশিত হয়েছে। ঘরের অন্দরে সর্বদা ঘুরাফিরা করা নাপাক না
হওয়ার ইল্লত। যার প্রভাব হাদীসে অর্থাৎ বিড়ালের ঝুটার মাসআলায়
প্রকাশিত।’ তবে শাফেয়ী ইমামদের মতে ইল্লতের প্রভাব সৃষ্টিকারী হওয়া জরুরী
নয়, বরং মুজতাহিদকর্তৃক কোন বিষয় সম্পর্কে ইল্লত হওয়ার ধারণা পোষণই
যথেষ্ট। প্রথম মতের ভিত্তিতে আমল করা হলে ভুলের আশংকা অতি ক্ষীণ। দ্বিতীয় মত অনুযায়ী আমলের ক্ষেত্রে মুজতাহিদের ধারণা ভুল হওয়া স্বাভাবিক।
ইসলাম সহজতার ধারক: মানুষের সাধ্যের বাইরে কোন বিধান শরীয়ত চাপিয়ে
দেয়নি এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে উপকরণগুলো জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে শরীয়ত
সেগুলোকে যথাসম্ভব বৈধতা দিতে চায়। ইসলামী শরীয়ত স্থান,
কাল, পাত্রভেদ ও ভেদের মাত্রাকে
মূল্যায়ন করে ও সবিশেষ গুরুত্ব দেয়। এ ভিত্তিতে মাসআলাসমূহকে
প্রয়োজনে নুতনভাবে বিন্যাস করে ও পাল্টায়। এই প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি
ও মাসআলার পরিবর্তিত প্রয়োগ ইসলামী আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূূলনীতি। এর পাশাপাশি মানুষ যেহেতু বিভিন্ন শ্রেণী, বৈচিত্রময় সংস্কৃতি, বহুমুখী জীবনমান ও
অবস্থানের ধারক, অতএব শরীয়ত সবার উপর সমান মাত্রায় বিষয়সমূহকে
প্রত্যেক পরিস্থিতির জন্য আবশ্যক করেনি। বরং মানুষকে তার স্ব
স্ব অবস্থানে রেখে নীতিমালা প্রয়োগ করেছে। শরীয়তের প্রকৃতি হলো
‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বুঝা হালকা করতে চান’ ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চাননা’ (সূরা: মায়েদা)। কুরআনের ঘোষণা ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান,
তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না’ (সূরা: বাকারা)। জটিলতা- তা যে কোন যুগেই দেখা দিক, সংকট- তা যে
কোন প্রকৃতিতেই আত্মপ্রকাশ করুক ইসলাম এর সুরাহা করতে চায় সহজতা অবলম্বনের মাধ্যমে। যে কোন যুগে উদ্ভুত সংকটময় পরিস্থিতির কালোপযোগী সমাধান- এটাও এই সহজতার অংশ। এ কারণে উসূলে ফেকাহের অন্যতম এক মূূূলনীতি হলো-‘জটিলতা সহজীকরণ সৃষ্টি করে’। এই মূলনীতি কিয়ামত পর্যন্ত জটিল পরিস্থিতির সহজাত ও মানুষের পক্ষে অনুকুল সমাধান
পেশ করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে দেখা দেয়া সংকট এ ভিত্তিতে মানবীয় সামর্থ
ও স্বাভাবিকতার অনুকুলে সমাধান হয়েছে। যেমন দাঁড়িয়ে নামায
পড়তে হয়, এটা অপরিহার্য । কিন্তু অতিশয় পীড়িত মানুষ, যে দাঁড়াতে পারছেনা,
কিভাবে সে নামায আদায় করবে? পরিস্থিতিটি কঠিন। দাঁড়ানোর অপরিহার্যতা, যা নসের মাধ্যমে প্রমাণিত, এর উপর কঠোরতা করার
সুযোগ ছিল।
এমনও সম্ভব ছিল যে, দাঁড়ানো যেহেতু
অপরিহার্য, অতএব এখন যেভাবে পারে নামায পড়–ক, পরে সুস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে কাযা করবে। কিন্তু শরীয়ত যেহেতু সহজতা চায়, এই উসূলের ভিত্তিতে
পীড়িত মানুষের জন্যে প্রয়োজনে বসে, শুয়ে, ইশারায় যেভাবে সম্ভব, নামায পড়ার অনুমতি দেয়া হলো। ঠিক তেমনিভাবে খাদ্যাভাবে
মৃত্যুমুখী মানুষের জন্যে জান বাচাঁনো পরিমাণ মৃত জন্তুর গোশত খাওয়ার বৈধতা এই উসূলের
ভিত্তিতেই । মহিলাদের অপবিত্রতাকালীন নামাযের কাযা পড়া
