মুসা আল হাফিজ
তার আবির্ভাবের পর বাংলাদেশের ইতিহাস আর আগের জায়গায় থাকলো না। ইতিহাসের কক্ষপথে নতুন এক বিপ্লবের সাইরেন বেজে উঠলো। গর্জে উঠলো মানচিত্রের কেশরওয়ালা সিংহ। যার গর্জনময় কবিতার
অস্তিত্ব গতকালও ছিল কেবলমাত্র স্বপ্ন, অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের উত্থান কল্পনাকেও করলো পরাজিত। একেবারে ঘূর্ণিঝড়ের মতো, ঝঞ্চার তীব্রতায়,
সমুদ্রের উত্থালতায় তার উদ্ভাসন ঘটলো। যার ফলে প্রাণ আবেগের কোলাহলে জেগে উঠলো গোরাস্তান, যৌবনের রক্তকল্লোলে গর্জে উঠলো মুমূর্ষ জনপদ, চেতনার বারুদস্পর্শে জ্বলে উঠলো দ্রোহের আগ্নেয়গীরি। বিশ্বাসের বৃষ্টিধারায় ভেসে যেতে লাগলো নাস্তিক্যের কেদ, পরাধীনতার অন্ধকারার খসে পড়লো ইটপাথর এবং সাম্য মানবতা ও মুক্তি
প্রগতির দামামা বাজিয়ে আমামা বাধা কবি ভাঙা কিল্লায় নিশান উড়িয়ে ঘোষণা করলেন “নয়া জামানার ইশতেহার”।
তার অন্তরে ছিলো অনির্বাণ বহ্নি, তার চেতনায় ছিলো প্রেমের রক্তধারা, তার বিশ্বাসে ছিলো স্বাধীনতার হুতাশন, তার শিল্পবোধে ছিলো মানবিক অঙ্গীকার আর তার অস্তিত্বের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে সুরভি ছড়াচ্ছিল ঈমানের অবিশ্বাস্য লাল গোলাপ। বঞ্চিতের বেদনায় তার রক্তে জেগে ওঠে সেই রোষ, পরাধীন মাতৃভূমি তার চেতনায় জাগিয়েছিলো ক্ষোভ, পশুশক্তির আস্ফালন তার আত্মার গভীরে সৃষ্টি করছিলো বজ্রাগ্নির উত্তাপ। সেই রোষ, সেই ক্ষোভ, আর উত্তাপই তার কবিতাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণাবেগ, দিয়েছে প্রকাশের দূরন্ত সাহস আর বিকাশের উদ্দামতা। পান্ডিত্বের গুরুভার কঠিনতাকে তিনি হেলাভরে এড়িয়ে গেছেন, সূক্ষ্মদার্শনিক তত্তকথার প্রতি তার কোনো আদিখ্যেতা ছিলোনা, পশ্চিমাজ্ঞান ও চিন্তার শুড়িখানার প্রতি তার ছিলোনা অকারণ মোহ, মানবতার ভাষ্যকার হওয়ার জন্যই তার এসবের প্রয়োজন ছিলোনা মোঠেই। তিনি আত্মার ঐশ্বর্য নিয়ে, শিল্পের বিক্রম নিয়ে, প্রজ্ঞার দীপ্তি নিয়ে, মনীষার বিশালতা নিয়ে যে অমূল্য ভাব, ভাষা ও সাহিত্য সম্পদ মানবতার জন্য রেখে গেলেন তা শুধু একটি জাতির নয়, একটি যুগের নয় বরং যুগ-যুগান্তরে বিশ্বমানবতার অনস্বীকার্য সম্পদ হয়ে আছে, উজ্জলতার উপকরণ হয়ে আছে। ‘যেথায় মিথ্যা ভন্ডামী ভাই করবো সেথায় বিদ্রোহ’Ñ নজরুলের এই ছিলো জীবনের মন্ত্র। যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, তিনি তার ‘রক্তলেখায়’ তাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন। অগ্নিবীণা