মাহমুদ হাসান
ছাবি্বশ মার্চ আমাদের মহান
স্বাধীনতা ও জাতীয় একটি দিবস। স্বাধীনতা কারো দয়ার দান নয়। দীর্ঘ
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উনিশ' একাত্তরের ছাবি্বশ মার্চ বাংলাদেশ
স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। দেশের মজলুম জনগণের স্বার্থে
স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের অসংখ্য উলামায়ে কেরাম তাদের জান-মালসহ সর্বশক্তি
দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা মনে
করেন স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেম সমাজের কোনো অবদান নেই। এমনটি মনে করার
কোনো অবকাশ নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমদের অবদান অনস্বীকার্য। অপরদিকে
অনেক আলেমও এমন ধারণার শিকার। তাই যে কোনো দাবিতে আমাদের যেমন ঐতিহাসিক
জোর নেই, তাদেরও তেমন দাবি পূরণের ইচ্ছা নেই। ফলে আলেম সমাজ স্বদেশে,
স্বজাতির মধ্যে থেকেও এক ধরনের বিদেশি ও ভিন্ন জাতির মতো বসবাস করছেন।স্বাধীনতা যুদ্ধে উলামায়ে কেরাম ছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সিপাহসালার। বাংলাদেশের বিখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.) সে সময় স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, 'এ যুদ্ধ ইসলাম আর কুফরের যুদ্ধ নয়, এটা হলো জালেম আর মজলুমের যুদ্ধ'। পাকিস্তানিরা জালেম, এদেশের বাঙালিরা মজলুম। তাই সামর্থ্যের আলোকে সকলকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং এটাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করতে হবে'।এ দেশের শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ, ফেদায়ে মিল্লাত আল্লামা হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.)-এর বিশিষ্ট খলিফা, আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা লুৎফর রহমান বর্ণভী ছিলেন একজন দূরদর্শী সিপাহসালার। তিনি তখন পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং বিপদগ্রস্ত বাঙালি মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে একবার তিনি আল্লামা আশরাফ আলী ধরমপুরী (রাহ.)কে বলেছিলেন, 'আমি সূর্যের মতো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, কয়েক দিনের ভেতরেই এদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে এবং পাকিস্তানি হানাদারের জুলুমের কবল থেকে এ দেশের জনগণ মুক্তি লাভ করবে'।আড়াইহাজার থানার কমান্ডার মরহুম শামসুল হকের অধীনে আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রাহ.) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যখন আমি লালবাগ মাদরাসার ছাত্র তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ শুরু হলে আমার মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি হাফেজি হুজুর (রাহ.)কে প্রশ্ন করলাম; হুজুর এ যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা বা কর্তব্য কি? তখন হুজুর আমাকে বললেন পাকিস্তানি জালিম হানাদার বাহিনীর জুলুম থেকে এ দেশের মানুষকে রক্ষা করা অবশ্যই তোমার আমার সকলের কর্তব্য। তাই বসে থাকার আর সময় নেই, জালিমদের কবল থেকে মজলুমদের বাঁচানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কর। এ দেশের নিরীহ জনগণকে সহযোগিতা করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।আর সেই সময় হাফেজি হুজুর (রাহ.) বলেছিলেন, 'হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান' অর্থাৎ 'দেশপ্রেম ঈমানেরে অঙ্গ'। তার এ কথার উত্তর শুনে আমি বেশ অনুপ্রাণিত হয়ে আমিও মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়ে গেলাম।হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ (রাহ.) ও বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে ছিল। তার বক্তব্য ছিল বাঙালিদের পক্ষে। মাওলানা আব্দুস সালাম তিনি বলেন, '৭১ সালে আমি করাচি ইউসুফ বিন নুরী মাদরাসার ছাত্র। একদিন মুফতি মাহমুদ সাহেব মাদরাসায় এলে তাকে এক নেতা শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেছিল শেখ মুজিব গাদ্দারকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। তাকে এখনই হত্যা করা হবে তখন মুফতি সাহেব হুজর রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন শেখ মুজিব গাদ্দার নন; তিনি একজন দেশপ্রেমিক মুসলমান।মুফতি মাহমুদ (রা.) ১৩ মার্চ এক বক্তব্যে পরিষ্কার ভাষায় পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খানের নীতিকে ভুল আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর আহ্বান জানান। ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় যে, স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠক হিসেবে এবং এদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহ ও সহযোগিতায় আলেম সমাজেরও ভূমিকা আছে। কারণ সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন অসংখ্য কওমী উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখগণ। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, আল্লামা হাফেজি হুজুর (রাহ.), আল্লামা আসয়াদ মাদানী (রাহ.), আল্লামা লুৎফুর রহমান বরুণী (রা.), চরমোনাইর পীর ফজলুল করীম রাহ, আল্লামা কাজী মু'তাসিম বিল্লাহ, আল্লামা মুফতি নুরুল্ল্যাহ (রাহ.) আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রাহ.), আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী (রাহ.) আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ দা. বা, প্রমুখ।স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিসাংবাদিত মুসলিম নেতা বিশ্বের প্রখ্যাত আলেম আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আসয়াদ আল মাদানী ( রা.)-এর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। যখন পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশের নিরীহ মানুষের ওপর বর্বোরোচিত হামলা চালালো তাৎক্ষণিক তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেন এবং নিরীহ বাঙালিদের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে উলামায়ে কেরামদের ভূমিকা তথা অবদান দেখে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল হযরত হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.)-এর হাতে বাইয়াত তথা মুরিদ হয়ে গেলেন। তিনি বাইয়াত হওয়ার পর তাকে তার ভক্তও শীষ্যরা প্রশ্ন করল আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কিভাবে হাফেজি হুজুরের মতো রাজাকার এক ব্যক্তির কাছে মুরিদ হলেন, জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'হযরত হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.) কোনো রাজাকার নন, তিনি শ্রেষ্ঠ আলেম এবং সত্যিকার একজন দেশপ্রেমিক'। উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হলো মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তারা মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের সিপাহসালার হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে কওমী ওলামাদের অবদান ভূমিকা অবিস্মরনীয়।
ছপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের এই দেশ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত হয় এবং বাংলার হৃদপিন্ডে টকটক লাল স্বাধীনতার সুর্য উদ্ভাসিত হয়। সবুজ-শ্যামল স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেয়েছে হিজল তমাল,তরুলতা আর সবুজ শ্যামলতায় ঘেরা রুপসী রাংলাদেশ। বিশ্বেও দরবারে আমাদের আত্ম পরিচয় ঘটেছে স্বাধীন জাতি হিসাবে। স্বাধীনতা প্রতিটি জাতির গৌরব ও অহংকারে বিষয়।৭১’ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমের। পাকিস্তানীরা ছিল জালিম আর এদেশের নিরীহ মানূষ ছিল মাজলুম। সুস্থ-বিবেক সম্পন্ন কোন মানুষ কখনো জালেমের পক্ষাবলম্বন করতে পারেনা। মাজলুমকে সাহায্য করা, তাদের পক্ষে কথা বলা এটাই মনুষত্বের পরিচয় এবং ঈমানী দায়িত্ব। আর সে জন্যই এদেশের আলেম সমাজ এদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাড়িয়ে দেশের মানুষকে পাকিস্তানী জালিম শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। পাকিস্তানীহানাদার বাহিনীর জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রাজপথে যুদ্ধে করেছেন। কাজ করেছেন দেশ-প্রেমিক হয়ে। অসংখ্য উলামায়ে কেরামগণ তাদের জান-মাল ,সব শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে এ দেশের মাজলুম জনগণের স্বাার্থে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে উলামায়ে কেরামদের অবদান অনস্বীকার্য। নিম্নে উলামায়ে কেরামগণের নাম ও তাদের অবদানের কথা খুবই সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হল।