
...৮ জানুয়ারি ২টা বেজে ১০ মিনিট। গাড়ী এসে থামলো কক্সবাজার লিং রোড পার হয়ে সদর উপজেলার সামনে। সালাতুজ্জুহর আদায় করলাম সবাই উপজেলা মসজিদে। নামাজ আদায় করে খোঁজখবর নিতে লাগলাম মনযিলের সর্বশেষ পরিস্থিতি। গতকাল ত্রাণ নিয়ে আসা পরিচিত এক ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি অবস্থান করছেন টেকনাফ থানা সদরে। জানালেন পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। মূল স্পটে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা। গতদিন দুইজন ত্রাণকর্মীকে ক্যাম্প থেকে গ্রেফতার করা হয়। দশহাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে তারা থানা থেকে ছাড় পায়। স্থানীয় (কিছু অসাধু) জনপ্রতিনিধি ও স্বঘোষিত লিডারদের অবৈধ হস্তক্ষেপ। মাস্তানদের দৌরাত্ব। ভাগ না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। পুরনো শরণার্থীদের মুনশিয়ানা ও একক ভোগের মানসিকতা। নতুনদের নাম ভাঙিয়ে নিজেরা আত্মসাৎ ও লুন্ঠনে মরিয়া। জটলা বেধে ছিনিয় নিতে চায়। নবাগতদের প্রাপ্ত নগদ টাকা হাতিয়ে নিতেও মন কাঁপেনা তাদের! এমতাবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে না যাওয়াই ভাল। প্রয়োজনে কোন মাদ্রাসার দায়িত্বে দিয়ে দেয়াই মঙ্গল। তারা সুবিধেমতে নতুন অনিবন্ধিত শরণার্থীদেরে মাঝে বন্ঠন করে দিবে।
কিছুটা ভয় ও আশংকা দেখা দিল। সাথীদের মাঝে দেখা দিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সাহস-ভয়ের দুলাচলে দুপুরের খাবার সারলাম। দায়িত্ববোধ ও সাহস সঞ্চয় করলাম। মন মানছে না। যেভাবেই হোক আমাদের মিশন সফল হতে হবে। এরিফাঁকে খুঁজতে লাগলাম স্থানীয় পুরাতন সাথী। যিনি ইতিমধ্যে কাজ করেছেন ক্যাম্পের অভ্যন্তরে। আল্লাহর রহমতে কিছু সময়ের বব্যবধানে দক্ষ রাহবার Aslam Bin Zahir এর প্রচেষ্টায় পেয়ে গেলাম কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের ভাই, তিন চিল্লার মুনাসিব সাথী জাহেদ ভাইকে। কিছু দিকনির্দেশনা ফলো করে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করলাম; আমাদের কদম চলবেই মজলুমদের সাহায্যার্থে সম্মুখপানে। হেফাজতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।
জাহেদ ভাই বাহনের ব্যবস্থা করলেন। গাড়ী চলছে আলোচিত উপজেলা সদর উখিয়ার পথধরে। কাফেলার যিম্মাদার হিসেবে বাড়তি কিছু বিষয় মাথায় রাখতেই হচ্ছে। নিত্যনতুন ও বুদ্ধিভিত্তিক পলিসির উদ্ভাবন করতে হচ্ছে। সহযোগিতা করছেন চৌকস সাথী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও Haris Uddin ভাই। দেখতে দেখতে চলে আসলাম উখিয়া। নামলাম গাড়ী থেকে। মুহুর্তেই মানুষের জটলা। বুঝতে বাকী নাই, আমরা ওদের টার্গেটে। বেশভূষা, লেবাস-সূরতে শিকারিরা বুঝে ফেলছে আমরা আগন্তুক-ত্রাণকর্মী। দ্রুত চললাম বাজারের জামে মসজিদের দিকে। আদায় করলাম সালাতুল আছর।
নামাজ শেষে পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত হলো, ড্রেস পরিবর্তনের। লুঙ্গী-গেঞ্জি পরিহিত ছদ্মরূপ। এবারের মনযিল, রোহিঙ্গাদের সর্ববৃহৎ আশ্রয়স্থল "কতুপালং" শরণার্থী ক্যাম্প। জাহেদ ভাই সিএনজি নিয়ে আসলেন। সেইসাথে সতর্ক নির্দেশনা দিলেন বেশকিছু। সাথে থাকা নগদ টাকা ভাগাভাগি করে নিলাম সবাই। নিরাপদ পজিশন নিয়ে চেপে বসলাম। সিএনজি চলছে। চলারপথে মানুষের কৌতুহলী দৃষ্টি আমাদের দিকে। কিছুদূর এগোতেই কিছু হৃদয়বিদারক, করুণ দৃশ্য দেখে আমাদের শরীর হয়ে যায় আরো হিমেল। অজান্তেই চুখের কার্ণিশ বেয়ে ঝরছে কষ্ঠের লোনাজল। চৌচির হয়ে যাচ্ছে, বুকের পাজর। বাকরুদ্ধ চাহনিতে যন্ত্রণায় কষাঘাত করছে বুকেরপাটায়, হৃদয় সৈকতে। বিলাপদিয়ে কেঁদে হালকা হতে মন চাচ্ছে। কিন্তু কান্না আসছে না। চাপাকান্না নিয়ে এগোচ্ছি আর দেখছি। রাস্তার পাশে খোলা আকাশের নিচে, বৃদ্ধ-যুবক-তরুণ-নিস্পাপ শিশু, পুরুষ-মহিলাদের বাঁকা মুখের চাহনি। একটু আশ্রয় পাবার আশায় রাস্তার ধারে, পাহাড়ের গলিপথে, গাছের নিচে গোলাকারে বসে আছে জালিমের তাড়নায় বেরিয়ে আসা অসংখ্য বনি আদমের আহাজারি। গাড়ীর শব্দ আর লোকাওয়াজে অনিচ্ছায় বেরিয়ে আসা কম্পন লম্বা হাতের হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য! সহযোগীতা পাবার আশায় সিএনজির পিছনে আবাল বৃদ্ধের দৌঁড়ানোর নির্মম চিত্র! ড্রাইভার হাইস্প্রিটে এগিয়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে আপাতত চুখ বুজে, শক্তমনে আমরাও বাধ্যহয়ে আগাচ্ছি। গাড়ী চলে আসলো। আল্লাহর নাম নিয়ে নামলাম।

রাস্থাঘেষে নতুন পুরাতন, রেজিস্টার্ড ও আনরেজিস্টার্ড অনেকগুলো ক্যাম্প। লাল সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলছে। পিনপতন নিরবতা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে। বাতিকপি জলে ওঠতে শুরু করছে ঝুপড়ির ভেতর। লাজুক কিছু মহিলা ও শিশু উঁকি দিচ্ছে আমাদেরে দেখে। কিছু সাহসীরা চলে আসলো একদম কাছে। আস্তে আস্তে সমাগম। এ অবস্থায় আমরা...!!!
#চলবে ইনশাআল্লাহ। যদি টাইম আমাকে সময় দেয়।
No comments:
Post a Comment