দুস্কর, তাই এর কাযা মওকুফ এই উসূলের ভিত্তিতেই। শরীয়তের আরেকটি মূলনীতি হচ্ছে ক্ষেত্রভেদে হুকুমের পরিবর্তন। এটিও কিন্তু মানুষের সাধ্য ও পরিস্থিতির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দানের দৃষ্টিভঙ্গি
থেকে প্রণীত। মুকিম অবস্থায় চার রাকাআত নামায পড়তে হয়,
সফর অবস্থায় পড়তে হয় দু’রাকাত, নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে এই বিভাজন মূলত উপরোক্ত উসূলের দাবিতে। ইসলামী ফিকাহের আরেকটি মূলনীতি হচ্ছে ‘ছাড় দেয়া’। শরীয়ত বহু জিনিষের ব্যাপারে ইচ্ছাকৃত হুকুম প্রদান করা থেকে বিরত থেকেছে। যেন স্থান, কাল, পাত্রভেদে সেটার উপর আমল করা সম্ভব হয়। নবী করীম সা. ইরশাদ
করেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য কিছু সীমা নির্ধারণ
করে দিয়েছেন, তা তোমরা লঙ্ঘন করোনা এবং কতগুলো জিনিষ ফরয
করে দিয়েছেন তা নষ্ট করো না। কতগুলো বস্তু হারাম
করে দিয়েছেন তাতে লিপ্ত হয়ো না আর কতগুলো বিষয়ে চুপ রয়েছেন তোমাদের উপর সহজ করে দিতে,
ভুলবশত নয়, সেগুলোর হুকুমের ব্যাপারে
জিজ্ঞাসাবাদ করোনা। (দারে কুতনী)। অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা স্বীয়
গ্রন্থে যেগুলো হালাল করেছেন, সেগুলো হালাল,
আর যেগুলো হারাম করেছেন সেগুলো হারাম। আর যেগুলো সম্পর্কে কোন হুকুম দেননি, বরং চুপ রয়েছেন
সেগুলো তোমাদের জন্য ছাড়। সুতরাং তোমরা আল্লাহ
প্রদত্ত ছাড় গ্রহণ করো’। উপরোক্ত উসূলসমূহ যেহেতু সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য, অতএব পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উদ্ভাবিত নব নব উপকরণ এবং দেখা দেয়া নয়া নয়া পরিস্থিতি
ও সংকটের ক্ষেত্রে উক্ত মূলনীতির ভিত্তিতে সমাধান পেশের দরজা উন্মুক্ত থাকা আবশ্যক। সেই দরজা শরীয়ত খোলা রেখেছে এবং নিত্য নতুন বিষয়ে সমাধান পেশের জন্য কিছু মূলনীতি
প্রদান করেছে। যেমন: ইজমা, কিয়াস, ইস্তিহসান, মাসালিহে মুরসাল ইত্যাদি।
জীবন যখন ইসলামের আওতায়: এ কারণে দেখা যায়, ইসলামী শরীয়তের আওতায় যখন জীবন প্রবেশ করলো, জীবন সার্বিক বিকাশের পথ পেলো। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যখন জীবনের প্রাণশক্তিকে ত্বরান্বিত করে তখন মানবতার
বাগানে বসন্তের বাতাস বয়ে যায়, আর আইন-কানুন যখন স্বভাবগত স্বাভাবিকতার সাথে একাত্মবোধে মনুষত্যের
বিকাশ কামনা করে, তখন মানবীয় সম্ভাবনা ও প্রতিভার প্রতিটি পাতা
পল্লব ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। ইসলামী শরীয়তের শাসনে
মানুষের মানবিক উৎকর্ষ উন্নততর পর্যায়ে উপনীত হলো। মানব প্রকৃতি যেন সুপ্ত সকল সুন্দরের বাতায়ন খুলে দিলো। আর মানুষের মহিমা যেন আত্মবিকাশের অনুভবের সিক্ততায় প্রশান্তি উদযাপন করছিলো। যে পৃথিবী ছিল জমাট এক গ্রহ, নানা পুরান অপবিশ্বাস
ও কুসংস্কারের আবিলতায় আকীর্ণ, মানুষের মেধা ছিল অবিকশিত,
আর সকল সম্ভাবনা নিয়ে সময় যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল আদিম নর্দমায়- তখনই
অবতীর্ণ ওহীর আলোকমালা ইসলামী শরীয়তের উদ্ভাসনে একটি অভিঘাত তৈরী করলো। সেটা ছিল প্রবল এক প্রকম্পন, যা সব নিস্তরঙ্গতাকে
কাঁপিয়ে দিলো। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো সবকিছুকে করে রাখা বহুত্ববাদের
শিকল। যে মানুষ সৃষ্টির চতুর্দিকে স্বীয় প্রভূদের প্রত্যক্ষ করতো,