৭১’ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে উলামায়ে কেরামরা-ই ছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সিপাহসালার। বাংলাদেশের বিখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ আল্লামা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.) সে সময় স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন,“এ যুদ্ধ ইসলাম আর কুফরের যুদ্ধ নয়,এটা হল জালেম আর মাজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানীরা জালেম আর এ দেশের বাঙ্গালীরা মাজলুম। তাই সামর্থ্যরে আলোকে সকলকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করতে হবে এবং এটাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করতে হবে”।এ দেশের শ্রেষ্ট বুজুর্গ ফেদায়ে মিল্লাত আল্লামা হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (রাহ.)এর বিশিষ্ট খলিফা,আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা লুৎফুর রহমান বর্র্র্ণভী ছিলেন একজন দূরদশী সিপাহসালার। তিনি তখন পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছিলেন এবং বিপদগ্রস্থ বাঙ্গালী মানুষদেরকে সাহায্য-সহযোগীতা করেছিলেন। তৎকালিন সময়ে একবার তিনি আ্ল্লামা আশরাফ আলী ধরমপুরী (রাহ.) কে বলেছিলেন,“ আমি সুর্যের মত ¯পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে,্কয়েক দিনের ভিতরেই এ দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে এবং পাকিস্তানী হানাদারের জুলুমের কবল থেকে এ দেশের জনগন মুক্তি লাভ করবে”।আড়াইহাজার থানার কমান্ডার মরহুম শামসুল হকের অধিনে আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রাহ.) মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছিলেন। তিনি বলেন ১৯৭১ সালে যখন আমি লালবাগ মাদরাসার ছাত্র তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ শুরু হলে আমার মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি হাফেজ্জি হুজুর ( রাহ.) কে প্রশ্ন করলাম; হুজুর এ যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা বা কর্তব্য কি? তখন হুজুর আমাকে বললেন পাকিস্তানী জালিম হানাদার বাহিনীর জুলুম থেকে এ দেশের মানুষকে রক্ষা করা অবশ্যই তোমার আমার সকলের কর্তব্য। তাই বসে থাকার আর সময় নেই ,জালিমদের কবল থেকে মাজলুমদেরকে বাচাঁনোর জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন কর। এ দেশের নিরীহ জনগনকে সহযেগিীতা করা আমাদের ইমানী দায়িত্ব।আর সেই সময় হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.) বলেছিলেন,“হুব্বুল ওয়াতান মিনাল ঈমান” অর্থাৎ ‘দেশ প্রেম ঈমানেরে অঙ্গ’। তাঁর এ কথার উত্তর শুনে আমি বেশ অনুপ্রাণীত হলাম এবং আর বসে থাকতে পারলাম না। আমিও মুক্তিযুদ্ধে শরীক হয়ে গেলাম।হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ (রাহ) ও বাঙ্গালী মুসলমানদের পক্ষে ছিল। তার বক্তব্য ছিল বাঙ্গালীদের পক্ষে। মাওলানা আব্দুস সালাম তিনি বলেন ৭১’সালে আমি করাচি ইউসুফ বিন নুরী মাদরাসার ছাত্র একদিন মুফতি মাহমুদ সাহেব মাদরাসায় এলে তাকে এক নেতা শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেছিল শেখ মুজিব গাদ্দার কে গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। তাকে এখনই হত্যা করা হবে তখন মুফতি সাহেব হুজর রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেন শেখ মুজিব গাদ্দার নন; তিনি একজন দেশ প্রেমিক মুসলমান।মুফতি মাহমুদ (রা.) ১৩ মার্চ এক বক্তব্যে পরিস্কার ভাষায় পাকিস্তানের ইয়াহইয়াা খানের ভুট্রোর নীতিকে ভুল আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর আহব্বান জানান।ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে গিয়ে জানা যায় যে,স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠক হিসেবে এবং এদেশের মানুষকে মুক্তি যুদ্ধে উৎসাহ ও সহযোগীতায় আলেম সমাজের ভুমিকাই সবচয়ে বেশী। কারন সক্রীয়ভাবে মুক্তি যুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন অসংখ্য কওমী উলাময়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখগণ। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন আল্লামা হাফেজ্জি হুজুর ( রাহ.)আল্লামা লুৎফুর রহমান বরুণী (রা.),আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ, আল্লামা মুফতি নুরুল্ল্যাহ ( রাহ.) আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রাহ.),আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী ( রাহ.) ফরিদ উদ্দিন মাসউদ, প্রমুখ।