১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড


১৪ই ডিসেম্বর, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন।  স্বাধীনতার পরেও যাতে জাতি হিসাবে আমরা আর কোনদিন মাথা তুলে দাড়াতে না পারি সেই পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা। তারা সফল হয় নাই। সেলিনা পারভীন এর মত অসংখ্য বুদ্ধিজীবী আমরা হারিয়েছি। তারপরও আজ আমরা সাউথ এশিয়ার সফলতম দেশ। পাকিস্তান এখন আস্তাকুরে চলে গেছে। অর্থনীতির প্রায় সব মাপকাঠিতে আমরা এগিয়ে আছি সাউথ এশিয়ার সব দেশ থেকে। যদি আমরা সেদিনের বুদ্ধিজীবীদের না হারাতাম তবে আমরা আজ হয়তো সমগ্র বিশ্বেই একটি উদাহরন হতে পারতাম। সে দিনও আর বেশীদূরে নয় বলে আমি বিশ্বাস করি। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদের প্রতি। ১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত শোকাবহ একটি দিন। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এই দিনটিতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালি জাগরণের অগ্রদূত এদেশের সূর্য -সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো। আর এ কাজে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলো তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার,
পাক হানাদার বাহিনী যখন বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরাজয় অনিবার্য তখনই পরিকল্পিতভাবে তারা জাতিকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নবগঠিত এই দেশটি যাতে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দূর্বল থাকে, কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য তারা জাতির সূর্য -সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নিধন করার এক কুৎসিত এবং লোমহর্ষক পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনার মুল সহযোগী আল-বদর বাহিনী, যাদের সহযোগীতা ছাড়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। এরাই ১১ ডিসেম্বর থেকে ব্যাপকভাবে বুদ্ধিজীবী নিধন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের দেশীয় দোসরদের সঙ্গে নিয়ে দেশের বরেণ্য সকল শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তুলে আনে এবং পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করে। পরিকল্পিত এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত।

প্রতিটি বাঙালি ১৪ ডিসেম্বরকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে স্মরণ করে। পাশাপাশি কোটি কোটি দেশপ্রেমিক বাঙালি ইতিহাসের এই বর্বোরচিত হত্যাকাণ্ডের কুলাঙ্গারদের প্রতি ঘৃণা জানায়।
১৪ ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজার সহ বিভিন্ন স্থানে বুদ্ধিজীবীদের লাশ ফেলে যায়। ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের পর শহীদের নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের লাশ খুঁজে পায়।

এই সূর্য -সন্তানরাই জাতির যে কোন বিপর্যয়ে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। বাঙালীর ভাষা-আন্দোলনে, স্বাধীনতা ও স্বাধীকারের আন্দোলনে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বেই বাঙালীরা জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। এজন্য যুদ্ধের শুরু থেকেই মেধাবী ধীমান ব্যক্তিবর্গের প্রতি পাক বাহিনীর ছিলো সীমাহীন ক্ষোভ।

২৫ শে মার্চের কালোরাত্রি থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরো নয় মাসই সুপরিকল্পিতভাবে বাছাই করে করে একের পর এক বুদ্ধিজীবী হত্যা চলতে থাকে। পরবর্তীতে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে শেষ পর্যন্ত পরাজয় নিশ্চিত জেনে সকল বুদ্ধিজীবীদের নিধনকে পাক হানাদার বাহিনী তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে স্থির করে। আল-বদর বাহিনীর সহযোগিতায় তারা তালিকা তৈরি করে এবং নীলনকশা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে তা বাস্তাবায়ন করে। পাকিস্তানী ঘাতকদের আত্মসমর্পনের ঠিক দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরে রাতে বীভৎস- নারকীয়-পাশবিকভাবে একসাথে এত বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা ঘটে, যা ইতিহাসে এক জঘন্য বর্বর ঘটনা হিসাবে প্রকাশ পায়। পৃথিবীতে এর আগে একসাথে এতো বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা আর ঘটেনি। হত্যার আগে প্রায় প্রতিটি সূর্য -সন্তানকেই চরম পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিলো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ এভাবেই ফুটে ওঠে। “আর একটু এগিয়ে যেতেই বাঁ হাতের যে মাটির ঢিপিটি ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা। গামছা দুটো আজও এখানে পড়ে আছে। পরনে কালো ঢাকাই শাড়ী ছিল। এক পায়ে মোজা ছিল। মুখ ও নাকের কোন আকৃতি নেই। কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে। যেন চেনা যায় না। মেয়েটি ফর্সা এবং স্বাস্থ্যবতী। স্তনের একটা অংশ কাটা। লাশটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বীভৎস চেহারার দৃশ্য বেশীক্ষণ দেখা যায়না। তাকে চেনার উপায় ছিল না। পরে অবশ্য সনাক্ত হয়েছে যে, মেয়েটি সেলিনা পারভীন। ’শিলালিপি’র এডিটর। তার আত্মীয়রা বিকেলে খবর পেয়ে লাশটি তুলে নিয়ে গেছে।”