ইসলামী শরীয়ত তাকে বললো, গোটা সৃষ্টি তোমার দাসানুদাস, সবকিছু জয় করো। হৃদয়ের দরজা খুলো এবং চিন্তার দিগন্ত উন্মোচন করো। আল্লাহর আয়াত ছড়িয়ে আছে আকাশ পৃথিবীর প্রতিটি কণায়, প্রাণী, পদার্থে, হাওয়ায়, সমুদ্রে, মাটির তলায়। এই হলো এক তীব্রবোধ, প্রখর মনন, চিন্তারমুক্তি ও বিজ্ঞানচেতনার
নবজন্মের কাহিনী। ইসলামী ফিকাহের ছায়ার নিচে জেগে উঠে ঘুমন্ত
চেতনা ও অনুসন্ধিৎসা, যার জাদুময় ছোয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠে আজকের বহু
উচ্চারিত, মহিমান্বিত নাম- আধুনিক বিজ্ঞান। ইসলামী ফিকাহ যখন সমুদ্র অতিক্রম করে স্পেনের বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো, তার ঢেউ ক্রমশ- ‘অজ্ঞতা ও আদিমতার
মহাঅরণ্য’ (রবার্ট ব্রিফল্ট) ইউরোপে আলোর আগমনী জানিয়ে দিলো। ইউরোপ পেলো জ্ঞান বিজ্ঞানের ছোয়া এবং জেগে উঠলো সহস্র বছরের ঘুম থেকে। সেই জাগরণই মানুষকে পথ দেখালো চন্দ্র জয়ের, নবনব আবিস্কারের, আকাশ-পৃথিবীর রহস্য মন্থনের। বহুত্ববাদ ও পৌরাণিক বিশ্বাস প্রকৃতিকে মানুষের শ্রদ্ধার ‘বেদিতে’ বসিয়ে রেখেছিলো, যার ফলে মুক্ত বিশ্লেষণ ও অধিকার প্রয়াসের প্রক্রিয়া থেকে মানুষ দূরে রইল। ইসলামী ফিকাহ এলো মুক্ত
বিশ্লেষণের কাড়ানাকাড়া বাজিয়ে। ইসলামী ফিকাহের জগতে
প্রবেশের পূর্ব প্রস্তুতি হলো মনের দরজা জানালা খুলে দেয়া। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি তথা প্রকৃতির মুক্ত বিশ্লেষণ ও তার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার
প্রক্রিয়ায় নবনব উদ্ভাসন- তা মূলত ইসলামী ফিকাহের মেজাজের সাথে অধিকতর সঙ্গতিশীল। ইসলামী ফিকাহ মানেই ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা, ভিত্তিহীন মনগড়া মূলনীতির ইৎসাদন এবং ঔজ্জল্য উৎকর্ষ ও প্রমাণসিদ্ধ প্রক্রিয়ায়
সত্যে উপনীত হওয়া। প্রগতির সমার্থক সেই প্রক্রিয়া, তা এমনই যে, যার স্রোতধারায় চিন্তানীতি
এবং কর্মনীতি সমান্তরালভাবে প্রবাহিত। এর পাশাপাশি ইসলামের
মূলপ্রয়োগস্থল যেহেতু মানুষ এবং মনুষত্বের মর্যাদাকে সর্বোত্তম উপায়ে উচ্চকিত করেছে। মানুষের দেহের বিকাশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আত্মার পবিত্রতা ও সৌকর্য বিধানে বিধিব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। প্রাণ ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করেছে। এ জন্য প্রয়োজনে কঠোর
আইনের ধারস্থ করেছে। হত্যার বদলে হত্যা, চুরিতে হাতকাটা, নিষিদ্ধ যৌনাচারে
রজম ও হদ (তবে সবগুলোই কঠিন শর্ত ও ব্যাপক পথ-পরিক্রমার সূত্রে আবদ্ধ)। আবার অন্যদিকে শরয়ী জ্ঞান অর্জন বাধ্যতামূলক। চরিত্রি গঠনে সর্বাত্মক তৎপরতা, সামাজিক ন্যায়বিচার
ও সাম্য, সম্পদের ইনসাফভিত্তিক বন্টন, মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যের অপনোদন, ‘আমরবিল মা’রুফ’ ও ‘নাহি আনিল মুনকারের’ মাধ্যমে অপরাধের উৎসকে বন্ধ করেছে। তাকওয়াভিত্তিক মন ও সালাতভিত্তিক জীবন গঠনের কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যক্তির হৃদয়ে
বলিষ্টতা দিয়েছে সেই শক্তিকে, অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে
যা মনোজগতে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলে।
জীবনের চালক: ইসলামী ফিকাহ বরাবরই মধ্যপন্থার ধারক। যেহেতু কুরআন-হাদীসই তার সারাসার, অতএব ইসলামী
