ইমদাদুল হক নোমানী এর রোহিঙ্গা সফরনামা-৫


... কেয়ারী সিন্ধাবাদে ঘুরেছি নাফের পাড়ে পাড়ে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন-টেকনাফ। সূর্যের আলো বিদায় নিয়েছে সারাদিন পৃথিবীকে আলোকিত করে। আমরাও ছুটে চললাম টেকনাফ ছেড়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।

রাতের অন্ধকার ভেদকরে গাড়ী চলছে। যাত্রীরা পরস্পর আলোচনা-আড্ডায়। প্রবালদ্বীপ, নারিকেল ঝিঞ্জিরা, সমুদ্রবিলাস আর সাগরপরীর দ্বীপ নিয়ে। তাদের আলোচনা-অনুভূতি আমার মন জয় করছে না। আগ্রহ-উদ্দীপনা কাজ করছে না। চুখের সামনে ভেসে ওঠে শুধু ওপারের রাখাইন আর মংডু জেলার নিবৃত পল্লির নির্যাতিত মানুষের ছায়াচিত্র। সানাই যেন বাজিয়েই যায়, হাহাকারের করুণ সূরধ্বনি। মজলুম বনিআদমের আর্তনাদ আর ফরিয়াদ- "হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে বের কর এ নির্যাতিত জনপদ থেকে। আমাদের উদ্ধারে পাঠাও, কিছু বিবেকবান প্রতিনিধি-উদ্ধারকারী এবং একনিষ্ঠ সাহায্যকারী। "
গাড়ী এসে থামলো কক্সবাজার। টার্গেট কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল। পূর্বথেকে অপেক্ষমাণ তিনজন ভাই। যারা নবাগত শরণার্থীদের সেবায় নিয়োজিত। জালেমদের নির্যাতনের শিকার মুমূর্ষু আহত রুগী, শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসাসেবা দেন অন্তরিকভাবে। ছাড়পত্র পেলে আশ্রয়দেন কোন ক্যাম্পে নয়তো কোন এক আনসারের তত্ত্বাবধানে। চিকিৎসা তহবিল গঠন করে সাধ্যানুযায়ী পাশে দাঁড়াচ্ছেন মজলুমদের খেদমতে। মূল দায়িত্বে আছেন, স্থানীয় বাসিন্দা মাওলানা আবুল কালাম ভাই। আমাদেরকে সাদরে রিসিভ করলেন। সোজা নিয়ে গেলেন হাসপাতালের পাঁচতলায়। প্রতিদিনই নতুন তালিকা তৈরী হয়। যোগ-বিয়োগ হয়। আপডেট নবাগত ও ইমার্জেন্সীদের তালিকা হাতে দিলেন। ইশারায় দেখিয়ে দিলেন রুগীদের বেড ও অবস্থান।
বহিরাগত দর্শণার্থীদের আনাগোনা এবং প্রকাশ্যে নগদ টাকা প্রদান সরাসরি নিষেধ না থাকলেও টার্গেট করা হয় ভিন্নঅর্থে। হাসপাতালে একশ্রেণীর দালালও আছে, যারা এসুযোগকে কাজে লাগায়। আরো একপ্রকারের লোভী মানব আছে যারা স্বেচ্ছায় নিজেদেরকে রোহিঙ্গা দাবী করে হৃদয়স্পর্ষী অভিনয় করে এবং কামাই করার ধান্ধা করে। আমরা তালিকাভুক্তদের খোঁজে খোঁজে অবস্থানুযায়ী কিছু নগদ টাকা দিতে সক্ষম হই। সেসাথে পার্শ্ববর্তি ডিজিটাল হাসপাতালেও (প্রাইভেট ক্লিনিক) কিছু মুমূর্ষু রোগিণী ও নব্যভূমিষ্ট শিশুকে দেখতে যাই এবং সহযোগিতা প্রদান করি।
একজন বয়স্ক আলেম। যার পিঠে ও রানে দায়ের অসংখ্য কুপ। আরেকজন মধ্যবয়সী যুবক। যার তলপেটে আঘাত। ভূড়ি যেন বের হয়ে আসতে চায়। ব্যায়বহুল চিকিৎসা। তার চুখ-মুখে বাচার আকুতি। ধার্মিক বৃদ্ধ মহিলা। দৌঁড়তে গিয়ে পা দু টুকরো। মাথাঢেকে তাসবীহ পড়ছেন। আল্লাহর রাহমাত কামনা করছেন। একটু সহযোগিতা পেলে হৃদয় উজাড় করে 'শুকর-আলহামদুলিল্লাহ' বলে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে সাহায্যকারীদেরকে ভাবিয়ে তুলেন। বিকলাঙ অনেকগুলো শিশু। পাশে তার মা। আগন্তুকদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বাকরুদ্ধ অসহায়নী মা। কিছু জিজ্ঞেস করলেই কান্নার আওয়াজ। কথা না বলেই ফিরে আসি। একজন জন্মদ্রাত্রী মা। সেলাইন চলছে। পাশে শুয়ে আছে, নব্যভুমিষ্ট কংকাল শিশুটি। পুষ্টির অভাবে মা-সন্তান মৃত্যুর প্রহর গুনছে। অবস্থাদৃষ্টে ঠিক থাকতে পারিনি। কিছু নগদ টাকা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসি। চুখ মুছতে মুছতে সিঁড়িতে পা ফেলছি। পা আগাচ্ছে না। সাথে থাকা আবুল কালাম আজাদ ও Haris Uddin ভাইদেরও চুখ লাল হয়ে আছে। মুখ ঘুরিয়ে একে অন্যের আড়ালে চুখের জল মুছি। ভাই Aslam Bin Zahir কফি শপে নিয়ে ডুকলো। স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করলো। এখানে বসেই পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলো।
ইতিমধ্যে সন্ধান পাওয়া গেল রাখাইন ফেরত একজন মুফতি ও জনপ্রতিনিধির। ইন্টারনেটে দেখা মায়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে একজন বড় আলেম ও প্রখ্যাত খতীব হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী...
>>>
চলবে, ইনশাআল্লাহ।

No comments:

Post a Comment