কাজী নজরুল ইসলাম: বিশ্বাসে, নিঃশ্বাসে




মুসা আল হাফিজ

সত্য মাত্রই সুন্দরÑ কথাটি কাজী নজরুলেরকাজী কবির কাছে আর্ট মানেই ছিলো সত্যের প্রকাশকবির শিল্প ছিলো সুন্দরের প্রহরী, সত্যের সেবকযেখানেই সত্য আক্রান্ত হয়েছে, অবমানিত হয়েছে, সমাজে হোক, রাষ্ট্র্রে হোক, জগতপরিমন্ডলে হোক, কাজী নজরুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেনকবিতার কাছে তার প্রথম ও শেষ অঙ্গীকার ছিলো সত্যের জন্যে লড়াইতার সত্যের শর্ত তৈরী হয়েছিলো মানবিকতায়

মনুষত্য, সাম্য, স্বাধীনতা ছিলো সেই সত্যের প্রাণসত্যের স্বার্থে তার দৃষ্টি উদ্ধত হয়, উলঙ্গ হয়, বাণী ক্ষুরধার হয় এবং বীণা তরবার হয় বলে এর বিপরীতে বস্তুগত ঐশ্বর্য পরিত্যাজ্য হয়েছিলো কবির কাছেঅসঙ্কোচ প্রকাশের দূরন্ত সাহস যখন পাওয়া গেছে, তখন দারিদ্র তার দৃষ্টিতে কোনো সমস্যাই ছিলোনাবরং সত্যের শক্তিতে তিনি একে দেখেছিলেন কন্টক- মুকোট শোভা হিসেবেখ্রিষ্টের সম্মান হিসেবে প্রয়োগবাদী বাস্তবতা আকর্ষিত করেছিলো তার সৃষ্টিকে, আর দৃষ্টিকে রহস্যভেদী করেছিলো আত্মদর্শনের স্বচ্ছতা, এর সাথে যুক্ত ছিলো চরিত্রের অনমনীয় দৃঢ়তা ও আদর্শের প্রশ্নে শিলাসম প্রত্যয়যুগ ও পরিবেশের হাহাকার তিনি শুনেছিলেন, শুনেছিলেন নিপীড়িত মানুষের হৃদয়ের কান্নাপরাধীন ভারতের মুক্তিতৃষ্ণা ধারণ করে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক দাস্যবৃত্তি ও সর্বপ্রকার জোর জুলুমের অবসানে সত্যকে সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেনতার বিদ্রোহ কোনো বিশেষ দল, মতবাদ, কিংবা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে ছিলোনা, তার প্রতিপক্ষ ছিলো অন্যায়, অমানবিকতা, কুপমন্ডুকতা ও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিতিনি আক্রমণ করেছিলেন অসাম্যকে, যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন পরাধীনতার বিরুদ্ধেসাম্রাজ্যবাদের উৎপীড়নে নিষ্পেষিত পরাধীন স্বদেশ ভূমি তাকে ব্যথিত- বিক্ষুব্ধ করেছিলোফলে তিনি নিপীড়িত স্বজাতির মুক্তিনেশায় আত্মদানের বিকল্প দেখেননিজাতিকে তিনি সে লক্ষ্যে সচকিত করতে চেয়েছিলেনধুমকেতুতে তিনি যখন ভিক্ষা দাও বলে কাতর মিনতি জানালেন, তখন শুনা গেলো আর কিছু নয়, জাতির তাজা তরুণের প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছেন আত্মদানের জন্যে, শাহাদাতের জন্যেকবির ভাষায়Ñ ‘তোমরা চেয়ে দেখো, সর্বনাশ আমাদের বুকের উপর চেপে বসে আছেকোটি কোটি লোক দু মোটো ভাতের জন্য হা হা করে ছুটছেঐ দেখ কোটি কোটি ভাই আধপেটা না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছেতোমাদের বুকে হাত দিয়ে দেখো, সেখানে আর প্রাণ নাই, তোমাদের হৃদয়ে অনুভব করে দেখো সেখানেই আর বল নাইওগো, বলি চাই, একটি ছেলে বলি চাই

