ইমদাদুল হক নোমানী এর রোহিঙ্গা সফরনামা-৩

...পড়ন্ত বিকেল। শীতের আমেজ, হীমেল হাওয়া। শরণার্থী রোহিঙ্গা মজলুম ও কৌতুহলী দৃষ্টিতে ক'জন মানুষ আমাদের চারপাশে। দ্রুত স্থান ত্যাগ করা নিরাপদ ও সমিচীন। আমরা ছুটে চললাম স্থানীয় মসজিদের দিকে। মসজিদের মিনার হতে মুয়াজ্জিনের আযান। আমরা সালাতুল মাগরিব আদায়ে ঠুকে পড়লাম মসজিদে। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নামায শেষে দলবদ্ধভাবে ক্যাম্পে যাওয়ার কথা। কিন্তু এ মুহুর্তে এই পলিসি নিরাপদ ও কার্যকরী মনে হচ্ছে না। এককভাবে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। সাথী ভাইদের উপস্থিত মনোপোত না হলেও পরবর্তীতে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

মসজিদে পূর্ব থেকে অবস্থান করছিল কাকরাইল হতে আগত তাবলীগের চিল্লার এক জামাআত। পরিচয় পর্ব শেষে আমরা দ্রুত মিশে যাই তাদের সাথে। সাথে থাকা হ্যান্ডব্যাগগুলো রেখে দেই তাদের ইজতেমায়ী ছামানায়। খোঁজ নিলাম তাদের গাশতের আমলের রাহবার। সহসাই পেয়ে গেলাম সেই ব্যক্তিকে। সন্ধ্যার আগে সংগ্রহ করা হয়েছে এখানের সর্ববৃহৎ রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের মসজিদের ইমাম সাহেবকে। হাটহাজারী হতে দাওরা ফারেগ মাওলানা জিয়া ভাইকে আমাদের আগমণের কারণ, পরিকল্পনা জানিয়ে তার সহযোগিতা চাই। নিরাপত্তার অজুহাতে প্রথমে না বললেও আড়ালে পথপ্রদর্শক হবার সম্মতি দেন। এবারে আমাদের রাহবার হলো, তিনজন। রাসেল, জিয়া আর জাহেদ ভাই। আমরা তিনজন রাহবার নিয়ে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হই। একজন রাহবর অপরজন মুতাকাল্লিম। মূল রাহবার Aslam Bin Zahir ভাই মসজিদে থাকবেন ছামানা পাহারাদারি ও যিকিরে-ফিকিরে। বাহিরের পরিস্থিতি আপডেট দিবেন মোবাইলে। এরিয়া ঠিক হলো। আবুল কালাম আজাদ ভাই যাবেন পুরনো ক্যাম্পে নতুন আশ্রিতদের উদ্দেশ্যে, Haris Uddin ভাই যাবেন পার্শবর্তী হাসপাতালে আর আমি ইমদাদুল হক নোমানী যাব নতুন ক্যাম্পে অবস্থানরত শরণার্থী ঝুপড়ীতে। সব ঠিকঠাক। আল্লাহর নাম নিয়ে এবার আমরা বেরিয়ে পড়লাম গাশতের নামে (হেকমত) আমাদের মূল মিশণে। 

আমার সাথে স্থানীয় হাইস্কুলের নবম শ্রেণী ছাত্র রাসেল। মসজিদের পাশের বাড়ী তাদের। ইতিমধ্যে সে তাবলীগে তিনদিন করে তিনবার সময় লাগিয়েছে। মহল্লার মসজিদে জামাআত আসলে সে প্রায়ই আম ও খুসুসী গাশতে রাহবারী করে। আমি তাকে নিয়ে হাঠছি ক্যাম্প লক্ষ্য করে। গাশতের মাওকা এদিকে নাই বলে সে আমাকে দিক পরিবর্তন মাশওয়ারা দিল। আমি তাকে দ্বীন সবার জন্য, দাওয়াতের মেহনত আম এগুলো বলে মেহনতের তাকাযা পেশ করতেই সে মাথানেড়ে সম্মতি ও উৎসাহিত হলো। চলে আসছি ক্যাম্পের কাছে। রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা জীর্ণকুঠির। মুলিবাস দিয়ে চটের দেয়াল আর কালো পলিথিনের ছাদ। কাদামাটির প্লোর। বিছানাবিহীন মাঠির মানুষ মাঠিতে বসে মহিলা তার ছোট্ট শিশুকে কি যেন বলছে। এগিয়ে গেলাম কড়াবিহীন দরজার পাশে। আগন্তুকের আওয়াজ শুনে অন্ধকারাবৃতা মহিলা কেপে ওঠলেন। ভয়ার্ত মজলুমার কোলে ভয়ে আশ্রয় নিল তার মাসুম বাচ্চাটি। আমার চুখের বাধ ভেংগে গেল এ করুণ দৃশ্যে। অভয় দিলাম আমি নরপশু বৌদ্ধ নয়; আমি তোমারি স্বধর্মের একজন মুসলমান, মুসাফির। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আদর করলাম, কিছু.. দিয়ে পাশের ঝুপড়ীতে ঢুকলাম। ৭টি ঝুপড়ী পাড়ি দিতেই পুরো ক্যাম্পে খবর ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের অবস্থান। মুহুর্তেই আমাদের পাশে এসে উপস্থিত ক্যাম্পের মালিক। রাসেল আমার উদ্দেশ্য বুঝে এতক্ষণ নিরব ভূমিকায় রাহবারী করছে। এবার মুখখোল্ল। বল্ল, আর পকেটে হাত ন দিয়ন। ইবারে দাওয়াত দ্যন। সালাম দিয়ে কোশল বিনিময় করলাম, মুরব্বিপ্রায় মানুষটাকে। দেরী না করেই বলে দিলেন, আমার এখানে ১১৫টি পরিবার। সবাই নতুন। কিছু দিতে হলে আমার কাছে লিস্ট আছে। দিলে সবাইকে দিন। সময় না থাকলে আমার কাছে দিয়ে যান, আমি সবাইকে ডেকে দিয়ে দেব। আমি বললাম, আপনাদের পাশের মসজিদে জামাআত এসেছে, আমি আসছি দেখতে। বেচারা বুঝেও হয়তো আর আগাননি। আমি গল্প জমিয়ে দিলাম। জানতে পারলাম, উখিয়া-টেকনাফ মেইন রোডের পাশের এই সরকারী জমি উনার দখলে। আটহাত করে ভাড়া দেন। ঘর বানাবে নিজ দায়িত্বে। মাসিক ভাড়া একহাজার টাকা! ক্যাম্প ঘুরে দেখলাম কাচাল্যাট্রিন ২টি, টিউবওয়েল বসিয়েছেন ১টি। অন্ধকার, দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে দেখে বেরিয়ে আসলাম মেইন রাস্তায়।

রাস্তায় বিশোর্ধ লোকের জটলা। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ঘিরে ধরলো আমাকে। কানে কানে বললাম রাসেলকে, তুমি বল হুজুর আপনাদেরকে কি যেন বলতে চান, শুনেন! শুরু করলাম ঈমান-ইয়াকীনের কথা, ঢাকা ইস্তেমা, চিল্লা ও তিন চিল্লার তাশকিল। আস্তে আস্তে সমাগম কমতে লাগলো। কিছুসময়ের ব্যবধানে দুইজন বয়স্ক মানুষ ছাড়া সবাই বাঁচি মা, ভিক্ষার দরকার নাই মানসে চলে যেতে লাগলো। রাসেলকে নিয়ে ঢুকলাম আরেকটি ক্যাম্পে। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা। জানালেন তার স্বামী শহীদ হয়েছেন। বড় ছেলে বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়। শূণ্য ঘরে অচল সন্তানকে রেখে বাকী দুটি শিশুসন্তানকে বাঁচাতে এখানে পালিয়ে আসেন আজ এগার দিন। খবর পান, রেখে আসা সন্তানটিও চিকিৎসার অভাবে মারা যায় দুইদিন আগে। ফুফিয়ে কাঁদছেন মহিলা। বাকরুদ্ধ। এভাবে একে একে ছয়টি ক্যাম্পে যাই।

এশার নামায অত্যাসন্ন। হারিছ ভাই ফোন দিলেন ভয়াল কন্ঠে। জানালেন, কাঁচাঘরের অস্থায়ী হাসপাতাল থেকে বের হতেই তার কানে শব্দ আসে, একজন ফোনে বলছে, এইমাত্র বের হয়েছে! চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। দূরে আরো কয়েকজন। সকলের চুখ আমার দিকে। রাহবার নাই। ব্যাটারিচালিত রিক্সায় দ্রুত চলে আসছি একরকম পালিয়ে। পরিস্থিতি ভালো নয়, চলে আসুন। আসলামও সবাইকে ফিরে আসতে তাগাদা দিচ্ছে। আমিও শান্তধিরে পথিকদের নামাজের দাওয়াত দিতে দিতে মসজিদের দিকে রওয়ানা হই। ফোন দিলাম আজাদ ভাইকে কয়েকবার। রিসিভ হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর বেক করে বললেন, আসছি। ছামানা গাড়ীতে তুলে আমরা অপেক্ষা করছি, কিন্তু না এখনো আসছেন না। টেনশন এসে ভর করলো। মসজিদে আকামত হচ্ছে। আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, দ্রুত হেটে আসছেন একজন মুসল্লি। না, আজাদ ভাই। রাহবার কই? কাপাকন্ঠে বলছেন, পিছনে। একসাথে বের হয়ে এসেছি। কিন্তু রাস্তায় প্রায় পনেরজন লোক হবে আমাদেরকে ঘেরাও দিয়েছিল....

চলবে, ইনশাআল্লাহ।

No comments:

Post a Comment