স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবিসাংবাদিত মুসলিম নেতা বিশ্বের প্রখ্য্যাত আলেম আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আসয়াদ আল মাদানী ( রা.) এর ভূমিকা অবিস্মরনীয়। যখন পাকিস্তানী বাহিনী এ দেশের নিরীহ মানুষের উপর বর্বোরোচিত হামলা চালালো তাৎক্ষনিক তিনি পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেন এবং নিরীহ বাঙ্গালীদের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলেন।স্বাধীনতা সংগ্রামে উলামায়ে কেরামদের ভুমিকা তথা অবদান দেখে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল হযরত হাফেজ্জি হুজুর (রাহ )এর হাতে বাইয়াত তথা মুরিদ হয়ে গেলেন। তিনি বায়ইয়াত হওয়ার পর তাকে তাঁর ভক্তও শীষ্যরা প্রশ্ন করল আপনি একজন মুক্তিযুদ্ধা হয়ে কিভাবে হাফেজ্জী হুজুরের মতো রাজাকার এক ব্যক্তির কাছে মুরিদ হলেন, জবাবে তিনি বলেছিলেন হযরত হাফেজ্জি হুজুর (রাহ.) কোন রাজাকার নন,তিনি শ্রেষ্ট আলেম এবং সত্যিকার একজন দেশপ্রেমিক।কিন্ত আফসোস ! আজ হাফেজ্জি হুজর এর অনুসারী তথা কওমী পড়–য়া আলেমদেরকেই বর্তমানে রাজাকার উপাধী দেয়া অসম্মানী করা হচ্ছে। ঐতিহাসিক বাস্তব সত্য যে, ১৯৭১ সালের এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে উলামায়ে কেরামগণের অবদানই সবচেয়ে বেশী ছিল। মূলত যারা রাজাকার,আলবদর, আল শামস, তারাই কেবল নিজেদের কে ঢাকার জন্য আলেম সমাজের উপর এ উপাধী গুলো চাপিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
১৮৫৭-এর প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে উলামায়ে কেরামের ভূমিকা ১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহ
আঠারোশো সাতান্নর বিদ্রোহকে ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহ বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আসলে এটা কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না, বরং সিপাহীদের সাথে সাথে জনগণেরও বিদ্রোহ ছিল। ভারতে ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে ধূমায়িত আক্রোশের এটাই ছিল প্রথম বিস্ফোরণ। এ বিদ্রোহে মুসলমানের সাথে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের বিরাট অংশও যোগ দেয়। তবে বাংলার হিন্দুরা ছিল ব্যতিক্রম। তারা ইংরেজের পক্ষ নেয়। ইংরেজের শাসনকে পরাধীনতার শৃংখলের পরিবর্তে তারা ভগবানের বিশেষ আশীর্বাদ ও কৃপা আখ্যায়িত করতে থাকে।ইংরেজের একশো বছরের শাসন জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ও সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। সিপাহীদের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় কারণটি ছিল কারতুজে শুয়োরের চর্বি ব্যবহার সম্পর্কিত গুজবটি। আর এ কারতুজ দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। ফলে মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে সকল সিপাহীর এতে ক্ষিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালের ২ জানুয়ারী দমদম থেকে এ অস্থিরতার প্রকাশ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারীতে কোলকাতা থেকে ১৬ মাইল দূরে বারাকপুর সেনানিবাসে মংগল পাণ্ডে নামক একজন হিন্দু সৈনিক একজন ইংরেজ সার্জেন্ট মেজরের ওপর গুলী চালিয়ে এই বিদ্রোহের উদ্বোধন করে।তারপর মীরাটে সবচেয়ে বড় সেনানিবাসে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিদ্রোহী বিপ্লবী সৈন্যরা দিল্লীর দিকে মার্চ করতে শুরু করে। সেখানে ছিলেন ক্ষমতাহীন শেষ মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর। সারা দেশ থেকে একই আওয়াজ ওঠে, ‘দিল্লী চলো’।ইনকিলাবী সেনাদলের দিল্লীতে প্রবেশ
১৮৫৭ সালের ১১ মে থেকে বিভিন্ন দিক থেকে ছোট বড় বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে স্বেচ্ছাসেবক, মুজাহিদ ও ইনকিলাবী সেনাদল দিল্লীতে প্রবেশ করতে লাগলো। তারা বাদশাহকে স্মারকলিপি পেশ করলো। তার শুরুতেই বলা হলো, ‘সৃষ্টি আল্লাহর, রাজ্য বাদশাহর, হুকুম কোম্পানীর।’ ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশবাসী বাদশাহের কাছে এসেছে ইনসাফের জন্য। কিন্তু বাদশাহ প্রথমে ইংরেজের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। পরবর্তী পর্যায়ে রাজী হয়ে গেলেন।ইনকিলাবী সেনাদল ও মুজাহিদগণ সারা দেশে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। যেখানে সেনাছাউনি আছে সেখানে লড়াই চলতে লাগলো। মজলুম সৈনিকরা কেবল ইংরেজ জাতিসত্তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করতো না, তারা ইংরেজদের প্রতিটি জিনিস ও প্রতিটি নিদর্শনকে ঘৃণা করতো। ঘৃণা ও আক্রোশের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে তারা ইংরেজের প্রতিটি নিশানী খতম করে দিতে চাচ্ছিল। সেনাবাহিনীর ইংরেজ অফিসারদের খতম করে দিতে লাগলো। ইংরেজদের বসতি আক্রমণ করে ইংরেজ বাসিন্দাদের মেরে কেটে ছারখার করে দিল। ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক আক্রমণ করে টাকা-পয়সা লুটপাট করে নিয়ে ব্যাংক জ্বালিয়ে দিল। ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত প্রেস দিল্লীর কাশ্মিরী গেটের কাছে দিল্লী গেজেটের বিল্ডিংয়ে আক্রমণ করে প্রেস জ্বালিয়ে দিল। প্রেসে কর্মরত ঈসায়ী কম্পোজিটারকেও রেহাই দিল না। তারপর ইংরেজের গীর্জার দিকে অগ্রসর হলো। ওপরে টাঙানো ক্রুশকে গুলীবিদ্ধ করলো। ঘণ্টার রশি কেটে দিল। দেয়ালের গায়ে যেসব ক্রুশ সেঁটে দেয়া হয়েছিল সেগুলো টেনে নামিয়ে খন্ড-বিখণ্ড করে দূরে নিক্ষেপ করলো।ইনকিলাবী ফৌজের সংখ্যা দিল্লীতে পঞ্চাশ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল। চার মাস ধরে তারা বীর বিক্রমে ইংরেজের মোকাবিলা করলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সেনাপতি বখ্ত খান। কিন্তু রসদ ফুরিয়ে আসছিল। সৈন্যদের বেতন দেবার সামর্থ ছিল না কর্তৃপক্ষের। সেপ্টেম্বর মাস আসতে আসতেই চারদিকে পরাজয়ের আলামত ফুটে উঠছিল। দিল্লীর ও আশাপাশের উলামায়ে কেরাম একজোটে ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন যার ফলে বাদশাহের কোষাগারে অর্থ ও খাদ্য না থাকলেও শহরের মুসলিম জনসাধারণ ইসলামী চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুজাহিদদের আহার জুগিয়ে আসছিল। কিন্তু তাদেরও সামর্থ ফুরিয়ে আসছিল। তাছাড়া ইংরেজের ‘ওজীফাখোর’ একদল অসৎ উলামার কর্মকাণ্ডও ভেতরে ভেতরে ঘুণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। ফলে ইংরেজ সেনাদল বিদ্রোহের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে নিজেদের শক্তি সুসংবদ্ধ করে যখন দিল্লীর ওপর চড়াও হলো তখন পরিস্থিতি পালটে যেতে থাকলো। মীরাট থেকে শুরু ১৮৫৭ সালের ১০মে মীরাটের সশস্ত্র সৈন্যরা দেশ ও মিল্লাতের প্রতি নিজেদের গুরু দায়িত্ব অনুভব করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। মীরাট ও তার আশপাশের সমগ্র এলাকার জনগণের সার্বিক সহায়তা তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে সমগ্র মীরাট জেলা স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানী দিল্লীর আশপাশের মুজফফরনগর, সাহারানপুর, বুলন্দশহর, আলীগড় ও রোহিলাখণ্ড ইত্যাদি জেলায় ও শহরে। মীরাট থেকেই স্বাধীনতা সৈনিকদের বিশাল বাহিনী দিল্লীতে প্রবেশ করে দিল্লীকে ইংরেজের শাসনমুক্ত করেছিল। জেনারেল বখ্ত খানের নেতৃত্বাধীনে দিল্লীর জামে মসজিদে শহরের শ্রেষ্ঠ উলামা ও মুফতীগণ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেছিলেন।দিল্লীর আশেপাশের এই এলাকাগুলোয় মুসলমানরা সংখ্যার দিক দিয়ে বিপুল না হলেও শিক্ষা-দীক্ষা, ইসলামী তাহযীব-তমদ্দুন, রাজ্য শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ পরিচালনা এবং অন্যান্য গুণগত মানের দিক দিয়ে সিপাহী বিদ্রোহ-পূর্ব বিগত আড়াইশো বছর সময় কালে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। তাই ইসলামী চেতনায় তারা ছিল অগ্রবর্তী। থানাভূন, কিরানা, কান্ধলা, শামেলী, পাহল্ত, খাতুলী, জাঁস্ট, ঝানঝানা, বুঢানা, দেওবন্দ, নানুতা, গাংগোহ, মংগলোর, রুড়কী, আম্বীঠ, রায়পুর, রামপুর মিনহারান, নুক্কড় এই এলাকার বিখ্যাত থানা শহর।
থানভূনে উলামায়ে কেরামের জিহাদী মোর্চা চতুর্দিকে সেনা বিদ্রোহের কারণে যখন আইন-শৃংখলার চরম অবনতি দেখা দিয়েছিল এবং ইংরেজ শাসকরাও ভীতি ও আতংকের মধ্যে অবস্থান করছিল তখন সাহারানপুরের ইংরেজ কালেকটর মি. স্প্যাংকির একটি চক্রান্তমূলক পদক্ষেপের কারণে স্থানীয় উলামা ও জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। কালেকটর সাহেব বিনা দোষে থানাভূনের প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত রইসের ছোট ভাই কাজী আবদুর রহীম ও তাঁর দলবলকে সাজানো মামলায় ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ঘোষণা করে তড়িঘড়ি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলালো। এ ঘটনায় থানাভূন, নান্নুতা ও চারদিকের থানাগুলোর জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তাছাড়া এসব এলাকার সকল প্রতিষ্ঠিত ও মশহুর আলেমের মুরব্বী ও মুরশিদ হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর বাসস্থানও ছিল থানাভূন। শহীদ কাজী আবদুর রহীমের বড় ভাই কাজী ইনায়েত আলী খান এসময় জনগণের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।