কাজী নজরুল ইসলাম তার কওিতায় জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে সতর্ক বাণী শুনিয়েছেন এই মর্মে যে, স্বাধীনতার জন্যে কোরবানী দিতে হবেতিনি বলেছিলেন আজাদী মেলেনা পস্তানোয় দস্তা নয় সে সস্তা নয় স্বাধীনতা পেতে হলে চাই শক্তির উদ্ভোধনস্বজাতির স্বাধীনতার জন্যে সেই শক্তির সূচনা তিনি ঘটাতে চান স্বীয় সত্তায়  স্বীয় অন্তর্জগতে তিনি আজাদীর পরিমন্ডল রচনা করেছিলেনএবং উৎপীড়ক, লুঠেরা , উপনিবেশিক জোরবারের বিরুদ্ধে বঞ্চিত মানুষের মুত্তি আকাঙ্খায় স্বীয় সাহিত্যকে নিবেদিত করেছিলেন কবি বলেছিলেনÑপ্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস /আমার রক্ত লেখায় হয় যেন তাদের সর্বনাশ উপনিবেশিক লুঠেরা শক্তির সাথে আপোষের পথ ধরে যারা স্বাধীনতা কামনা করতেন, তাদের স্বাধীনতার ফাক ও ফাঁকি কবির চোখে ধরা পড়েছিলোএরা ভীরুর প্রার্থনার মতো স্বরাজ কামনা করতো, তাঁত বুনে বুনে স্বাধীকারের স্বপ্ন দেখতোকাজী কবি তার মানবিক অনুভব ও মুক্তিকামনার তীব্রতা থেকে চাবুক বর্ষণ করেছেন তাদের আত্মপরতায়কবির ভাষায়Ñ ‘বুকের ভিতরে ন পাই, ছ পাই, মুখে বলিস স্বরাজ চাই/ স্বরাজ কথার মানে তোদের ক্রমেই হচ্ছে দরাজ তাইঅন্যত্র তিনি বলেছেনÑ ‘সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুণি/ জাগরে জোয়ান! বাত ধরে গেলো মিথ্যার তাঁত বুনিশোষণমুক্ত দুঃশাসনমুক্ত সমাজ, লাঞ্চনা, নিগ্রহ ও নিপীড়নমুক্ত জগতÑ এই ছিলো নজরুলের স্বপ্নের সারাসারএ থেকে চুল পরিমান ও কখনো সরেননি, নড়েননিসেই যে বিদ্রোহী কবিতায় তিনি লিখেছিলেনÑ ‘মহা বিদ্রোহী রণকান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বণিবেনা/অত্যাচারির খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবেনাকামাল পাশা কবিতায় সেই বিদ্রোহী সত্তার গর্জন শোনা গেলোÑআজাদ মানুষ বন্দি করে অধীন করে স্বাধীন দেশ/কুল মুলুকের কুষ্টি করে জোর দেখাল জদিন বেশ/মোদের হাতে তুর্কী নাচন নাচলে তাধিন তাধিন শেষরণভেরী কবিতায় লক্ষ্য করা গেলো সেই বিদ্রোহীরই আফসোসতোর ভাই ম্লান চোখে চায়/মরি লজ্জায়/ওরে সব যায়/তবু কবজায় তোর শমশের নাহি কাঁপে আফসোসে হায়এ ছিলোনা প্রাণশূণ্য কোনো আর্তিতার এই বিদ্রোহী সত্তার উৎসারণে আদর্শিক যুক্তির বিশ্বস্ত প্রয়োগ ও বিশ্বাসের অন্ত:সার ছিলো সুস্পষ্টতিনি মহা সিন্ধুর পার হতে ঘণরণভেরী শুনে যখন তারুণ্যকে আহ্বান করলেন ওরে আয় বলে; সেই আহ্বান অকারণ ছিলোনা, কবি এর কারণ ব্যক্ত করলেনÑ ‘ঐ ইসলাম ডুবে যায়এবং যত শয়তান/সারা ময়দান/জুড়ি খুন তার পিয়ে হুঙ্কার দিয়ে জয় গান শোন্ গায়শুধু তাই নয়, জিন্দাদীল নকীবের মতো কবির আহ্বানÑ ‘কর কোরবান আজ তোর জান দিল আল্লার নামে ভাই/ঐ দীন-দীন- রব আহা বিপুল বসুমতী ব্যোম ছায়/শের গর্জ্জন/করি