ও বিষের বাশিতে তুলেছেন দীপক রাগিনী। ‘গগণপথে সাতসারথীর’ ঘোড়া হাকাবার বিলাসিতা তার ছিলোনা, বরং ‘মর্ত্যে দানব মানব পীঠে কোড়া’ মারছেÑএটাই ছিলো তার বেদনা, এর উৎসাদনেই ছিলো তার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের সাগর পাড়ি দিতে যে কবি সাঁতার শুরু করলেন, তার জীবনে আরাম থাকবে কন? হাঙ্গর কুমীরের ঢেউয়ে তিনি দোল খেয়েছেন অবিরত, এক তরঙ্গ তাকে আছড়ে ফেলেছে আরেক দু:সহ তরঙ্গে । দুর্দিনের ঝড় তার যাত্রাপথকে করেছে আধারাচ্ছন্ন। শক্রতার বিষাক্ত শ্বাপদ ধেয়ে এসেছে শা শা করে। কিন্তু কাজী নজরুল পরাভব কী জিনিস তা তো জানতেন না। ফলত তিনি ইথারে ইথারে ছড়িয়েছেন অজেয় মুজাহীদের সংগীতÑ‘আল্লাহ আমার প্রভূ আমার নাহি নাহি ভয়’ এতই শিলাদৃঢ় যার প্রত্যয় তিনি তো পরাজিত হতে পারেন না। হ্যাঁ নজরুল থেকে গেছেন, তার সত্য হয়ে আছে অক্ষয় মীনার। যে দিন কাজী কবি সাহিত্যে তার পদচিহ্ন ফেলা শুরু করেন, সেদিন বাংলা সাহিত্য আরেকবার মহাকালের অমোঘ জীবনীশক্তির দ্বারা অন্ত:সত্তা হলো। সে দিন দিগন্তে আরেকবার লিখিত হলো বিশ্বজয়ের পংক্তিমালা। ভাবুন তো ‘খেয়াপারের তরণী’র কথা! তখনও তিনি হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম। উন্মিলনের একেবারে উষালগ্ন। সবেমাত্র তিনি জানান দিচ্ছেন আত্মপ্রকাশ। কিন্তু কী রাজকীয় সেই আত্মপ্রকাশ। খেয়াপারের তরণী কবিতাটাই কাঁপিয়ে দিলো গোটা সাহিত্য বলয়কে। সবাই দেখলো কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে নবযুগের এক সুনিপুন শিল্পির অপূর্ব কারুকাজ। কীভাবে, কী ভাষায়, শব্দে, ছন্দে এক আশ্চর্য উৎসারণ। মোহিত লাল মজুমদারকেও তখন লিখতে হলোÑ‘বাংলা কাব্যের যে আধুনাতন ছন্দ ঝংকার ও ধ্বনিবৈচিত্রে এককালে মুগ্ধ হইয়াছিলাম, কিন্তু অবশেষে নিরতিশয় পীড়িত হইয়া যে সুন্দরী মিথ্যারূপিনীর উপর বিরক্ত হইয়াছি, কাজী সাহেবের কবিতা পড়িয়া সেই ছন্দ ঝংকারে আবার আস্থা হইয়াছে। কাজী সাহেবের ছন্দ বিস্ময়, ভয় ভক্তি সাহস অটল বিশ্বাস এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত একটি ভীষণ- গম্ভীর অতিপ্রকৃত কল্পনার সুর শব্দ বিন্যাস ও শব্দ ঝংকারে মূর্তি যেন ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমি কেবল একটি মাত্র শ্লোক উদ্ধৃত করিবÑ ‘আবু বকর উসমান উমর আলী হায়দর/দাড়ী যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর/কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/ দাড়ী মুখে সারি গান লা-শারীক আল্লাহ!’ এই শ্লোকে মিল, ভাবানুযায়ী শব্দবিন্যাস এবং গম্ভীর ধ্বনি আকাশে ঘণায়মান মেঘপুঞ্জের প্রলয় ডম্বরুধ্বনিকে পরাভূত করিয়াছে। বিশেষ করে এ ছত্রের শেষ বাক্যÑ ‘লা-শারীক আল্লাহ’ যেমন মিল তেমন আশ্চর্য প্রয়োগ। ছন্দের অধিন হইয়া এবং চমৎকার মিলের সৃষ্টি করিয়া এই আরবী বাক্য যোজনা বাংলা কবিতায় অভিনব ধ্বনি গাম্ভীর্য লাভ করিয়াছে।’ মোহিত লাল বিস্ময় মেনেছিলেন কবির শব্দব্যবহারের নৈপুণ্যে। মোহিত হয়েছিলেন কবির ধ্বনিমাধুর্যে। উপলব্ধি করেছিলেন কবির শব্দ ও বাক্য গাথুনির কাছে আকাশের মেঘগর্জনের পরাজয়। আর বিষয় বস্তুতে দেখেছিলেন নতুন এক মহাদেশের দ্বারোদঘাটন। বিকাশের প্রথম দিন থেকেই ‘একহাতে বিষের বাশরী আর হাতে রণতূর্য নিয়ে’ Ñ‘হিংসা মদের মত্ত বারণ রণে’ তিনিই ছিলেন মহাবীর। যে ভাষা তার মুুখে এসেছে তাই প্রকাশ করেছে কবির তপ্ত আবেগ, তারই উপযুক্ত ছন্দধারা বিপুল প্রাণবন্যার মতো প্রবাহিত হয়েছে। কবির নৈসর্গির প্রতিভার ক্ষমতা এই ভাষা ও ছন্দকে দিয়েছে অকৃত্রিম সাফল্য। উপনীত হয়েছে উচ্চতর কবিতার স্বর্ণদ্বীপে। কবির সেই প্রতিভার উন্মেষ রহস্য বিস্ময়কর ও ব্যাখ্যার অতীত। প্রথাগত সৌন্দর্য চেতনার দাসত্বের বেড়ি প্রথম দিকেই কবি ছিড়ে ফেলেন । তার সৌন্দর্য হেসে উঠেছে জীবনের প্রত্যক্ষতায়। অথচ, এই প্রত্যক্ষতার প্রাদুর্ভাব যে কোন কবিতার শিল্পমহিমাকে দুলঞ্চিত না করে ছাড়েনা। কিন্তু কাজী কবি জীবনানুভূতির সাথে কাব্যসৌন্দর্যের গড়েছেন আত্মীয়তা। স্বপ্নময় সৌন্দর্যলোকের দিকে প্রবাহিত করেছেন জীবনের আবিল জলরাশীকে। যাপিত জীবনের অসুস্থ গতিধারাকে মহোত্তম আকুতির আলোকমালায় বিধৌত করে দান করেছেন অপরূপ নান্দনিকতা। মানুষের বেঁচে থাকার দূরন্ত ক্ষুধা, তার প্রবৃত্তির অবারিত অভিলাষ, তার আত্মপ্রসারণের দুর্বার তৃষ্ণা , কাজী কবির কাব্যে ছন্দসুন্দর উদ্যানে শিল্পউচ্ছাসের মহীরোহ হয়ে উঠেছে। সেই মহীরোহ থেকে জন্ম নিলো আগ্নেয় ফুল। ডালপালার আড়াল ভেদ করে কোষমুক্ত তরবারির প্রখর দীপ্তি ঝলসে উঠলো, পল্লবের নড়াচড়া ও লতা পাতার গুঞ্জরনে এই প্রথমবার উচ্চকিত হতে লাগলো জনতার দীপ্ত দাবী, ধ্বনিত হলো অপরাজেয় মানবতার বজ্র নিনাদ। ‘অপরাজেয় মানবতা’ এই হলো নজরুলের আত্মার ধ্বনি। এজন্যই তার কবিতার উৎসারণ। এরই লক্ষ্যেই তার প্রেমের বাধভাঙ্গা ব্যাকুলতা। এরই জয়গান গেয়ে ‘দুর্দিনের দুর্গশিরে উড়িয়েছেন তিনি বিজয় কেতন’। মানবাতর মহিমা