ইমদাদুল হক নোমানী এর রোহিঙ্গা সফরনামা-৮


...রাবাইল্যা এলাকার একজন ধর্মপ্রাণ মুসল্লী। দেখা হলো থানা সদরের...। অনেক শহীদের প্রত্যক্ষদর্শী ইভেন হাফেজ মাওলানা খতিব দ্বীন ইসলামেরও। সাদা দাড়িওয়ালা কালো মানুষ। বয়স ষাটোর্ধ। সাহসে একজন তরুণ, টগবগে যুবক। হিম্মত অনেক। লড়েছেন বৌদ্ধদের সাথে কিছুদিন। শেষতক পারেন নি। ঠিকে থাকা সম্ভব হয়নি, গেরিলাদল আকাশপথ বেছে নেয়ায়। অবশেষে বাধ্যহয়ে রাতের আধারে পাড়ি জমালেন সীমান্তদেশে, একটু আশ্রয় ও বেঁচে থাকার আশায়।
-
থেমে থেমে গেরিলা আক্রমণ। মানবহত্যা মহা পাপের শ্লোগানধারী, সুযোগসন্ধানী বৌদ্ধ মিথ্যুক শয়তানেরা গ্রহণ করে প্রতারণার আশ্রয়। সরলমনা মুসলমানদের বোকা বানাতে তারা কৌশলী হয়। অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করে তারা রণকৌশলে নেমে পড়ে।
মুসল্লিশূণ্য ফাকা মসজিদ। মিনারে নাই আযানের ধ্বনি। ভয়ে রাস্তায় নেই মুসলমান। নিরাপদে, আত্মগোপনে অবস্থান করছে যার যার মতো। হঠাৎ মসজিদের মিনার হতে আযানের ধ্বনি। চলার পথে, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নামাজের এ'লান। মুসল্লীদের প্রাণ ফিরে আসে। মনে করে ফতেহ হয়েছে। নিরাপদ তাদের রাজ্য। মুক্তি তাদের হাতছানি দিয়েছে। বিশ্বাসের বলে সবাই বেরিয়ে আসে রাস্তায়। ছুটে যায় মসজিদের দিকে।
গিয়ে দেখে বুমেরাং। হাসিমুখগুলোতে আবার কালোছায়া। প্রতারকরা মুসলমানদের টুপি মাথায় দিয়ে, জোর করে একজনকে দিয়ে আজান দিয়ে মসজিদে জড়ো করে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মুসলমানদেরকে বোকা বানিয়ে নির্দয় পাষণ্ডরা নির্বিচারে হত্যা করছে। প্রতারক কৌশলি বৌদ্ধ নামক পশুরা বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠছে। জালিমদের এমন জুলুমের বর্ননা দিচ্ছেন বেচেথাকা মুসল্লী দ্বীন ইসলাম। কান্নায় এবং দু:খে যেন মুর্ছে যাবার অবস্থা। এদিকে আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রামে অংশ নিতে বের হবার তাগাদা দিচ্ছেন রাহবার। তার কাছ থেকে কীভাবে বিদায় নেই? ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে ছুটে চললাম পরবর্তী মঞ্জিলের দিকে। আর ভাবতে থাকি, এপ্রিলফুল এবং তুরস্কের সেই ইতিহাসের কথা!
-
রাখাইন রাজ্যের একাধিক মাদ্রাসার কিছু ছাত্র ভাইয়েরা কক্সবাজারের বিভিন্ন মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে। আমরা খোজ নিয়ে তাদের সন্ধান পেলাম। দু'দিন আগ থেকেই যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনা করে তাদের কিছু অংশকে জমায়েতের সিদ্ধান্ত হলো। জেলা শহরের একটি মাদ্রাসায় তাদেরকে জমায়েত করা হলো। আমরা উপস্থিত হলাম। ভাইগুলোর নির্মল চেহারাগুলো দেখে কষ্ঠ লাগছে। তাদের চোখেমুখে অসহায়ত্বের চাপ, হারানোর বেদনা। অশ্রুসিক্ত তালেবে ইলমদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা রাখলাম। মনে হলো কিছুটা সাহস এবং শক্তি তাদের অন্তরে রেখাপাত করেছে। আশাহত দ্বীনীবন্ধুরা আশান্বিত হলো। সিদ্ধান্ত নিলো, কোন অবস্থায়ই তাদের দেশ থেকে আসা কাউকেই অভাব-অনটনের সুযোগে ঈমান বিক্রি করতে দেবে না। ঈমানের সাথে সকল পরিস্থিতি মুকাবেলা করতে সবাইকে উৎসাহিত করবে। আমরা তাদের হাতে কিছু নগদ টাকা এবং তাদের পক্ষে আলাদাভাবে আবাসিক খরচ বাবত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের নিকট কিছু জমা দেই।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আমাদেরে সানন্দে ও সম্মানে বরণ করেন। তাদের প্রশংসনীয় মেহমানদারী আমাদেরে বিমুগ্ধ করে। মুদাররিসদের অমায়িক ব্যবহার ভুলবার নয়। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। সময় বা'আছর। পড়ন্ত বিকেল। পশ্চিমাকাশে লাল সূর্য। সাগরে ডুবন্ত সূর্য দেখতে নাকি নান্দনিক। বিশ্বের বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। আমাদের অবস্থান কাছেই। সাথী ভাইদেরো দেখার আগ্রহ। টানা সফরে আমরা ক্লান্ত, শ্রান্ত। যান্ত্রিক জীবনকে একটু প্রশান্ত, মানসিক ও শারিরিক অবস্থার পরিবর্তনেরও প্রয়োজন। আমরা হাজির হলাম সাগরপাড়ে। শক্তিমান মাওলার অফুরান সৃষ্টি, কুদরতি খেলা অবলোকন করলাম। এখানে আসা সবাই মনে হলো স্বাধীন, সুখী ও সমৃদ্ধ। কিন্তু কাছেইযে রাখাইনের রোহিঙ্গা বনিআদমগুলো.....! ভাবনার ঢেউয়ে ভেসে যাই সাগরের উত্তাল তরঙ্গে। নির্যাতনের বেলাভূমিতে সৈকতের নির্মল হাওয়া, সূর, পরিবেশ......
---
চলবে, ইনশাআল্লাহ।

No comments:

Post a Comment