বিজয় অর্জনের কিছুদিন পরই “বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটি” গঠিত হয়। এই কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাও ফরমান আলী এদেশের ২০,০০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনামতো হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারেনি। ফরমান আলীর টার্গেট ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের কে গভর্নর হাউজে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা। বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির প্রধান জহির রায়হান বলেছিলেন, এরা নির্ভুলভাবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রমনা বুদ্ধিজীবীদের কে বাছাই করে আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য,ওই কমিশনের আহ্বায়ক ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান যিনি নিখোঁজ হন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী।

আজ সেই ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর স্মৃতিঘেরা শোকাবহ দিন। ইতিহাসের পাতায় বেদনা বিধুর কালোদিবস। প্রতি বছর জাতি শ্রদ্ধার সাথে এ দিনটি স্মরণ করে।

কি ভয়ানক সেই পিশাচ গুলো, যাদের মনে করলে এখনো ঘৃণায় চোখ লালচে হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের প্রতি আমার নতজানু শ্রদ্ধা, তাদের আত্মত্যাগের সঠিক মর্যাদা আমরা কোনদিন দিতে পারিনি, পারবোও না হয়তো। শুধু এই শ্রদ্ধাঞ্জলি টুকু ছাড়া।

শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির সূর্য্য সন্তানদের
হারিয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবীরাই আমাদের পথ প্রদর্শক
অদম্য জাতি কিভাবে মাথা উঁচু করে চলতে হয়,আমরা এটি শিখেছি তাঁদের কাছ হতেই।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচার হচ্ছে……… এটি আমাদের জাতীয় দায় ছিল।



বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড:: বলতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টুকুতেই পাকিস্তানী হানাদারবাহিনী কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের জ্ঞানী-গুণী ও মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের হত্যা করাকে বুঝায়। ১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাসে স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে পাকিস্তান বাহিনী যখন বুঝতে শুরু করে যে তাদের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না, তখন তারা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দূর্বল এবং পঙ্গু করে দেয়ার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরআল শামস বাহিনীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। এই পরিকল্পিত গণহত্যাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। বন্দী অবস্থায় বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত ও বিকৃত লাশ রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায়। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়াও যায়নি বহু লাশ।১৯৭১ এর ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বুদ্ধিজীবী হত্যার স্মরণে বাংলাদেশের
ঢাকায় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ডাকবিভাগ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকিটের সিরিজ বের করেছে।

বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা :: প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যারা দৈহিক শ্রমের বদলে মানসিক শ্রম বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম দেন তারাই বুদ্ধিজীবী। বাংলা একাডেমী প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো: বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পি, কন্ঠশিল্পি, সকল পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।

 কারণ:: যুদ্ধের পরপরই রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে তোলা ছবিতে বুদ্ধিজীবীদের লাশ দেখা যাচ্ছে (সৌজন্যমূলক ছবি: রশীদ তালুকদার, ১৯৭১) পাকিস্তান নামক অগণতান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই বাঙালিদের বা পূর্বপাকিস্তানীদের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। তারা বাঙালিদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে। এরই ফলশ্রুতিতে বাঙালির মনে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে এবং বাঙালিরা এই অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে। এ সকল আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকতেন সমাজের সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীরা। তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালিদের বাঙালি জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফলেই জনগণ ধীরে ধীরে নিজেদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে থাকে যা পরবর্তীতে তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। এজন্য শুরু থেকেই বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের সামরিক শাষকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাই যুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তানী বাহিনী বাছাই করে করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। এছাড়া যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন পাকিস্তানের পরাজয় যখন শুধু সময়ের ব্যাপার তখন বাঙালি জাতি যেন শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে তাই তারা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করে দেবার লক্ষ্যে তালিকা তৈরি করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। এ প্রসঙ্গে শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে যে যুক্তিটি দেয়া হয়েছে তা প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত:-
এটা অবধারিত হয়, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, জাগিয়ে রাখেন তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে নিবীর্য করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবী শূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অতর্কিতে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রুতগতিতে।

হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা:: মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি, পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানী সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধারণা করা হয় পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তার স্বহস্তে লিখিত ডায়েরী পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। এছাড়া আইয়ুব শাসন আমলের তথ্য সচিব আলতাফ গওহরের এক সাক্ষাৎকার হতে জানা যায় যে, ফরমান আলীর তালিকায় তার বন্ধু কবি সানাউল হকের নাম ছিল। আলতাফ গওহরের অনুরোধে রাও ফরমান আলি তার ডায়েরীর লিস্ট থেকে সানাউল হকের নাম কেটে দেন। এছাড়া আলবদরদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন বলে তার ডায়েরীতে একটি নোট পাওয়া যায়। এছাড়া তার ডায়েরীতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন আমেরিকান নাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিল। এর মধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দাবাহিনীতে যুক্ত ছিল এবং ডুসপিক ছিল সিআইএ এজেন্ট। এ কারণে সন্দেহ করা হয়ে থাকে, পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ'র ভূমিকা ছিলো।


হত্যাকাণ্ডের বিবরণ:: ডিসেম্বরের ৪ তারিখ হতে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখক-সহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরেরা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেদিন প্রায় ২০০ জনের মত বুদ্ধিজীবীদের তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য আরো অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের উপর বিভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়।

এমনকি, আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পরেও পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তার সহযোগীদের গোলাগুলির অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনই একটি ঘটনায়, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখ স্বনামধন্য চলচ্চিত্র-নির্মাতা জহির রায়হান প্রাণ হারান। এর পেছনে সশস্ত্র বিহারীদের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়। নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে প্রতি বছর ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ "শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস" হিসেবে পালন করা হয়।

জড়িত ব্যক্তিবর্গ:: পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পক্ষে এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে তালিকা প্রস্তুতিতে সহযোগীতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পেছনে ছিল কুখ্যাত আল বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিলেন বদর বাহিনীর চৌধুরী মঈনুদ্দীন (অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (প্রধান জল্লাদ)। ১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরী উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বদ্ধভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায় যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল। আর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিতেন।

হত্যার পরিসংখ্যান:: বাংলাপিডিয়া হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শহীদ  বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নিম্নরূপঃ-

  • শিক্ষাবিদ - ৯৯১ জন
  • সাংবাদিক - ১৩
  • চিকিৎসক - ৪৯
  • আইনজীবী - ৪২
  • অন্যান্য (সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী এবং প্রকৌশলী) - ১৬
১৯৭২ সালে জেলাওয়ারি শহীদ শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীদের একটি আনুমানিক তালিকা প্রকাশিত হয়।[১৭] সেটি নিম্নরূপ:-
জেলা এবং বিভাগ
শিক্ষাবিদ
আইনজীবী
প্রাথমিক
মাধ্যমিক
উচ্চমাধ্যমিক
৩৭
১০
২৭
১২
২০

৪৬
২৮
ঢাকা বিভাগ
১৩০
৫৫
১৭
১০
৩৯
১৬
১৯

৪৫
৩৩
২৬
১৩
চট্টগ্রাম বিভাগ
১৩৮
৭৩
১৩
১০
৪৮
১৫
৫৫
৩১
৫০
২১



২৮
১৩

খুলনা বিভাগ
১৮৪
৮১
১৫
৩৯
৪১
২২
৫০
১০
১৪
১২

৪৩
রাজশাহী বিভাগ
১৮৭
৬১
১৪
১৫
বাংলাদেশ
৬৩৯
২৭০
৫৯
৪১
শহীদ শিক্ষাবিদ (বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন) = ৯৬৮
শহীদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক = ২১
মোট শহীদ শিক্ষাবিদ = ৯৮৯
বিঃদ্রঃ- এখানে ১৯৭২ সালের প্রশাসনিক বিভাগ ও জেলা অনুযায়ী তালিকা প্রদান করা হয়েছে।

নিহত বুদ্ধিজীবীদের তালিকা:: ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:-