সত্যের তাবৎ সৌন্দর্য নিয়ে সে জীবনের সমুদ্রে ফিতরাত নামক জাহাজের নাবিক। এখানে প্রান্তিকতা নেই, নেই বাড়াবাড়ি। ঘূর্ণিমত্ব তুফানের ভেতর নেই অযথা আত্মধ্বংশ, আবার নেই গতিহীনতা। ইফরাত নেই, তাফরীতও নেই। কষ্ট সাধ্য দুটি বিষয়ের মধ্যখানে এই ফিকাহ
সম্ভবের দুয়ার ধরে দাঁড়িয়ে। যে দূরত্ব অনতিক্রম্য,
ইসলামী ফিকাহ সেটা মানুষের সন্নিকটে এনে দেয়। সমকালীন ও জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দ্রব্যের মূল্যনির্ধারণ ব্যবস্থাকে পেশ করা যায়। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বাজারের লাগামকে তুলে দিয়েছে পুঁজিপতির হাতে। ফলে বেনিয়াদের আকাঙ্খার পারদ উঠা-নামার সাথে দ্রব্যমূল্যের জোয়ার ভাটা হয়। ধনতন্ত্রী সাধারণত আত্মকেন্দ্রিক, ফলে তার স্বার্থের
চুল্লিতে সবসময় আগুন জ্বলে। অতএব ব্যবসায়িক স্বার্থকে
অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রব্যের যে মূল্য নির্ধারণ করবে, সে মূল্যের উত্তাপে দরিদ্র মানুষের ক্ষুধার্ত উদর পুড়ে যেতে বাধ্য। কিন্তু কার উদর পুড়লো, আর কার উদর তিমির মতো
ফুলে উঠলো, তাতে পুঁজিবাদ দৃষ্টিপাত করবে না । সে সবাইকে বলেছে পেটটা তিমির মতো বানিয়ে নাও। কিন্তু সুযোগ দিয়েছে কেবল পুঁজিপতিকে। তাই বলে যারা পারলোনা,
পুঁজিবাদের কাছে তাদের নালিশ করার কিছু নেই। এটা হলো পুঁজিবাদের জুচ্চুরি। কিন্তু সমাজতন্ত্র
এ রকম নয়। সে সরাসরি লুটেরা। সে বলবে বাজার ব্যবস্থা
সরকারের এখতিয়ারের একটি অংশ। সরকার যখন যে দাম বলবে,
সেটাই দ্রব্যের উপযুক্ত দাম। এতে উৎপাদনকারীর স্বার্থ যদি মারা যায়, তার জীবনযাত্রা যদি পথকলির মতো পথের পাশে নি:শব্দদশায় উপনীত হয়- তাতে কিছুই যায়
আসে না । আবার যদি নির্ধারিত মূল্য জনগণের ছোট ছোট হাত নাগাল না পায়-
তাতেও কিছুই করার নেই। সরকার যা করেছেন, অলংঘনীয়। কিন্তু ইসলাম মূল্যনির্ধারণ ব্যবস্থাকে বাজার
পরিস্থিতির উপর ছেড়ে দিয়েছে, উৎপাদক যাতে না ঠকে,
ক্রেতাও যাতে শোষিত না হয়। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হবে ক্রেতা বিক্রেতার যৌথ সঙ্গতির ভিত্তিতে। অযাচিত দালালি, মজুদদারী, প্রতারণা ইত্যাদিকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। উপার্জনের অবৈধ সবপন্থার লাগাম টেনে ধরেছে। অসৎ ব্যবসায়ীর মূল্যবৃদ্ধির কোন সুযোগ নেই। সিন্ডিকেট বলতে কোন কিছু নেই। দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রে
স্বার্থচরিতার্থকারীদের জন্য কঠোর আইনের প্রয়োগ সুনিশ্চিত। ফলে ইসলামে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়না। সাধারণ মানুষের জীবনকে
দূর্বিষহ করে তুলে না।
পৃথিবীতে এক বিপ্লব হলো, ইসলামী আইনকে গৃহবন্দী করা হলো: ইউরোপ জাগলো ইসলামের স্পর্শে। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখানো কুরআনের শানেনুযূল সূত্র ও আয়াতের ক্রমানুক্রমিক
প্রক্রিায়াকে আত্মস্থ করে বেকননামায় দার্শনিকদ্বয় ইউরোপে প্রচার করলেন প্রয়োগবাদ। প্রয়োগবাদই হলো পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রকৃত দার্শনিক ভিত্তি। জাগৃতির টনিক। প্রয়োগবাদের পথ ধরে বিভিন্ন সভ্যতা থেকে জীবনোপকরণ
তারা নিয়েছে। ইসলাম থেকে নিয়েছে বিপুলভাবে, সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাদের আইনাদর্শের
বুনিয়াদ ছিল রোমান ল এম্পায়ার। রোমান আইন প্রণীত হয়