তর্জ্জন/হাঁকে বর্জ্জন নয় অর্জ্জন আজ শির তোর মায় চায়যেহেতু কবির রক্তে ছিলো শহীদের লোহু, দিলীরের খুন, যেহেতু আমি বুকে বরণ কারী, ও হাসি মুখে মৃত্যুকে গ্রহণকারী জাতির প্রতিনীধি হিসেবে কবির রক্তে খুন জোশী বীরের উল্লাস ছিলো, অতএব স্বাধীনতার জন্যে রক্তফোরাত বইয়ে দিতে যারা ভীত ছিলো, যারা কোরবানীর খুনের খুঁটিতে কল্যাণ কেতু কীভাবে উড়ে তা না বুঝে অকারণ হল্লা করতো, তাদের লক্ষ্য করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করার জন্যে সারা ভারতে তিনিই ছিলেন যোগ্যতর কবিকবি সেটি করেছেন দুঃসাহসেকোরবানী কবিতায় তিনি লিখেছেনÑ ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যগ্রহ শক্তির উদবোধন/দুর্ব্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামোখা ক্ষুব্ধ মনএই দুঃসাহসের তিক্ত ফল কবিকে ভোগ করতে হয়েছে জীবদ্দশায়, এবং মৃত্যুর পরও রয়ে গেছে তার রেশকবির সাহিত্যকে সামলোচনার মুখে পড়তে হয়েছেএবং কবিকে বলা হয়েছে তিনি আবেগের তোড়ে তলওয়ার দিয়ে দাড়ি ছাচছেনবলা হয়েছে তিনি উত্তেজনার অপরিনামদর্শী কাব্যকার, যার কবিতায় সত্যিকার কোনো চিন্তাশীলতা বিকশিত হয়নিসমালোচনার এই তীরগুলো প্রবল গতিতে কবির দিকে নিক্ষিপ্ত হলেও তার কবিতাই লৌহ বর্ম হয়ে সব আক্রমণ প্রতিহত করেছে ও করে চলছেজীবদ্দশায় কবি নিজেই জবাব দিয়েছেন এরএবং দুঃখ করে লিখেছিলেনÑ ‘গালির গালিচায় বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া রোগ, এ স্বদেশপ্রেমের বাই উঠলো?’ আসলে আলোক যখন জ্বলে, যখন নক্ষত্র চোখ ধাধিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার স্বরূপ উদঘাটন করা অনেকের পক্ষেই সহজ হয়নাএই বাস্তবতার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষিত বহু বাঙালীর চিত্তের দীনতা ক্রিয়াশীল ছিলো কাজী নজরুলের আক্রান্ত হওয়ার পিছনে একশ্রেণীর ধর্মধ্বজী কাজী কবির সমুজ্জল বিকিরণে সহসা হতভম্ব হয়ে গেলেন আর ঘোর লাগা দৃষ্টি দিয়ে আবিষ্কার করলেন চারদিকে থৈ থৈ করা এ আলোর ভিতরে লুকিয়ে আছে কুফুরীর আলেয়াএরা সবাই বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ ছড়িয়েছেন, এরা চেয়েছেন সঙ্কীর্ণতা, পায়বার, খোপ আর ডোবার কেদ, কিন্তু কাজী কবির লক্ষ্য ছিলো উদার আকাশ, নিত্য আলোক এবং ভেদহীন প্রেমফলত শক্রদের সমবেত হট্টগোল সুরের বিপরীতে অসুরের উৎপাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ইতিহাসে  বিদ্রোহের রণতূর্য কাজী কবির এক হাতে থাকলে অন্য হাতে ছিলো প্রেমের বাশরী নিঃক্ষত্রিয় এক পৃথিবী নির্মাণের প্রত্যয় বিদ্রোহীর দ্রোহ নয়, প্রেমিকেরই জালওয়াপ্রেমই তাকে শিখিয়েছিলো প্রলয়ের ঝুঁটি চেপে ধরার মন্ত্রশিখিয়েছিলো জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসাতার জৈষ্টের ঝড় বসন্তের বন্যা নিয়ে এসেছিলো চেতনায়বিপুল এক দহন তার হৃদয়ে ছিলো, ছিলো অবিরাম রক্তক্ষরণআবার সেই হৃদয়ের দু কোল ছাপিয়ে প্রত্যুষের সমীরণের মতো উপচে পড়তো মানবিক সৌহার্দ্য ও আবেগের ইত্থালতাএই সৌহার্দ্য ও আবেগ সাহিত্যের বেণুবনে কেবলই ফুল ফোটায়নি, বরং জাতির চেতনাহীনতার শরীরে হুলও ফোটিয়েছে নির্দ্বিধায়প্রেমই তাকে দেখিয়েছিলো মর্ত্যে দানব মানব পীঠে সওয়ার হয়ে কোড়া মারছে, অতএব গগণ পথে রবি রথের ঘোড়া হাকাঁনোকে পরিত্যিাজ্য বিবেচনা করেছিলেন তিনিনিদ মহলার আঁধারপুরে ভোরের সানাই বাজানোই তার কাছে ছিলো গুরুত্বপূর্ণঅতএব অন্ধকারার বন্ধপ্রকোষ্টে আঘাত না হেনে তার উপায় ছিলোনাউপায় ছিলোনা অনশন বন্দিদেরকে উঠ উঠ বলে জাগরণী হাক না দিয়েতিনি শ্রমিকদের ডাক দিয়ে কলেছেনÑ জাগো, নারীদের বলেছেন জাগো, কৃষকদের জন্য লিখেছেন জাগরণী গানসকল শ্রেণী ও পেশার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্যে তাদের কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন অন্তর হতে বিস্ফোরিত শব্দের আগুনএই হলেন কাজী নজরুল ইসলামতিনি নিজেকে চিনতে পেরেছিলেন এবং আত্মপরিচয়ের পথ ধরে সত্যকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেনসেই সত্যে ছিলো মধ্যাহ্ন সূর্যের উত্তাপ, সেই সত্য ছিলো মাটির মতো শীতল, নদীর মতো গীতল, সেই সত্য সাহিত্যকে অভিজাত শ্রেণীর কয়েদখানা থেকে মুক্ত করে গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার বানিয়ে দিলো! কাজী কবির সত্য অধরা ছিলোনা, লীলাময়ী ছিলোনা, এই সত্যে ছিলো তার সমগ্র সত্তা তনুমন প্রাণ উৎসর্গীত এবং তা বিজড়িত ছিলো তার গোটা অস্তিত্বেঅস্তিত্ব দর্শন কাজী নজরুল ইসলামকে দিয়েছিলো বিশালতা, যে বিশালতার প্রেক্ষাপটে তিনি যথার্তই বলেছিলেনÑ ‘আমি রুষে উঠে যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া/ভয়ে সমস্ত নরক, হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়াকাজী কবির এই অস্তিত্ববাদ আত্মগর্বীর আস্ফালন ছিলোনা, ছিলো তাওহীদে সমর্পিত কবির সুগভীর দার্শনিক বোধের ইল্লস্ফন, সূর্যবোধ তার নিজের  সত্তায় স্রষ্টার সত্যকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলোকাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় লিখেছেনÑ ‘স্রষ্টারে খোঁজো- আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে/ইচ্ছা-অন্ধ! আখি খোল দেখ দর্পণে নিজ কায়া/দেখিবে তোমারি সব অবয়বে পড়েছে তাহার ছায়াকেবল কাব্যে নয়, সঙ্গীতেও আছে একই দার্শনিক ভাবের দ্যোতনাÑ ‘অন্তরে তুমি আছো চির দিন/ওগো অন্তর্যামী!