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ
  1. ডঃ গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শনশাস্ত্র)।
  2. ডঃ মুনির চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)।
  3. ডঃ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা সাহিত্য)।
  4. ডঃ আনোয়ার পাশা (বাংলা সাহিত্য)।
  5. ডঃ আবুল খায়ের (ইতিহাস)।
  6. ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি সাহিত্য)।
  7. ডঃ সিরাজুল হক খান (শিক্ষা)।
  8. ডঃ এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিক্ষা)।
  9. হুমায়ূন কবীর (ইংরেজি সাহিত্য)।
  10. রাশিদুল হাসান (ইংরেজি সাহিত্য)।
  11. সাজিদুল হাসান (পদার্থবিদ্যা)।
  12. ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান)।
  13. এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান)।
  14. এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা)।
  15. শরাফত আলী (গণিত)।
  16. এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা)।
  17. অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা)।
  18. এম এ সাদেক (শিক্ষা)।
  19. এম সাদত আলী (শিক্ষা)।
  20. সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস)।
  21. গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস)।
  22. রাশীদুল হাসান (ইংরেজি)।
  23. এম মর্তুজা (চিকিৎসক)।
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকঃ
  1. ডঃ হবিবুর রহমান (গণিত বিভাগ)।
  2. ডঃ শ্রী সুখারঞ্জন সমাদ্দার (সংস্কৃত)।
  3. মীর আবদুল কাইউম (মনোবিজ্ঞান)।
  • চিকিৎসকঃ
  1. অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি (হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ)।
  2. অধ্যাপক ডাঃ আলিম চৌধুরী (চক্ষু বিশেষজ্ঞ)।
  3. অধ্যাপক ডাঃ শামসুদ্দীন আহমেদ
  4. অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল আলিম চৌধুরী
  5. ডাঃ হুমায়ুন কবীর
  6. ডাঃ আজহারুল হক
  7. ডাঃ সোলায়মান খান
  8. ডাঃ আয়েশা বদেরা চৌধুরী
  9. ডাঃ কসির উদ্দিন তালুকদার
  10. ডাঃ মনসুর আলী
  11. ডাঃ মোহাম্মদ মোর্তজা
  12. ডাঃ মফিজউদ্দীন খান
  13. ডাঃ জাহাঙ্গীর
  14. ডাঃ নুরুল ইমাম
  15. ডাঃ এস কে লালা
  16. ডাঃ হেমচন্দ্র বসাক
  17. ডাঃ ওবায়দুল হক
  18. ডাঃ আসাদুল হক
  19. ডাঃ মোসাব্বের আহমেদ
  20. ডাঃ আজহারুল হক (সহকারী সার্জন)
  21. ডাঃ মোহাম্মদ শফী (দন্ত চিকিৎসক)
  • অন্যান্যঃ
  1. শহীদুল্লাহ কায়সার (সাংবাদিক)।
  2. নিজামুদ্দীন আহমেদ (সাংবাদিক)।
  3. সেলিনা পারভীন (সাংবাদিক)
  4. সিরাজুদ্দীন হোসেন (সাংবাদিক)।
  5. আ ন ম গোলাম মুস্তফা (সাংবাদিক)।
  6. আলতাফ মাহমুদ (গীতিকার ও সুরকার)।
  7. ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (রাজনীতিবিদ)।
  8. রণদাপ্রসাদ সাহা (সমাজসেবক এবং দানবীর)।
  9. যোগেশ চন্দ্র ঘোষ (শিক্ষাবিদ, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)।
  10. জহির রায়হান (লেখক, চলচ্চিত্রকার)।
  11. মেহেরুন্নেসা (কবি)।
  12. ডঃ আবুল কালাম আজাদ (শিক্ষাবিদ, গণিতজ্ঞ)।
  13. নজমুল হক সরকার (আইনজীবী)।
  14. নূতন চন্দ্র সিংহ (সমাজসেবক, আয়ূর্বেদিক চিকিৎসক)।
  
বধ্যভূমির সন্ধান:: ঢাকার রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ২০০৯ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি খোঁজার জন্য ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর থেকে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। সারা দেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করতে পেরেছে তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন প্রকাশিত পত্রিকা, এ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গ্রন্থ, এবং মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবার এবং স্থানীয় লোকজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব বধ্যভূমি খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেক বধ্যভূমিতে ফলক স্থাপনের পরিকল্পনা হচ্ছে। অধিকাংশ জেলাতেই মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমিগুলো হয় রেলের নয়তো সড়ক ও জনপথের আওতাভুক্ত জায়গায়।

No comments:

Post a Comment