মানুষের প্রবৃত্তি ও অভ্যাসের উপর ভিত্তি করে, যার ফলে উন্নত চরিত্র বিধান করার কোন আকাঙ্খা এই আইনে গুরুত্ব পায়নি এবং এই লক্ষ্যের
সাথে তার কোন যুগসূত্রও ছিলনা। রোমান আইনের দৃষ্টিভঙ্গির
উপর নতুন রূপরেখায় গড়ে তুলা হলো ইউরোপীয় আইন। এই আইনের অবস্থাও তথৈবচ। ফরাসী বিপ্লবের পর
ইউরোপে পরিবর্তনের স্রোত বইতে থাকে। সেই স্রোত যখন ইউরোপীয়
আইনের উপর দিয়ে বয়ে গেল, দেখা গেলো শান্তি ও
নিরাপত্তাবিষয়ক মূলনীতিগুলো ছাড়া ইউরোপীয় আইনে ধর্মীয়, মানবিক গুণাবলী, চারিত্রিক বিধিবিধানের যতটুকুই বা ছিটে ফোটা
অবশিষ্ট ছিল - স্রোতের তীব্রটানে সব নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। সে আইন ইশ্বরের প্রাপ্যকে পরজগতে নির্বাসিত করলো, ইশ্বরের বিধি- নিষেধকে একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছার হাতে তুলে দিলো। আর জীবনের মাঠে ইশ্বর বানিয়ে দিলো স্বার্থপ্রবণতা, প্রবৃত্তি ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে। ভোগবাদের বুনোমোষের
লাগাম খুলে দিলো । ফলে পাশববৃত্তি আর বেহায়াপনার দৌরাত্মে জীবনের
মানচিত্র থরথর করে কাঁপতে লাগলো। প্রবৃত্তির চাহিদা
যেহেতু আইনের অন্যতম মানদন্ড, অতএব ব্যভিচারের বৈধতার
সনদ পেলো, এখন পেতে যাচ্ছে পশুর সাথে মানুষের সহবাস। এই চরম অধ:পতনের পাশাপাশি ইউরোপীয় সভ্যতা পৃথিবীকে দিলো বস্তুগত উন্নয়ন ও বিস্ময়কর
গতিশীলতা। নতুন নতুন জীবনোপকরণ আবিস্কৃত হতে লাগলো। জীবনোপকরণের মান চাঁদের দেশের উচ্চতা স্পর্শ
করলো। সাবেকী জীবনযাত্রা পৃথিবীতে অচল হয়ে গেলো। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী উঠে এলো মানুষের হাতের মুঠোয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন আদালত, শিল্প-প্রযুক্তি, সমাজ-সভ্যতা, নকুন নতুন উদ্ভাবন, বিকাশ, অভূতপূর্ব প্রাণবন্যা
ও বহুবিস্তারী রূপরেখায় বিস্ময়কর নতুনত্ব লাভ করলো। প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়াবলী মানুষের সামনে আসতে লাগলো এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার
অবসান ঘোষণা করে নবতর ব্যবস্থা এসে পুরাতনের স্থান অধিকার করতে লাগলো। এর ধারাবহিকতা শিল্পবিপ্লবের পর থেকে সেই
যে শুরু হলো, তা আর পিছনের দিকে তাকায়নি। কেবলই অভিনব গতি মাত্রা লাভ করেছে। কিন্তু নতুনের এই প্লাবন
যেহেতু এমন এক প্রেক্ষাপটে শুরু হয়, যখন ইসলামের
সত্যিকার অনুসরণ ত্যাগ করে অকর্মন্য জীবনযাপন, ভোগ-বিলাসে নিমজ্জন ও জ্ঞান গবেষণার দিগন্ত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার ফলে বিশ্ব
সভ্যতার কর্তৃত্ব মুসলমানদের হাত থেকে সরে গিয়ে ইউরোপের মাটিতে ডেরা গেড়েছে। জীবনের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যে কর্মকুশলতা ও সৃজনশীলতা চাই, তার অনুপস্থিতিতে মুসলমানরা শুধু নেতৃত্ব হারালো না,
বরং ইউরোপীয় সভ্যতার রাজনৈতিক গোলামীর নাগপাশে আবদ্ধ হতে থাকলো
এবং ক্রমান্বয়ে সাংস্কৃতিক গোলামীও অবধারিত হয়ে উঠলো। এ সময়ে ইউরোপ নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীতে চালু করলো, এটা ছিল এমন এক শিক্ষা, যা জীবনের মৌলিক বহুচেতনা থেকে রিক্ত হলেও ইসলাম থেকে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য
ছিল যথেষ্ট। এই শিক্ষা দ্বারা আপাদমস্তক সিক্ত এক শ্রেণীর
বিভ্রান্ত লোকের হাতে পরবর্তীতে ইসলামী দুনিয়ার নেতৃত্ব চলে গেলো। এদের হাতে ইসলাম মোটেও নিরাপদ ছিলনা এবং ইসলামী শিক্ষা ও ফিকাহের প্রতি বরাবরই