এলাকার লোকদের কাছে দিল্লীর ইনকিলাব এবং স্থানীয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিলতার সৃষ্টি করেছিল। তাই পরিস্থিতি সামাল দেবার এবং করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য উলামায়ে কেরামের জরুরী মজলিস শূরা আহবান করা হলো। কাজেই মওলানা মুহাম্মদ কাসেমকে আহবান করা হলো নান্নুতা থেকে।১ মওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব এসময় সাহারানপুরে ছিলেন। তাঁকে সেখান থেকে ডেকে আনা হলো।২ রহমতুল্লাহ কিরানভীকে দিল্লীর সঠিক অবস্থা জানার জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ফিরে এসে বৃদ্ধ বাদশাহ ও তাঁর শাহজাদাদের অনভিজ্ঞতার রিপোর্ট পেশ করেছিলেন। তাঁর রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, ইনকিলাবী ফৌজ বাদশাহর হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি ও নিয়মতান্ত্রিক দলের পক্ষে তাঁদের ওপর নির্ভর করা কঠিন।কাজেই প্রথম বৈঠকে সাইয়েদ আহমদ শহীদ প্রবর্তিত এ যাবত যে সংস্কারমূলক ও রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থাপনা চলে আসছিল তাকে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার রূপ দেবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেবকে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ‘আমীর’ নির্বাচন করা হলো। মওলানা মুহাম্মদ কাসেম, মওলানা রশীদ আহমদ, হাফেজ যামেন, মওলানা মুহাম্মদ মুনীরের ন্যায় নেতৃবৃন্দকে সেনাবাহিনী, প্রতিরক্ষা, আইন-শৃংখলা ও বিচার বিভাগ ইত্যাদি পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো।৩ এই সংগে বাদশাহর একান্ত সহচর নওয়াব শের আলী মুরাদাবাদীকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হলো যথাযথভাবে আইন-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং তাঁদের সাথে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়ে। মওলানা মানাযির আহসান গীলানী তাঁর মওলানা মুহাম্দ কাসেমের জীবন কথার ২য় খণ্ডের ১৩৭ পৃষ্ঠায় ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব সাহেবের সূত্রে একথাও লিখেছেন, ‘বাদশাহকে শামেলীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য শের আলী সাহেবকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হয়েছিল।’ কারণ ইতিপূর্বে বাদশাহর ইনকিলাবী ফৌজকে নেতৃত্ব দান করে শাহী জুলুস সহকারে ১২ মে দিল্লী শহর পরিভ্রমণ করেছিলেন। বড় বড় বাজার খোলার ব্যবস্থা করেছিল এবং জনগনকে শান্তি ও নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করেছিলেন। কাজেই শামেলীতে উলামা গ্রুপ যেভাবে মোর্চা গঠন করে হাজী ইমদাদুল্লাহর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উঁচু করেছিলেন তার ফলে দিল্লী থেকে বাদশাহর নেতৃত্বে ইনকিলাবী ফৌজ এদিকে আক্রমণ পরিচালনা করলে দিল্লী থেকে নিয়ে এই পুরো এলাকা
আঠারোশো সাতান্নর বিদ্রোহকে ইংরেজরা সিপাহী বিদ্রোহ বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আসলে এটা কেবল সিপাহী বিদ্রোহ ছিল না, বরং সিপাহীদের সাথে সাথে জনগণেরও বিদ্রোহ ছিল। ভারতে ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে ধূমায়িত আক্রোশের এটাই ছিল প্রথম বিস্ফোরণ। এ বিদ্রোহে মুসলমানের সাথে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের বিরাট অংশও যোগ দেয়। তবে বাংলার হিন্দুরা ছিল ব্যতিক্রম। তারা ইংরেজের পক্ষ নেয়। ইংরেজের শাসনকে পরাধীনতার শৃংখলের পরিবর্তে তারা ভগবানের বিশেষ আশীর্বাদ ও কৃপা আখ্যায়িত করতে থাকে।ইংরেজের একশো বছরের শাসন জনগণের মধ্যে বিক্ষোভ ও সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। সিপাহীদের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় কারণটি ছিল কারতুজে শুয়োরের চর্বি ব্যবহার সম্পর্কিত গুজবটি। আর এ কারতুজ দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। ফলে মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে সকল সিপাহীর এতে ক্ষিপ্ত হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালের ২ জানুয়ারী দমদম থেকে এ অস্থিরতার প্রকাশ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারীতে কোলকাতা থেকে ১৬ মাইল দূরে বারাকপুর সেনানিবাসে মংগল পাণ্ডে নামক একজন হিন্দু সৈনিক একজন ইংরেজ সার্জেন্ট মেজরের ওপর গুলী চালিয়ে এই বিদ্রোহের উদ্বোধন করে।তারপর মীরাটে সবচেয়ে বড় সেনানিবাসে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বিদ্রোহী বিপ্লবী সৈন্যরা দিল্লীর দিকে মার্চ করতে শুরু করে। সেখানে ছিলেন ক্ষমতাহীন শেষ মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর। সারা দেশ থেকে একই আওয়াজ ওঠে, ‘দিল্লী চলো’।ইনকিলাবী সেনাদলের দিল্লীতে প্রবেশ
