...রাত সাড়ে আটটা। শীতের তীব্রতা বেড়েই চলছে। শুনশান নিরবতা। আমরা বসে আছি সিএনজিতে। তিনি এখনো আসেননি। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলেন, অপেক্ষিত রাহবার। হাপাতে হাপাতে বললেন, কিছুকিছু দিয়ে কোনরকম রেহাই পেলাম। আমরা তাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। সালাম-মুসাফাহার মাধ্যমে আনসার ও রাহবারদের কাছ থেকে দ্রুত বিদায়ের পর্ব শেষ করে নিলাম।
এবার টার্গেট লেদা ও হ্নিলা। আবার শুরু হলো টেকনাফের রোডধরে আমাদের পথচলা। অন্ধকার রাত। রাত গড়িয়ে মধ্যরাতের আলিঙ্গনের অপেক্ষায়। ছোট-বড় পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সড়ক। সিএনজি এগুচ্ছে তিমির রজনীর অন্ধকারকে অবারটেইক করে আপন গতিতে। ঝিঝি শব্দে মুখরিত কিন্তু পরিবেশ বিষণ্ণ। এতোরাতে মানুষ রাস্তার কিনারে, গলিপথে? পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে কিংবা গ্রাম্য-পাহাড়ী সাজোয়াল যুদ্ধারা প্রতিবাদ-প্রতিশোধের নেশায় রাস্তায় স্বদলীয় অবস্থান? না, এতো দিনের বেলার সেই করুণ চিত্র! এরাতো আমার দেশের মুক্তবাতাস গ্রহণকারী স্বাধীন জনগণ নয়। ওরা বর্বর নির্যাতনের শিকার, বাধ্যহয়ে আসা পরাধীন, রিফুজি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী! আবাল, বৃদ্ধ ও নিষ্পাপ শিশু বনি আদমের খোলা আকাশের নিচে এ নির্মম অবস্থান বিবেককে কষাঘাত করছে। হৃদয়ের কন্দরে বিষাদের হিমেল হাওয়া উল্কার বেগে বইছে। অশ্রুপাত করে দেখতে দেখতে পৌঁছালাম হ্নীলা। সেখানে দেখা হলো কিছু শরণার্থীদের। এ সুযোগে দেখে নিলাম, ছদর সাহেব রাহ. এর মাদ্রাসা নামে পরিচিত হ্নীলা দারুল হাদীস জামেয়া। কথা হলো, দু'জন শিক্ষকের সাথে। জানা হলো, এ মাদ্রাসায় কিছুদিন আগে ভিজিট করেছেন, সিলেটের আলেম সমাজের অহংকার, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সাবেক সাংসদ মাওলানা Shahinoor Pasha Chowdhury সাহেব। রাত ১২টার দিকে আমরা সালামতির সাথে পৌঁছলাম টেকনাফ থানা সদরে।
টেকনাফ থানা সদর ঘেষেই ঐতিহাসিক নাফ নদী। এ নদীর ওপারে সীমান্ত দেশ মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য। বুছিদং, রাছিদং সহ চারটি জেলা নিয়ে গঠিত এ রাজ্যের মংডু শহর নাফের পাশঘেষে। দেখা যায়। সবচেয়ে বেশী নির্যাতন হয় এ জেলায়। কাউয়ারবিল, ওয়াবেক, নারিবিল, কেয়ারীপাড়া, জামুইন্যা, রাফাইল্যা, বর্গজিবিল, কোলাবিল সহ কয়েকটি ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য। এখানকার জামুইল্যা, গজারবিল ও ছোট গজারবিল এলাকায় এখনো নির্যাতনের ফলে জনমানব শূণ্য। সেন্টমার্টিন যেতে কিছুদূর সামনে মায়ানমারের শেষ ভূখণ্ড নাইকাংদিয়া। কাটাতারে বেড়া। এর ভিতরেই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম ও নৃশংস অপরাধ এবং মুসলিম নিধনের হোলিখেলা সংঘঠিত হয় এবং হচ্ছে।
ভোরবেলা আমরা এসব এলাকা পরিদর্শন করতে বের হই। কেয়ারী সিন্দাবাদযোগে আমি ইমদাদুল হক নোমানী, আবুল কালাম আজাদ, Haris Uddin, Aslam Bin Zahir ভাই যাত্রাকরি নদীপথে। নদীতে ভাসতেই মনেপড়ে, এ অভিশপ্ত জনপদের করুণ অমানবিকতা। নাফ নদীতে ভেসে আসা মানব-মানবির জীবন-মরণ লড়াই বা জীবনযুদ্ধের নির্মম যন্ত্রণা। চুখের সামনে ভেসে ওঠে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও নরপশু, পিশাচ বৌদ্ধ মানবরূপী হায়েনাদের হাতে শহীদ হওয়া মুসলিম মানবদেহের ভাসমান লাশ! দেশান্তরি হতে নদীর দ্বারে অপেক্ষমান মজলুম রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচার সারিবদ্ধ মিছিল। নদী পার হতে না পেরে মাঝ নদীতে ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রী মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুদের একটু বেচে থাকার আর্তনাদ। পানির নিচ থেকে ভেসে ওঠা ফুলন্ত লাশ! পুশইন করে ফিরিয়ে দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার অমানবিক দায়িত্ব(!)। মানবাধিকারকে গলাটিপে হত্যা আর বিশ্ব বিবেকের নিরাপদ ভূমিকা ভাবিয়ে তুলে।
নাফের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে সাথে মনের ভেতর তরঙ্গ বইছে, কাটাতারের ভেতর কী অবস্থা বিরাজমান। দিনের আলো বিদায় নিচ্ছে। মজলুমানদের পাশ থেকে যাই কী করে? সুযোগতো নেই, ভেতরে যাবার! খন্ডিত হৃদয়ে ফিরে এলাম আবার টেকনাফ। সাধ্যে ও নিয়মের গন্ডিতেই থাকতে হবে। ছুটে চললাম...
-----
চলবে, ইনশাআল্লাহ।
No comments:
Post a Comment