এরা ছিলো বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু যাদের থেকে ইসলামী শিক্ষা ও ফিকাহের
যথার্থ বিকাশ এবং জীবনের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে এর ভূমিকাকে নিশ্চিত করণের কথা ছিলো,
তাদের থেকে জীবনের গতিময়তার সমান্তরাল কোন তৎপরতা পরিলক্ষিত
হয়নি। ফলে জীবন এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইসলামী ফিকাহ গুপ্তধনের এক পুঞ্জিভূত সঞ্চয়ের মতো গ্রস্থ ও গ্রন্থের চারপাশে
ঘূর্ণমান এক পরিমন্ডলে নিরাপদ আশ্রয় লাভ করলো। বৃহত্তর জীবনযাত্রার পরিচালনায় তার ভূমিকা কায়েম করা ও তাকে সেভাবে সম্পাদন করার
চেষ্টা থাকলেও সুপ্তির সুবিশাল পরিমন্ডলে তা কাঁপন ধরাতে পারেনি। অথচ সমস্যাসমূূহ জীবনের রাজপথে প্রতিনিয়ত গর্জন করছিলো। নবনব জিজ্ঞাসার কালো মেঘ আকাশ আচ্ছন্ন করছিলো। জীবনের অভিযাত্রীরা সমাধান খুঁজছিলো।
ইসলামী ফিকাহ চায় পরিবর্তন: ইসলামী ফিকাহ যেহেতু প্রয়োগশীল,
অতএব তার চাহিদা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের নবসম্পাদন। ইসলামী ফিকাহ যেহেতু জীবনের জন্যে, অতএব জীবন এগিয়ে
যেখানে আছে, ইসলামী ফিকাহ তার লাগাম ধরতে চায়। জীবন যদি ডুব দিয়ে সমুদ্রের তলে যায, ফিকাহ সেখানেও
যাবে, জীবন যদি গ্রহ-উপগ্রহে ঘরবাড়ি বানায় সেখানেও
ফিকাহর পরিসর পরিব্যাপ্ত। সে প্রতিটি প্রেক্ষাপটেই
অনিবার্য এবং জীবনের প্রতিটি সম্ভাবনায় স্বীয় গতির তরঙ্গ কামনা করে। বাঁচা মরার সংগ্রামে সে কর্মকে, দৃষ্টিভঙ্গিকে
এবং চৈতন্যকে নির্দেশনা দিতে চায়। প্রতিটি পরিবর্তনে
আলো ফেলতে চায়, হতে চায় পরিবর্তনের সহচর। এটি সেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, যা বিকাশ ও উন্নতির
পূর্ণ যোগ্যতা রাখে। অত্যন্ত প্রশস্ত ও প্রগতিশীল এই আইন;
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমনসব চিরস্থায়ী রীতিনীতির উপর যেগুলোর ক্ষয়
নেই, লয় নেই। চিরন্তন ও চিরনবীন। জীবন বাঁক ঘুরে যেখানেই দাঁড়ায় সেখানেই তাকে দেখতে পাবে, উন্নতি যে পর্যায়ে হোক, সে তার সহযাত্রী হতে পারে এবং তার উপস্থিতিতে মানুষের উদ্ভাবিত কোন আইনের আশ্রয়
নেয়ার কোনো প্রয়োজনই পড়েনা। কিন্তু সেই আইন নিজেই
যখন পরিস্থিতির পরিবর্তনে মাসআলার পরিবর্তনকে বিধিবদ্ধ করে দিয়েছে, সেখানে পরিবর্তিত এলাকার উপর দিয়ে এই স্রোতাবহ নদীটির গতিযাত্রা
ব্যাহত করা হলো এবং বিস্ময়করভাবে এক খরস্রোতা নদীকে অলসতা ও স্থবিরতার কঙ্কর দিয়ে এমনভাবে
আবদ্ধ করে দেয়া হলো যে, দূরে অবস্থানকারী লোকেরা
ভাবলো এটি একটি নদীর ধ্বংসাবশেষ, যা স্থবিরতা,
আবদ্ধতা ও মৃত্যুময়তার ভেতর দিয়েও অতীতের জীবন্ত স্রোত ও গতিশীলতার
একটি স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখছে মাত্র। যে কারণে তারা প্রচন্ড
ক্ষুৎ পিপাসায় তড়পালেও তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এদিকে আসলো না। ভাবতেই পারলোনা এখানে শীতল পানির সঞ্চয় বিদ্যমান। দোষ কি শুধু বিশ্বের মানুষের? যে পদ্ধতিগত ধারাবাহিকতার
কারণে তর্কের তুফান তুলা, মাযহাবী মতভেদ,
কতিপয় মাসআলার প্রাচীন অবশেষ ও একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ের কিছু
উপাদানের সমাহার হিসেবে পৃথিবীর নিকট ইসলামী ফিকাহ পরিচিত হলো, এর দায়ভার সেই অব্যাহত ধারাবাহিকতার কাঁধে পতিত হবে। যার কারণে আধুনিক পৃথিবী সঙ্কটের আগুনে দাউ দাউ করে পুড়লেও বিপন্ন মানুষ অগ্নি