প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতা অপরিহার্য। অতএব, নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার জন্য গণবিপ্লবের বৈশাখী ঝড়কে উত্থাল করে তুললেন। বিপ্লব ছাড়া তো স্বাধীনতা অসম্ভব। গণমনের প্রস্তুতি ছাড়া তো স্বাধীনতা অকল্পনীয়। কাজী নজরুল কবিতায়, গানে, বাগ্মীতায় সেই বিপ্লবের বীজতলা তৈরী করলেন। সেখান থেকে জাগলো নবচেতনার চারাবৃক্ষ। আর স্বাধীনতা তো এরই ফসলমাত্র। এ দেশে স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কাজী কবির সাহিত্য যে ভূমিকা রেখেছে, তা তুল্য হতে পারে রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে টলস্টয়, ফরাসী বিপ্লবের ক্ষেত্রে রুশো ও ভল্টেয়ারের ভূমিকার সাথে। শুধু কি তাই? তার আবির্ভাব গোটা বাংলা সাহিত্যকে দিলো নব বিবর্তন। নিত্য নতুন চিন্তায়, নিত্য নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাংলা সাহিত্য চলচ্ছল হয়ে উঠলো। তার আগে বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকরা ছিলেন কোনটাশা, অপাঙেক্তয় দুর্বল সংখ্যালঘু ও সন্ত্রস্থ। কিন্তু নজরুল যেই মাত্র জাগলেন, সাথে সাথে তারা হয়ে উঠলো আত্মবিশ্বাসী অভিজাত, পরাক্রান্ত ও সংখ্যাগুরু। আবুল মনসুর আহমদ ঠিকই লিখেছেনÑ‘নজরুল ইসলাম একদিন বিনা নোটিশে আল্লাহু আকবার তাকবীরের হাঁক মেরে ঝড়ের বেগে এসে বাংলা সাহিত্যের দূর্গ জয় করে বসলেন। মুসলিম বাংলার ভাঙা কিল্লায় নিশান উড়িয়ে দিলেন। একদিনে দূর করে দিলেন মুসলিম বাংলায় ভাষা ও ভাবের হীনমন্যতা। মনের দিক থেকে জাতীয় জীবনে এ একটা বিপ্লব। এ বিপ্লবের একমাত্র ইমাম কবি কাজী নজরুল ইসলাম’। এ বিপ্লবের ফলেই তো বলিষ্ট হতে পারলো জাতিসত্তার আত্মশক্তি। বিপন্নতার গোরস্তানে স্বাধীকারের প্রাণসঞ্চারে বাণীর বীণা নিলেন হাতে, তা হয়ে গেলো অগ্নিবীণা। আত্মবিস্মৃতির মুমূর্ষ প্রেক্ষাপটে জাতীয় শক্তির জাগরণে তিনি সুরের বাশি নিলেন হাতে, হয়ে গেলো বিষের বাশি। পশুশক্তির পাপের জাহান্নামের আগুনে তিনি মানবতার বিজয়ের স্বপ্নে হাসলেন পুষ্পের হাসি। যেখানে হাজারো প্রতিবন্ধকতা ‘ফণিমনসার’ কাটাপুঞ্জ তৈরী করেছে, সেখানে তিনি ছড়িয়ে দিলেন ‘প্রলয়শিখা’। ‘ভাঙার গান’ গেয়ে গেয়ে তিনি হয়ে উঠলেন ‘বাধনহারা’। ‘সিন্ধুহিল্লোল’। ‘সর্বহারার’ হাতে পায়ে যে বৈষম্যের ‘জিঞ্জির’ তা ছিড়ে ফেলার জন্য তিনি ছুটিয়ে দিলেন ‘সাম্যবাদী’ ঝড়। আর ‘মরুভাস্করের’ সুমহান রশ্মিতে মানবতার আকাশে তিনি অঙ্কন