১৮৫৭ সালের ১১ মে থেকে বিভিন্ন দিক থেকে ছোট বড় বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে স্বেচ্ছাসেবক, মুজাহিদ ও ইনকিলাবী সেনাদল দিল্লীতে প্রবেশ করতে লাগলো। তারা বাদশাহকে স্মারকলিপি পেশ করলো। তার শুরুতেই বলা হলো, ‘সৃষ্টি আল্লাহর, রাজ্য বাদশাহর, হুকুম কোম্পানীর।’ ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশবাসী বাদশাহের কাছে এসেছে ইনসাফের জন্য। কিন্তু বাদশাহ প্রথমে ইংরেজের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অপারগতা প্রকাশ করলেন। পরবর্তী পর্যায়ে রাজী হয়ে গেলেন।ইনকিলাবী সেনাদল ও মুজাহিদগণ সারা দেশে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। যেখানে সেনাছাউনি আছে সেখানে লড়াই চলতে লাগলো। মজলুম সৈনিকরা কেবল ইংরেজ জাতিসত্তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করতো না, তারা ইংরেজদের প্রতিটি জিনিস ও প্রতিটি নিদর্শনকে ঘৃণা করতো। ঘৃণা ও আক্রোশের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে তারা ইংরেজের প্রতিটি নিশানী খতম করে দিতে চাচ্ছিল। সেনাবাহিনীর ইংরেজ অফিসারদের খতম করে দিতে লাগলো। ইংরেজদের বসতি আক্রমণ করে ইংরেজ বাসিন্দাদের মেরে কেটে ছারখার করে দিল। ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক আক্রমণ করে টাকা-পয়সা লুটপাট করে নিয়ে ব্যাংক জ্বালিয়ে দিল। ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত প্রেস দিল্লীর কাশ্মিরী গেটের কাছে দিল্লী গেজেটের বিল্ডিংয়ে আক্রমণ করে প্রেস জ্বালিয়ে দিল। প্রেসে কর্মরত ঈসায়ী কম্পোজিটারকেও রেহাই দিল না। তারপর ইংরেজের গীর্জার দিকে অগ্রসর হলো। ওপরে টাঙানো ক্রুশকে গুলীবিদ্ধ করলো। ঘণ্টার রশি কেটে দিল। দেয়ালের গায়ে যেসব ক্রুশ সেঁটে দেয়া হয়েছিল সেগুলো টেনে নামিয়ে খন্ড-বিখণ্ড করে দূরে নিক্ষেপ করলো।ইনকিলাবী ফৌজের সংখ্যা দিল্লীতে পঞ্চাশ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল। চার মাস ধরে তারা বীর বিক্রমে ইংরেজের মোকাবিলা করলো। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সেনাপতি বখ্ত খান। কিন্তু রসদ ফুরিয়ে আসছিল। সৈন্যদের বেতন দেবার সামর্থ ছিল না কর্তৃপক্ষের। সেপ্টেম্বর মাস আসতে আসতেই চারদিকে পরাজয়ের আলামত ফুটে উঠছিল। দিল্লীর ও আশাপাশের উলামায়ে কেরাম একজোটে ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন যার ফলে বাদশাহের কোষাগারে অর্থ ও খাদ্য না থাকলেও শহরের মুসলিম জনসাধারণ ইসলামী চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুজাহিদদের আহার জুগিয়ে আসছিল। কিন্তু তাদেরও সামর্থ ফুরিয়ে আসছিল। তাছাড়া ইংরেজের ‘ওজীফাখোর’ একদল অসৎ উলামার কর্মকাণ্ডও ভেতরে ভেতরে ঘুণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। ফলে ইংরেজ সেনাদল বিদ্রোহের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়ে নিজেদের শক্তি সুসংবদ্ধ করে যখন দিল্লীর ওপর চড়াও হলো তখন পরিস্থিতি পালটে যেতে থাকলো। মীরাট থেকে শুরু ১৮৫৭ সালের ১০মে মীরাটের সশস্ত্র সৈন্যরা দেশ ও মিল্লাতের প্রতি নিজেদের গুরু দায়িত্ব অনুভব করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। মীরাট ও তার আশপাশের সমগ্র এলাকার জনগণের সার্বিক সহায়তা তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে সমগ্র মীরাট জেলা স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানী দিল্লীর আশপাশের মুজফফরনগর, সাহারানপুর, বুলন্দশহর, আলীগড় ও রোহিলাখণ্ড ইত্যাদি জেলায় ও শহরে। মীরাট থেকেই স্বাধীনতা সৈনিকদের বিশাল বাহিনী দিল্লীতে প্রবেশ করে দিল্লীকে ইংরেজের শাসনমুক্ত করেছিল। জেনারেল বখ্ত খানের নেতৃত্বাধীনে দিল্লীর জামে মসজিদে শহরের শ্রেষ্ঠ উলামা ও মুফতীগণ ইংরেজের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেছিলেন।দিল্লীর আশেপাশের এই এলাকাগুলোয় মুসলমানরা সংখ্যার দিক দিয়ে বিপুল না হলেও শিক্ষা-দীক্ষা, ইসলামী তাহযীব-তমদ্দুন, রাজ্য শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ পরিচালনা এবং অন্যান্য গুণগত মানের দিক দিয়ে সিপাহী বিদ্রোহ-পূর্ব বিগত আড়াইশো বছর সময় কালে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। তাই ইসলামী চেতনায় তারা ছিল অগ্রবর্তী। থানাভূন, কিরানা, কান্ধলা, শামেলী, পাহল্ত, খাতুলী, জাঁস্ট, ঝানঝানা, বুঢানা, দেওবন্দ, নানুতা, গাংগোহ, মংগলোর, রুড়কী, আম্বীঠ, রায়পুর, রামপুর মিনহারান, নুক্কড় এই এলাকার বিখ্যাত থানা শহর।