নিবারণের ক্ষেত্রে ইসলামী ফিকাহের কোনো উপযোগিতা বিস্মৃত হয়েছে এবং ইসলামী ফিকাহের
অপরিহার্যতাকে সে অবজ্ঞা করেছে ও জীবনের কাছে ইসলামের আবেদনকে সময়ের যুক্তিতে অস্বীকার
করেছে। সে একে জেনেছে যাদুঘরের বস্তু অথবা একান্তই ঘরোয়া আসবাব। ফলে সে মুরতাদ হয়েছে এবং কেবল ‘সে’ বা ‘তারা’ নয় বরং ইরতেদাদ মুসলিম বিশ্বের ঘরে ঘরে বানের পানির মতো ছড়িয়ে
পড়েছে। অথচ এই ফিকাহ যদি নতুন পোষাকে সজ্জিত হতো, যাতে যামানা তাকে বুঝতে পারে এবং তাপদগ্ধ মানুষ তার শীতলতা উপলব্ধি
করতে পারে, তাহলে এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী এক
বিপ্লব ছিলো অনিবার্য। যার ফলে পণ্য ও যন্ত্রকে যারা মাবুদ হিসেবে
জানে ও পুঁজা করে, তারা সত্যিকার ‘মানুষের’ সন্ধান পেতো। ভুগবাদ যেখানে ‘আনা রাব্বুকুমুল আ’লা’ বলে শত শত বছর ধরে একচ্ছত্র ফেরাউনী শাসন
পরিচালনা করছে, সেখানে মুসার জালালিয়াত নিয়ে ‘আসমানী পয়গামের ঢেউ’ তাগুতী বালাখানার বুনিয়াদকে ধ্বসিয়ে দিতো। যেখানে বস্তুবাদী সভ্যতার হাজার হাজার যাদু সাপের আকারে চারদিক বিস্তার করে ফেলছে,
সেখানে পয়গাম্বরী ‘আসা’ মুহূর্তেই রুদ্ররূপ ধারণ করে সব যাদুর ভেলকি নিশ্চিহ্ন করে দিতো। সেই বিপ্লব সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন ছিলো ইসলামী শরীয়তের শক্তিশালী মর্মস্পর্শী হৃদয়গ্রাহী
ও চিত্তাকর্ষক ব্যাখ্যা বর্ণনা এবং আধুনিক যুগে যে ভাষা, সাহিত্য, বর্ণনাপদ্ধতি ও রচনাশৈলীর প্রয়োজন তার উপর
দক্ষতাসম্পন্ন মুহসিন আলেম ও দায়ী ইলাল্লাহর জামাত। যারা পরিপূর্ণ বিজ্ঞতার সাথে আধুনিক সভ্যতার খোলসকে উন্মোচন করবেন, তার কদাকার চিত্রের জ্ঞানদক্ষ সমালোচনা করবেন এবং এর পাশাপাশি
ইসলামের সত্যিকার উচ্চতা ও শ্রেষ্ঠত্বের চিত্র অঙ্কন করবেন যামানার অন্দরে ও মানবমনের
কন্দরে। এ জন্য ইসলামী ফিকাহ সর্বশ্রেষ্ট হাতিয়ার, ব্যবহৃত হওয়ার জন্যে সবরকমভাবে সে তৈরী ছিলো। যামানার পরিবর্তনকে নিজের সাথে সামঞ্জস্যশীল করার জন্যে তার আগ্রহ ছিলো পুরোপুরি। এটি ছিল ইসলামের চাহিদা ও দাবি। ইসলামের সেই কর্মনীতি
চিরন্তন । যখনই যে সংস্কৃতির গায়ে সে হাত রাখে তার রোগগুলো দূর করে,
সুস্থ, বলবীর্য ও বিকাশের
ব্যবস্থা করে, তাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে। নতুন সমস্যাসমূহের ভারসাম্যপূর্ণ ও উপযুক্ত সমাধানের উপর নির্ভর করছে আজকের এই
বস্তুবাদী গ্যাংগ্রিন দূষিত, এইডস আক্রান্ত সভ্যতাকে
ইসলামী ফিকাহের মুখোমুখি করা।
মানবতার জন্য যে কাজটি না করলেই নয়: যন্ত্র ও যোগাযোগের এ সভ্যতা
পৃথিবীকে দুহাত ভরে দিলেও নৈতিকগুণাবলীর দিক দিয়ে করেছে রিক্তহস্থ। জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুললেও মানবিক জীবন ও পাশবিক জীবনের মধ্যকার পার্থক্য ঘুচিয়ে
দিয়েছে। হিসেব করলে এই সভ্যতার অবদানের চেয়ে অপদানই বেশি। কেননা মানুষ যখন পশুত্বকে গ্রহণ করলো, তখন সে মুহূর্তেই
পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে যোগাযোগ করতে পারলেও সেই যোগাযোগ পশুত্বেরই বিস্তার
ঘটালো। অতএব মানুষকে মানুষ রেখে যোগাযোগ উপকরণ তার আয়ত্বে এনে দিলে
পৃথিবীর জন্য সুফলদায়ক হয়। এ জন্যে আধুনিক সভ্যতার অপদানগুলোকে দূরিভূত করে অবদানগুলোকে মানবতার