করলেন ‘নতুন চাঁদ’ এর মতো মানবিক ‘চিত্তনামা’। তারপর? তারপর ইতিহাসের প্রচছদ গেলো পাল্টে। জাতীয় জীবনের গতিধারা অসম্ভব দ্রুততায় হয়ে গেলো রূপান্তরিত। কিন্তু শত বিবর্তন সত্তেও দুর্দিনের দূর্গশিরে উত্তোলিত তার সেই শিল্প কেতন পতপত করে উড়তে থাকলো আগের মতোই। বিস্ময়! এ যেনো এক মহাবিস্ময়! হ্যাঁ, কাজী নজরুলের জগতটাই বিস্ময়ের অতল পারাবার। বিশ্বসাহিত্যে কাজী নজরুলের বিকল্প একমাত্র কাজী নজরুল ইসলাম।
তার অন্তরে ছিলো অনির্বাণ বহ্নি, তার চেতনায় ছিলো প্রেমের রক্তধারা, তার বিশ্বাসে ছিলো স্বাধীনতার হুতাশন, তার শিল্পবোধে ছিলো মানবিক অঙ্গীকার আর তার অস্তিত্বের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে সুরভি ছড়াচ্ছিল ঈমানের অবিশ্বাস্য লাল গোলাপ। বঞ্চিতের বেদনায় তার রক্তে জেগে ওঠে সেই রোষ, পরাধীন মাতৃভূমি তার চেতনায় জাগিয়েছিলো ক্ষোভ, পশুশক্তির আস্ফালন তার আত্মার গভীরে সৃষ্টি করছিলো বজ্রাগ্নির উত্তাপ। সেই রোষ, সেই ক্ষোভ, আর উত্তাপই তার কবিতাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণাবেগ, দিয়েছে প্রকাশের দূরন্ত সাহস আর বিকাশের উদ্দামতা। পান্ডিত্বের গুরুভার কঠিনতাকে তিনি হেলাভরে এড়িয়ে গেছেন, সূক্ষ্মদার্শনিক তত্তকথার প্রতি তার কোনো আদিখ্যেতা ছিলোনা, পশ্চিমাজ্ঞান ও চিন্তার শুড়িখানার প্রতি তার ছিলোনা অকারণ মোহ, মানবতার ভাষ্যকার হওয়ার জন্যই তার এসবের প্রয়োজন ছিলোনা মোঠেই। তিনি আত্মার ঐশ্বর্য নিয়ে, শিল্পের বিক্রম নিয়ে, প্রজ্ঞার দীপ্তি নিয়ে, মনীষার বিশালতা নিয়ে যে অমূল্য ভাব, ভাষা ও সাহিত্য সম্পদ মানবতার জন্য রেখে গেলেন তা শুধু একটি জাতির নয়, একটি যুগের নয় বরং যুগ-যুগান্তরে বিশ্বমানবতার অনস্বীকার্য সম্পদ হয়ে আছে, উজ্জলতার উপকরণ হয়ে আছে। ‘যেথায় মিথ্যা ভন্ডামী ভাই করবো সেথায় বিদ্রোহ’Ñ নজরুলের এই ছিলো জীবনের মন্ত্র। যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, তিনি তার ‘রক্তলেখায়’ তাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন। অগ্নিবীণা ও বিষের বাশিতে তুলেছেন দীপক রাগিনী। ‘গগণপথে সাতসারথীর’ ঘোড়া হাকাবার বিলাসিতা তার ছিলোনা, বরং ‘মর্ত্যে দানব মানব পীঠে কোড়া’ মারছেÑএটাই ছিলো তার বেদনা, এর উৎসাদনেই ছিলো তার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের সাগর পাড়ি দিতে যে কবি সাঁতার শুরু করলেন, তার জীবনে আরাম থাকবে কন? হাঙ্গর কুমীরের ঢেউয়ে তিনি দোল খেয়েছেন