থানভূনে উলামায়ে কেরামের জিহাদী মোর্চা চতুর্দিকে সেনা বিদ্রোহের কারণে যখন আইন-শৃংখলার চরম অবনতি দেখা দিয়েছিল এবং ইংরেজ শাসকরাও ভীতি ও আতংকের মধ্যে অবস্থান করছিল তখন সাহারানপুরের ইংরেজ কালেকটর মি. স্প্যাংকির একটি চক্রান্তমূলক পদক্ষেপের কারণে স্থানীয় উলামা ও জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। কালেকটর সাহেব বিনা দোষে থানাভূনের প্রভাবশালী ও সম্ভ্রান্ত রইসের ছোট ভাই কাজী আবদুর রহীম ও তাঁর দলবলকে সাজানো মামলায় ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ঘোষণা করে তড়িঘড়ি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলালো। এ ঘটনায় থানাভূন, নান্নুতা ও চারদিকের থানাগুলোর জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তাছাড়া এসব এলাকার সকল প্রতিষ্ঠিত ও মশহুর আলেমের মুরব্বী ও মুরশিদ হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর বাসস্থানও ছিল থানাভূন। শহীদ কাজী আবদুর রহীমের বড় ভাই কাজী ইনায়েত আলী খান এসময় জনগণের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।এলাকার লোকদের কাছে দিল্লীর ইনকিলাব এবং স্থানীয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিলতার সৃষ্টি করেছিল। তাই পরিস্থিতি সামাল দেবার এবং করণীয় সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য উলামায়ে কেরামের জরুরী মজলিস শূরা আহবান করা হলো। কাজেই মওলানা মুহাম্মদ কাসেমকে আহবান করা হলো নান্নুতা থেকে।১ মওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব এসময় সাহারানপুরে ছিলেন। তাঁকে সেখান থেকে ডেকে আনা হলো।২ রহমতুল্লাহ কিরানভীকে দিল্লীর সঠিক অবস্থা জানার জন্য সেখানে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ফিরে এসে বৃদ্ধ বাদশাহ ও তাঁর শাহজাদাদের অনভিজ্ঞতার রিপোর্ট পেশ করেছিলেন। তাঁর রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, ইনকিলাবী ফৌজ বাদশাহর হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি ও নিয়মতান্ত্রিক দলের পক্ষে তাঁদের ওপর নির্ভর করা কঠিন।কাজেই প্রথম বৈঠকে সাইয়েদ আহমদ শহীদ প্রবর্তিত এ যাবত যে সংস্কারমূলক ও রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থাপনা চলে আসছিল তাকে একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার রূপ দেবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেবকে এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার ‘আমীর’ নির্বাচন করা হলো। মওলানা মুহাম্মদ কাসেম, মওলানা রশীদ আহমদ, হাফেজ যামেন, মওলানা মুহাম্মদ মুনীরের ন্যায় নেতৃবৃন্দকে সেনাবাহিনী, প্রতিরক্ষা, আইন-শৃংখলা ও বিচার বিভাগ ইত্যাদি পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো।৩ এই সংগে বাদশাহর একান্ত সহচর নওয়াব শের আলী মুরাদাবাদীকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হলো যথাযথভাবে আইন-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত রাখার এবং তাঁদের সাথে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়ে। মওলানা মানাযির আহসান গীলানী তাঁর মওলানা মুহাম্দ কাসেমের জীবন কথার ২য় খণ্ডের ১৩৭ পৃষ্ঠায় ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব সাহেবের সূত্রে একথাও লিখেছেন, ‘বাদশাহকে শামেলীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য শের আলী সাহেবকে বাদশাহর কাছে পাঠানো হয়েছিল।’ কারণ ইতিপূর্বে বাদশাহর ইনকিলাবী ফৌজকে নেতৃত্ব দান করে শাহী জুলুস সহকারে ১২ মে দিল্লী শহর পরিভ্রমণ করেছিলেন। বড় বড় বাজার খোলার ব্যবস্থা করেছিল এবং জনগনকে শান্তি ও নিরাপত্তা দানের ওয়াদা করেছিলেন। কাজেই শামেলীতে উলামা গ্রুপ যেভাবে মোর্চা গঠন করে হাজী ইমদাদুল্লাহর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উঁচু করেছিলেন তার ফলে দিল্লী থেকে বাদশাহর নেতৃত্বে ইনকিলাবী ফৌজ এদিকে আক্রমণ পরিচালনা করলে দিল্লী থেকে নিয়ে এই পুরো এলাকা