ইমদাদুল হক নোমানী এর রোহিঙ্গা সফরনামা-৬


একজন মুখলিছ মুফতি ও আলেমেদ্বীন। নাম...। রাখাইন রাজ্যের...অঞ্চলে বাড়ী। কষ্টার্জিত লক্ষাধিক টাকায় ক্রয় করেছিলেন, ফতওয়ার কিতাবসহ অনেক দুর্লভ কিতাবাদী এবং রেসালাহ। গড়ে তুলেছিলেন, ব্যক্তিগত পাঠাগার। সাজিয়েছিলেন তার ঘরেই সংগ্রহশালা। মুতায়ালা (অধ্যয়ন) করতেন দ্বীনের পাণ্ডিত্য অর্জনে নিরবে-নির্জনে। স্বপ্নের সাধনা, অর্জন শহস্রাধিক কিতাবাদী আজ নিজের আয়ত্বে নেই। সন্তান কিংবা বাবা-মা হারানোর চেয়ে বেশী বেদনাজনিত কন্ঠে বলেন, "আমি আজ নি:স্ব। বৌদ্ধ সন্ত্রাসিরা আমার ব্যক্তিগত পাঠাগার তছনছ করে দিয়েছে। জানিনা, তারা আগুনদিয়ে জালিয়ে দিল কি না। আমার জীবনের সাধনা, সম্বল ও স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে।" শান্তনা দেয়ার ভাষা নেই। তিনি নাফনদী পার হয়ে আসা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনপথ পাড়ি দিচ্ছেন। স্বপ্ন দেখছেন তার গচ্ছিত প্রাণাধিক প্রিয় কিতাবের পাশে ফিরে যেতে।
 
একজন নন্দিত জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় মেম্বার। শিক্ষিত গ্রাজুয়েট পার্সন। পাশাপাশি ব্যবসায়ী। ফার্মেসি, চাউলের আড়ত ও রড-সিমেন্টের দোকানের মালিক। মা হারিয়েছেন। বাবাও নাই। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জলে পুড়ে ছাই। নিজ বসত ঘরে আগুন। আপন বোন নির্যাতন ও ধর্ষনের শিকার। শেষতক আর থাকা সম্ভব হয়নি। যুবতী দুই মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে রাতের আধারে আসতে বাধ্য হন। ডিঙি নৌকায় অনেক টাকা ভাড়া করে নাফ নদি পাড়ি দিলেন। আশ্রয় নেন দূরাত্বীয় একজনের বাড়ীতে।

দীর্ঘক্ষণ কথা হলো। কাঁদলেন, কাঁদালেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়েই চুখের জল ফেলেন। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিটি মুহুর্ত কাটাচ্ছেন মানুষটি। সুখে থাকা মানুষটি কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান। গেঁজাগেজি করে থাকা আশ্রিত ঘর যেন জেলখানা। এ যেন গারদে হাজতীর বসবাস। বাসা ভাড়া নিবেন। গৃহসামগ্রী-হাড়িপাতিল? দুমোট খাবার? মেয়েগুলোর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ? এনিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তামগ্ন ভাইটিকে কি দিয়ে, কিভাবে শান্তনা দেয়া যায়! সামর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার করে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেছি। পরবর্তী আশ্বাস দিয়েছি। কিন্তু....?

একজন উঁচুমানের আলেম ও হাফেয। রাখাইনের শাহী মসজিদের খতীব। নিরলস দায়ী ও বক্তা। মজলুম মানবতার বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছিল যার সাহসী প্রতিবাদ ও উচ্চারণ। মাওলানা দ্বীন ইসলাম। যাকে মায়ানমারের সেনাবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে, নিহত লাশে মুজাহিদী লেবাস (!) পড়িয়ে, একে ৪৭ হাতে দিয়ে নির্লজ্জ তুহমতের কলপ লেপন করে, বিশ্ববাসীর কাছে একজন জঙ্গী হিসেবে ব্যর্থ প্রমাণের অপচেষ্টা করেছিল। আমরা ভার্চুয়াল জগতে অনেকেই হয়তো এ করুণ দৃশ্য দেখেছি।

শহীদ এ হযরতের একজন বয়স্ক মুসল্লি, নিকটতম সাথীর সাথে দেখা হলো। নির্মম হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলেন। কাপাকাপা কন্ঠে স্বদেশীয় ভাষায় বর্ণনা দিতে লাগলেন। নিজে বেচে আসার কাহিনিও বললেন। তার কান্নার আওয়াজে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠল। রুম নিরব-নিস্তব্ধ। সবার চুকে মুখে পানি। বুকে চিনচিন...। বুকের ব্যথা অশ্রুপাত করে। বেদনার মরমী নি:শ্বাস। তিনি নিজে কাঁদছেন। আমাদেরে কাঁদাচ্ছেন। সইতে পারছি না। এমতাবস্থায়.....।
------------
চলবে, ইনশাআল্লাহ।

No comments:

Post a Comment