/বাইরে বৃথাই যত খুঁজি তাই/পাইনা তোমারে আমিঅন্তরের এই সত্যানুভূতি তার সত্তায় গভীর এক আস্থার মোহনা তৈরী করেছিলোযেখানে সত্যের আলোয় স্নাত, পুলকিত ও প্রশান্ত কবি বলেনÑ ‘আল্লা পরম প্রিয়তম মোর, আল্লা ত দূরে নয়/নিত্য আমারে জড়াইয়া থাকে, পরম সে প্রেমময়অত:পর কাজী নজরুলের কবিতায় আমরা শুধু বিদ্রোহ পাচ্ছিনা, শুধু সাম্যের আকুলতা দেখছিনা, যুদ্ধের নাকাড়াধ্বণিই শুনছিনা, শুনছি গভীর থেকে গভীরতর এক প্রতীতির লহরী, শুনছি আত্মশক্তির চূড়াস্পর্শী বিজয়গাঁথাতার প্রেম, তার সংগ্রাম, তার আত্মদহন, আত্মখণন, সব কিছুর মর্মমূলে আত্মবোধের প্রাণসম্পদ রয়েছে, যা জর্জ বার্কলী প্রবর্তিত ভাববাদ, কিংবা পাশ্চাত্যদর্শনের অতিমানব চেতনা থেকে পৃথকএ হচ্ছে কাজী কবির স্বয়ং প্রকাশ মৌলিকত্ব; সসীমের মাঝে অসীমের উপলব্ধি, প্রলয়ের সাথে সৃষ্টির অভিপ্রকাশ, ব্যষ্টির ভিতরে সমষ্টির সত্তানুভূতিÑ যা সেই মৌলিকত্বের বৈচিত্রময় নক্ষত্রালোক মাত্রকবির সত্তায় জীবনবোধের স্বচ্ছ এক দর্পণ ছিলো, সদুত্তর ছিলো জীবনজিজ্ঞাসারফলত তার সত্য নিখিল আত্মার সমান্তরাল হতে পেরেছেএ কথাই আমরা শুনতে পাই কবির উচ্চারণেÑ ‘আমি জানি, আমার কণ্ঠের ঐ প্রলয় হুংকার/ একা আমার নয়, সে যে নিখিল আত্মার যন্ত্রণা চিৎকারকাজী নজরুলের এই যন্ত্রণা চিৎকার জানিয়ে দিলো একটি জাতিকেযে জাতি ছিলো ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ছিন্নভিন্ন, আত্মপরিচয় সংকটে চলৎরহিতকাজী কবি তার কবিতায় জাগৃতির দ্রিম দ্রিম তানা দ্রিম দ্রিম ধ্বণি তুলে, জাতের নামে বজ্জাতি ও জাত-জালিয়াতের মুন্ডু খসিয়ে বাঙালীকে সত্যিকার অর্থে একদেহ, এক জাতিতে রূপায়িত হবার সুস্পষ্ট পথনির্দেশ করলেনযে পথের লক্ষ্যকেন্দ্র হলো স্বাধীন, সার্বভৌম, সুখী-সমৃদ্ধ, জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত একটি প্রগতিশীল সমাজ ও আত্মনির্ভরশীল জাতিরাষ্ট্রএ লক্ষ্য অর্জনে দূর্গম গীরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে জাতির মানসিক ও ব্যবহারিক প্রস্তুতির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনিকবির এ বক্তব্য নিছক তত্তচর্চা ছিলোনা; ‘উন্নত মম শির বলে এতোটাই ভীম বেগে তিনি সে আওয়াজ তুললেন যে, তার দামামার গর্জনে জাতি জাগলো, এবং যতক্ষণনা মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তারা থামবেনা বিশ্বের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনাস্বাধীনতার মধ্য দিয়ে সে ঘটনা পরিণতি পায়নি, বরং অংশত প্রকাশিত হয়েছে, সে ঘটনা এখনো ঘটছে এবং ঘটতে থাকবে, যতদিন না অর্জিত হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য, যতদিন না বিশ্বসভায় বাংলাদেশ হিমাদ্রিশিখরে সমাসীন হবেকাজী নজরুল ইসলাম এ জাতির মানসভূমিতে যেভাবে সংসক্ত, তেমনি জাতি-গোষ্ঠী হয়ে উঠার পথপরিক্রমায়তিনি অবিচ্ছিন্ন স্বাধীনতায়, সংগ্রামে, এ জাতির নিঃশ্বাস ও বিশ্বাসেএ অবিচ্ছিন্নতা চির অটুট, চির অম্লান