অবিরত, এক তরঙ্গ তাকে আছড়ে ফেলেছে আরেক দু:সহ তরঙ্গে । দুর্দিনের ঝড় তার যাত্রাপথকে করেছে আধারাচ্ছন্ন। শক্রতার বিষাক্ত শ্বাপদ ধেয়ে এসেছে শা শা করে। কিন্তু কাজী নজরুল পরাভব কী জিনিস তা তো জানতেন না। ফলত তিনি ইথারে ইথারে ছড়িয়েছেন অজেয় মুজাহীদের সংগীতÑ‘আল্লাহ আমার প্রভূ আমার নাহি নাহি ভয়’ এতই শিলাদৃঢ় যার প্রত্যয় তিনি তো পরাজিত হতে পারেন না। হ্যাঁ নজরুল থেকে গেছেন, তার সত্য হয়ে আছে অক্ষয় মীনার। যে দিন কাজী কবি সাহিত্যে তার পদচিহ্ন ফেলা শুরু করেন, সেদিন বাংলা সাহিত্য আরেকবার মহাকালের অমোঘ জীবনীশক্তির দ্বারা অন্ত:সত্তা হলো। সে দিন দিগন্তে আরেকবার লিখিত হলো বিশ্বজয়ের পংক্তিমালা। ভাবুন তো ‘খেয়াপারের তরণী’র কথা! তখনও তিনি হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম। উন্মিলনের একেবারে উষালগ্ন। সবেমাত্র তিনি জানান দিচ্ছেন আত্মপ্রকাশ। কিন্তু কী রাজকীয় সেই আত্মপ্রকাশ। খেয়াপারের তরণী কবিতাটাই কাঁপিয়ে দিলো গোটা সাহিত্য বলয়কে। সবাই দেখলো কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে নবযুগের এক সুনিপুন শিল্পির অপূর্ব কারুকাজ। কীভাবে, কী ভাষায়, শব্দে, ছন্দে এক আশ্চর্য উৎসারণ। মোহিত লাল মজুমদারকেও তখন লিখতে হলোÑ‘বাংলা কাব্যের যে আধুনাতন ছন্দ ঝংকার ও ধ্বনিবৈচিত্রে এককালে মুগ্ধ হইয়াছিলাম, কিন্তু অবশেষে নিরতিশয় পীড়িত হইয়া যে সুন্দরী মিথ্যারূপিনীর উপর বিরক্ত হইয়াছি, কাজী সাহেবের কবিতা পড়িয়া সেই ছন্দ ঝংকারে আবার আস্থা হইয়াছে। কাজী সাহেবের ছন্দ বিস্ময়, ভয় ভক্তি সাহস অটল বিশ্বাস এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত একটি ভীষণ- গম্ভীর অতিপ্রকৃত কল্পনার সুর শব্দ বিন্যাস ও শব্দ ঝংকারে মূর্তি যেন ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমি কেবল একটি মাত্র শ্লোক উদ্ধৃত করিবÑ ‘আবু বকর উসমান উমর আলী হায়দর/দাড়ী যে এ তরণীর নাই ওরে নাই ডর/কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/ দাড়ী মুখে সারি গান লা-শারীক আল্লাহ!’ এই শ্লোকে মিল, ভাবানুযায়ী শব্দবিন্যাস এবং গম্ভীর ধ্বনি আকাশে ঘণায়মান মেঘপুঞ্জের প্রলয় ডম্বরুধ্বনিকে পরাভূত করিয়াছে। বিশেষ করে এ ছত্রের শেষ বাক্যÑ ‘লা-শারীক আল্লাহ’ যেমন মিল তেমন আশ্চর্য প্রয়োগ। ছন্দের অধিন হইয়া এবং চমৎকার মিলের সৃষ্টি করিয়া এই আরবী বাক্য যোজনা বাংলা কবিতায় অভিনব ধ্বনি গাম্ভীর্য লাভ করিয়াছে।’ মোহিত লাল বিস্ময় মেনেছিলেন কবির শব্দব্যবহারের নৈপুণ্যে। মোহিত হয়েছিলেন কবির ধ্বনিমাধুর্যে। উপলব্ধি করেছিলেন কবির শব্দ ও বাক্য গাথুনির কাছে আকাশের মেঘগর্জনের পরাজয়। আর বিষয় বস্তুতে দেখেছিলেন নতুন এক মহাদেশের দ্বারোদঘাটন। বিকাশের প্রথম দিন থেকেই ‘একহাতে বিষের বাশরী আর হাতে রণতূর্য নিয়ে’ Ñ‘হিংসা মদের মত্ত বারণ রণে’ তিনিই ছিলেন মহাবীর। যে ভাষা তার মুুখে এসেছে তাই প্রকাশ করেছে কবির তপ্ত আবেগ, তারই উপযুক্ত ছন্দধারা বিপুল প্রাণবন্যার মতো প্রবাহিত হয়েছে। কবির নৈসর্গির প্রতিভার ক্ষমতা এই ভাষা ও ছন্দকে দিয়েছে অকৃত্রিম সাফল্য। উপনীত হয়েছে উচ্চতর কবিতার স্বর্ণদ্বীপে। কবির সেই প্রতিভার উন্মেষ রহস্য বিস্ময়কর ও ব্যাখ্যার অতীত। প্রথাগত সৌন্দর্য চেতনার দাসত্বের বেড়ি প্রথম দিকেই কবি ছিড়ে ফেলেন । তার সৌন্দর্য হেসে উঠেছে জীবনের প্রত্যক্ষতায়। অথচ, এই প্রত্যক্ষতার প্রাদুর্ভাব যে কোন কবিতার শিল্পমহিমাকে দুলঞ্চিত না করে ছাড়েনা। কিন্তু কাজী কবি জীবনানুভূতির সাথে কাব্যসৌন্দর্যের গড়েছেন আত্মীয়তা। স্বপ্নময় সৌন্দর্যলোকের দিকে প্রবাহিত করেছেন জীবনের আবিল জলরাশীকে। যাপিত জীবনের অসুস্থ গতিধারাকে মহোত্তম আকুতির আলোকমালায় বিধৌত করে দান করেছেন অপরূপ নান্দনিকতা। মানুষের বেঁচে থাকার দূরন্ত ক্ষুধা, তার প্রবৃত্তির অবারিত অভিলাষ, তার আত্মপ্রসারণের দুর্বার তৃষ্ণা , কাজী কবির কাব্যে ছন্দসুন্দর উদ্যানে শিল্পউচ্ছাসের মহীরোহ হয়ে উঠেছে। সেই মহীরোহ থেকে জন্ম নিলো আগ্নেয় ফুল। ডালপালার আড়াল ভেদ করে কোষমুক্ত তরবারির প্রখর দীপ্তি ঝলসে উঠলো, পল্লবের নড়াচড়া ও লতা পাতার গুঞ্জরনে এই প্রথমবার উচ্চকিত হতে লাগলো জনতার দীপ্ত দাবী, ধ্বনিত হলো অপরাজেয় মানবতার বজ্র নিনাদ। ‘অপরাজেয় মানবতা’ এই হলো নজরুলের আত্মার ধ্বনি। এজন্যই তার কবিতার উৎসারণ। এরই লক্ষ্যেই তার প্রেমের বাধভাঙ্গা ব্যাকুলতা। এরই জয়গান গেয়ে ‘দুর্দিনের দুর্গশিরে উড়িয়েছেন তিনি বিজয় কেতন’। মানবাতর মহিমা প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতা অপরিহার্য। অতএব, নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার জন্য গণবিপ্লবের বৈশাখী ঝড়কে উত্থাল করে তুললেন। বিপ্লব ছাড়া তো স্বাধীনতা অসম্ভব। গণমনের প্রস্তুতি ছাড়া তো স্বাধীনতা অকল্পনীয়। কাজী নজরুল কবিতায়, গানে, বাগ্মীতায় সেই বিপ্লবের বীজতলা তৈরী করলেন। সেখান থেকে জাগলো নবচেতনার চারাবৃক্ষ। আর স্বাধীনতা তো এরই ফসলমাত্র। এ দেশে স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কাজী কবির সাহিত্য যে ভূমিকা রেখেছে, তা তুল্য হতে পারে রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে টলস্টয়, ফরাসী বিপ্লবের ক্ষেত্রে রুশো ও ভল্টেয়ারের ভূমিকার সাথে। শুধু কি তাই? তার আবির্ভাব গোটা বাংলা সাহিত্যকে দিলো নব বিবর্তন। নিত্য নতুন চিন্তায়, নিত্য নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বাংলা সাহিত্য চলচ্ছল হয়ে উঠলো। তার আগে বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকরা ছিলেন কোনটাশা, অপাঙেক্তয় দুর্বল সংখ্যালঘু ও সন্ত্রস্থ। কিন্তু নজরুল যেই মাত্র জাগলেন, সাথে সাথে তারা হয়ে উঠলো আত্মবিশ্বাসী অভিজাত, পরাক্রান্ত ও সংখ্যাগুরু। আবুল মনসুর আহমদ ঠিকই লিখেছেনÑ‘নজরুল ইসলাম একদিন বিনা নোটিশে আল্লাহু আকবার তাকবীরের হাঁক মেরে ঝড়ের বেগে এসে বাংলা সাহিত্যের দূর্গ জয় করে বসলেন। মুসলিম বাংলার ভাঙা কিল্লায় নিশান উড়িয়ে দিলেন। একদিনে দূর করে দিলেন মুসলিম বাংলায় ভাষা ও ভাবের হীনমন্যতা। মনের দিক থেকে জাতীয় জীবনে এ একটা বিপ্লব। এ বিপ্লবের একমাত্র ইমাম কবি কাজী নজরুল ইসলাম’। এ বিপ্লবের ফলেই তো বলিষ্ট হতে পারলো জাতিসত্তার আত্মশক্তি। বিপন্নতার গোরস্তানে স্বাধীকারের প্রাণসঞ্চারে বাণীর বীণা নিলেন হাতে, তা হয়ে গেলো অগ্নিবীণা। আত্মবিস্মৃতির মুমূর্ষ প্রেক্ষাপটে জাতীয় শক্তির জাগরণে তিনি সুরের বাশি নিলেন হাতে, হয়ে গেলো বিষের বাশি। পশুশক্তির পাপের জাহান্নামের আগুনে তিনি মানবতার বিজয়ের স্বপ্নে হাসলেন পুষ্পের হাসি। যেখানে হাজারো প্রতিবন্ধকতা ‘ফণিমনসার’ কাটাপুঞ্জ তৈরী করেছে, সেখানে তিনি ছড়িয়ে দিলেন ‘প্রলয়শিখা’। ‘ভাঙার গান’ গেয়ে গেয়ে তিনি হয়ে উঠলেন ‘বাধনহারা’। ‘সিন্ধুহিল্লোল’। ‘সর্বহারার’ হাতে পায়ে যে বৈষম্যের ‘জিঞ্জির’ তা ছিড়ে ফেলার জন্য তিনি ছুটিয়ে দিলেন ‘সাম্যবাদী’ ঝড়। আর ‘মরুভাস্করের’ সুমহান রশ্মিতে মানবতার আকাশে তিনি অঙ্কন করলেন ‘নতুন চাঁদ’ এর মতো মানবিক ‘চিত্তনামা’। তারপর? তারপর ইতিহাসের প্রচছদ গেলো পাল্টে। জাতীয় জীবনের গতিধারা অসম্ভব দ্রুততায় হয়ে গেলো রূপান্তরিত। কিন্তু শত বিবর্তন সত্তেও দুর্দিনের দূর্গশিরে উত্তোলিত তার সেই শিল্প কেতন পতপত করে উড়তে থাকলো আগের মতোই। বিস্ময়! এ যেনো এক মহাবিস্ময়! হ্যাঁ, কাজী নজরুলের জগতটাই বিস্ময়ের অতল পারাবার। বিশ্বসাহিত্যে কাজী নজরুলের বিকল্প একমাত্র কাজী নজরুল ইসলাম।