কাজে লাগনোটাই সময়ের চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মুকাবেলা
করার জন্যে প্রয়োজন প্রতিটি বিষয়কে ওজন করার দাড়িপাল্লা। প্রয়োজন এমন এক বিচারের আদর্শ, যা মানবতার মাটিতে
দাঁড়িয়ে আধুনিক মূল্যবোধ ও জীবনযাত্রার প্রতিটি অনু-পরমাণু পরীক্ষা নিরীক্ষাপূর্বক
তার সম্পর্কে রায় দেবে। মানবিক বিবেক সেই আদর্শের সন্ধানে পথচারি
এবং এর অনুপস্থিতিতে হতাশ। অতএব আমাদের প্রস্তাব
সেই বিচারের আদর্শ হওয়ার যোগ্যতা একমাত্র ইসলামী ফিকাহের মধ্যে নিহিত আছে। যে মন্দ জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইসলামী ফিকাহ এর বিকল্প উপাস্থাপন করতে চায়। যে ভালোয় মন্দত্ব মিশে আছে অর্থাৎ যা একদিক দিয়ে ভালো অন্যদিক দিয়ে মানুষের জন্য
ক্ষতির, ইসলামী ফিকাহ ক্ষতিকে দূর করে নিঁখাদ ভালো
হিসেবে তার কল্যাণকামিতা নিশ্চিত করতে চায়। বিরাজমান জাহিলিয়্যাতকে
সে বিধ্বস্ত করে, কিন্তু এটি করে নবসৃষ্টির স্বার্থে,
পরিপূর্ণ এক ব্যবস্থাপনার জন্য স্থান করে দিতে। যার মাধ্যমে মানবতাকে দেয়া যাবে প্রতিটি বস্তুর উত্তম বিনিময়। ইসলাম কখনো জীবনের চাকাকে স্থবির করে দিতে চায়না এবং মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির
জন্য জটিল বিষয়কে পরিত্যাগ করে সরলপথ অবলম্বনই ইসলামের নিয়ম। শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে তাইমিয়া রাহ. ‘ইকতেযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম’ গ্রন্থে লিখেন-‘মানবীয় স্বভাব ও প্রকৃতি সর্বদাই কোনো জিনিষ থেকে কেবল তখন হাত গুটিয়ে নেয় এবং
তার উপর দাবি পরিত্যাগ করে যখন সে এর বিকল্প পায়। মানুষ স্বভাবতই কিছু করার জন্য জন্ম নিয়েছে এবং তার স্বভাবের দাবি ও চাহিদা হলো
সক্রিয়তার ভেতর দিয়ে আবর্তিত থাকা। নিস্ক্রিয়তা ও স্থবিরতা
মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বিরুদ্ধ। ’ “কিতাবুন নবুওত” গ্রন্থে তিনি লিখেন- ‘আম্বিয়ায়ে কেরাম মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি বদলে দেবেন বলে আসেননি, বরং তাকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য এসেছিলেন।’ শাহ ওয়ালীইল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহ. “হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা” গ্রন্থের ষষ্টতম আলোচ্য বিষয়ের একবিংশতম অধ্যায়ে
‘জাহিলি যুগ ও রাসূল সা. এর সংস্কার’ শিরোনামে এ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন যে, নবীকরীম সা. আরবকে পরিপূর্ণ নতুন শরীয়ত বা অভিনব কোনো ব্যবস্থার মুখোমুখি করেন
নি। নতুন কোনো সংস্কৃতিও তাদের উপর চাপিয়ে দেননি। বরং তাদের মধ্যে যে ব্যবস্থাপনা, যে সংস্কৃতি
ও জীবনযাত্রা প্রচলিত ছিল, এর মন্দজিনিষগুলো দূর
করেছেন, বক্রতা সোজা করেছেন। বিচ্যুতি সংশোধন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উত্তম বিকল্প উপস্থাপন করেছেন। আজকের এই সভ্যতাকে ইসলামী ফিকাহের বিচারের সম্মুখীন করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
জরুরী হয়ে পড়েছে । সেই কাজ মানবতার জন্য, মানবতার পৃথিবীর জন্য এবং অনাগত আগামীর জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এ জন্য ইসলামী ফিকাহের সরঞ্জামগুলোর প্রায়োগিক প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা চাই,
নব সম্পাদন করা চাই। (অসমাপ্ত)